#আকাশ_জুড়ে_একা_আমি
#লামিয়া_ইসলাম
#পর্ব_২৬
(শব্দসংখ্যা ১৪০০+)
দুই বার কল হতেই নাজমা বেগম ফোন রিসিভ করলেন। ফোন রিসিভ করেই চিন্তিত স্বরে বললেন,
“কই আছিস তুই?বাহিরে এতো বেশি ঝড় বৃষ্টি হচ্ছে তোর কোনো খবরই নেই।”
মেঘলা মৃদু স্বরে তার মাকে বললো,
“মা বাহিরে অনেক বেশি ঝড় হচ্ছে। এই ঝড়ে ওনার জন্য গাড়ি ড্রাইভ করা রিস্ক হয়ে যাবে। তাই আজকে রাতটা হয়তো এখানেই থাকা লাগবে।”
মেঘলার কথা শুনে নাজমা বেগম বেশ খুশি হয়ে বললেন,
“আরেহ কোনো সমস্যা নেই। ওখানেই থেকে যা।”
“ঠিক আছে মা।”
নাজমা বেগম ফোন কেটে আলহামদুলিল্লাহ বললেন। ফাইনালি আল্লাহ তার মনের কথা শুনেছে। এবার তার বড় মেয়েটার ও একটা সংসার হবে।
আরশাদ ল্যাপটপে বসে কাজ করছিলো। হুট্ করে মেঘলার উপর নজর পড়তেই খেয়াল করলো সে সোফায় বসেই ঘুমাচ্ছে। দুই তিনবার ডাক দেয়ার পরেও তার কোনো সাড়া পাওয়া গেলো না । তাই আরশাদ তাকে কোলে নিয়ে বেডরুমে শুয়িয়ে দিলো। আজ বেশ ঠান্ডা তাই মেঘলার গায়ে একটা চাদর ও টেনে দিলো। তারপর আরশাদ নিজে ড্রয়িং রুমের সোফায় এসে শুয়ে পড়লো। যদিও তার ঘুম আসলো না। এতো সুন্দর বউ যদি বাসায় থাকে তাহলে এমন আবহাওয়ায় কোনো পুরুষেরই ঘুম আসবে না। তাই তো শোয়া থেকে উঠে আবার ল্যাপটপে কেস ফাইলগুলো দেখা শুরু করলো।
————–
রাতে ঝড় বৃষ্টি হওয়ায় সকালের আবহাওয়া বেশ ঠান্ডা। তাই মিতা ফরাজী বাসার সবার জন্য ভুনা খিচুড়ি আর ইলিশ মাছ ভাজা করেছেন। এই পদটা আরশাদের ও খুব পছন্দ করে । তাই তো আরশাদের জন্য গরম গরম খিচুড়ি আর ইলিশ ভাজা নিয়ে তার বাসায় এলেন। সাথে আদনান ফরাজী ও এসেছে।আরশাদের ফ্ল্যাটের এক্সট্রা চাবি তার কাছে আগে থেকেই ছিলো। ফ্ল্যাটে ঢুকে ভিতরের রুম থেকে ওয়াশরুমের পানির শব্দ পেয়ে সে কিছুটা স্বস্তি পেলো।ভালোই হয়েছে ছেলেটা এখনো অফিসের জন্য বের হয়নি। গরম গরম খাবারগুলো খেতে পারবে। বেডরুমের দরজা অর্ধেক খোলাই ছিলো তাই সেদিকে তাকাতেই তারা দুইজনেই ৪২০ ভোল্টেজের জটকা খেলো। আরশাদের বেডরুমে একটা মেয়ে শুয়ে আছে। মিতু ফরাজী নিজের স্বামীকে হাত দিয়ে ধাক্কা মেরে বললেন,
“আরশাদের বাবা আমি কি ঠিক দেখছি? না এটা আমার ভ্রম?”
“আমিও বুঝতে পারছি না, মিতা।হয়তো আমার চশমার পাওয়ার কমে গিয়েছে।”
বেডরুমে শুয়ে থাকা মেয়েটি উল্টো পাশে ঘুরতেই তারা দুইজন আরো একবার অবাক হলো। এবার মিতা ফরাজী উচ্ছাসের সাথে বললেন,
“না না। আমি সব ঠিকই দেখছি। ফাইনালি আমার বড় ছেলেটা লাইনে এলো।”
আরশাদ ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে নিজের বাবা মা দেখে বেশ অবাক হলো।
“তোমরা হঠাৎ এখানে?”
” তোর জন্য খিচুড়ি আর ইলিশ ভাজা নিয়ে এসেছি।”
“তোমরা বসো। আমি তোমাদের জন্য কফি বানাচ্ছি।”
এবার মিতু ফরাজী আদনান সাহেবকে তাড়া দিয়ে বললেন,
“আরেহ না না। তোর বাবার অফিসের দেরি হয়ে যাচ্ছে। বৌমার সাথে অন্য একদিন দেখা করবো।”
এই কথা বলেই মিতু ফরাজী তার স্বামীকে নিয়ে তড়িঘড়ি করে দ্রুত বের হয়ে গেলেন। বেডরুমে শোয়া মেঘলার দিকে খেয়াল হতেই আরশাদ কিছুটা লজ্জা পেলো। ইশ তার মা বাবা কি না কি মনে করলো যেনো। তারা তো আর জানে না যে তাঁদের ছেলে সারারাত সোফায় শুয়ে শুয়ে মশার কামড় খেয়েছে।
———————-
মেঘলার যখন ঘুম ভাঙলো তখন বাজে ১২ টা। মোবাইলে ঘড়ির টাইম দেখে সে আঁতকে উঠলো। সে মাথার কাছে বেড সাইড টেবিলে একটা চিরকুট দেখতে পেলো।
” আমার অফিস থেকে আর্জেন্ট কল এসেছে তাই যেতে হচ্ছে।টেবিলে ইলিশ ভাজা আর খিচুড়ি ঢাকা দেয়া আছে, ওভেনে গরম করে খেয়ে নিও। তোমার শাড়িটা শুকিয়ে গেছে আমি ইস্ত্রি করে ওয়ারড্রবে রেখেছি।টেবিলের নিচের ড্রয়ারে লকের এক্সট্রা চাবি রাখা আছে। যাওয়ার সময় দরজা লক করে চাবিটা তোমার কাছেই রেখে দিও বউউ।”
চিরকুটটা পড়েই মেঘলা আনমনে হাসলো। জীবনে এমন কাউকে পাবে সেটা সে কখনো কল্পনাও করতে পারেনি। কিন্তু কাল রাতে তার ঘুম বেশ ভালো হয়েছে। এই বাসাটা বেশ কমফোর্টেবেল। একদম খোলামেলা। এতো সুন্দর বাসাটার লোভে এখন তার এই ফরাজীর সাথে সংসার করতে ইচ্ছে করছে।
—————-
নাবিল তানিয়াদের বাসায় ড্রইংরুমে গিয়ে প্রায় আধা ঘন্টা যাবত অপেক্ষা করছে। প্রায় আধা ঘন্টা পরে তানিয়ার বাবা ড্রইংরুমে আসলেন। এসেই বেশ গম্ভীর স্বরে বললেন,
” তোমার সাহস কিভাবে হয় আমার একমাত্র মেয়ের গায়ে হাত তোলার?
” মানে বাবা? ”
” ওই মুখ দিয়ে আমাকে বাবা ডাকবে না। তানিয়া আমার একমাত্র মেয়ে। তার গায়ে তুমি হাত তুলেছ। ”
এবার নাবিল আমতা আমতা স্বরে বলল,
” আসলে মাথাটা খুব গরম হয়ে গিয়েছিল তার জন্যই..”
” আমার মেয়েকে বিয়ে করেছো তাই মাথা তোমার ঠান্ডা রাখতে হবে। তুমি কি জানো কথায় কথায় বউয়ের গায়ে হাত তোলা যে ছোটলোকদের স্বভাব। ”
এবার নাবিল তানিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো,
“আমি সত্যিই দুঃখিত, আর কখনো এমন হবে না। এবারের মত আমাকে ক্ষমা করে দাও।”
এবার তানিয়ার বাবা বেশ উচ্চস্বরে বললেন,
” দেখো নাবিল তোমার কাছে মেয়ে বিয়ে দিয়েছি শুধু তোমাকে দেখে। নইলে তোমার ফ্যামিলির সাথে আমাদের টোটালি যায় না। তোমার মা সারা জীবন গার্মেন্টসে কাজ করে তোমাদের বড় করেছে। এমনকি আমার বাসার যাকাতের বড় একটা এমাউন্ট তোমার মা নিতো। তুমি প্রফেশনাল লাইফে অনেক সফল তা দেখেই আমি তোমার কাছে মেয়ে বিয়ে দিয়েছি। আমাদের দিক থেকে একটা ছোটখাটো ভুল হয়ে গিয়েছিল চেনটা নিয়ে। তা নিয়ে তোমার মা জঘন্য ব্যবহার করেছে তারপরেও সে আমার মেয়ের গয়না চাওয়ার সাহস কিভাবে পায়? আমি শুধু একটাই কথা বলবো তোমার মায়ের সাথে আমার মেয়ের থাকা সম্ভব নয়। যদি আমার মেয়েকে আলাদা সংসার দিতে পারো তাহলে আমার মেয়ে আবার তোমার বাসায় যাবে। ”
” কিন্তু আমার মায়ের তো আমি ছাড়া আর কেউ নেই? আমাদের সাথে না রাখলে সে কোথায় থাকবে? ”
” বৃদ্ধাশ্রমে। দেখো তোমার মা যদি কোন ঝামেলা না করা ব্যক্তি হত তাহলে আমার মেয়ে অবশ্যই তোমার মায়ের সাথে থাকতো। কিন্তু তোমার মা কথায় কথায় ঝামেলা করে আমার মেয়েকে কথা শোনায়। তাই আগে তোমার মাকে ঐ বাসা থেকে বিদায় করো, তারপর আমি আমার মেয়েকে তোমার বাসায় পাঠাবো।”
নাবিল করুণ স্বরে বলল,
” আমার মা বৃদ্ধাশ্রমে যাবে? এটা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। ”
” ঠিক আছে সমস্যা নেই। আমার মেয়ে তাহলে তোমার নামে যৌতুক আর নারী নির্যাতনের মামলা করবে। তোমার নামে মামলা হলে তোমার চাকরিটাও কিন্তু যাবে। ”
” না না আপনার এমন কিছু করবেন না,আমি আমার মায়ের সাথে কথা বলে দেখছি। ”
” দেখাদেখির কোন ব্যাপার নেই,তোমার মাকে ঐ বাসা থেকে বিদায় কর। এটাই আমাদের ফাইনাল ডিসিশন। আর শুনলাম তোমার বোন নাকি পাঁচ লাখ টাকা চেয়েছে। তা না হলে নাকি তোমার নামে মামলা করবে।”
” জি। ”
” যদি তোমার মা আর বোনকে সারা জীবনের মতো তোমার বাসা থেকে বিদায় করতে পারো তাহলে তোমার বোনকে ৫ লাখ টাকা আমিই দেবো।এখন তাড়াতাড়ি যাও আর তোমার মাকে বাসা থেকে বিদায় করো।
” ঠিক আছে। ”
নাবিলের নিজেকে খুব অসহায় লাগতে লাগলো। মনে হল সে বিয়ে করে ফেসে গিয়েছে। অবশ্য নিজের বোনই টাকার জন্য তার নামে এখন মামলা করতে চাচ্ছে। সে হিসেবে তো তার শশুর শুধু নিজের মেয়ের জন্য একটা সংসারই চাচ্ছে। কিন্তু সে তার মাকে কিভাবে বলবে বৃদ্ধাশ্রমে যাওয়ার কথা? অনেকক্ষণ নিজের বিবেকের সাথে যুদ্ধ করে নাবিল তার মাকে বৃদ্ধাশ্রমে যাওয়ার কথা বলবে বলেই ঠিক করলো।
—————
মেঘলা দুই ঘন্টা যাবত কাকরাইল থানায় লিলির পোস্টমর্টেম রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করছে। ওসি শাহাদাত হোসেন তাকে কোনো মতেই পোস্টমর্টেম রিপোর্ট দিচ্ছে না। মেঘলা বুঝতে পারলো এভাবে কাজ হবে না তাই সে আরশাদকে সবটা জানিয়ে মেসেজ করলো। আরশাদ কাছাকাছিই ছিলো তাই সে ২০ মিনিটের মধ্যেই থানায় পৌছালো। আরশাদ থানায় ঢুকতেই থানার সবার মধ্যেই অস্থিরতা দেখা গেলো। ওসি শাহাদাত হোসেন আরশাদের দিকে এগিয়ে এসে বললো,
“স্যার আপনি এখানে? আমাকে বললে তো আমি আপনার অফিসে চলে যেতাম।”
“আপনাদের জন্যই তো বাধ্য হয়ে আসতে হলো।”
এবার আরশাদ মেঘলার দিকে ইশারা করে বললো,
“আমার মিসেস দুই ঘন্টা যাবত পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এর জন্য অপেক্ষা করছে কিন্তু আপনাদের কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই।এই আপনাদের দায়িত্ব।”
মেঘলার আরশাদ ফরাজীর ওয়াইফ বুঝতে পেরে শাহাদাত হোসেন মাথা নিচু করে বললো,
“সরি স্যার।আমি এখনি রিপোর্টটা এনে দিচ্ছি।”
—————-
অনুষ্ঠানের জন্য ব্যাক গেইট দিয়ে রওনক একটু আগেই ভার্সিটিতে এসে পৌঁছেছে। একটু পরেই স্টেজে মাহিরা আর তার বন্ধুরা মিলে তাকে ফুল দিয়ে ওয়েলকাম করবে তাই একটু ফ্রেশ হতে মাহিরা ওয়াশরুম এরিয়াতে গেলো। কিন্তু ঢুকেই দেখলো কোনো ছেলে মানুষ বেসিনে নিজের মুখ ধুচ্ছে। লেডিস ওয়াসরুমে ছেলে মানুষ!মাহিরা বেশ রেগে গিয়েই ব্যাক্তিটির শার্টের কলার ধরে বললো,
“আস্তা বেয়াদব তো আপনি?মেয়ে মানুষের ওয়াশরুমে ঢুকে পড়েছেন। কমনসেন্স নেই নাকি?
ব্যাক্তিটি মাহিরার দিকে ঘুরতেই মাহিরা কিছুটা থতমত খেয়ে বললো,
“আপনি এখানে? মেয়েদের ওয়াসরুমে কেনো ঢুকেছেন?কি মনে করেছেন সেলিব্রেটি দেখে পাড় পেয়ে যাবেন?”
“আরেহ মিস আমাকে কিছু বলার সুযোগ ও তো দিবেন আপনি। বাহিরে কোনো সাইন নেই যে এটা মেয়েদের ওয়াশরুম। তাই এখানে এসেছি। এখানে কোনো মেয়ে দেখলে অবশ্যই ঢুকতাম না।”
এবার মাহিরা রওনক হাসানের হাত ধরে তাকে টেনে বাহিরে নিয়ে আসলো। ওয়াশরুমের দরকার দিকে ইশারা করে বললো,
“এই দেখুন সাইন আছে। আর আপনি বলছেন সাইন নেই?”
দরজার উপর সাইন দেখে রওনক নিজেও বোকা বনে গেলো।
“আমি যখন ঢুকেছি তখন কোনো সাইন ছিলো না।”
মাহিরার দেরি হয়ে যাচ্ছে দেখে মাহিরা কিছুটা বিরক্ত ভঙ্গিতে বললো,
“ওকে ওকে বিলিভ করলাম আপনাকে। বাট আপনাকে আপনি নজরে নজরে রাখবো, কোনো প্রকার মেয়ে ঘটিত ঝামেলা করবেন না।”
রওনক মাহিরার চলে যাওয়ার দিকে দেখতে লাগলো। সে মনে মনে ভাবলো,
“আজব মেয়ে তো, আমার উপর নাকি নজর রাখবে। আমি কি চোর না ডাকাত।? যদিও ফেমাস হওয়ার পর এই মেয়েটাই প্রথম যে আমাকে একটা নরমাল মানুষের মত ট্রিট করলো। এর জায়গায় অন্য কেউ হলে সেলফির জন্য লাফানো শুরু করতো।”
চলবে………
বড় পর্ব দিয়েছি কিন্তু আজ। রাতে আরো দুইটা পর্ব দেয়ার চেষ্টা করবো। আপনারা শুধু টুস করে লাভ রিয়েক্ট দিবেন আর সুন্দর সুন্দর কমেন্ট করে যাবেন।তাহলে পরবর্তী পর্ব তাড়াতাড়ি পেয়ে যাবেন।

