#আকাশপ্রিয়া
#পর্ব_২৫
#dure_dilshad_dua_দুর_এ_দিলশাদ্_দুআা
[🚫কপি করা নিষেধ, সম্পূর্ণ প্রাপ্তবয়স্ক এবং মুক্তমনাদের জন্য। ১৮++ কথাবার্তা আছে।চাইলে অ্যাভোয়েড করতে পারেন]
জীবন কেটে যায় জীবনের মতো।সময়ের স্রোতে তলিয়ে যায় অনেক কিছু।কিন্তু এ মান অভিমান এর পালা ফুরাবে কখন?
রোদ ঝলমলে দিন আজকে।তবে আবহওয়া স্পষ্ট বলে দিচ্ছে বসন্ত এসে গেছে।কারো মন ভালো করা আবার কারোর মন নিমিষেই খারাপ করে দেওয়ায় মতো আবহাওয়া যাকে বলে আরকি।বৃষ্টি নেই বেশ কয়েকদিন হলো।কালেভদ্রে প্রকৃতি মন খারাপ করে থাকলে কাঁদতে দেখা যায়না আজকাল।
আচ্ছা আকাশপ্রিয়া কাকে বলা হয় আসলে?আকাশের প্রতি অগাধ প্রেম যার তাকে বোধহয়।
প্রিয়া তার বারান্দায় দোলনাটায় গা এলিয়ে শুয়ে আছে।বিশাল বড় বারান্দা ছাদ খোলা। শুয়ে শুয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নীল আকাশের দিকে।আকাশ তার বরাবরই পছন্দ, সৃষ্টিকর্তার তৈরি দুই আকাশের প্রতিই আজকাল তার এক আকাশ সমান টান।সেই ছোট্টবেলা থেকেই তার নীল আকাশের প্রতি মায়া।মন খারাপ,মন ভালো যেকোনো মূহুর্তের সঙ্গী খোলা আকাশ। তুলোর মতো সাদা সাদা মেঘ যখন ওই নীল আকাশের বুকে ভেসে বেড়ায়,এক ঝাক পাখি মুক্ত ডানা ঝাপটে তাদের গন্তব্যে পারি জমায়।এই ধরনির বুকে এক কিশোরি অবিরাম সে দৃশ্যে মুগ্ধ হয়।কতশত গল্প সাজায় সে বিশাল জায়গাটায়।
আজকে মেয়েটা কেনো তাকিয়ে আছে তাহলে।কি বলছে আসমানে দৃষ্টি রেখে।মন খারাপ বুঝি?
প্রিয়া চোখের কার্নিশ বেয়ে অনর্গল পানি গড়িয়ে পরছে।দু হাতে চোখ মুছে কাত হয়ে শুলো দোলনার ওপর।মনটা তার সত্যি খারাপ।
সেদিন রাতের সেই অঘটনের পর থেকে কেটে গেছে সাত সাতটি দিন।এ সাত দিনে একবারের জন্যও সে আকাশের সাথে কথা বলতে পারেনি।তাই তো এই মুক্ত আকাশের কাছে তার আকাশের নামে একরাশ অভিযোগ জানাচ্ছে সে।খুব কান্না পাচ্ছে প্রিয়ার।কতশত চেষ্টা করেছে এ কদিনে আকাশের সাথে একটু কথা বলতে।লোকটা বড্ড একরোখা।একবারের জন্যও কথা বলেনি।সে সমানে থাকলে এমন ঢং করে যেনো চেনেনা তাকে।তার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এমন করে দেখে মনে হয় প্রিয়া অদৃশ্য। তার বুঝি মন খারাপ হয় না!লোকটা এতো নির্দয় কেনো।সামান্য একটা ভুলই তো হয়েছে।আচ্ছা সামান্য নয়,মানে তো সে। ভুলটা বড়সড়। তবুও।সে তো ম্যাচুয়র পুরুষ মানুষ। তার কি প্রিয়ার মতো ছোট মেয়ের সাথে এতো রাগ,অভিমান সাজে!লোকটার রাগ ভাঙানোর কোনো উপায়ও পাচ্ছে না সে।রিমিটা গেছে রাজশাহী, তার নানির বাড়ি।মেয়েটা আসবে সামনে সপ্তাহে।ও থাকলে তাও একটা বুদ্ধি বাতলে দিলো।এখন একা একা সে কোনো পথই পাচ্ছে না একদম।
লোকটা আজকাল ফেরে এত্তো রাত করে,তারমধ্যে এসেই সেই যে দরজা নক করে। আর খোলার নাম নেই।ইদানীং খাবারও বাইরেই খায়।রাতুল ভাইের সাথে যে কথা বলবে তার উপায় নেই,রেদোয়ান, রাকিব ভাইয়া কেউই আজকাল কটেজে সময় মতো ফেরে না।সবকটা সময় অসময়ে ফেরে।কারোর সাথে কথাই বলে উঠতে পারে না সে।অফিসের যে দারুণ ব্যাস্ততা তা তো না হয় বুঝলো সে।শিয়াকেও তো দেখছে এতো ব্যাস্ত।তারপরেও আকাশের ব্যাস্ততার সাথে তাকে ইচ্ছে করেই যে ইগনোর করছে প্রিয়া সেটা স্পষ্ট বুঝতে পারছে।
হঠাৎ করেই রিয়ান এর কথা মনে পরলো প্রিয়ার।রিয়ান একমাত্র সময় মতো বাসায় ফেরে।এমনকি আজকাল নিয়মমতো নাস্তার টেবিলে আসে।প্রায় প্রতিবেলাই প্রিয়ার আর রিয়ান এর দেখা হয়ে যায়,একসাথে খাবার খায়।প্রিয়ার মুখটা হাসিহাসি হয়ে গেলো।রিয়ান ভাইয়া মানুষ টাকে তার ভালোই লাগে,এর আগে একবার বিপদ থেকে বাচিয়েছিলো তাকে।মানুষ টা ভদ্র।তাকে ধরলে কেমন হয়।সেও তো আকাশের ফ্রেন্ড। রিয়ান যদি একবার আকাশের সাথে কথা বলিয়ে দিতে পারে।প্রিয়া লাফিয়ে উঠে বসলো।আজ দুপুরে রিয়ান ভাইয়া খেতে আসলেই তার সাথে ভাব জমিয়ে ফেলতে হবে।
****
রাতুল সেই কখন থেকে আসে আছে আকাশের রুমে।আকাশ কিছুতেই ল্যাপটপ থেকে মুখ তুলছে না।রিয়ানরা সবাই পিকনিক এর ব্যবস্থা করতে বলছে সামনে পয়লা ফাল্গুনে।এখানে আসার প্রায় পাঁচ মাস হয়ে গেছে।এখন অবধি কাজ ছাড়া আর কোনো কিছুতে মন দেওয়ার সময় হয়নি তাদের। অফিসের স্টাফ রাও সবাই হাঁপিয়ে উঠেছে একটানা কাজেকর্মে থেকে।তাছাড়া রিয়ান বাদে এ কয় মাসে তারা একজনও বাড়ি যেতে পারেনি।তার থেকেও বড় কথা রাকিব,রেদেয়ান দুজনেরই গার্লফ্রেন্ড আছে।এতদিন ছার দিয়েছে।ভালোবাসা দিবসেও যদি সময় দিতে না পারে দুজনেরই সংসারে আগুন ধরবে এটা নিশ্চিত।
রাকিব,রেদোয়ান একপ্রকার ঠেলাঠেলি করে পাঠিয়েছে রাতুলকে আকাশের কাছে।প্রায় দু ঘন্টা হলো রাতুল এখানে এসেছে।এরমধ্যে ছয় কাপ দুধ চা খেয়েছে কড়া চিনি দিয়ে। তার আবার আকাশের মতো তেতো কফিতে পোষায় না কি না।ছেলেটা ওই তেতো খেয়ে খেয়ে মুখের রসকষ ও তেতো বানিয়ে রেখেছে।রাতুলের ইচ্ছে হচ্ছে দুটো ঘুষি মেরে আসতে।কিন্তু সেটা সে কল্পনায় ও করে ফেললে তার লাশ এ বিল্ডিং এর ছাদ থেকে মিনিট পাঁচেক এর মধ্যে নিচে পরতে দেখা যাবে।রাতুল ধৈর্য হারিয়ে গিয়ে দারালো আকাশের টেবিলের সামনে।
“তোর সমস্যা টা কি বলতো।গুরুত্ব নেই আমার কথার কোনো?”
আকাশ মুখ তুললো না।গম্ভীর গলায় বললো,”মেয়ে মানুষ এর মতো আহ্লাদ করা শিখেছিস কেনো।”
“আমি মেয়ে মানুষ? “
“এর জন্যই গর্ধব বলি।তোকে মেয়ে কখন বললাম।”
“এইমাত্র বললি”
আকাশ মাথা এবারেও তোলেনা।ভ্রু কুচকে কাজেই ডুবে থাকে।
“কি বলছি আমি শোনার প্রয়োজন নেই তোর।”
“নাহ নেই।কারণ আমি একশ পার্সেন্ট নিশ্চিত তুই অকাজের বায়না নিয়েই এসেছিস।”
রাতুল থমকে গেলো।তারপর সাহস জুগিয়ে জোর গলায় বললো,”মোটেই না।কাজের কথা ছাড়া আমি আসিনা।”
আকাশ এবার ল্যাপটপ বন্ধ করলো,মুখ তুললো রাতুল এর দিকে।
“বল শুনছি।”
“গুরুত্ব দিবি কিন্তু যা বলবো।”
“আমারও আজকাল সন্দেহ হচ্ছে তোকে নিয়ে।”
রাতুল কপাল ভাজ করে তাকায়।”কিসের সন্দেহ? “
আকাশ আয়েশি ভঙ্গিতে চেয়ারে হেলান দেয়।কফির কাপ থেকে এক চুমুক দিয়ে নামিয়ে রাখে টেবিলে।উদাশ গলায় বলে,”রাকিব যে বলে…”
আকাশের কথা শেষ হওয়ার আগেই লাফিয়ে উঠলো রাতুল।”তুই ও ওদের কথায় কান দিবি আকাশ?তুই ও আমার জেন্ডার নিয়ে প্রশ্ন করবি।নেহাৎ একটা গার্লফ্রেন্ড জোটাতে পারছি না।সাথে সাথে বিয়ে করে তোদের আগে যদি ক্রিকেট টিম না বানাচ্ছি আমি!তারপর আমার নাম পাল্টে রাখিস।”
“” চোরের মন পুলিশ পুলিশ।, আমি কখন বললাম তোর জেন্ডার এ সমস্যা। “
আকাশের বাঁকা হাসিতে থতমত খেলো রাতুল।কথার জালে ফাঁসিয়ে টিজ করা হচ্ছে। ঠিক আছে,ব্যাপার নাহ।সবকটা বন্ধু একেকটা বজ্জাত।আকাশটাও যোগ দিয়েছে তাতে।
“আমি এসেছি ওদেরই বায়না নিয়ে,আর কথা শোনাচ্ছিস তুই একা আমাকে।”
“বেশ বল।”
“ওরা পিকনিক এর কথা বলছে ভালোবাসা দিবসে।”
“তো?”
“তো মানে কি।তুই পারমিশন না দিলে হবে?”
“রাতুল,খুব ভালো করে জানিস অফিসের কাজের কতটা চাপ।এখন ভালেনটাইন সেলিব্রেট করার সময়? “
“তোর না-হয় ঝুলে আছে।আই মিন কঠিন পুরুষ তুমি,আটকে রেখেছো নিজের সব।কিন্তু সবাই তো আর আকাশ এহনাজ নয়।তাদের ও একটু আধটু রাত হলে বউ,প্রেমিকার কথা মনে পরে আরকি।পাঁচ মাস হলো তো একদিনও ছুটি না দিয়ে আটকে রেখেছিস সবকটাকে।তা ওদের ডিভোর্স হলে জরিমানা কি তুই দিবি?বংশ বিস্তারের সুযোগ ওদের দেওয়া হচ্ছে না,তার দায় কে নেবে।বুড়ো বয়সে ওদের বাচ্চাকাচ্চা কে পালবে। তুই আর আর তোর বউ?”
আকাশ বিরক্ত মুখে তাকিয়ে সবটা শুলনো।সামান্য একটা বিষয় থেকে হাঁদারাম টা কতক্ষণ বকবক করে গেলো।ছাগল একটা।
“এখন আমাকে কি করতে বলছিস সবার সংসার বাচাতে?কিভাবে বংশবিস্তার এর ব্যবস্থা করে দিতে পারি আমি?”
“সবাই পিকনিক এ যেতে চাইছে বললাম তো।”
“পিকনিক এ গেলে বাচ্চা হয়ে যাবে?”
“আকাশ।সেটা কখন বললাম আমি।অন্তত প্রসেস টা তো করবে পারবে সবাই।তুষি,রাকাকে আনতে চাচ্ছে রাকিব,রেদোয়ান। “
“ঝেড়ে কাশ।কি করতে চাস।”
“ওরা কক্সবাজার ট্যুরে যেতে চাচ্ছে কয়েকদিনের জন্য।তাছাড়া ওখানে আমাদের হোটেল রয়েছেই। কয়েকটা দিন একটু চিল করে আসলে সবার আবার কাজে ভালোমতো মন বসবে। “
আকাশ চুপ করে রইলো।স্থির চোখে তাকিয়ে রইলো রাতুল এর দিকে।ভাবলো কিছু একটা।কপাল ঘষলো দু আঙুলে।
“বেশ।ওদের বল সব অ্যারেন্জ করতে।আমরা তেরো ফেব্রুয়ারিতে বের হবো।পাঁচ দিনের একটা ট্যুরে।অফিসের সবাই যাবে।তাদের বউ,বাচ্চা,প্রেমিকা আনতে চাইলে আনুক।চলবে?”
রাতুল হাতে তালি দিয়ে লাফিয়ে উঠলো খুশিতে।
“চলবে মানে,দৌড়াবে একদম।হাতে এখনও দশদিন সময় আছে সব গুছিয়ে ফেলবো আমরা।”
“এখন যা বের হ।”
“বলছি আকাশ,তোর জন্য কি স্পেশাল হানিমুন কাপল রুমটা বুক করতে বলবো?”
আকাশ চোখ গরম করে তাকালো।
“না মানে মন্দ হয়না বল!প্রিয়া তোর সাথে, শিয়াকে অয়ন ভাইয়ের….এইযে রেগে যাচ্ছিস।ভেবে দেখিস যা বললাম।”
রাতুল আর এক সেকেন্ড দাড়ালো না।জান বাচানো ফরজ।দৌড়ে বেড়িয়ে এলো আকাশের রুম থেকে।
আকাশ মাথা এলিয়ে চোখ বন্ধ করলো চেয়ারের ওপরই।প্রিয়াকে সত্যি আজকাল কাছে পেতে বড্ড মন চায়।সেদিন এর পর থেকে মেয়েটাকে ভালোমতো দেখার সুযোগ টাও পায়না।রাতে যে দু একদিন যাবে লুকিয়ে মেয়েটার রুমে,বিচ্ছু মেয়েটা অনেক রাত জাগে।না ঘুমালে সে যাবে কিভাবে।আড়চোখে আর কতদিন দেখবে।বুকের ভিতর টা ছটফট করে সারাক্ষণ। দূরে থাকা আকাঙ্খার জিনিস একবার যখন কাছে পেয়ে যায়,সে মধুর স্বাদ টের পায় তারপর কি আর দূরে রাখা যায়।সারাক্ষণ মেয়েটার শরীরের ঘ্রান পায় সে।ওই শরীরের মাতাল করা ঘ্রান নেশা জাগায় তার মস্তিষ্কে।শূন্য হয়ে যায় মস্তিষ্ক। গভীর থেকে গভীর আদরে ভরিয়ে দিতে মন চায় মেয়েটাকে।কিন্তু সে অবুঝ বালিকা তা বুঝলে তবে তো।বাচ্চা মেয়ে ভালোবাসা এই এক সমস্যা। বোঝে কম,আবার বুঝলে সেটা দু লাইন বেশি।রেগে নেই সে প্রিয়ার ওপর।এই সামান্য কারণে সে তার প্রানপাখির ওপর রাগ করে থাকবে এটা সম্ভব! সম্ভব নয়।কিন্তু প্রিয়া তাকে সত্যি মন থেকে চায় কিনা,যতটুকু চাইলে সব কিছুর উর্ধ্বেও তার সান্নিধ্যেই চাইবে,তাকেই পাশে চাইবে,কাছে চাইবে,কোনো অবস্থা তেই হাত ছাড়ার কথা ভাববে না…সেটা শতভাগ নিশ্চিত না হওয়া অবধি লিমিটে তাকে থাকতে হবে,মেয়েটাকেও রাখতে হবে
।আজকাল মেয়েটার আশেপাশে থাকতেও ভয় হয় তার।সেদিন যে ভুল করতে যাচ্ছিলো,প্রকৃতি সময়মতো বাধা না দিলে কি সর্বনাশ হতো সেদিন!তারপর প্রিয়া যে তাকে সবটার জন্য ব্লেম করতো না,তাকে দূরে সরিয়ে দিতো না রাগ করে তার নিশ্চয়তা কি।
ঘোরের মধ্যে যে আদর প্রিয়ার স্বর্গসুখ লাগবে,ঘোর কেটে গেলে প্রিয়ার সে আদর জোরজবরদস্তি, সুযোগ নেওয়া,তাকে অসম্মান করা লাগবো না তার কি গ্যারান্টি।আকাশ চায় প্রিয়া বুঝুক তাকে,তার ভালোবাসাতে।নিজে আকাশের মতো ভালোবাসতে শিখুক,আসমান জমিন এক করে খোদার কাছে তাকে চাইতে শিখুক তবো তো তার ভালোবাসা স্বার্থক…
আকাশ উঠে গিয়ে দারালো খোলা জানালার সামনে।দু হাত গুজলো কালো প্যান্টের পকেটে।বাইরের বাতাসের বন্ধ করে নিলো চোখ।তাকালো শূন্যে।সম্পূর্ণ আকাশ জুড়ে ভেসে উঠলো তসর চোখে পৃথিবীর সবচাইতে সুন্দরী, নিষ্পাপ এক কিশোরীর হাসিমাখা মুখ।হাসলো আকাশ।বিড়বিড়িয়ে বললো,
ভালোবাসা কি এর এর ব্যাখা আমার কাছে নেই।কখন,কিভাবে, কেনো ভালোবেসেছি সেটা জিজ্ঞেস করলে আমি বলতে পারবনা।ভালোলাগা, ভালোবাসা,প্রয়োজনীয়তা,আকর্ষণ, মোহ-মায়া তার প্রতি আমার অনূভুতি এগুলো দিয়ে আমি বর্ণনা করতেও পারবনা।শুধু জানি,
ওই একজোড়া চোখে চোখ রেখে গোটা একটা জীবন কাটিয়ে দিতে চাই।ঝুম বৃষ্টি তে সময়-অসময়ে তার সাথে ভিজতে চাই।তপ্ত গ্রীষ্মে তার কপালে জমে ওঠা ওই একফোঁটা ঘাম মুছিয়ে দিতে চাই,পৌষের শীতল বাতাসে তার গায়ে উষ্ণতা হতে চাই,ভোরের ওই সূর্য়দয় থেকে গোধূলী বেলার সূর্যাস্ত তার সাথে দেখতে চাই,ভালো খারাপ প্রতিটি সেকেন্ড তার তার সান্নিধ্যে থাকতে চাই।তাকে তিন কবুলের সঙ্গী বানাতে চাই। মৃত্যু যখন দরজায় কড়া নাড়বে শেষ একবার আমার জন্য তার কান্নাভেজা নরম মুখটা দেখতে চাই।মৃত্যুর পর ওই ম্যাজিকাল সাত মিনিটের প্রতিটা সেকেন্ড তার হাসিমাখা মুখের স্মৃতি চাই।সবশেষে এ জীবন, সে জীবন দুই জীবনেই খোদার দরবারে হালাল করে, একমাত্র আমার করে ওই একজনকেই পেতে চাই।।
*****
নিচের দরজা খোলার শব্দ পেয়েই দৌড়ে বেড়িয়ে এলো প্রিয়া।এসময় প্রতিদিন রিয়ান ফেরে।সিড়ির কাছে আসতেই দেখলো সত্যিই রিয়ান।প্রিয়াকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে একগাল হাসলো।উঠে এলো সিড়ি বেয়ে।ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,”কি ব্যাপার, হাঁপাচ্ছো কেনো?”
প্রিয়া হাসলো। আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলো,
“লাঞ্চ করবেন তো এখন?”
রিয়ান খানিকটা অবাক হলো।প্রিয়া কখনো এভানে জিজ্ঞেস করেনা।রোজ তাদের ডাইনিং এ দেখা হয়।নরমাল টুকটাক গল্প হয় আরকি।তার বরাবরই তাড়াহুড়ো থাকে।শুধুমাত্র প্রিয়াকে একনজর দেখতে বাসায় আসে লাঞ্চ করতে।মাথা ঝাকালো রিয়ান।”হ্যা করবো।”
“তবে ফ্রেয় হশে আসুন।আমি অপেক্ষা করছি।”
প্রিয়া কথাটা বলে সহাস্যে নেমে গেলো নিচে।রিয়ান ঘুরে তাকিয়ে দেখলো প্রান চঞ্চল সেই মেয়েটার ছুটে চলা।হাসলো সে।তাকে নিয়ে প্রিয়ার ভাবনা ভালো লাগছে তার।দ্রুত ফ্রেশ হয়ে এসে বসলো টেবিলে।প্রিয়া সত্যিই অপেক্ষা করছে তার জন্য। রিয়ান আসতেই আবার অবাক করার কাজ করলো মেয়েটা।নিজ হাতে খাবার তুলে দিলো রিয়ান এর প্লেটে।
“খেয়ে নিন।”
রিয়ান মুগ্ধ হচ্ছে। সামান্য এতটকুই যে তাকে এতো শান্তি দিতে পারে ভাবনি সে।মেয়ে জাতির ওপর উঠে যাওয়া বিশ্বাস, ভাবনা এই মেয়েটার কারণে আজ মিথ্যে হতে বসেছে।নিজের এতো বছরের বুকের জ্বালা মিটতে শুরু করেছে এই হরিণি চোখের কিশোরীর শীতল করা দৃষ্টিতে। সে এই মেয়েটাকে হারাতে চায়না।সম্ভব নয় হারানো,বাঁচবে না তবে এবার।নিঃস্ব হয়ে যাবে সে।রিয়ান চোখ নামায় খাবারের দিকে।
“আপনার বাড়িতে কে কে আছে রিয়ান ভাই।
“ মা,বাবা,দাদু, ছোট বোন। “
“মিনি ফ্যমিলি।সো সুইট।”
রিয়ান মুচকি হাসলো।”আমি কিন্তু তোমার কথা সবই জানি মোটামুটি। শিয়া আমাদের খুব ভালো ফ্রেন্ড। “
প্রিয়া একগাল হাসলো।মুখে পুরে নিলো খাবার।রিয়ান দেখলো মেয়েটাকে। কি মিষ্টি দেখাচ্ছে।
“আর আপনার বন্ধু রা ওদের গল্প বলিন শুনি।একই বাড়িতে থাকি অথচ আমি কারোর সম্পর্কেই জানিনা।মানা যায়!”
রিয়ান পানি তে গলা ভেজালো।খাবার খেতে খেতেই জবাব দিলো।
“রাকিব এর শুধু মা আর ছোট একট ভাই আছে বাসায়।ওর বাবা মারা গেছে বহু আগে।ওর গার্লফ্রেন্ড আমাদেরি আরেক ফ্রেন্ড রাকা।আমাদের প্রজেক্ট টা শেষ হলে ওরা বিয়ে করবে।রেদোয়ান এর জয়েন্ট ফ্যামিলি,বাবা চাচা সবাই আছে।আকাশের মতো।আর ওর হবু বউ তুষি।কাবিন করে রাখা ওদের। ওরও একই কাহিনি, আমাদের প্রজেক্ট এর পর অনুষ্ঠান করে তুলে আনবে আরকি।আর রাতুল এর মা, বাবা,ছোট একটা ভাই”
আকাশের নাম শুনেই আগ্রহ নিয়ে নড়েচড়ে বসলো প্রিয়া।”আর আকাশ ভাই? “
“ওদের বিশাল ফ্যামিলি।ঢাকা শহরে বিশাল জৌলুশ ওদের।বুঝতেই পারছো।অয়ন ভাইকে তো চেনো?আকাশের বড় ভাই,আকাশ ছোট।ওদের আরেকটা বোন আছে।তাছাড়া ওদের বাড়ির সদস্য অনেক।চাচা,চাচি,কাজিন দিয়ে বাড়ি ভর্তি অতো মনে রাখতে পারবে না।”
রিয়ান হেসে খাওয়ায় মন দিলো।প্রিয়া মনটাা ভালো হয়ে গেলো নিমিষেই।আকাশের যৌথ পরিবার!তার বারবারই যৌথ পরিবার এর স্বপ্ন। তাদের আত্মীয় সজন কেউ বেই বললেই চলে।কেউই নেই।ছোটবেলা থেকে পরিবার এ তার চারজন। একসাথে থাকার আনন্দ থেকে বঞ্চিত সে।
রিয়ান এর ফোন বেজে উঠলো হঠাৎ। রিসিভ করলো সে।বেশকিছুক্ষন পর কল কেটে তাকালো প্রিয়ার দিকে।
“ঘোরাঘুরি ভালো লাগে? “
প্রিয়া হেসে মাথা নাড়লো,”খুব”.
রিয়ান নিজের হাসলো।,”সামনে আমাদের একটা ট্যুর আছে।আমরা সবাই যাচ্ছি।শিয়া রাতে এসে তোমাকে বলবে হয়তো।”
প্রিয়ার চোখ চকচক করে উঠলো সাথে সাথে। “
“সত্যি! কোথায় যাচ্ছি আমরা?”
“কক্সবাজার।ভ্যালেনটাইন ডে উপলক্ষে পিকনিক আরকি পাচ দিনের।”
প্রিয়ার খুশিতে লাফিয়ে উঠতে ইচ্ছে হলো।সে তো প্ল্যান করে রেখেছে সেদিন টা নিয়ে। আরও সুযোগ পেয়ে গেলো।খোলা আকাশের নিচে সমুদ্র কে সাক্ষী রেখে ভালোবাসা প্রকাশ করার থেকে সুন্দর কিছু হয় নাকি!
****
গুনগুনিয়ে গান গাইতে গাইতে কিচেন এর দিকে যাচ্ছে প্রিয়া।সন্ধ্যা হয়ে এসেছে।সারাদিন রুমে একা একা মুভি দেখতে দেখতে বিরক্ত হয়ে গেছে।ফ্রিজ খুলে মনমতো কিচ্ছু পেলো খাওয়ার।ড্রয়ার থেকে শসা বের করে ধুয়ে নিলো ভালো মতো।ডাইনিং এর কাছে লবনের জন্য আসতেই খট করে শব্দ হলো মেইন দরজায়।চমকে উঠলো প্রিয়া।এ সময় কেউ তে আসেনা বাসায়।দরজা ঠেলে ভিতর আসলো আকাশ।দ্রুত হাতে দরজা লক করে ঘুরেই দেখতে পেলো প্রিয়াকে দাড়িয়ে থাকেতে।যথারিতি পাত্তা না দিয়ে পকেটে হাত গুজে পাশ কাটিয়ে ওপরে উঠতে পার বাড়ালো।প্রিয়া সাহস নিয়ে একটা কাজ করে
বসলো।সামনে এসে দাড়ালো আকাশের।প্রিয়ার এমন আচরণ আশা করেনি আকাশ।প্রিয়া ঘেসে সামনে দাড়াতেই চমকে দু পা পিছিয়ে গেলো সে।মুখ চূড়ান্ত কঠিন,আর কপালে বিরক্তির ভাজ ফেলে তাকিয়ে রইলো প্রিয়ার দিকে।
“কি হয়েছে,সামনে দাড়িয়ে আছো কেনো!”
“কথা আছে।”
“আমার নেই।”
“কেনো নেই?”
“রাবিশ।বিরক্ত না করে রাস্তা ছাড়ো।”
“যদি না ছাড়ি।”
আকাশ তপ্ত চোখে তাকালো।প্রিয়া মনে মনে ভয় পেলেও প্রকাশ করলো না সেটা।বরং উল্টো কোমড়ে দু হাত রেখে সিরিয়াস ভঙ্গিতে এগিয়ে এলো খানিকটা।
“কি সমস্যা? পাত্তা দিচ্ছেন না কেনো?”
“পাত্তা কিভাবে দেয়?”
“বোঝেননা না কিভাবে দেয়?”
আকাশ মুখ গম্ভীরই রাখলো।উদাস গলায় বললো,”দিচ্ছিলাম তো।তখন তো চরিত্রহীন,বেহায়া,অসভ্য বলে মুখে ফেনা তুলে ফেললে।”
প্রিয়ার সেদিন এর কথা মনে পরে গেলো।বুকের ভিতরটায় চিনচিন করে উঠলো।আকাশ সত্যিই সেদিন এর বিষয়টা নিয়েই অভিমান করে আছে স্পষ্ট বুঝতে পারলো সে।মুখ গোমরা করে বললো,
“আর বলবো না।”
আকাশ মনে মনে হাসলো।তবে মুখ নির্বিকার রেখে বললো,”তার মানে যা করেছিলাম তা আবার করতে বলছো?”
প্রিয়া লজ্জা পেলো অনেকটা।মাথা নামিয়ে মেঝেতে দৃষ্টি রাখলো,”অসভ্য লোক,সেটা কখন বললাম।”
আকাশের মুখে আসা হাসি সযত্নে লুকিয়ে ফেললো, “এইযে।আবার বললে অসভ্য”.
প্রিয়া মুখ তুললো না।মিনমিনে গলায় বললো,”আপনি মহা পেচানো লোক”.
আকাশ লুকিয়ে বাঁকা হাসলো।গলাটা নরম করে বললো,”নো ডিয়ার।কোনো প্যাচ নেই সত্যি! তোমার হাতের ওটার মতো।”
প্রিয়া হাতের দিকে তাকালো।তার হাতে একটু আগে ফ্রিজ থেকে বের করা শসাটা ধরা।হঠাৎ এটার উদাহরণ বুঝলো না সে।আগ্রহ কন্ঠে জিজ্ঞেস করলে,”এটা তো শসা?পছন্দ আপনার, খাবেন?”
বোকা মেয়েটার কথা দারুণ হাসি পাচ্ছে আকাশের।জ্বালাতে ইচ্ছে হচ্ছে খুব।বাঁকা গলায় বললো,”তোমার পছন্দ? “
প্রিয়া সজোরে মাথা নাড়লো ওপর নিচে।,”খুউউউব,তাই তো খাচ্ছি।”
আকাশ খানিকটা এগলো তার দিকে।প্রিয়া ভড়কে পিছিয়ে গেলো দু পা।পিঠ ঠেকলো চেয়ারে।
আকাশ মুখ নামিয়ে আনলো প্রিয়ার কানের কাছে।হাস্কিস্বরে বললো,”অ্যাম ইমপ্রেসড্।যাও মাফ করলাম।এখন থেকে আবার পাত্তা দেবো।বেশি দিয়ে ফেললে একটু ওয়ার্নিং দিয়ো হ্যা?আর ওটা তুমিই খাও।আমারও পছন্দ তবে খেতে না, খাওয়াতে।আফটার অল আমার মনটা বিশাল তে।ইন ফ্যাক্ট বাকিসবও।”
আকাশ কথাটা বলেই পাশ কাটিয়ে চলে গেলো।উঠে গেলো ওপরে।প্রিয়া ঠায় দাড়িয়ে সেখানে।বরাবর এর মতোই লোকটার কাছে আসা এলোমেলো করে দিয়ে গেলো তাকে।চোখ বুঝে টেনে নিলো আকাশের শরীরেের ঘ্রানের অস্তিত্ব। মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠলো।ফট করে চোখ মেললো সে।
কি বলে গেলো লোকটা।কি ছিলো কথাটার মধ্যে। খানিকটা বোধহয় টের পেলো সে।
লজ্জায় লাল হয়ে গেলো মুখখানা।এক নজর তাকালো হাতের জিনিসটার দিকে।এটা এখন সে মুখে দিতে পারবে!ছিহ্ লোকটা আসলেই অসভ্য,নির্লজ্জ সব।লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে তার এখন।এ জীবনে আর এ জিনিস সে খেতে পারবে বলে মনে হয় না।চোখের সামনে ভেসে উঠবে অন্যকিছু,কানে বাজবে এই ঠোঁটকাটা লোকটার নষ্ট কথাগুলো।দু হাতে মুখ ঢেকে ফেললো প্রিয়া।এতো লজ্জা দেয় কেনো মানুষ টা…
চলবে ইনশাআল্লাহ 🌼🍂

