#আকাশপ্রিয়া _____[পর্ব ৫১]
#dure_dilshad_dua_দুর_এ_দিলশাদ্_দুআা
.
_____”আকাশ এর সাথে সৌমি বেশ ঝামেলা করছে প্রিয়া। তুমি জানতে না কিছু?”
রিয়ান এর কথায় ভ্রু কুচকে আসে প্রিয়ার। আকাশের সাথে সৌমির কি নিয়ে ঝামেলা হবে! কথাটা জিজ্ঞেস করতেই রিয়ান মুখটা গম্ভীর করে ফেললো। খানিকটা ইতস্তত করলো যেনো। খানিক্ষন সময় নিয়ে বললো,,
_____”সৌমি কেমন তা তো জানোই। আমার ফ্রেন্ড, কিন্তু… বুঝতেই পারছো। সমস্যা টা হলো সৌমি ইজ প্রেগন্যান্ট। “
চোয়াল ঝুলে গেলো প্রিয়ার। দু হাতে ময়দা মাখা ছিলো। টেবিলের ওপর থেকে ট্যিসু নিয়ে কোনোমতে মুছলো সেটা। অবাকের চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে বললো,
_____”উনি তো আনম্যারেড।”
মাথা নাড়লো রিয়ান। চোখেমুখে ফুটে উঠলো অন্য রকম অসহায়ত্ব। কন্ঠ নামিয়ে বললো,
_____”সেটাই তো সমস্যা। আকাশের অফিসে গিয়ে আজকে ঝামেলা করছে সৌমি। এই বিষয়টা নিয়ে।”
প্রিয়া চট করে ধরতে পারলো না যেনো। সৌমির প্রেগন্যান্সির সাথে আকাশের সঙ্গে ঝামেলার কারণ কি! প্রিয়ার কথাটা জিজ্ঞেস করতে হলো না। রিয়ান রান্নাঘরের দিকে তাকিয়ে বুয়া কে একবার পরখ করে ইতস্তত কন্ঠে বললো,
_____”বাচ্চাটার… আই মিন সৌমি এই বাচ্চাটার দায় আকাশের ওপর চাপাতে চাচ্ছে।”
প্রিয়া যেনো আসমান থেকে পরলো। হত-বিহবল হয়ে গেলো একেবারে। এ কোন ধরনের মেয়ে মানুষ! একে অবিবাহিত। কার না কার বাচ্চা পেটে নিয়ে ঘুরছে। সেটার দায় আকাশের ওপর চাপাতে চাচ্ছে মানে! প্রিয়ার মাথা গরম হলো। নরম ভাব চলে গিয়ে চোখেমুখে কাঠিন্য ফুটে উঠলো। কঠিন গলাতে বললো,
_____”পাগল উনি? একে চরিত্রহীন। তার ওপর আকাশ এহনাজ কে ব্লেম করে! দাগ লাগাতে চায়!”
_____”সে জন্যই তোমাকে নিতে পাঠালো রাকিব রা। আকাশ ওদিকে ভীষন ইমব্যারেসিং মোমেন্ট এ পরেছে। সৌমিকে তো চেনোই। ওর মতো মেয়ে রা কি পরিমাণ হাঙ্গামা করতে পারে। চৌধুরী দের মানসম্মান ধুলোয় মেশাবে একদম। তুমি যদি…”
প্রিয়া নড়েচড়ে উঠলো। ব্যাস্ত কন্ঠে বললো,
_____”এক্ষুনি যাবো আমি। যাই হয়ে যাক। আমি ওনাকে অবিশ্বাস করি না, করবোও না। আমি ওনাকে চিনি। ওনার সব বিপদে আমি পাশে থাকতে চাই। আপনি একটু অপেক্ষা করুন। আমি সেলফোন টা নিয়ে আসি “
প্রিয়া আর দাড়ায় না। ছুটে যায় দোতলায়। তার ফোন টা রয়েছে ওপরে। সেটা হাতে নিতেই দেখলো আকাশের বেশ কয়েকটা ফোন। বুকটা হু হু করে উঠলো। মানুষ টা নিশ্চয় তাকে আশা করছে এই মূহুর্তে। প্রিয়া দেরি করে না। নিচে বুয়া কে চলে যেতে বলে ছোটে রিয়ান এর সাথে।
সরু পাহাড়ি রাস্তার আঁকাবাকা মোড় পেরিয়ে ছুটে চলছে রিয়ান এর গাড়ি টা। রিয়ান চোয়াল শক্ত করে গাড়ি চালাচ্ছে। গাড়িতে ওঠার পর থেকে দুজনেই চুপ করে আছে। প্রিয়ার মাথা রাগে গজগজ করছে। রিয়ান গাড়ির লুকিং গ্লাস এ দেখলো প্রিয়ার রক্তিম হয়ে থাকা কঠিন মুখটা। রাগলে মেয়েটাকে কি ভীষন সুন্দরই না লাগে! হাতে ধরা স্টেয়ারিং এর বাধন শক্ত হয় অজান্তেই। সে যে দিকেই হাত বাড়ায়। কোনো না কোনো ভাবে সেটা আকাশের হয়ে যায়! বারবার একই ইতিহাস এর পুনরাবৃত্তি সে হতে দিতে পারে না।
_____”ভাইয়া এদিকে যাচ্ছেন! উনি কোন অফিসে? এদিকে আপনাদের অফিস কোথায়?”
প্রিয়া ভাবনা চিন্তার মাঝে এতক্ষণ এ খেয়াল করলো আদতে তারা উত্তর এর বদলে দক্ষিণ দিকে যাচ্ছে। শহর উত্তর দিকে। আকাশের অফিসও তাই। রিয়ান স্বাভাবিক কন্ঠে বললো,
_____”তুমি তো আর আমাদের সব ব্রাঞ্চের কথা জানো না প্রিয়া। এদিকেও আছে।”
প্রিয়া উশখুশ করে। আকাশের চিন্তায় মাথার ভিতর ছটফট করছে।
_____”ওনাকে একবার কল করে দেখবো!”
_____”যাচ্ছিই তো। এখন কি না কি ঝামেলায় আছে। নিতে পাঠিয়েছে তোমাকে। গিয়েই যা করার করো না হয়।”
প্রিয়ার মন তবুও মানছে না। অন্তত রাতুলদের কাউকে কল করে ওদিক টা সামলে রাখতে বলা উচিত। প্রিয়া রাতুলের নাম্বার ডায়াল করতেই ফোন টা হুট করে ছো মেরে কেড়ে নিলো রিয়ান। প্রিয়া চমকালো হুট করে এমন হওয়ায়।
_____”কি হলো ভাইয়া?”
রিয়ান আচমকা ব্রেক কষলো গাড়ি টা। প্রিয়ার ফোনটা আলগোছে রাখলো নিজের পকেটে। সামান্য কাত হয়ে প্রিয়ার দিকে ফিরে বললো,
_____”আকাশ কে অনেক ভালোবাসো?”
এমন অবস্থায় গাড়ি থামিয়ে এই প্রশ্ন টা করার কোনো কারণ খুঁজে পেলো না প্রিয়া। দিনের আলো ফুরিয়ে আসছে। আকাশ ওদিকে কি বাজে অবস্থায় আছে,সৌমি মেয়েটা কি ঝামেলা করছে হাজার একটা দুশ্চিন্তা এসে হানা দিচ্ছে মাথায়। প্রিয়া ঝটপট মাথা নাড়লো।
_____”ভালোবাসি। অনেক ভালোবাসি।”
_____”কারণ?”
_____”হ্যা?”
রিয়ান এর বলা ‘কারণ’ শব্দটার মানে বুঝতে পারলো না প্রিয়া। রিয়ান স্পষ্ট কন্ঠে বললো,
_____”ভালোবাসার কারণ?”
দু ভ্রুর মাঝখানে সরু ভাজ পরলো প্রিয়ার। তবে স্বাভাবিক কন্ঠে বললো,
_____”ওনার মতো মানুষ কে ভালো বাসার কারণ দরকার হয়? “
_____”আমার মধ্যে কি সমস্যা? “
প্রিয়া চকিত তাকায় রিয়ান এর দিকে। রিয়ান এর কন্ঠস্বর, চোখের দৃষ্টি, মুখের কাঠামো অন্য রকম দেখাচ্ছে। প্রিয়া কুন্ঠিত গলায় শুধালো,
_____ “মানে?”
_____”মানে আমার মধ্যে কি সমস্যা? আমাকে ভালোবাসতে সমস্যা কি? আমাকে ভালোবেসে দেখলে না কেনো?”
প্রিয়া থমকায় রিয়ানের কথায়। বলাবাহুল্য ভয় পেলো রিয়ানের কন্ঠের একরোখামি তে। মানুষ টা তার সাথে মজা করছে বলে মনে হলো না। তাছাড়া রিয়ান এর সাথে তার মজা ঠাট্টার সম্পর্ক নয় কোনো কালেই। রাতুল ভাইয়ের সাথে মজা ঠাট্টায় যতটা অভ্যস্ত সে। তবুও এ ধরনের ঠাট্টা মশকরা অবশ্যি নয়। আর রিয়ান এর সাথে তার এক বিন্দু ও নয়। প্রিয়ার দৃষ্টি পরে রাস্তায়।
কালেভদ্রে এক দুইটা গাড়ি যাচ্ছে। প্রিয়া কন্ঠ সামান্য দৃঢ় করতে চায়। তবে হয় না। কেমন একটা ছমছম পরিবেশ।
রিয়ান আচমকা নিজের সিট বেল্ট খুলে আরেকটু ঝুকতেই হুড়মুড়িয়ে পিছনের দিকে হেলে গেলো প্রিয়া। অস্বাভাবিক লাগছে এখন।
_____”ভাইয়া জলদি চলুন। দেরি হয়ে যাচ্ছে তো।”
_____ “হলে হোক।”
এমন একটা সময়, এমন একটা জায়গায় তারা ছাড়া আর একটা মানুষ ও চোখে পরছে না। রিয়ানের ওপর চোটপাট করতেই ভয় এসে বাধা বাঁধছে মনে। রিয়ান এর চোখমুখ এর ভঙ্গিতে গবার শরীর হীম হলো প্রিয়ার। আকাশের বন্ধু এরা। খারাপ হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। সবাই তাকে বোনের নজরে দেখে। তবে আর হাবিজাবি ভাবতে পারলো না প্রিয়া। দরজা খুলে নেমে যেতে উদ্ব্যত হতেই মুখ চেপে ধরলো রিয়ান। পুরুষ মানুষ এর শক্তির সাথে সে পেরে উঠলো না। কয়েক সেকেন্ড এর ব্যবধানে অন্ধকার হলো চোখের সামনে। ক্লোরোফরম এর গন্ধে জ্ঞান হারালো দ্রুতই।
প্রিয়া জ্ঞান হারিয়েছে সেটা নিশ্চিত করা মাত্র হাতের রুমাল রাস্তায় ফেলে গাড়ি এগিয়ে নিয়ে থামালো। গাড়ির দরজা খুলে নেমে শ্বাস নিলো বড় বড় করে। নিলয় এর কথামতো এখন নির্দিষ্ট লোকেশন এ পৌছুতে হবে প্রিয়া কে নিয়ে। আকাশের অবস্থা খুব একটা ভালো না। বৃষ্টি নামবে যখন তখন!
গাড়ি এসে যখন নিলয়ের দেখানো মতো কাঙ্ক্ষিত জায়গায় থামলো ততক্ষণে সন্ধ্যা পেরিয়ে গিয়েছে প্রায়। গাড়ি থেকে নামতেই চোখ ধাঁধিয়ে একট গাড়ি এসে থামলো পাশে। রিয়ান কিছু বুঝে ওঠার আগেই সেখান থেকে নেমে এলো সৌমি। সৌমির লোক চব্বিশ ঘন্টা নজরে রাখছিলো রিয়ান কে। ওর চালচলনের প্রতিটা মূহুর্তের খোঁজ থাকতো সৌমির কাছে। তারাই জানিয়েছিলো রিয়ান প্রিয়া কে নিয়ে কোথাও যাচ্ছে। সৌমির মা হবার খবর পাওয়ার পর এই প্রথম মুখোমুখি হলো দুজনে। রিয়ান এর মুখের ভাব বদলালো। সৌমি কে দেখে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো যেনো। তবে সৌমি বেশ নির্বকার। দমকা হাওয়া পেরিয়ে এসে মুখোমুখি দারালো রিয়ান এর।
তারপর শুরু হলো একপ্রকার বাকবিতন্ডা। সৌমি গাড়িতে উঁকি দিয়ে দেখতে পেলো জ্ঞান হারানো প্রিয়াকে। সে প্রিয়া কে জাগাতে গাড়িতে উঠতেই একই ভাবে তাকেও অজ্ঞান করার পায়তারা জুড়লো রিয়ান। গাড়ির ভিতরের ধস্তাধস্তি যখন তুঙ্গে ঠিক সেই সময় নিলয়ের ঠিক করা লোক ঘটনা টা ঘুরিয়ে ফলাও করে দিলো গ্রামে। তবে যতক্ষণ এ গ্রামবাসী চিৎকার চেচামেচি শুনে এখানে এসে পৌছেছে সৌমির জায়গা হয়েছে ততক্ষণে পাশের ঝোপঝাড়ে। রিয়ান একহারা অসহায় চেহারা বানিয়ে প্রিয়াকে নিয়ে বসে রইলো। সাধাসিধা গ্রামের মানুষ এরও মাথায় আসলো না অন্য কোনো মেয়ের কথা।
*
লাল শাড়ি পরিয়ে ফেলা হয়েছে প্রিয়াকে। এখানে নিয়ে আসার প্রায় ঘন্টা খানেক পর জ্ঞান ফেরে তার। তবে তার বাধা এখানকার মানুষ শুনলো না। কারণ রিয়ান নিজেই মুখে কুলুপ এঁটে বসা।
চুলগুলো বেঁধে দেওয়া হতেই পাশের বছর পনেরোর মেয়েটাকে প্রিয়া নিচু কন্ঠে বললো,
_____”ওই সাহেব কে একটু আমার সাথে দেখা করিয়ে দিতে পারবে?”
ঘরের মধ্যে এই মূহুর্তে যারা আছে সবাই হয়তো প্রিয়ার সমবয়সী, নয়তো ছোট। বয়যেষ্ঠ রা সকলেই বিয়ের বাকি তোরজোর করতে সম্ভবত বাইরে গিয়েছে। কিছুক্ষণ এর মধ্যে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হতেই সবার ঘরদোর এর কথা মনে হতেই ছুটলো সকলে। একপ্রকার ফাঁকা হলো প্রিয়ার ঘর। মেয়েটা কিছুক্ষণ দোনোমনা করে হলেও বাইরে বসারত রিয়ান কে ডাকলো। রিয়ান ওদিকে কি বোঝালো কে জানে! সে আসলো মিনিট পাঁচেক এর মাথাতেই।
প্রিয়ার চোখমুখ আগুন ঝড়ছে এখন। এই চোখের আগুনে ভষ্ম করে দিতে চাইছে রিয়ান কে।
_____”এমন কেনো করলেন?”
_____”আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
_____”আপনি পাগল হয়েছেন? আমি আকাশকে ভালোবাসি। আপনার বন্ধুর হবু বউ আমি। সেই শুরু থেকে ভাইয়ের নজরে দেখো এসেছি আপনাকে।”
রিয়ান আচমকা তেড়ে এলো প্রিয়ার দিকে। দাঁতে দাঁত পিষে বললো,
_____”আমি তোমার ভাই হতে কখনো প্রস্তুত ছিলাম না। সেই প্রথম দিন। প্রথম দিন যেদিন তোমাকে দেখেছিলাম। মনে পরে কি? তুমি আর রিমি যাচ্ছিলে কলেজ থেকে? সর্বপ্রথম আমি প্রেমে পরেছিলাম তোমার। প্রথম দেখাতেই। আকাশ! আকাশ সেদিন দেখেওনি তোমাকে। অথচ আমাকে বলেছিলো তোমাকে খুঁজে এনে দেবে। অথচ তোমাদের কখন প্রেম ভালোবাসা হলো আমিই জানলাম না! ৩-৪ মাস পর জানতে পারলাম তুমি ততদিনে আকাশের৷! কিভাবে হয়ে গেলে! আকাশ আজীবন আমার থেকে সব কেড়ে নিয়েছে। শেষমেশ তোমাকে দেখে মনে হলো জীবন এবার অন্য রকম হবে। ঠিক তখনই, ঠিক তখনই তোমাকেও কেড়ে নিলো! ওর থেকেও আমিও কেড়ে নেবো সব।”
প্রিয়া থমকে তাকিয়ে থাকে। গড়গড় করে বলে যাওয়া রিয়ান এর কথাগুলো গলাধঃকরণ করে যেনো। অথচ সামনের মানুষ টা কে কতটা ভালো মানুষ মনে করেছিলো সে! আকাশের বেস্ট ফ্রেন্ড বলে জানতো। আকাশ কতটা ভরসা করে তার বন্ধু দের। অথচ! সেই বন্ধুই আকাশ কে এভাবে পিঠে ছুড়ি মারতে মরিয়া!
_____ “সৌমির বিষয়টা আপনি মিথ্যা বলেছেন না? আর যদি সত্যিও হয়। সৌমি যদি প্রেগন্যান্ট হয় ও। আমার দৃঢ় বিশ্বাস সে সন্তানের বাবা আপনি। তাই নয় কি?”
রিয়ান এবারে শব্দ করে হেসে ফেললো। বিশ্রি শোনালো সেই হাসি প্রিয়ার কানে। গা জ্বালা করলো।
_____”ভীষন চালাক তো। ঠিক ধরে ফেললে। তবে বিশ্বাস করো। ওসব কিচ্ছু না। সৌমির মতো মেয়ের গর্ভে আমার সন্তান! এটা আমি মানবো কেনো? ওর মতো মেয়ে রাস্তায় জন্মায়, ওই সন্তানও আজ বাদে কাল ও রাস্তায় ফেলবে। “
গা ঘিনঘিন করে উঠলো প্রিয়ার। গা গুলিয়ে বমিও পেলো। যতই খারাপ হোক, নিজের সন্তান নিয়ে এ ধরনের বাজে কথা যে বলতে পারে কোনো ভাবে সে মানুষ এর কাতারে পরে না।
_____”আপনার সন্তান ও।”
_____”সেটার স্বীকৃতির বিষয়টা ডিপেন্ডেবল’ বাচ্চা টা কার গর্ভে। তোমার মনে হয় সৌমির মতো মেয়ের গর্ভে শুধু আমারই সন্তান হতে পারে? আর কার কার সাথে শুয়েছে তার নিশ্চয়তা কি?”
_____”ছিহ্। আপনি এতো নিচ। সেটা ক্ষুনাক্ষরেও টের পেতে দেন নি। ভাইয়ের আসনে বসিয়েছিলাম আমি আপনাকে।”
_____”বিয়ে হচ্ছে আর আধ ঘন্টার মাথায়। স্বামী হিসেবে মানতে শেখো।”
প্রিয়ার ইচ্ছে হলো সজোরে একটা চড় মারতে। কঠিন স্বরে বললো,
_____”কল্পনা করতেও তো আপনার বুক কাঁপার কথা। কাঁপলো না? আকাশ যখন এখানে আসবে আমাকে নিতে। আপনার কি অবস্থা হবে সেটা ভেবে ভয় পান অন্তত!”
রিয়ান এর মুখ কঠিন হলো। বাঁকা বাঁকা হাসি সরে গিয়ে প্রিয়ার হাত চেপে ধরলো। তবে সঙ্গে সঙ্গেই সেি হাত ঝটকা টানে সরিয়ে ছিটকে সরে এলো সে।
দাঁতে দাঁত পিষে বললো,
_____”ডোন্ট ডেয়ার টু টাচ মি। আকাশ খুন করে ফেলবে আপনাকে। বিয়ে টা হয়ে গেলেও আপনি আমাকে পাবেন না। আকাশ আমাকে ঠিক নিয়ে যাবে আপনাকে কবরে পুতে দিয়ে হলেও।”
রিয়ান ফিচেল হাসলো। বুকের ওপর আড়াআড়ি হাত চেপে দাড়িয়ে বিরক্তিকর ভঙ্গিতে ভ্রু জোড়া উচিয়ে বললো,
_____”আমার নামে কবুল পরার পর আকাশ এহনাজ চৌধুরী তোমাকে আর গ্রহন করবে এটা কল্পনায় এলো কি করে তোমার? ওর ইগো সম্পর্কে ধারনা আছে তোমার? অন্যের নামের, অন্যের ছোঁয়া জিনিস ও থোরাই ছোবে।”
প্রিয়া রাগে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য শূন্য হলো। কিছু বলতে যাবে তার আগেই ঘরের ভিতর হুড়মুড়িয়ে ঢুকলো গ্রামের মহিলারা। বিয়ে পরানো শুরু হবে সম্ভবত এখনই। রিয়ান বেরিয়ে যেতে উদ্ব্যত হতেই দরজার সমানে এসে দাড়ালো সৌমি। পাশ থেকে এক মধ্যবয়স্ক মহিলা ধরে আছে মেয়েটাকে। সৌমি কে দেখে রিয়ান ভূত দেখার মতো চমকালো। নাটক সিনেমার সিন ক্রিয়েট হলো একপ্রকার। সৌমি গড়গড় করে বলে গেলো বিয়ে ছাড়া কি করে রিয়ান এর সন্তান তার গর্ভে। আজও সেই ছিলো রিয়ান এর সাথে। প্রিয়া অসুস্থ ছিলো। জ্ঞান ছিলো না। আদতে রিয়ান এর সাথে ঘনিষ্ঠ সময় কাটাচ্ছিলো সৌমি নিজেই। এখান কার স্থানীয় এক কিশোর সৌমির সাথে তাল মেলালো। গরু নিয়ে ফিরছিলো বাড়ির দিকে। রিয়ান এর সাথে সে মূলত সৌমি কে দেখে সে। প্রিয়া কে নয়।
আরও বেশ কিছুক্ষণ ঝই ঝামেলার হলো সেখানে। হাজার একটা বাকবিতন্ডায় জড়ালো রিয়ান সৌমি। অবশেষে কথার প্যাচে স্বীকার করতে বাধ্য হলো। এবং সবশেষে বিয়ে করতে হলো সৌমি কে।
*
বর্তমান,
এদিককার পরিস্থিতি ঠান্ডা হয়েছে বেশ খানিকক্ষণ। রিয়ান কে নিয়ে অফিসের দুজন কর্মচারী হাসপাতালে ছুটেছে। বাহিরের বৃষ্টি আরেকদফা থেমেছে ইতিমধ্যেই। আকাশ রা যখন কটেজে ফিরলো সবাই, তখন রাতে সাড়ে তিনটে বাজে। সবাই ভিজে দাড়কাক হয়ে আছে। সৌমি কেও সাথে নিয়ে এসেছে। মেয়েটার এই শারিরীক অবস্থায় একা ছাড়তে মন সায় দিচ্ছিলো না কারোরই। ফেরার সময় স্থানীয় এক ক্লিনিকে গাইনি ডাক্তার এর চেক আপ করিয়ে তাকেও সাথে এনেছে।
সৌমিকে ওপরের ঘরে পৌছে দিয়ে এসে বোনের কাছে আসলো শিয়া। জ্বর জ্বর শরীর।
_____”চেঞ্জ করতে হবে তো নাকি? জ্বর এসেছে তো।”
প্রিয়া এদিক ওদিকে তাকালো। আকাশ রা এখনো বাইরেই। গাড়ি পার্কিং করে সম্ভবত কথা বলছে নিজেদের মধ্যে। বোনের মুখের ভাষা পরতে পারে শিয়া। জানালো পুলিশ কেস টেস হয়েছিলো। সেসব নিয়েই কথা বলছে বাহিরে।
সৌমি হাঁটু তে মুখ গুজে থ মেরে বসে আছে বিছানার ওপর। এই ঘরটা রিয়ান এর। সে সেটা জানে। শিয়া তাকে অন্য রুমে নিতে চাইলেও নিজে থেকে এসেছে সে এই রুমে। এমন তো নয় আজ প্রথম। এই ঘরে,এই বিছানায় এর আগেও রাত কাটিয়েছে তারা। দীর্ঘশ্বাস ফেললো সে। বিছানার ওপর ছড়িয়ে আছে প্রিয়ার ছবি। এগুলো রিয়ান এর আলমারি থেকে পেলো সে।
কান্না পাচ্ছে আচমকা। আজ সে বিবাহিত হয়ে গেলো। ভাবা যায়! কখনো কি ভেবেছিলো তার বিয়ে হবে, তার গর্ভে একটা অস্তিত্ব বেড়ে উঠবে। তাও আবার রিয়ান এর! ভেবেছিলো কি? নাহ তো। স্বপ্নেও নয়। কিন্তু হয়েছে সেটাই। নিয়তি তাকে আজ কোথা থেকে কোথায় টেনে নিয়ে এসেছে। বিয়ে হলো। প্রথম রাতে স্বামী হাসপাতালে কাতরাচ্ছে। নিজের করা পাপের শাস্তি সরুপ। সৌমি নিজেও কি শাস্তি পাচ্ছে না? পাচ্ছে তো। এ জীবন এ সে অভ্যস্ত? নাহ, একদম নয়। জন্মের পর মা কে হারিয়েছে। ঠিক মতো তো চেহারা টাও মনে নেই। ছোট বেলায় প্রথম যেদিন বাবা সাথে অন্য এক মহিলা কে দেখেছিলো ঘনিষ্ঠ অবস্থায়, তার ন্যানি বলেছিলো এটা নাকি তার মা হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। প্রায় রোজ একেকজন মহিলা কে নিয়ে হাজির হতো তার বাবা। বড় হলো, বুঝতে শিখলো। বাবার ওপর রাগ হলো না। কারণ ততদিনে তাকেও এই জীবনে ঠেলে দিয়েছিলো তার বাবা। টাকা পয়সায় নষ্ট করেছিলো তার জীবনটাও। আজ যেমন! তার মা থাকলে এই জীবন লিড করতো কি সে? না বোধহয়। সে মা হতে যাচ্ছে। অথচ এটা খুশি হয়ে ঘটা করে জানানোর মতো কেউ-ই নেই তার জীবনে! এই সন্তান এর বাপ যে সে সুযোগ পেলে এ সন্তান সহ তাকে খুন করতে দু বার ভাববে না। আজ যেমন মারধর করে ফেলে এসেছিলো রাস্তায়। তার কি মানসম্মান নেই? আত্মসম্মান নেই? আছে তো। হাজার গুন আছে। সে যদি সেই আগের সৌমি হতো, আর দু মাস আগের সৌমি হতো। রিয়ান এর একটা চড়ের বদলে তার বুলেটের দশটা গুলি ঠুকে দিতো রিয়ান এর মাথায়। রিয়ান এর গোটা বংশ নির্বংশ করে পারি জমাতো আবার অন্ধকার এর পথে। কিন্তু আজকের সৌমি আর আগের সেই অবুঝ,ঔদ্ধত্যতায় ডুবে থাকা নোংরা মনমানসীকতা,চরিত্রের মেয়েটি নেই। আজ সে একজন পরিপূর্ণ নারী। তার গর্ভে তার সন্তান।
সে আজ একটু বেহায়া। নাহ, একটু না অনেকটা বেহায়া। সে একটা সংসার চায়। নিজে যেটা পায়নি তার সন্তান কে সেটা দিতে চায় সে। রিয়ান কে ফিরিয়ে আনতে চায় অন্ধকার থেকে। একটা ছোট্ট সংসার সাজানোর স্বপ্ন দেখে সে এই সন্তানটির অস্তিত্ব জানার পর থেকে।
চোখ দিয়ে নোনাজলের বন্যা বয়ে গেলো। সৌমি নিজের পেটে হাত রাখলো। হু হু করে কেদে ফেললো।
*
প্রিয়া শাওয়ার নিয়ে চুল শুকিয়ে নিয়েছে। শিয়া এসে খাবার খায়িয়ে ওষুধ ও দিয়ে গিয়েছে। সৌমি কে ওদিকে খায়িয়ে দিয়েছে। মেয়েটার শরীর ভয়াবহ দূর্বল। আজ আর একটু এদিক সেদিক হলে খুব বড় ক্ষতি হয়ে যেতো বাচ্চাটার। ডাক্তার তো বললেন মিস ক্যারেজ হওয়ার তীব্র সম্ভাবনা ছিলো।
রাতুল, রাকিব সহ অয়ন আকাশ সকলেই যার যার ঘরে এসেছে। ঘড়ির কাটা নিজের বেগে ঘুরছে।
ঘরময় পায়চারি করছে প্রিয়া। আকাশ তো আসলো না আর একবার। আবার রেগে আছে কি! নাকি শরীর খারাপ করলো। মানুষ টার ওপর আজ যা ঝড় গিয়েছে। তার জন্য সব। সে যদি বোকার মতো রিয়ান এর সাথে না যেতো। আজ এমন টা হতো না হয়তো বা।
পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ লাগছে। ক্লান্তি তে সকলেই বিছানায় গা এলিয়েছে হয়তোবা। প্রিয়া কয়েকবার এগিয়ে গেলো আকাশের দরজার সামনে। নক করবে কি না বুঝে উঠতে পারলো না। তবে দরজায় হাত রাখা মাত্র খুলে গেলো সেটা। ঘরের ভিতর ঘোর অন্ধকার।
ঘরময় সব আসবাবপত্রও প্রায় কালোই। দরজা ঠেলে ঘরে উঁকি দিতেই বাইরের সরু আলোতে দেখলো আকাশ বিছানায় শুয়ে আছে। গায়ে এখনো সেই ভেজা জামাকাপড় গুলোই।
প্রিয়া জলদি কাছে চলে আসলো। বিছানায় বসে ঝুকলো আকাশের দিকে। কপালে হাত ঠেকালো। জ্বরে গা টা পুড়ে যাচ্ছে একেবারে। আলো জ্বেলে এসে বসতেই দেখতে পেলো জ্বরের তীব্রতায় রক্তিম হয়ে যাওয়া ফর্শা পুরুষালি সুদর্শন মুখটা।
_____ “জ্বরে গা পুড়ছে। ডাকেন নি কেনো কাউকে? ভেজা কাপড় পাল্টাননি কেনো!”
আকাশ নিভু নিভু চোখ মেলতেই প্রিয়া দ্রুত হাতে ভেজা শার্টের বোতাম গুলো খুলে দিলো।
_____”উঠুন। পাল্টাতে হবে এসব।”
আকাশ উঠে বসলো। প্রিয়া আলমারি খুলে শুকনো জামাকাপড় এনে হাতে ধরিয়ে দিলো।
_____ “আসুন বাথরুম অবধি নিয়ে যাচ্ছি। পাল্টে নিন। তারপর… রাতে খেয়েছেন?”
দু দিকে মাথা নাড়লো আকাশ। খায়নি সে। প্রিয়ার মুখে অভিমান জমলো। চোখ রাঙালো। পাকা গিন্নি মতো লাগছে মেয়েটাকে। বউ বউ লাগছে। কেমন শাসন করছে তাকে। প্রিয়া ধীরেসুস্থে আকাশকে বাথরুম অবধি নিয়ে গেলো। আকাশ যেনো বাধ্য ছেলে। ভেজা কাপড় ছেড়ে বেরিয়ে এলো।
_____”আপনি বসুন। আমি খাবার নিয়ে আসে।”
কথাটা বলে ছুটতে যেতেই কোমড় পেঁচিয়ে ধরলো আকাশ। প্রিয়াকে টেনে এনে মুখ ডোবালে মেয়েটার বুকে। প্রিয়া কে অবাক করে দিয়ে কেঁপে উঠলো সে। প্রিয়ার বুঝতে বাকি রইলো না মানুষ টা কেঁদে ফেলেছে। নরম হাত দুটো টে চেপে ধরলো আকাশের মাথাটা৷ আকাশ ধীর কন্ঠে বললো,
_____ “আজ কি হয়ে যেতে পারতো সেটা যতবার মনে পরছে, আমার মরে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে পাখি। তোমাকে যদি হারিয়ে ফেলতাম? কোথায় পেতাম আমি?”
আকাশের আকুল কন্ঠস্বরে বরাবরের মতো বুকের বাম পাশ টা দুমড়েমুচড়ে উঠলো।
_____”এরকম হতোই না। আমার ওপর বিশ্বাস নেই আপনার? বেঁচে থাকতে আমি অন্যের হবো আপনি ছাড়া। এ হয়না। আর কতবার বলবো এটা আমি?”
আকাশ শান্ত হয় না। হতে পারছে না কিছুতেই। সব কিছুর জন্য ক্রমাগত নিজেকে দোষী মনে হচ্ছে। কেনো মেয়েটাকে সেফ করতে ব্যার্থ হলো সে এই ভাবনা কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে তাকে।
_____”আমি তোমাকে হারাতে পারবনা কিন্তু। “
প্রিয়া আকাশের কথার উত্তর সরুপ সাহস করে এক কাজ করে বসলো। মাথা ঝুকিয়ে চুমু আকলো আকাশের তপ্ত ললাটে। আকাশ রক্তিম চোখে তাকালো প্রিয়ার দিকে। মুখটা কেমন উদভ্রান্তের মতো লাগছে এখনো। একটা মানুষ কতটা হারানোর ভয় পেলে এমন হয়ে যেতে পারে বোঝে প্রিয়া। নিজের বোন কে দেখেছিলো। আকাশও কি একই ভয় পায়নি? পেয়েছো তো। না হলে আকাশ এহনাজ এর মতো পুরুষ বাচ্চাদের মতো অসহায় হয়ে কাঁদে!
প্রিয়া আকাশের মুখ নিজের ছোট্ট হাতের আজলায় নিলো। ভীষন আদুরে গলায় বললো,
_____”আজ এই মূহুর্তে বিয়ে করবেন আমাকে? বউ করবেন আপনার? পূর্নতা দেবেন এই ভেসে থাকা, বেনামি সম্পর্কের? বউ হতে চাই আপনার। মিস প্রিয়ানিশা রহমান থেকে মিসেস আকাশ এহনাজ চৌধুরী হতে চাই…করবেন বউ?”
আকাশ এর নিভু নিভু চোখের দৃষ্টি স্পষ্ট হলো। প্রিয়া হাটু ভেঙে আকাশের সামনে বসে পরেছে। আকাশ ঝুকে তাকালো প্রিয়ার দিকে। হালকা কন্ঠে শুধালো,
_____ “হবে বউ?”
_____ “আজই।”
_____”যদি বলি এখন?”
_____”কবুল আপনাকে।”
আকাশ দু হাতে খামচে ধরে প্রিয়ার বাহু। একপ্রকার ছিটকে এসে প্রিয়া পরে আকাশের বুকে। আকাশ উন্মাদের মতো চুমু আঁকে প্রিয়ার কাধ,কন্ঠদেশে। কপালে কপাল ছুয়িয়ে বললো,
_____”সত্যি রাজি তুমি?”
_____”হুম।”
_____”আজই হবে বিয়ে। আজই বিয়ে হবে পাখি। আর একমুহূর্ত আমি তোমাকে আমার থেকে দূরে রাখতে পারবনা। তোমাকে নিজের নামে হালাল না করে মরেও শান্তি পাবো না পাখি। করবো বিয়ে। সবাইকে ডাকছি। কাজি আনতে বলছি। আজই হবে বিয়ে। আজই আকাশ এহনাজ চৌধুরী তোমাকে নিজের করে নেবে। আজই।”
.
.
চলবে ইনশাআল্লাহ 🍂🌷
.
.
[ পাখিরা,কাল কি হতে যাচ্ছে এনি ওয়ান ক্যান গেসেস???
সবাই অপেক্ষা করছিলেন এ দিনটার? আমিও করছিলাম। ভীষন ভাবে…
অবশেষে 🤌🥹 আকাশ প্রিয়া পূর্নতা পাবেএএএএএএএএ🌷]
🚫 আমি কিন্তু একটু একটু দুষ্টু আছি। সুতরাং আপনাদের রেসপন্স না পেলে বিয়ে ভেঙ্গেও দিতে পারি🙃ভয় দেখাচ্ছি কিন্তু। ভয় পান🔪🌚 বেশি বেশি রিঅ্যাক্ট আর গঠনমূলক কমেন্ট করে ভরে ফেলুন। সম্ভবত বাসর পর্বও #আকাশপ্রিয়া তেই আগে আসবে🌚🙃]

