#চাঁদের_হাসি
#লেখিকা_সিনথিয়া_জাহান
#পর্বঃ১৪
পিকুর কান্না সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে ৷ অলি ওর কান্না থামানোর জন্য নানা পদ্ধতি প্রয়োগ করতেছে ৷ কোনোটাই কাজে দিচ্ছে না ৷ ক্রন্দনরত কন্ঠে পিকু বলতে লাগল,,,
আম্মু তো দিল না ৷ তাহলে তুমি আমাকে শামুক আর ঝিনুক রান্না করে দাও ৷ আমি খাব ৷
অলি থতমত খেয়ে গেল ৷ নিজেকে সামলে নিয়ে ও গলা খাকারি দিয়ে বলতে লাগল,,,
আমি রান্না জানি না বাপু ৷
পিকু কান্না থামিয়ে অবাক গলায় বলল,,, এতো বড় হয়ে গেছো অথচ রান্না করতে পারো না? তোমার কি লজ্জা করে না?
সত্যি বলতে করে না ৷ আমি বিদেশী রান্না করার প্রতি আগ্রহী না ৷
কেন আগ্রহী না? এটা অনেক টেস্টি ৷ আমি দেখেছি ভিডিওতে ওরা খুব মজা করে খাচ্ছে ৷ এতোই মজা যে চোখ বন্ধ করে ইয়াম ইয়াম বলেছে ৷
অলি মনে মনে বলল,,, ছাগলগুলোর কাছে বাল ছাল ই তো টেস্টি লাগবে ৷ ওদের কাছে ভালো জিনিস কেন টেস্টি লাগতে যাবে? ভালো জিনিস খেলে তো আর করোনা ভাইজানের ছোট ভাই বোনদের দুনিয়ার মুখ দেখানো যাবে না তাই না?
অলিকে কথা বলতে না দেখে পিকু বলতে লাগল,,, কি ব্যাপার তুমি চুপ করে আছো কেন?
তুমি আমার কথা বলাই তো বন্ধ করে দিয়েছো ৷ আমি টুকটাক রান্না করতে পারি ৷ বাকি রান্না আমার বউ করবে ৷
তোমার বউ কে?
জানি না ৷
আশ্চর্য তোমার বউ কে সেটা তুমি জানো না? তুমি এতো বোকা কেন?
অলি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,,, আসলেই আমি বোকা ৷ আমার বউ কে সেটা আমি জানি না ছ্যাহ!
পিকু চোখমুখ শক্ত করে বলল,,, আমাকে কোল থেকে নামাও ৷
অলি অবাক হয়ে বলল,,, কেন?
তোমাকে নামাতে বলেছি ৷
অলি পিকুকে কোল থেকে নামিয়ে দিল ৷ পিকু নামার পর অলির দিকে আঙুল তাক করে বলতে লাগল,,,
তুমি তোমার বউকে চেনো না তাই তোমার সাথে ব্রেকআপ ৷ আমার সাথে কথা বলবে না তুমি ৷
কথাগুলো বলে পিকু গুটিগুটি পায়ে জায়গা প্রস্থান করল ৷ অলি আহাম্মক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ৷ এই ছোট বাচ্চা কি লেভেলের চালু সেটা যত সময় যাচ্ছে তত বুঝতে পারছে ও ৷ এখানে ও একা একা দাঁড়িয়ে আছে ৷ মাহি শামুক ঝিনুকের রান্নার কথা শুনে হাসতে হাসতে ঘাসের উপর বসে গিয়েছিল ৷ তারপর অলির চোখ রাঙানিতে হাসি থামানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলে জায়গা ত্যাগ করে বিল্টুর কাছে চলে গিয়েছে ৷
অলির মাথায় এখনও পিকু ঘুরতেছে ৷ পিকুকে মাথায় রেখেই ও হাঁটতে লাগল ৷হঠাৎ সামনে দেখল কয়েকটা বাচ্চা পানি ছোড়াছুড়ি করছে ৷ একদৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে থাকল ও ৷ তবে অবচেতন মনে এমন হুবহু আরেকটা দৃশ্য জেগে উঠল ৷ অলির মাথায় পিকুর জায়গা সেই দৃশ্য দখলে নিয়ে নিল ৷ এবং তার সাথে সাথেই অলির চোখ বড় বড় হয়ে গেল ৷
ও চাপা আর্তনাদ করে ঘাসের উপরে বসে গেল এবং কপাল চাপড়াতে লাগল ৷ কিছু সময় পর ও হতাশ গলায় বলতে লাগল,,,
হায় আল্লাহ আমি এ কি করে ফেলেছি? মাফ চাওয়ার কথা ভুলে গেলাম কিভাবে? এতো বড় ভুল তো আমার কখনো হয় না!
ক্ষণকাল তব্দা মে*রে বসে থাকার পর অলি উঠে দাঁড়াল ৷ জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে নিজেকে যথাসম্ভব সামলাল ৷ তারপর বিরবির করে বলতে লাগল,,,
অলি বাবাজি তোমাকে এখন অনেকগুলো মাফ চাইতে হবে ৷ মাফ চাওয়ার কথা ভুলে যাওয়ার জন্য দরকার পড়লে পা ধরে মাফ চাইতে হবে ৷
°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°
অনন্যা চুপচাপ বসে আছে ৷ তখনকার হেনিন আর পিকুর কারবার দেখে হতভম্ভ হয়ে গেলেও অবচেতন মন কিছু একটা মনে করিয়ে দিয়ে ওর ভিতর থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসতে বাধ্য করছে ৷ এই যে আজকের ব্যাঙ্গাত্বক শব্দ ‘ট্যারা’ ওকে অনেক কিছু মনে করিয়ে দিয়েছে ৷
ছোটবেলায় বাচ্চারা স্কুলে যাওয়ার সময় কান্নাকাটি করলেও অনন্যা অত্যন্ত আনন্দিত ছিল স্কুলে যাওয়ার কথা শুনে ৷ সেদিন খুব ভোরবেলা ওর ঘুম ভেঙে গিয়েছিল ৷ নিজের মাকেও তাড়াতাড়ি ডেকে তুলে খাওয়া দাওয়া করেছে ৷ তারপর স্কুল ড্রেস আর ব্যাগ কাঁধে নিয়ে ও বাবার হাত ধরে স্কুলে প্রবেশ করেছিল ৷
ভেবেছিল নতুন নতুন মানুষের সাথে ওর আজ পরিচয় হয় ৷ সবাই ওকে সাদরে গ্রহণ করে নিবে ৷ কিন্তু তা হয়নি ৷ অনন্যার সব আনন্দ, আশা, আকাঙ্ক্ষা ধূলোয় মিশে গিয়েছিল সহপাঠীদের বিরুপ আচরণে ৷ তাদের হাসি ঠাট্টার পাত্র হয়ে উঠেছিল অনন্যা ৷ ওকে দেখলে ‘ট্যারা’ বলা যেন তিনবেলা ভাত খাওয়ার মতো প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছিল ওদের কাছে ৷
স্কুলের ব্যাপারে সেই উৎফুল্ল অনন্যা ক্রমেই হতাশায় নিমজ্জিত হতে লাগল ৷ স্কুলের নাম শুনলেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ত ৷ তবুও পরিবারের চাপে পড়ে যেতে হতো ৷ কিন্তু সহপাঠীদের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত স্কুল পরিবর্তন করতে হলো ৷ তাতেও লাভ হলো না ৷ সেখানেও ওকে ‘ট্যারা’ ডাক শুনতে হলো ৷
কারো চেঁচামেচি কানে যেতেই অনন্যা নিজের অতীত থেকে বেরিয়ে আসল ৷ শব্দের উৎস খুঁজে বের করার চেষ্টা করতে লাগল ৷ শোভন আর সানা মা*রামা**রি করছে ৷ অনন্যার আগ্রহ হলো ওদের ঝগড়ার সূত্রপাত কিভাবে হলো সেটা জানার জন্য ৷
কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝতে পারল ওদের ঝগড়ার মুল বিন্দু একটা মালা ৷দুজনের থাবড়াথাবড়ি মাত্রাতিরিক্ত পর্যায়ে চলে গেল ৷ তাই অনন্যা বসা থেকে উঠে ওদের কাছে এসে বলতে লাগল,,,
এই আবার কি হলো?
শোভন অত্যন্ত রাগত স্বরে বলতে লাগল,,,,,, আমার মালা চু*রি করেছে এই বে’য়াদব টা!
অনন্যা ভ্রু কুঁচকে বলল,,, তোমার মালা? তুমি মালা দিয়ে কি করো? ছেলেরাও মালা পড়ে?
আরে না ৷ আমি কারো জন্য কিনেছিলাম ৷
অনন্যা কিছু বুঝতে পারছে না ৷ তবে শোভন যে ভীষণ রেগে গেছে সেটা বেশ ভালোই বুঝতে পারছে ৷ অথচ সানার মুখ হাসিহাসি ৷ এতো থাবড়াথাবড়িতেও ওর কোনো যায় আসেনি বরং মালা টা চু*রি করতে পেরে যেন ও মহাখুশি ৷
শোভন গর্জন করে বলল,,, বল আমার মালা কোথায়?
সানা হাই তুলে বলল,,, যেখানে থাকা উচিত সেখানেই আছে ৷
দেখ সানা আমাকে রাগানোর চেষ্টা করবি না ৷
চেষ্টা করছি না তো ৷ অলরেডি রাগিয়ে দিয়েছি ৷
শোভনের রাগ তরতর করে বাড়ছে ৷ ও ফট করে এক চ*ড় বসিয়ে দিল সানার গালে ৷ চ*ড়ের শব্দে অনন্যা চমকে উঠল ৷ অথচ সানা স্বাভাবিক ভাবে দাঁড়িয়ে আছে যেন কিছুই হয়নি , ওর গালে সামান্য একটা টোকা দেওয়া হয়েছে ৷
বোনের নির্লিপ্ততা যেন শোভনের রাগে আ*গুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করছে ৷ ওর রাগ দেখে অনন্যার ভয় করতে লাগল ৷ না জানি কি করে বসে ও! এদের সামলানো তো সহজ কথা না ৷ শোভন অসম্ভব গম্ভীর গলায় বলল,,,,
শেষবারের মতো জিজ্ঞাসা করছি, বল মালা কোথায়?
সানা নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,,, বলতে আলসেমি লাগছে ৷ পারব না বলতে যা ভাগ ৷
অনন্যা দেখল শোভন হাত মুষ্টিবদ্ধ করেছে ৷ এই মুঠো যদি সানার গালে পড়ে তাহলে কে*লেঙ্কারি হয়ে যেতে পারে ৷ অনন্যা এই কান্ড আটকানোর জন্য পূর্ব প্রস্তুতি নিতে লাগল ৷ তবে ওকে কিছু করতে হলো না ৷ শোভন সানাকে মারতে যাবে এমন সময় হেনিন ওদের দিকে এগিয়ে এসে বলল,,,
অলি ভাইয়া তোমাদের ডাকছে ৷
আশ্চর্যজনকভাবে শোভনের মুখে আর কোনো রাগ নেই বরং ওর মুখে একটা লাজুক হাসি ফুটে উঠল ৷ হেনিনের থেকে চোখ সরিয়ে শোভনের এমন রুপ দেখে অনন্যার পিলে চমকে উঠল ৷ এতো দ্রুত কারো রাগ কমতে পারে সেটা ওর জানা ছিল না ৷
হেনিন পুনরায় বলল,,, কি হলো চলো ৷
শোভন অত্যন্ত মিষ্টি গলায় বলতে লাগল,,, তুমি ডাকতে এসেছো আর আমি যাব না সেটা কি কখনো হতে পারে?
অনন্যা আহাম্মক হয়ে শোভনের দিকে তাকাল ৷ সানা ক্রমাগত হাই তুলে যাচ্ছে ৷এই হাই যেন শোভনের মিঠা কথাকে ব্যঙ্গ করল ৷ অন্যদিকে হেনিন চোখমুখ কুঁচকে শোভনের দিকে তাকিয়ে আছে ৷ ক্ষণকাল বাদে ও ছোট্ট করে বলল,,,
আসুন সবাই ৷
বলে ও ব্যস্ত পায়ে জায়গা প্রস্থান করল ৷ শোভনও ক্যাবলার মতো হাসতে হাসতে হেনিনের পিছু পিছু যেতে লাগল ৷ এসব দেখে অনন্যার চোখ বড় বড় হয়ে গেল ৷ ও আহাম্মক হয়ে সানার দিকে তাকাল ৷ সানা হাই তুলে বলল,,,
এসবই চলছে ৷ সামনে আরও কিছু ঘটবে ৷
বলে সানাও চলে গেল ৷ কিন্তু অনন্যা নিজের হতভম্ভ ভাব এখনও কাটাতে পারছে না ৷ মানে এসব কি দেখছে ও? টোনাটুনিদের এসব দেখতে হবে সেটা ও ভাবতেই পারেনি ৷
°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°
রাতের অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার অনেক সময় বাকি আছে ৷ ততক্ষণে সকলের একটু বিশ্রাম নেওয়া প্রয়োজন তাই অলি সকলকে ডেকে পাঠিয়েছে ৷ অবশ্য ও জানে কেউ ক্লান্ত নয় ৷ সবাই বিশ্রাম নেওয়ার কথাটা গ্রাহ্য করবে না ৷ তবুও ও ডেকে পাঠিয়েছে অনন্যার থেকে মাফ চাওয়ার সুযোগ খুঁজে বের করার জন্য ৷
অনন্যা হতভম্ভ হয়েই সেখানে উপস্থিত হলো ৷ শোভনের কারবার এখনও ভুলতে পারছে না ও ৷ ওর অবস্থা অলি বুঝল না আবার হয়তোবা বোঝার চেষ্টা করল না ৷ কারন ওর মাথায় এখন শুধু মাফের বিষয় টা ঘুরছে ৷
অন্যদিকে শোভন হেনিনের আশেপাশে থাকার চেষ্টা করতেছে ৷ ওর এমন ছ্যাবলামি হেনিনের অ*সহ্য লাগছে ৷ শোভন নরম গলায় বলতে লাগল,,,
চিতা তুমি কি কি পছন্দ করো?
হেনিন দাঁতে দাঁত চেপে বলল,,, সবকিছুই পছন্দ করি তবে বং আমার অপছন্দ ৷
শোভন একটু থতমত খেয়ে গেল ৷ পর মুহূর্তে দাঁত বের হাসার চেষ্টা করে বলল,,,
তা ঠিক ওরা সবসময় জাবর কাটতে থাকে যেটা অস*হ্য লাগারই কথা ৷
ঠিক আপনার মতো ৷ আপনিও সর্বক্ষণ মেয়েদের আশেপাশে ঘুরঘুর করেন যেটা অসহ্য লাগারই কথা ৷
শোভন দ্বিতীয় দফায় থতমত খেয়ে গেল ৷ তবুও গলা খাকারি দিয়ে বলল,,,
আমি সবার পিছনে ঘুরঘুর করি না ৷
আমিও সবাইকে বং বলি না ৷
তাই তো ৷ তোমার থেকে বং নিকনেম পাওয়া এতো সোজা নাকি? এটা শুধু স্পেশাল মানুষই পায় যেমন আমি ৷
বলে শোভন লাজুক হাসতে লাগল ৷ হেনিনের মেজাজ খারাপ হয়ে গেল ৷ ও অনেক কঠিন কিছু কথা বলতে চাচ্ছে ৷ তবে নিজেকে সংযত করার চেষ্টা করতে লাগল ৷ কিন্তু শোভনের মার্কামারা হাসির দিকে নজর যেতেই হেনিন ধৈর্য হারিয়ে বলতে লাগল,,,
আপনার একটা জিনিস মনে হয় কোথাও পড়ে গেছে ৷ সেটা ছাড়া আপনাকে মানুষের পল্লিতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে যেটা খুবই দুঃখজনক ৷
শোভন নিজের আপাদমস্তক খুটিয়ে খুটিয়ে দেখার পর বলল,,,
সব তো ঠিকই আছে ৷ তবে এটা ঠিক যে একটা জিনিস ছাড়া আমাকে দুনিয়ায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে সেটা হচ্ছে বউ ৷ বউ ছাড়া থাকা আসলেই দুঃখজনক ঘটনা ৷
হেনিন গম্ভীর মুখে শোভনের দিকে তাকিয়ে বলল,,,, মানুষ যে ব্রেন ছাড়া এতোটা নির্দ্বিধায় বেঁচে থাকতে পারে সেটা আপনাকে না দেখলে বুঝতেই পারতাম না!
চলবে,,,,,

