চাঁদের_হাসি #লেখিকা_সিনথিয়া_জাহান #পর্বঃ১৫

0
19

#চাঁদের_হাসি
#লেখিকা_সিনথিয়া_জাহান
#পর্বঃ১৫

অলির ধারনা ঠিক ছিল ৷বেশিরভাগই বিশ্রাম নেওয়ার ব্যাপারে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছে ৷ তবে গুটিকতেক যে কয়জন থেকে গেছে তার মধ্যে অনন্যা রয়েছে ৷ এতে করে অলি ভীষন খুশি ৷ তবে একটা সমস্যা আছে ৷ অনন্যা আলমগীর প্রামানিকের সাথে বসে আছে ৷ এই সময় মাফ কিভাবে চাবে সেটাই বুঝতে পারছে না ও ৷

এতো সব চিন্তার মাঝে ও দেখতে পেল হেনিনের দিকে শোভন ক্যাবলার মতো তাকিয়ে আছে ৷ না এসব আর মেনে নেওয়া যাচ্ছে না ৷ পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে গেলে কিছুই করার থাকবে না ৷ অলি চট জলদি উঠে শোভনের কাছে চলে গেল ৷ তারপর ইশারায় ওকে নিজের কাছে ডাকল ৷ কিন্তু শোভন ওকে এমন ভাবে ইগনোর করল যেন অলি ওর থেকে টাকা ধার চাইতে এসেছে ৷

ইগনোর করাকে পাত্তা না দিয়ে অলি শোভনের শার্টের কলার চেপে ওকে নিজের সাথে নিয়ে এলো ৷ শোভন কপাল কুঁচকে ওর কান্ডকারখানা দেখতে দেখতে বলল,,

কি করছো?

অলি শোভনকে নিজের সম্মুখে দাঁড় করিয়ে বলল,,, তার আগে বলো তুমি হোয়াট করছো?

আমি কোনো হোয়াট ফোয়াট করছি না ৷

চিতার সাথে তোমার কি?

শোভন অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় বলল,,, আমি আমার হারানো বউকে খুঁজে পেয়েছি ৷ তাই এমন কিছু করছি যেন সেই হারানো বউ আবারও না হারিয়ে যায় ৷

অলি ভেবেছিল শোভন শুরুর দিকে অস্বীকার করবে কিন্তু ওর এমন রাখ ঢাক না রেখে কথা বলায় ও কিছু টা হকচকিয়ে গেল ৷ কয়েক মিনিট নিশ্চুপ থেকে অলি গলা খাকারি দিয়ে বলল,,,

বেশ মানলাম কিন্তু তোমার হারানো বউয়ের বাপের বাড়ি সম্পর্কে তোমার কোনো ধারনা নেই ৷

কেন থাকবে না? কত মিষ্টি ব্যবহার সকলের ৷

অলি সামান্য হেসে বলল,,, এই মিষ্টি ব্যবহার তেতো হতে বেশি সময় লাগবে না ৷ ওরা যদি একবার জানতে পারে যে তাদের কোনো মেয়েকে বাইরের একটা ছেলে এসে ডিস্টার্ব করছে তাহলে এক্ষুণি তোমার কল্লা কাটা পড়বে ৷

শোভন ভয়হীন গলায় বলতে লাগল,,, আমি তো ডিস্টার্ব করছি না ৷আমি জাস্ট আমার হারানো বউকে পাহাড়া দিচ্ছি ৷ এটা আমার স্বামীগত দায়িত্ব ৷

চিতা মনে হয় না বউগত দায়িত্ব পালন করবে ৷ ওর ভাবভঙ্গি তো সেরকমই মনে হচ্ছে ৷

আরে ভাইয়া রিল্যাক্স ৷ মেয়েটা আমাকে মনে মনে পছন্দ করে কিন্তু উপরে দেখাচ্ছে না ৷ আসলে মেয়েরা একটু লজ্জাবতী হয় তো তাই ৷

অলি শান্ত দৃষ্টিতে শোভনের হাস্যজ্জ্বল মুখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,,,

জীবনে এমন কনফিডেন্স থাকলে আর কিছুই লাগে না ৷ শোভনের কনফিডেন্সের কোনো দোকান আছে নাকি?

আরো অনেকক্ষণ অলি শান্ত দৃষ্টিতে পলকহীন চোখে শোভনের দিকে তাকিয়ে থাকল ৷ বলতে আপত্তি নেই এতে করে শোভন খানিকটা ভড়কে গেছে ৷ তবে সেটা উপরে বুঝতে না দিয়ে ও ব্যঙ্গ করে বলল,,,

হিংসা হচ্ছে নাকি ভাইয়া? আমি এতো মিষ্টি একটা মেয়ে পেয়ে গেছি বিনা পরিশ্রমে ৷ এটা দেখে হিংসা হওয়ারই কথা ৷ আমি তোমাকে দোষ দিচ্ছি না ৷

অলি আহাম্মক হয়ে গেল ৷ এই ছেলে বলে কি! এ তো দেখি মাথার সব বুদ্ধিকে সোকেজে তুলে রেখেছে ৷ অলি নিজের হতভম্ভ ভাব কাটিয়ে বরফ শীতল গলায় বলল,,,

দোষ না দিয়ে অনেক উপকার করলে ৷ কিন্তু শোভন বাবু তোমার আচরণে চিতা যে লেভেলের বিরক্তি দেখিয়েছে তাতে মনে হয় অলরেডি কমপ্লেইন করা হয়ে গেছে ৷ একবার কি হয়েছে শোনো একটা ছেলে আদিবাসী এক মেয়েকে সামান্য ডিস্টার্ব করেছিল তো সেই মেয়ে কেঁদে কেঁদে সবাইকে বলেছে ৷ তারপর ওই ছেলেকে সকলে মিলে নেংটো হতে বাধ্য করেছে ৷ তারপর ওই অবস্থাতেই ২০০ বার কান ধরে উঠবস করিয়েছে ৷

শোভনের কনফিডেন্স হয়তো খানিকটা কমে গেল ৷ ওর গলার সেই আত্মবিশ্বাসী ভাব হারিয়ে গেল ৷ ও মিনমিন গলায় বলল,,,

কিন্তু ভাইয়া আমি সত্যি চিতাকে খুব পছন্দ করে ফেলেছি ৷

ওকে হার মানা গলায় কথা বলতে দেখে অলি হেসে ফেলল ৷ ও গলা খাকারি দিয়ে বলল,,,

শোনো বাছা কাউকে পছন্দ হওয়ার আগে তিনটা বিষয় ভাববে ৷ প্রথমটা হচ্ছে তোমার কি বিয়ে করার মতো বয়স হয়েছে অথবা বিয়ে করে যাকে নিয়ে আসবে তার সমস্ত খায়েস পুরণ করার সামর্থ্য কি তোমার হয়েছে? দ্বিতীয়টা হচ্ছে সেই মেয়েও কি তোমাকে পছন্দ করে নাকি তোমার আচরণে বিরক্তবোধ করে? আর সর্বশেষ হচ্ছে যাকে পছন্দ করছো তাকে মেনে নিতে তোমার পরিবারের কোনো আপত্তি থাকবে না তো? এখন ভেবে দেখো তুমি ৷

শোভন মাথা চুলকাতে লাগল ৷ অলি ভ্রু নাচিয়ে ওকে উত্তর দিতে তাগদা দিল ৷ ক্ষণকাল চিন্তাভাবনা করে শোভন বলল,,,

অলি ভাইয়া আমার তো তিনটা জিনিসই নেই ৷ এখন আমার কি হবে? নেগেটিভ মার্ক নিয়ে ফেল করলাম!

অলি ওর কথায় হেসে ফেলল ৷ ও শোভনের মাথার চুল এলোমেলো করে দিয়ে বলল,,,

বড় হও ৷ বড় হওয়ার পরও যদি মনে হয় যে চিতাকে তোমার পছন্দ তাহলে আমার সাথে যোগাযোগ করবে ৷ আমি নিজ দায়িত্বে তোমাকে এখানে নিয়ে এসে চিতা কে পটানোর উপায় বলে দিব ৷

শোভন অত্যধিক খুশি হয়ে গেল ৷ তবে অলি ওর খুশি বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে না দিয়ে বলল,,,

তবে এখন ওর থেকে একশহাত দূরে থাকবে ৷ এমন ভাবে ওর থেকে দুরত্ব বজায় রাখবে যেন ও আগুনের গোলা আর তুমি তুলা ৷ কাছাকাছি গেলেই পুড়ে ছাই বুঝেছো? যদি না করো তাহলে নেংটো হয়ে কান ধরে উঠবস করার জন্য প্রস্তুত হও ৷ তোমাকে অগ্রিম শুভেচ্ছা ৷

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°

লুসাই রা প্রায় প্রায় বিভিন্ন উৎসব পালন করে ৷ আজও একটা উৎসব পালন করছে ৷ সন্ধ্যার পর সুর্য হারিয়ে গিয়ে পুরো আকাশ টা তারায় তারায় রটে গেছে ৷ সেই সাথে জমিনে অনেকগুলো কাঠ একসাথে করে আগুন জ্বালানো হয়েছে ৷ সেই আগুনের চারপাশে গোল করে অনেক মানুষ বসে আছে ৷ ওদের সামনে কয়েকজন আদিবাসী রঙিন পোশাক পড়ে অদ্ভুত ভঙ্গিতে নৃত্য করছে যা দেখতে খুব একটা খারাপ লাগছে না ৷

অনন্যা ক্যামেরা বের করে সেগুলোর ছবি তুলতেছে ৷ ও ছবি তোলার মাঝে হঠাৎ অলির মুখোমুখি হলো ৷ ওকে দেখতেই অলি কিছু বলার জন্য উশখুশ করতে লাগল ৷ অনন্যা ওর দিকে ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে দ্রুত জায়গা প্রস্থান করল ৷ অনেকক্ষন থেকে অনন্যা দেখছে অলি ওর আশেপাশে ঘুরঘুর করছে ৷

অনন্যা পিছু ঘুরে একপলক অলির দিকে তাকাল ৷ তাকানোর সাথে অলির সাথে ওর চোখাচোখি হয়ে গেল ৷ এবং এই সুযোগে অলি ওর দিকে এগিয়ে আসতে ধরলে অনন্যা চট জলদি চোখ ঘুরিয়ে নিয়ে গটগট পায়ে কিছু মানুষের ভীড়ে লুকিয়ে পড়ল ৷ অলি ওকে হারিয়ে যেতে দেখে আহাম্মক হয়ে গেল ৷ মাথা চুলকাতে চুলকাতে আশেপাশে তাকাতে লাগল ৷

ওর অবস্থা দেখে অনন্যা ফিক করে হেসে ফেলল ৷ হঠাৎ হুঁশ হতেই ও হাসি বন্ধ করে ফেলল ৷ তারপর বিরবির করে বলল,,,

এই ছেলে আমার পিছে পড়েছে কেন? আবারও দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে বলবে না তো “দেশটা রসাতলে চলে গেল!”

একদম অলির ভঙ্গিতে কথাটা বলে অনন্যা মুখে হাত রেখে হেসে ফেলল ৷ ক্ষণকাল বাদে হুঁশ হতেই ও আবারও নিজেকে শাসাতে শাসাতে বলল,,,

হাসছিস কেন? এটা হাসার মতো কথা? তোর উচিত ওই রামছাগলের বাবার মাথা ফাটিয়ে দেওয়া!

কথামতো অনন্যা আর হাসল না ৷ মুখটা যথাসম্ভব গম্ভীর করার চেষ্টা করল ৷ তারপর মানুষের ফাঁক থেকে উঁকিঝুকি দিয়ে অলিকে খুঁজতে লাগল ৷ কিন্তু অলিকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না ৷ গেল কোথায়?

এমন সময় হঠাৎ কেউ একজন ওর পিছনে গলা খাকারি দিল ৷ অনন্যা সেদিকে পাত্তা না দিয়ে অলিকে খুঁজতে লাগল ৷ পিছন থেকে আবারও গলা খাকারির শব্দ আসল ৷ এভাবে পরপর অনেক কয়েকবার গলা খাকারি দিল কেউ ৷ শেষে অনন্যা বিরক্ত হয়ে গেল ৷ ও দাঁতে দাঁত চেপে বলল,,,

মুখে কফ জমে থাকলে সেটা ফেলে দিন তবুও দয়া করে এমন ঘ্যারত ঘ্যারত করবেন না ৷

পিছন থেকে আর একবারও গলা খাকারির শব্দ শোনা গেল না ৷ এতে করে অনন্যা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে অলিকে খুঁজতে আরম্ভ করল ৷ একটু পর ওর মতো করে আরও একজন ঝুঁকে বলতে লাগল,,,

কাউকে খুঁজছেন?

অনন্যা ঘোরের মধ্যে থেকে বলল,,, হ্যাঁ ৷ কোথায় যে গেল বুঝতে পারছি না ৷

চলুন একসাথে খুঁজি ৷ ছেলে না মেয়ে?

অনন্যা উত্তর দিতে যাবে তার আগে ভ্রু কুঁচকে ও কিছু বোঝার চেষ্টা করল ৷ অতঃপর পাশ ফিরে পেপসুডেন্টের এড মার্কা হাসি দেখে ওর পিলে চমকে উঠল ৷ ওর চমকানি দেখে অলি খানিকটা হতবাক হয়ে গেল ৷ ও নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,,,

এনি সমস্যা?

অনন্যার বুক এখনও ধড়াস ধড়াস করতেছে ৷ কোনো কথা বলল না ও ৷ তবে একটু পর অলি বলল,,,

কাকে খুঁজছেন বলুন ৷ আমি এক সেকেন্ডে খুঁজে দিচ্ছি ৷

অনন্যা আমতা আমতা করে বলল,,, কাউকে না ৷ কথা বলতে চাচ্ছি না আমি ৷

কিন্তু আমি কথা বলতে চাচ্ছি ৷

অনন্যা গম্ভীর গলায় বলল,,, খবরদার যদি ভাত খাওয়া নিয়ে কিছু বলেছেন তো! সত্যি বলছি আমার ক্যামেরা দিয়ে আপনার মাথা ফাটিয়ে দিব ৷

অলি ব্যস্ত গলায় বলতে লাগল,,, তওবা তওবা আমি এমন কাজ ভুলেও কোনোদিন ভুল করেও করব না ৷ আসলে আমি আপনাকে বিরক্ত করার জন্য মাফ চাইতে এসেছি ৷

অনন্যার মেজাজ নিয়ন্ত্রণে এলো ৷ ও স্বাভাবিক গলায় বলল,,, যাক আক্কেল হয়েছে তাহলে ৷ ঠিক আছে মাফ করে দিলাম ৷ যান এখন ৷

অলি গেল না বরং ইতস্তত করতে লাগল ৷ ওকে যেতে না দেখে অনন্যা কপাল কুঁচকে বলল,,,

আশ্চর্য! আপনি যাচ্ছেন না কেন?

অলি মাথা চুলকে এদিক ওদিক তাকিয়ে বলতে লাগল, আমম আসলে রিসোর্টে বল ছোঁড়ার ব্যাপার নিয়েও আমি ভুল করেছিলাম ৷

অনন্যা এতোক্ষণ অন্যদিকে তাকিয়ে ছিল ৷ এবার ও অলির দিকে তাকাল ৷ ওকে তাকাতে দেখে অলি আরও বেশি ইতস্তত করতে লাগল ৷ অনন্যা কাটকাট গলায় বলল,,,

আপনি কি বলতে চাচ্ছেন?

ওই যে বলটা শোভন ছুঁড়েছিল কিন্তু আমি দোষ দিয়েছি আপনাকে ৷ প্লিজ তার জন্য মাফ করে দিন ৷

আচ্ছা দিলাম মাফ করে ৷ কিন্তু ভবিষ্যতে একটু দোষ দেওয়ার আগে একশবার ভাববেন ৷

সত্যি মাফ করে দিয়েছেন তো? এটা কিন্তু অনেক বড় ভুল করেছি আমি ৷ এতো সহজে মাফ করে দিলেন? আমার কেন যেন বিশ্বাস হচ্ছে না যে আপনি আমাকে মাফ করেছেন ৷

অনন্যা আহাম্মক হয়ে বলল,,, হায় আল্লাহ আমি কি এখন আপনার গালে চ*ড় মে*রে বলব যা ভাই মাফ করে দিয়েছি? নাকি আপনি একশবার মাফ চাওয়ার পর আমি মাফ করলে বিশ্বাস করবেন?

অলি গভীর মনোযোগে কিছু চিন্তা করল ৷ তারপর জ্ঞানী জ্ঞানী গলায় বলল,,,

দুটো অপশনই আমার মনে ধরেছে ৷ তবে দ্বিতীয়টা বেশি ভালো ৷ প্রথমটায় ব্যাথা পাওয়ার সম্ভাবনা আছে ৷ আমি আবার ব্যাথা পেলে কিছু খেতে পারি না ৷

অনন্যা হতভম্ভ হয়ে গেল ৷ ও তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে মনে মনে বলল,,,

এ ছেলে না হয়ে মেয়ে হলে ভালো হতো ৷ কথায় কথায় ভাত না খাওয়ার প্রতিজ্ঞা করে ৷ মাফ না পেলে ভাত খাব না , ব্যাথা পেলে ভাত খাব না ব্লা ব্লা ব্লা!

ওকে বিরবির করতে দেখে অলি ভীত চোখে ওর দিকে তাকিয়ে বলতে লাগল,,,

মাফ করেননি তাই না?

অনন্যা বাজখাই গলায় বলে উঠল,,, মাফ করেছি রে ভাই ৷ আপনি যান ৷

অলি তবুও গেল না ৷ ও মিনমিন গলায় বলল,,, আরও একটা মাফ চাওয়ার বাকি আছে ৷

কি আশ্চর্য! আপনি দিনে কত হাজার পাপ করেছেন বলুন তো? আমার কেন যেন মনে হচ্ছে আপনি ইবলিশ শ**য়তানের থেকেও মাফ চান!

চলবে,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here