#চাঁদের_হাসি
#লেখিকা_সিনথিয়া_জাহান
#পর্বঃ১৭
আদিবাসী গ্রাম থেকে বিদায় নেওয়ার সময় এসেছে ৷ সকলে নিজেদের প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো গুছিয়ে নিল ৷ হেনিনের মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল ৷ ভিন্ন ভিন্ন মানুষের সাথে পরিচিত হতে ওর ভীষণ ভালো লাগে ৷ তার উপর মানুষগুলো যদি এমন মিশুক হয় তাহলে তো কথাই নেই ৷
অনন্যা হেনিনের পাশে গিয়ে দাঁড়াল ৷ তারপর ওর হাতের একটা ব্রেসলেট বের করে বলল,,,
তোমার হাতটা দাও দেখি হেনিন ৷
হেনিন হাত বাড়িয়ে দিল ৷ অনন্যা ওর হাতে ব্রেসলেট টা পড়িয়ে দিতে দিতে বলল,,,
এটা আমার সবচেয়ে পছন্দের একটা জিনিস ৷ এতোই পছন্দ যে কাউকে স্পর্শ পর্যন্ত করতে দিতাম না কিন্তু আজ পুরোপুরি তোমাকে দিয়ে দিলাম ৷ পছন্দের জিনিস পছন্দের মানুষের কাছেই থাকা উচিত ৷
হেনিনের চোখ ছলছল করে উঠল ৷ ও অনন্যাকে জড়িয়ে ধরে বলল,,,,
তুমি অনেক ভালো আপু ৷ দেখবে অনেক ভালো একটা ছেলের সাথে তোমার বিয়ে হবে ৷ তারপর তোমার আর কোনো দুঃখ থাকবে না ৷
অনন্যা মলিন ভাবে হাসল ৷ এই কথাটার জবাব দিতে ওর একদম ইচ্ছা করছে না ৷ ও হেনিনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,,,
কান্না করো না ৷ আমি আবার আসব তোমার সাথে দেখা করতে ৷ আমাকে ভুলে যেও না যেন ৷
হেনিন মাথা ডানে বায়ে ঝাকাতে ঝাকাতে বলল,,, তোমাকে ভুলে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না ৷
আরো কিছুক্ষণ জড়িয়ে ধরে থাকার পর ওরা আলাদা হলো ৷ হেনিন চোখের পানিটুকু মুছে নিল ৷ হাতের ব্রেসলেট টার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল অতঃপর বলল,,,
আপু শোনো তোমাকে একটা কথা বলি ৷
বলো ৷
আঙ্গা নাখনু নামনিকা ৷
অনন্যা হকচকিয়ে গেল ৷ ও অবাক গলায় বলল,,, এ কথার মানে কি হেনিন? আমি বুঝলাম না ৷
হেনিন অনন্যার কথার জবাব না দিয়ে সামনে হাসতে থাকা অলির দিকে তাকাল ৷ হেনিনের মনে কাল রাত থেকেই কিছু একটা চলছিল ৷ ও অলির থেকে নজর সরিয়ে অনন্যার দিকে তাকিয়ে রহস্যময় ভাবে হেসে বলল,,,
অলি ভাইয়ার থেকে জেনে নিও ৷ ভাইয়া আমাদের ভাষা টুকটাক বলতে পারে ৷ আচ্ছা বিদায় ৷
বলে হেনিন পিকুদের দিকে চলে গেল ৷ ওদিকে অনন্যা হতভম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিরবির করে হেনিনের বলা কথাটা আওড়াতে লাগল যেন ভুলে না যায় ৷ ওর মুখস্ত করার সময় হেনিন পিকুর সাথে কথা বলতে লাগল ৷ পিকু ঠোঁট উল্টে বলল,,,
যদিও তোমার সাথে ব্রেকআপ করেছিলাম কিন্তু এখন তুমি কথা বলতে পারো ৷
হেনিন সামান্য হেসে বলল,,, আমাকে ছেড়ে চলে যাবে?
তুমি তো একবারও থাকতে বলোনি তাহলে থাকব কেন?
আমি বললেও থাকতে না তাই বলিনি ৷ তোমার সাথে মনে হয় না আর দেখা হবে ৷
পিকু হঠাৎ কাঁদতে শুরু করল ৷ এতে করে হেনিনের মনটাও খারাপ হয়ে গেল ৷ পিকুর মা এসে ওর কান্না থামানোর চেষ্টা করতে লাগলেন ৷ এই সময় সানা আর শোভন সেখানে উপস্থিত হলো ৷ হেনিন সানাকে দেখে মুচকি হাসল ৷ প্রতি উত্তরে সানাও মুচকি হাসল ৷ তবে না শোভন ওর দিকে তাকাল আর না হেনিন শোভনের দিকে তাকাল , কথা বলা তো দূরের কথা ৷
সানা মুচকি হেসে বলতে লাগল,,,তোমার কথা অনেক মনে পড়বে চিতা ৷ তুমি বনের চিতার মতো হিং*স্র নও বরং খুবই মিষ্টি একটা মেয়ে ৷
হেনিন হেসে হেসে বলল,,, তুমিও অনেক কিউট তবে তোমাদের মা*রামা*রির ব্যাপার টা আমি এখনও ধরতে পারিনি ৷
এই প্রথমবার শোভন হেসে ফেলল তবে অন্যদিকে তাকিয়েই ৷ সানাও হাসল ৷ ও হেসে হেসে বলল,,,
এটা আমাদের গোপন বিষয় ৷ আমরা ব্যতীত এটা কেউ বুঝবে না ৷
না বোঝাই ভালো ৷ তবে হ্যাঁ মা*রামারি করতে করতে ম*রে টরে যেও না আবার ৷
আবারও দু ভাইবোন হেসে ফেলল ৷ হেনিন আরও কিছু সময় সানার সাথে কথা বলে ওদের থেকে বিদায় নিল ৷ এই পুরো সময়ে একবারের জন্যেও শোভন ওর দিকে তাকায়নি ৷ তবে হেনিন যখন চলে গেল তখন ও একদৃষ্টিতে ওর গমনপথের দিকে তাকিয়ে থাকল ৷ ওর চোখদুটো হঠাৎ ছলছল করে উঠল ৷ তা দেখে সানা ওর গালে ফটাশ করে একটা চ*ড় বসিয়ে দিয়ে বলল,,,
ঢং করিস না!
°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°
অলি সব বন্দোবস্ত করে ফেলেছে ৷ এবার রিসোর্টে ফেরার পালা ৷ মাহি ওকে হাতে হাতে সাহায্য করেছে ৷ কাজ শেষে মাহি বলতে লাগল,,,
কি রে বিল্টুকে দেখছি না যে ৷ ও আবার পিকুর আশেপাশে ঘুরঘুর করছে না তো? এই ল্যাদা বাচ্চাকে নিয়ে আর পারা গেল না ছ্যাহ!
বিল্টু বড় একটা ব্যাগের পিছন থেকে বেরিয়ে রাগত স্বরে বলতে লাগল,,,
চোখ থাকতেও সেটা ব্যবহার করো না কেন? তখন থেকে আমি এখানেই আছি ৷ আমার কোনো ঠ্যাকা পড়েনি ওই মেয়ের সাথে দেখা করতে যাওয়ার ৷
মাহি খানিকটা থতমত খেয়ে গেল ৷ তবুও গলা খাকারি দিয়ে নিজের পেস্ট্রিজ বজায় রাখার চেষ্টা করল ৷ ও বলতে লাগল,,,
হ্যাঁ হ্যাঁ বুঝেছি ৷ সেই জন্যেই তো প্রেম করার কথা বলিস ছ্যাহ ছ্যাহ!
বিল্টু কটমট দৃষ্টিতে মাহির দিকে এগিয়ে গিয়ে ওকে পটাপট মা**রতে লাগল ৷ মাহি হাসতে হাসতে বলল,,
ওরে বাবাহ সত্যি কথা বলায় কি রা**গ!
চুপ করো মাহি ভাইয়া! তুমি বাড়াবাড়ি করছো!
বাড়াবাড়ি বানান কর দেখি ৷
বিল্টু মা*রা থামিয়ে দিল ৷ এমন ভাব দেখাল যে তোমাকে আমি পরে দেখে নেব ৷ তবে তেমন টা না ৷ আসলে ও বাড়াবাড়ি বানান করতে পারে না তাই রাগ দেখিয়ে বানানের বিষয়টা ঢাকার চেষ্টা করল ৷
ওদের অবস্থা দেখে অলি মুচুরমুচুর করে হাসতেছিল ৷ এবার ও গলা খাকারি দিয়ে বলতে লাগল,,,,
মাহি ওর সাথে এমন করবি না ৷ তবে বিল্টু শোন একটা বিষয় তোকেও মাথায় রাখতে হবে ৷ বউয়ের কোনো জিনিস লাগবে কিনা সেটা তো তোকেই দেখতে হবে তাই না? যা একটু খোঁজ নিয়ে আয় ৷
অলি গম্ভীর গলায় কথাগুলো বলল ৷ ওর কথা শুনে মাহি পেটে হাত রেখে জোরে জোরে হাসতে লাগল ৷ অলিও এবার হেসে ফেলল ৷ ওদের দুজনের হাসির দিকে অ*গ্নিদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর বিল্টু ওদের দুজনকে পালা করে মা**রতে লাগল ৷ মা**র খাওয়া অবস্থাতেও ওরা হাসতে লাগল ৷
এক পর্যায়ে হাসি থামিয়ে অলি বলতে লাগল,,, হয়েছে আর মা**রিস না ৷ আর বলব না ৷
বিল্টু ওদেরকে আর মা**রল না তবে এখনও কঠিন দৃষ্টিতে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে ৷ এর মাঝে হেনিন ওখানে চলে আসল ৷ ও উৎসাহী গলায় বলতে লাগল,,
কি করছো তোমরা?
অলি ওর দিকে তাকিয়ে বলল,, এই তো রে চিতা সব গুছিয়ে নিলাম ৷ এখন যেতে হবে ৷
আবার কখন আসবে?
আমার তো আসা যাওয়া লেগেই থাকে ৷ কয়েকদিনের মধ্যেই আবার দেখা হবে ৷ তোর তো এখন প্রিয় মানুষের অভাব নেই ৷ ওদের থেকে বিদায় নিয়েছিস?
হু ৷
ভালো ৷
অলি ভাইয়া শোনো ৷
অলি ভ্রু নাচিয়ে বলল,,, কি?
এদিকে আসো ৷
হেনিন ইশারায় ওকে নিজের কাছে ডাকল ৷ অলি কাছাকাছি আসতেই হেনিন হাতের ইশারায় ওর কান নামিয়ে আনতে বলল ৷ ইশারামত অলি হেনিনের মুখের কাছে কান নিয়ে গেল ৷ হেনিন ফিসফিস করে বলতে লাগল,,,
তোমার দ্বারা মনে হয় না বউ খোঁজা সম্ভব হবে তাই আমি একটা খুঁজেছি ৷ লালকুমারীর সাথে তোমাকে অসম্ভব সুন্দর মানায় ৷ আর বিয়ে হলে নির্দ্বিধায় মাফও চাইতে পারবে , তখন আর ভাত না খেয়ে থাকতে হবে না ৷
কথাগুলো বলা শেষ করে হেনিন সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে হাসিহাসি মুখে অলির দিকে তাকিয়ে থাকল ৷ অলি হতভম্ভ হয়ে গেছে ৷ এমন কথা শুনবে সেটা ও ভাবতে পারেনি ৷ হেনিন আবারও বলতে লাগল,,,
হারিয়ে যেতে দিও না ৷ নিজের সাথে আটকে রেখো ৷ এমন আর খুঁজে পাবে না ৷
বলেই হেনিন এক ছুটে জায়গা ত্যাগ করল ৷ অলি এখনও হতভম্ভ মুখে দাঁড়িয়ে আছে ৷ মাহি ওর দিকে এগিয়ে এসে ভ্রু কুঁচকে বলল,,,
কি হারিয়ে যাওয়ার কথা বলছিল চিতা?
অলি নিশ্চুপ ৷ মাহি আরও একবার প্রশ্নটা করল ৷ এবারেও কোনো উত্তর নেই ৷ মাহি এবার ওর মাথায় একটা থা*প্পড় মে**রে বলল,,,
কি রে গা’ধা কথা বলছিস না কেন?
অলি ধ্যান থেকে বেরিয়ে এসে বলল,,, হু?
শালাহ আমি কি তোর ‘হু’ শুনতে চেয়েছি? চিতা কি বলছিল?
অলি ইতস্তত করে বলল,,, ক-ক-কিছু না ৷
মাহি সন্দেহজনক দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকাল ৷ তা দেখে অলি গলা খাকারি দিয়ে বলল,,,
কি শুরু করেছিস বল তো? চল আমাদের যাত্রা শুরু করতে হবে ৷ পিছন পিছন আয় ৷
°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°
অলি সবাইকে নিয়ে রিসোর্ট অভিমুখে যাত্রা আরম্ভ করল ৷ সকলে খানিকটা মন খারাপের সাথে হাঁটতে লাগল ৷ রিসোর্টে পৌঁছলেই ওদের ভ্রমণের ইতি ঘটবে ৷ আবারও ফিরে যেতে হবে বোরিং দৈনন্দিন জীবনে ৷ তবুও যেতে তো হবে ৷ জীবনে বাঁচার তাগিদে অপ্রিয় অনেক জিনিস স*হ্য করতে হয় ৷
অনন্যা পিকুর মায়ের সাথে হাঁটছে ৷ পিকু অবশ্য ওদের সাথে নেই ৷ ও আছে অলির কাছে ৷ আবারও কোনো উদ্ভট প্রশ্ন করা যায় কিনা নিশ্চয়ই সেই ফন্দী আটছে ৷ যাক সে কথা, অনন্যা হাঁটার পাশাপাশি পিকুর মায়ের দিকে তাকাতে লাগল ৷ ভদ্রমহিলা বেশ রুপবতী ৷ বাচ্চা তিনটাও উনার মতোই হয়েছে ৷ এদের কে রুপবতী পরিবারের অ্যাওয়ার্ড দেওয়া যেতে পারে ৷
পিকুর মা এক সময় বলে উঠলেন,,, তুমি কি মন খারাপ করেছিলে?
হঠাৎ প্রশ্নে অনন্যা চমকে উঠল ৷ ও তৎক্ষণাৎ নিজেকে সামলেও নিল এবং বলতে লাগল,,,
কেন মন খারাপ করব?
ওই যে কংলাক পাহাড়ে ক্যাম্পিংয়ের সময় যে বলেছিলাম তোমার চোখ নিয়ে ৷
অনন্যা সামান্য হেসে বলল,,, আপনি এখনও সেটা মনে রেখেছেন? আমি তো কবেই ভুলে গেছি ৷
আমি যে ভুলতে পারছি না মা ৷ তোমাকে আমি অজান্তে ক*ষ্ট দিয়ে ফেলেছি ৷ তোমার মুখের সেই মলিন ভাব এখনও আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে ৷
ক*ষ্ট পাবেন না আন্টি ৷ আমি কিছুই মনে করিনি ৷
কিছুক্ষণ চুপ থেকে উনি বলতে লাগলেন,,, শোনো মা সৌন্দর্য আল্লাহ প্রদত্ত ৷ তাই এটা নিয়ে যেমন অহংকার করার কোনো মানে নেই তেমন এটা নিয়ে ব্যাঙ্গ করারও কোনো মানে নেই ৷ কেউ কিছু বললে তুমি সেটা গায়ে মাখাবে না ৷ এটা তোমার দোষের কারনে হয়নি ৷ আল্লাহ তোমাকে ওমন করে দিয়েছেন ৷ তাহলে যেটার জন্য তুমি দায়ী না সেটার জন্য কষ্ট পাওয়ারও কোনো মানে হয় না ৷ বুঝেছো?
হু বুঝেছি ৷
অনন্যার হঠাৎ ভীষণ কান্না পেল ৷ সম্পূর্ণ অপরিচিত একজন ভদ্রমহিলা দুইদিনের পরিচয়েই ঠিক কতটা আপন করে নিয়েছে ওকে ৷ আল্লাহ যে পৃথিবীতে ভালো ভালো মানুষও রেখেছেন সেটা এই ভ্রমণে এসে বুঝতে পারল ও ৷
ওরা দুজন চুপচাপ হাঁটতে লাগল ৷ ওদের থেকে খানিকটা সামনে অলি আর পিকু হাঁটছে ৷ অলি পিছু ঘুরে একপলক অনন্যার দিকে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিল ৷ হেনিনের বলা সেই কথাটা শোনার পর থেকে মেয়েটাকে দেখলে ওর ভীষণ লজ্জা লাগছে, এই যে যেমন এখনও লাগছে ৷
ওর লজ্জা পাওয়ার মাঝেই পিকু বলতে লাগল,,, আচ্ছা অলি ভাইয়া ওই যে একটা কাক বসে আছে না সেটাকে দেখো ৷
অলি লজ্জা পাওয়া বাদ দিয়ে কাকের দিকে তাকিয়ে বলল,,, দেখেছি ৷ কেন বল তো?
ও নেংটু হয়ে বসে আছে কেন? আমরা কি পারি না ওদের জন্য জামাকাপড় বানিয়ে দিতে?
অলি দীর্ঘশ্বাস ফেলল ৷ এমন অদ্ভুত প্রশ্ন পিকু বেশ কিছুক্ষণ থেকেই করছে ৷ ও বলতে লাগল,,,
জামাকাপড় পড়িয়ে দিলেই বলতে গেলে ওদেরকে নেংটু লাগবে বুঝেছো?
চলবে,,,,,

