#চাঁদের_হাসি
#লেখিকা_সিনথিয়া_জাহান
#পর্বঃ১৮
রিসোর্টে পৌঁছে সকলে ক্লান্তিতে আচ্ছন্ন হয়ে গেল ৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই ওদের এই চির সবুজ আর পাহাড় এলাকা ছেড়ে নিজের বাসভূমিতে ফিরতে হবে ভেবে ক্লান্তিটা আরো বেড়ে চলেছে ৷ তবুও ফিরে তো যেতেই হবে ৷ অনন্যা নিজের রুমে গিয়ে সবকিছু গুছিয়ে নিল ৷ তারপর আলমগীর প্রামানিকের রুমে গেল ৷ হ্যাঁ উনিও সবকিছু গুছিয়ে নিয়েছেন কিন্তু উনার মধ্যে বেশ চনমনে ভাব ৷ তা দেখে অনন্যা বাকা হেসে বলল,,
বুড়োর দেখি মনের পাশাপাশি শরীরেও দারুণ রঙ লেগেছে ৷
আলমগীর প্রামানিক সামান্য হেসে বললেন,,, এমন জায়গায় আসলে রঙ লাগারই কথা লালকুমারী ৷
হু হু বুঝেছি ৷ তবে রঙ বেশিক্ষণ থাকবে না ৷ আজই আমাদের বাড়ি ফিরতে হবে ৷ তাই সবকিছু তৈরি করে রাখো ৷
আলমগীর প্রামানিক হাই তুলে বললেন,,, বাকিরা যাচ্ছে যাক কিন্তু আমরা যাচ্ছি না ৷
অনন্যা ভ্রু কুঁচকে বলল,,, আমরা যাচ্ছি না মানে?
যাচ্ছি না মানে যাচ্ছি না ৷
এখানেই কি সংসার পাতার ইচ্ছা আছে? তুমি কি টাকার পুটলি পেয়েছো? রিসোর্টে থাকার খরচ কি সেই টাকার পুটলি থেকে আসবে বুড়ো?
আমি কখন বললাম এই রিসোর্টে থাকব? আমরা অন্য কোথাও যাচ্ছি ৷
অনন্যার ভ্রু আরো খানিকটা কুঁচকে গেল ৷ ও দাদুর দিকে তাকিয়ে সন্দেহী গলায় বলতে লাগল,,,
তুমি ঠিক কি বলতে চাচ্ছ বলো তো বুড়ো ৷ তোমার হাবভাব আমার ভালো লাগছে না ৷
আলমগীর প্রামানিক হাসিহাসি মুখে নাতনির দিকে ক্ষণকাল তাকিয়ে থাকার পর বললেন,,,
আমরা অলি বাবুর সাথে তার বাড়িতে যাচ্ছি ৷
অনন্যা স্তম্ভিত হয়ে গেল ৷ কয়েক মিনিট লাগল ওর নিজেকে সামলাতে ৷ অতঃপর ও খেকিয়ে উঠে বলল,,,
তোমার মাথা ঠিক আছে বুড়ো? আমরা অযথা উনার বাড়িতে যাব কেন?
আরে বুঝছো না লালকুমারী ৷ অলি বাবু যেখানে থাকে সেই জায়গাটা দেখতে যাচ্ছি ৷ ওর থেকে বর্ণনা শুনে আমার লোভ লাগছে জায়গাটা দেখার ৷
না আমরা কোথাও যাচ্ছি না ৷ খামোখা উনাকে বিরক্ত করার কোনো মানে দেখছি না ৷ খবরদার উনার সাথে যাওয়ার কথা বলবে না ৷
অলি বাবু নিজে থেকে আমাকে সেখানে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছে তাই আমি যাচ্ছি ৷
কবে বলেছে তোমাকে?
দিন দুয়েক আগে ৷
তাহলে ওটা মজা করে বলেছে ৷ দেখো উনার হয়তো তোমাকে নিয়ে যাওয়ার কথাটাই মনে নেই ৷ সো তুমি ওখানে যাওয়ার কুরকুরি না দেখিয়ে বাড়িতে যাওয়ার কথা ভাবো তো বুড়ো ৷
অনন্যার কথার মাঝেই মাহি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে গলা খাকারি দিল ৷ দাদু নাতনি চকিতে ওর দিকে তাকাল ৷ ওদের মনোযোগ আকর্ষণ করার পর মাহি বলতে লাগল,,,
দাদু তোমার গোছগাছ শেষ হয়েছে? অলি তোমাকে দ্রুত আসতে বলল ৷ যাবে না আমাদের সাথে?
আলমগীর প্রামানিক উচ্ছ্বসিত গলায় বললেন,,, যাব না মানে আলবাত যাব ৷ আমি তৈরি ৷
মাহি মুচকি হেসে বলল,,, জলদি আসুন দাদু ৷
মাহি চলে গেল ৷ ও চলে যেতেই আলমগীর প্রামানিক নাতনিকে ব্যঙ্গ করে বললেন,,,
দেখলে এবার? আমার অলি বাবু কখনো কিছু ভোলে না ৷ ঠিকই আমাকে ডেকে পাঠাল ৷
অনন্যা কাটকাট গলায় বলল,,, তবুও আমরা যাব না দাদু ৷
আলমগীর প্রামানিক বুঝলেন নাতনির জেদ তিনি ভাঙাতে পারবেন না ৷ তাই উনি মুখটা যথাসম্ভব করুন বানিয়ে বলতে লাগলেন,,,
হ্যাঁ তাই তো ৷ তুমি যাবে কেন? ওখানে যাওয়া তো আমার ইচ্ছা ৷ আমার ইচ্ছার তো কোনো দাম নেই তোমার ৷ থাক যেতে হবে না লালকুমারী ৷ আমরা বাসায় ফিরে যাব ৷
এই এই খবরদার ইমোশনাল ব্লাকমেইল করার চেষ্টা করবে না বুড়ো!
করছি না ৷ চলো বাসায় যেতে হবে ৷
অনন্যা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে লাগল,,, আচ্ছা আচ্ছা তোমার অলি বাবুর গ্রাম দেখতে যাব ৷
আলমগীর প্রামানিক এলইডি বাল্বের মতো ঝিকমিক করে উঠলেন ৷ উনি ব্যাগ বস্তা হাতে নিয়ে চনমনে গলায় বললেন,,,
চলো লালকুমারী নতুন ভ্রমণে যাওয়া যাক ৷
অনন্যা কপাল চাপড়ে বলল,,, এই বুড়োকে অভিনয় ক্যাটাগরিতে অস্কার অফার করা উচিত ৷
আলমগীর প্রামানিক ওর অপমানকে গায়ে মাখলেন না ৷ অত্যন্ত জোশের সাথে উনি রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন ৷ অনন্যাও নিজের যাবতীয় জিনিসপত্র নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো ৷ ওখানে সকলে উপস্থিত আছে ৷ ও দেখল পিকু অলির কোলে চড়ে ওর কাঁধে মাথা রেখে চুপ করে আছে ৷
শোভন সানা একদম প্রথম দিনের মতো ভদ্র বাচ্চা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ৷ অনন্যা ক্লান্ত পায়ে ওদের পাশে গিয়ে দাঁড়াল ৷ ওরা দু ভাইবোন অনন্যার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল ৷ অনন্যাও হাসার চেষ্টা করল কিন্তু মন থেকে হাসি আসছে না ৷
বাঘাইহাটী আর্মি ক্যাম্পে যাওয়ার প্রথম স্কটে রওয়ানা হবে ওরা ৷ তারপর সেখান থেকে খাগড়াছড়ি হয়ে যে যার গন্তব্যে চলে যাবে ৷ এবার অলিও ওদের সাথে যাবে ৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা গাড়িতে বসে পড়ল এবং সেটা রওয়ানা হয়ে গেল ৷ সকলে চুপচাপ বসে আছে ৷ আসার দিন কত কথা হচ্ছিল আর আজ কি নিস্তব্ধতা ৷
অনন্যা এক এক করে সবার দিকে তাকাল ৷ শোভন সানার দিকে চোখ যেতেই ওর ভিতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো ৷ বাবার উপস্থিতিতে ওরা নিজেদের আসল রুপে ফিরে আসবে না আর অনন্যা সেটা দেখতেও পারবে না ৷ তবে ওরা দু ভাইবোন চুপ থাকলেও পিকু অলির সাথে অনর্গল কথা বলে চলেছে ৷ একটু পর ও আলমগীর প্রামানিককে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগল,,,
পটল দাদু তোমার ভাতের মতো দাঁড়িগুলোর রহস্য কিন্তু এখনও বলোনি ৷
আলমগীর প্রামানিক হেসে ফেলে বললেন,,, এগুলো ছেলেদের রহস্য ৷ মেয়েরা এই রহস্য জানতে পারবে না ৷
পিকু মন বেজার করে বলল,,, এটা তো ঠিক না ৷ মেয়ে হওয়ার অপরাধে এখন আমি দাঁড়ির রহস্য জানব না?
সবাই ওর প্রশ্নে হেসে ফেলল ৷ পিকু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,,,
আচ্ছা অলি ভাইয়া তুমি কি ছেলে?
অলি থতমত খেয়ে গেল ৷ এমন প্রশ্নের জন্য ও প্রস্তুত ছিল না ৷ তবে মাহি হাসতে হাসতে বলল,,,
সম্ভবত ছেলে ৷ আমি নিশ্চিত হয়ে কিছু বলতে পারছি না পিকু ৷
অলি চোখ পাকিয়ে মাহির দিকে তাকাল ৷ সেটা দেখে মাহির হাসি আরো বেড়ে গেল ৷ পিকু অলির মুখের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগল,,,
তুমি ছেলে হও বা মেয়ে হও , তোমার মুখটা কিন্তু অনেক সুন্দর ৷
অলির ঠিক কি প্রতিক্রিয়া করা উচিত ও বুঝতে পারছে না ৷ খুশি হবে না অপমানে থতমত খেয়ে যাবে? পিকুটা শেষ দিনে এসে যে ওর মান সম্মান এভাবে খেয়ে দিবে সেটা ও ভাবতেই পারেনি! অলির পিছনে লাগা শেষ হলে পিকু অন্যদিকে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করল ৷
বিল্টু শুরু থেকেই মাথা নিচু করে বসে আছে ৷ পিকু ওর দিকে তাকিয়ে বলতে লাগল,,,
তুমি ওমন চুপ করে আছো কেন বিল্টু ভাইয়া? সবার সাথে কথা বলা লাগে ৷ তুমি দেখছি খুব পচা হয়ে গেছো ৷
মাহি ওর কথার সাথে তাল মিলিয়ে বলল,,, ঠিক একদম ঠিক ৷
পিকু কাটকাট গলায় বলল,,, আমি ভুল বলি না হুহহ ৷
সেটাও ঠিক ৷
পিকু নিজের ছোট্ট ব্যাগ থেকে একটা চকলেট বের করে বিল্টুর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,,,
এই যে নাও খাও ৷
বিল্টু একপলক দেখল কিন্তু নিল না ৷ মাহি আর অলি মুচুরমুচুর করে হাসতেছে ৷ ওর হাসির দিকে তাকিয়ে বিল্টুর গা জ্বলে গেল ৷ মাহি মুচুরমুচুর হাসি অব্যাহত রেখে বিল্টুকে ঝাকিয়ে বলল,,,
আরে নে নে ৷ দিচ্ছে যখন নে ৷
বিল্টু তবুও নিচ্ছে না ৷ পিকু ওর দিকে চকলেট বাড়িয়ে রেখেছে এখনও ৷ ও বলতে লাগল,,,
বিল্টু ভাইয়া নাও ৷ চকলেট টা অনেক মজার ৷ কারুত কুরুত করে কামড়ে কামড়ে খেলে অনেক মজা পাওয়া যায় ৷
অলি নিজের হাসি যথাসম্ভব আটকে রেখে বলল,, কি হলো বিল্টু নিচ্ছিস না কেন?
বিল্টু এবার নিয়ে নিল ৷ পিকু হাসিমুখে বলল,,, এই চকলেটের সাথে ছোট গাড়িও পাওয়া যায় ৷ তোমার টাতেও আছে নিশ্চয়ই ৷
মাহি আর অলি মাথা নিচু রেখে মুচুরমুচুর করে হাসতে লাগল ৷ ওদের হাসির দিকে কটমট দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বিল্টু চকলেট টা খেতে লাগল ৷ ওকে খেতে দেখে পিকু উৎসাহী গলায় বলল,,,
মজা না?
বিল্টু মাথা উপর নিচ করে বলল,,, হু ৷
কিছুক্ষণ পর মাহি গলা খাকারি দিয়ে বলল,,, তা পিকু চকলেট কি শুধু বিল্টুর জন্য? আমাদের জন্য নেই?
না নেই ৷ বড় মানুষ চকলেট খায় না ৷ এটাও জানো না? তুমি কি বোকা!
অলি হেসে ফেলল ৷ মাহি থতমত খেয়ে গেলেও বলল,,
আমাদের এলাকার বড় মানুষেরা তো খায় ৷ তোমাদের এলাকার বিষয়ে কিছু বলতে পারছি না ৷
তবুও তুমি বোকা ৷
বলে পিকু খিকখিক করে হাসতে লাগল ৷ ওর হাসির শব্দই ক্ষণকাল গাড়িতে অব্যাহত থাকল ৷ অনন্যার মন কিছুতেই ভালো হচ্ছে না ৷ ভ্রমণ থেকে ফিরে যেতে বুঝি এতো কষ্ট লাগে? উফফ এই কষ্ট তো অসহ্যনীয় লাগছে ওর কাছে!
শোভন সানা কি অবলীলায় বসে আছে ৷ ওদের কি কোনো দুঃখ হচ্ছে না? হয়তো হচ্ছে না কারন ওরা নিজেদের মতো করে আনন্দ করতে জানে ৷ কিন্তু অনন্যা তো জানে না , ওর জীবনে যে সুখ ধরা দিতে চায় না ৷ তাই তো ভীষণ কষ্ট হচ্ছে ওর ৷
গাড়ি এসে বাঘাইহাটী আর্মি ক্যাম্পে থামল ৷ এই এখান থেকেই যাত্রা শুরু করেছিল ওরা ৷ এখানে এসেই সেই যাত্রা শেষ হলো ৷ যাত্রার পাশাপাশি যে নতুন মানুষগুলোর সাথে পরিচয় হয়েছিল সেই পরিচয়ও শেষ হলো ৷
বাড়ি ফিরে যাওয়ার কথা শোনার পর থেকে পিকু অলির গলা জড়িয়ে রেখে কাঁদতে লাগল ৷ ওর কান্না থামছে না আর না ও অলিকে ছাড়ছে ৷ পিকুর মা , বাবা ওকে সামলানোর চেষ্টা করছেন পাশাপাশি অলিও বোঝানোর চেষ্টা করতেছে ৷
অনন্যা সেদিকে নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে আছে ৷ এমন সময় হুট করে কিছু শব্দ শুনে ও সামনে তাকাল ৷ শোভন আর সানার থাবড়াথাবড়ি শুরু হয়ে গেছে ৷ অনন্যা কি মনে করে যেন বলে উঠল,,,
তোমাদের একটা ছবি তুলি?
অনন্যার কথায় কিছু একটা যেন ছিল যেটা শুনে ওরা কোনো আপত্তি ব্যতীত ছবি তুলতে দিল ৷ তাও আবার মা*রামা*রি করা অবস্থায় ছবি ৷ অনন্যার হঠাৎ কান্না পেতে লাগল ৷ চোখ দুটো ভিজে উঠল ৷ ছিহ কি লজ্জার কথা! কেউ দেখলে কি বলবে?
অনন্যা দ্রুত নিজের চোখের পানি মুছে ফেলল ৷ পিকুকে সামলানো গেছে ৷ ওর কান্না খানিকটা থেমেছে ৷ ওরা এখন যাওয়ার জন্য প্রস্তুত ৷ অনন্যা এগিয়ে গিয়ে সকলের সাথে খানিকটা কথা বলল ৷ তারপর একটা চকলেটের বক্স পিকুর হাতে দিয়ে বলল,,,
তোমরা তিন ভাইবোন এগুলো খাবে আর আমার কথা মনে করবে ঠিক আছে?
পিকু মাথা ঝাকিয়ে সম্মতি জানাল ৷ ওরা গাড়িতে চড়ে হাত নেড়ে বিদায় জানিয়ে চলে গেল ৷ অনন্যার চোখ আবার ভিজে উঠল ৷ তবে এবার ধরা পড়ল ৷ অলি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,,,
কান্না করবেন না ৷ ভাগ্যে থাকলে আবার দেখা হবে ইং শা আল্লাহ ৷
অনন্যা তৎক্ষণাৎ চোখের পানি মুছে বলল,,, এ্যাহহহ আমি কোথায় কাঁদলাম? পানি ছিটিয়ে দিয়েছিলাম মুখে ৷ এখনও সেগুলো লেগে আছে ৷
অলি আহাম্মক হয়ে গেল ৷ তবুও কন্ঠটা স্বাভাবিক করে বলল,,,
তাই তো তাই তো ৷ আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম মুখে পানি দিলে সেই পানি চোখ দিয়ে টপটপ করে পড়ে ৷ আমি খুব খুব দুঃখিত ৷
চলবে,,,,

