#চাঁদের_হাসি
#লেখিকা_সিনথিয়া_জাহান
#পর্বঃ৩১
কফিশপে একেক মানুষের একেক রকম কথাবার্তা ভেসে আসছে ৷ তবে অলি গালে হাত দিয়ে নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে ৷ মাহি ওর অবস্থা দেখে হাসবে না সমবেদনা জানাবে সেটা বুঝতে পারছে না ৷ ক্ষণকাল মুখ ঢেকে মুচুরমুচুর করে হাসার পর ও গলা খাকারি দিয়ে বলে উঠল,
দেখ অলি যা হওয়ার ছিল তা হয়েছে ৷ ভাগ্য তোকে ভাইয়া বানিয়েছে ৷
কথাটা অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় বললেও অলির চুপসে যাওয়া মুখের দিকে নজর যেতেই মাহি ফিক করে হেসে উঠল ৷ তা দেখে অলি বিরক্তিতে চ কারান্ত উচ্চারণ করে বলল,,,
তোর হাসি শোনার জন্য আসিনি আমি ৷
আরে রেগে যাচ্ছিস কেন? ভাগ্য তোকে ভাইয়া বানিয়েছে তো কি হয়েছে? তুই পরিশ্রম করে অনন্যার ভাইয়া থেকে উহু উহু হয়ে যাবি ৷ নিজের উপর কি তোর আত্মবিশ্বাস নেই?
অলি আবারও গালে হাত দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে লাগল,,, না রে ভাই ৷ আমার তো উনার সাথে কথা বলতেই লজ্জা করে ৷ কারো কাছে মাফ চাইতে এতোটা অস্বস্তি হয়না যতটা উনার কাছে মাফ চাইতে গেলে হয়!
শালাহ বউকে যদি শরম পাস তাহলে চলবে কিভাবে? এই শরমের ঠ্যালায় তো বউয়ের সাথে এক বিছানাতেই থাকতে পারবি না ৷
এক বিছানায় থাকতে গেলে বিয়ে হতে হবে ৷ আমার তো বিয়ে হওয়া নিয়েই শঙ্কা ৷
কিসের শঙ্কা? তুই বলেছিলি তোর বাবা লুঙ্গি দিয়ে ফাঁস দেওয়ার চেষ্টা করেছিল ৷ তুই না হয় আলু দাদুর জাঙ্গিয়া দিয়ে ফাঁস দেওয়ার চেষ্টা করবি!
অলি চোখমুখ কুঁচকে বলল,,, ছিহ! তোর সাথে কেউ কথা বলে? একটা ভালো আইডিয়া দেওয়ার মুরদ তো নেই শুধু আজেবাজে কথা বলার ধান্দা!
কথাটা মনে হয় মাহির ইগোতে গিয়ে লাগল ৷ ও ক্ষণকাল চুপ থেকে অলির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল ৷ অতঃপর কাটকাট গলায় বলল,,,
একটা কাকও জামাকাপড় পড়ে না
তুই আমার কদর বুঝলি না
মারো তালি;
অলি এতো টেনশনের মাঝেও জোরে জোরে হাসতে লাগল ৷ কফিশপে উপস্থিত বাকিরা ঘুরে ঘুরে তাকালে ও হাসি খানিকটা থামিয়ে দিল ৷ মাহি অবশ্য হাসেনি ৷ ও সিরিয়াস মুখে অলির চোখে চোখ রেখে বলল,,,
আমি যা বলছি তা মনোযোগ দিয়ে শোন ৷ আমি জানি অনন্যাকে সোজাসুজি ভালোবাসার কথা বলার মতো বুকের পাটা তোর নেই ৷ সো ইনিয়ে বিনিয়ে ওকে বোঝাবি তোর মনে ওর জন্য ইন্টুমিন্টু কিছু আছে ৷
কিভাবে বোঝাব?
ব*লদ সব যদি আমি বলে দিই তাহলে তুই করবি টা কি?
অলি থতমত খেয়ে গেল ৷ ও চুপচাপ বসে থাকল ৷ তা দেখে মাহি বলল,,,,, বসে না থেকে কফি খা ৷
অলি কফির কাপে চুমুক দিতে লাগল ৷ ওদিকে মাহিও কফি খেতে লাগল অলির উপর নিজের সুক্ষ্ম দৃষ্টি অব্যাহত রেখে ৷ কফি খাওয়া শেষ হলে ওরা উঠে পড়ল ৷ বিল মিটিয়ে কফিশপ থেকে বেরিয়ে আসল ৷ এমন সময় হুট করে একটা ছোট বাচ্চা তুফানের মতো দৌঁড়ে এসে অলির কোলে বাঁ*ন্দরের মতো লাফিয়ে উঠল ৷ তা দেখে মাহি আ*র্তনাদ করে বলল,,,
হায় আল্লাহ ঢাকায় আসতে না আসতেই ফষ্টিনষ্টি শুরু করে দিয়েছিস? এটা কার বাচ্চা বুকে হাত দিয়ে বল অলি? তোর থেকে শুনে আমি অনন্যাকে গিয়ে বলব ৷
পুরো ব্যাপারটায় অলিও হকচকিয়ে গেছে কিন্তু মাহির এমন বাজে কথা শুনে ও কটমট দৃষ্টিতে মাহির দিকে তাকিয়ে ওকে শাসাতে লাগল ৷ এমন সময় বাঁন্দরের মতো লাফিয়ে কোলে ওঠা বাচ্চা টা বলতে লাগল,,,
অলি ভাইয়া ৷ তোমাকে পেয়েছি আর ছাড়ব না ৷
কন্ঠটা শুনে অলির চোখ বড় বড় হয়ে গেল ৷ ও অবাকতর গলায় বলতে লাগল,,,
পিকু!
পিকু খিলখিল করে হাসতে হাসতে বলল,,, হ্যাঁ সারা ওরফে পিকু ৷ তুমি আমার সাথে দেখা করতে এসেছিলে?
অলি মিথ্যা কথা বলতে পারবে না তাই বলল,,,, আমি কফি খেতে এসেছিলাম ৷ এসে ভালোই হয়েছে তোমার দেখা পেলাম ৷
পিকু ঘাড় থেকে মুখ উঠিয়ে অলির দিকে তাকিয়ে বলল,,, তুমি আমাকে ভুলেই গিয়েছো ৷ শুধু ফোনে কথা বলে কি হয়? তুমি খুব পচা অলি ভাইয়া ৷
অলি কিছু বলার আগে পিকুর মা বাবা চলে আসল ৷ উনারা অলিকে দেখে বেশ খুশি হলেন ৷ পিকুর বাবা বলতে লাগলেন,,
তুমি ঢাকায় বেড়াতে এসেছো?
অলি মাহির দিকে একপলক তাকাল ৷ তারপর কিছু একটা ইশারা করে উনাদের কফিশপের ভিতরে নিয়ে গেল এবং সমস্ত কথা খুলে বলল ৷ সব শুনে পিকুর মা বাবা উচ্ছ্বসিত হয়ে বলতে লাগলেন,,,
এ তো সিনেমার কাহিনীকেও হার মানাবে দেখছি!
অলি প্রতি উত্তরে মুচকি হাসল ৷ পিকু অলির কোলে বসে আছে ৷ ও অলির মুখের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগল,,,
তোমার বাবাও আছে? এতো বড় ছেলেরও বাবা থাকে?
ওর অবিশ্বাস্য কন্ঠে বলা প্রশ্নে সবাই হেসে ফেলল ৷ পিকুর বাবা হেসে হেসে বললেন,,,
থাকবে না কেন? আমারও তো বাবা আছে ৷
সেটা তো দাদু ৷ আর তুমি তো বুড়ো হয়েছো তাই তোমার বাবা আছে কিন্তু অলি ভাইয়া তো এখনও বিয়েই করেনি ৷ তাহলে তার বাবা কোথা থেকে এলো?
মাহি হেসে উঠে বলল,,, তোমার কি ধারনা বিয়ের পরেই সবার বাবা ডাউনলোড হয়? তাহলে তোমার বাবা আছে কিভাবে?
পিকু কপট রাগ দেখিয়ে বলল,,, আরে বোকা আমি তো বাচ্চা ৷ বাচ্চাদের বাবা থাকে, বুড়োদেরও বাবা থাকে ৷ কিন্তু অলি ভাইয়ার মতো ছেলেদের বাবা থাকে সেটা আমি জানতাম না ৷
এই পুরো সময়টাতে শোভন আর সানা নিরব দর্শক ছিল ৷ এবার দু ভাইবোন সমস্বরে বলল,,,
তুই অনেককিছুই জানিস না! শুধু জানিস ব্রেকআপ করতে ৷
পিকু রাগত মুখে ভাই-বোনের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগল,,, তোমাদের সাথে ব্রেকআপ করলাম ৷
দু ভাইবোন একই সাথে হাই তুলে বলল,,, উই নো দ্যাট ৷
মাহি ভ্রু কুঁচকে বলতে লাগল,,, তোমাদের কন্ঠ কোনোভাবে একসাথে জোড়া লাগানো নাকি? না মানে সব কথা একসাথে বলো কিভাবে তোমরা?
শোভন আর সানা একে অপরের দিকে তাকিয়ে বাকা হাসল তারপর একযোগে মাহির দিকে তাকিয়ে বলল,,
টপ সিক্রেট ৷
ওদের চাহনিতে মাহি ভড়কে গেল ৷ তাই ও তৎক্ষণাৎ চোখ সরিয়ে কফি খাওয়ায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল ৷ অন্যদিকে পিকু অলির গলা জড়িয়ে ধরে আছে ৷ একটু পর ও বলতে লাগল,,
বিল্টু ভাইয়াকে নিয়ে আসোনি কেন? তুমি এতো হিংসুটে কেন অলি ভাইয়া?
মাহির নাকে মুখে কফি উঠে গেল ৷ ও কাশতে শুরু করল ৷ ক্ষণকাল বাদে নিজেকে সামলে নিয়ে রুমাল দিয়ে মুখমন্ডল মোছার সময় মুচুরমুচুর করে হাসতে লাগল ৷ তা দেখে অলি ওকে চোখ রাঙানি দিল ৷ মাহি সেটা বিন্দুমাত্র পাত্তা দিল না ৷ তাই অলি ব্যর্থ হয়ে পিকুর দিকে মনোযোগ দিল ৷ পিকু প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য অলির চোখে চোখ রেখে আছে ৷ অলি গলা খাকারি দিয়ে বলল,,,
তোমার বিল্টু ভাইয়াকে অন্য একদিন নিয়ে আসব ৷ আমি প্রথমবার ঢাকা এসেছি তো তাই আগে নিজে ঢাকা শহরকে বুঝতে চাই তারপর ওকে বোঝাব ৷
যাও অল্প একটু জাস্ট অল্প একটুর জন্য তোমাকে মাফ করে দিলাম ৷
অলি মুচকি হাসল ৷ তারপর পিকুর মা বাবার সাথে আরও কিছুক্ষণ কথা বলল ৷ নিজের নতুন আর চিরস্থায়ী ঠিকানা জানাল ৷ ওদের সকলকে একদিন ঘুরে আসার দাওয়াত দিল ৷
°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°
ইয়াসির প্রামানিক ছেলেকে নিজের ঘরে ডাকলেন ৷ কয়েক মিনিটের মধ্যেই অলি সেখানে উপস্থিত হলো ৷ ইয়াসির প্রামানিক ইশারা করতেই ও বাবার পাশে গিয়ে বসে পড়ল ৷ একটু দম নিয়ে ইয়াসির প্রামানিক বলতে লাগলেন,,
শুনলাম তুমি নাকি টুরিস্ট গাইড ৷ তো ট্রাভেলিংয়ের উপরও তোমার আগ্রহ আছে ৷ তাই ভাবছি একটা ট্রাভেল এজেন্সি খুলব এবং সেটা তুমি পরিচালনা করবে ৷
অলি উশখুশ করতে লাগল ৷ তা দেখে ইয়াসির প্রামানিক শীতল গলায় বলতে লাগলেন,,,
দেখো আরাফাত তুমি আমাদের বংশের একমাত্র ছেলে ৷ যা সম্পত্তি আছে সব তোমার ৷ সে হিসেবে একটা ট্রাভেল এজেন্সি খোলা খুব একটা বড় ব্যাপার না ৷ তাছাড়া অনন্যারও শুনেছি ভ্রমণের প্রতি আগ্রহ আছে ৷ তো দুজন মিলেই সেটা পরিচালনা করতে পারো ৷
অলি কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ থেকে বলল,,, তুমি যা ভালো মনে করো বাবা ৷
এই ট্রাভেল এজেন্সির শাখা একটা ঢাকাতে থাকবে আর একটা খাগড়াছড়িতে ৷ তুমি তাহলে খুব সহজেই দুই জায়গাতেই থাকতে পারবে ৷
এবার অলির মুখমন্ডল উজ্জ্বল হয়ে উঠল ৷ ও হাস্যজ্জ্বল মুখে বাবার দিকে তাকিয়ে বলতে লাগল,,,
ঠিক আছে বাবা ৷
আমি অনন্যার সাথে ইতোমধ্যে কথা বলেছি ৷ ও রাজি আছে ৷ তাহলে তোমাদের দুজনের নতুন একটা জার্নি শুরু হতে যাচ্ছে কি বলো?
জ্বিই ৷
°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°
কিহ! পিকুদের সাথে আপনার দেখা হয়েছিল?
অনন্যার হতভম্ভ গলায় বলা কথা শুনে অলি সামান্য হেসে বলল,,, হ্যাঁ ৷
শোভন সানাও ছিল?
জ্বি ৷
ওদেরকে সাথে করে নিয়ে আসলেন না কেন? আমি খুব মিস করি ওদের ৷
চিন্তা করবেন না ৷ কয়েকদিনের মধ্যেই ওদের সাথে আপনার দেখা করিয়ে দিব ৷ ঠিকানা জেনে নিয়েছি ৷
পাক্কা দেখা করাবেন?
আমি কখনো কথার খেলাপ করেছি?
অনন্যা নিশ্চুপ থাকল ৷ কারন অলিকে এসব বিষয়ে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করা যায় ৷ অনন্যা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বাগানে রাখা চেয়ারে গিয়ে বসে পড়ল ৷ অলিও অন্য একটা চেয়ারে বসে পড়ল ৷ একটু পর অনন্যা বলল,,,
ওরা কি বড় হয়ে গেছে?
অল্প একটু বড় হয়েছে মনে হয় ৷ তবে হ্যাঁ বিয়ে করার মতো বয়স হয়নি সো আপনার পাত্রী খোঁজার কোনো তাড়া নেই ৷
অনন্যা কপাল কুঁচকে ওর দিকে তাকিয়ে বলল,,, আমি আবার কখন বিয়ে দেওয়ার কথা বললাম?
অলি থতমত খেয়ে গেল, ও মাথা চুলকে বিরবির করে বলতে লাগল,,, আপনাকে দেখলে মাথায় শুধু বিয়ের ব্যাপার টাই ঘোরে ৷
অনন্যা চোখ সরু করে ওর দিকে তাকিয়ে বলল,,, কি বলছেন বলুন তো?
অলি চমকে উঠে বলল,,, ক-ক-কই কিছু না তো ৷
অনন্যা আরও কিছুক্ষণ চোখ সরু করে ওর দিকে তাকিয়ে থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে বলল,,,
আমরা তো এখন ট্রাভেল এজেন্সি চালাব তাই না আরাফাত ভাইয়া?
অলি উচ্ছ্বসিত গলায় কিছু বলার জন্য মুখ খুলতে যাবে তার আগেই ভাইয়া ডাক শুনে ও পোড়া বেগুনের মতো চুপসে গেল ৷ ওকে জবাব না দিতে দেখে অনন্যা পুনরায় বলল,,,
কি হলো কথা বলছেন না কেন? প্রস্তাবটা পছন্দ হয়নি?
প্রস্তাব তো মাশাআল্লাহ ৷ ওটা পছন্দ না হওয়ার কোনো কারন নেই ৷ কিন্তু…
কিন্তু কি?
অলি দরদর করে ঘামতে লাগল ৷ ও রুমাল বের করে কপালের ঘাম মুছতে লাগল ৷ অতঃপর গলা খাকারি দিয়ে কন্ঠস্বর স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বলল,,,
আমাকে ভাইয়া বলে ডাকবেন না ৷ এই ডাক টা আপনার মুখ থেকে শুনতে চাচ্ছি না আমি ৷
কথাগুলো গড়গড় করে বলে অলি বসা থেকে উঠে ভিতরে চলে আসল ৷ ওদিকে অনন্যা আহাম্মক হয়ে বসে আছে ৷ পর মুহূর্তে ওর কপালে ভাঁজ পড়তে লাগল ৷ ও অলির গমনপথের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকল ৷
এদিকে অলি বাবুর পা দুটো অনন্যার থেকে আড়াল হওয়ার পরপরই থরথর করে কাঁপতে লাগল ৷ এতোই কাঁপল যে ও ধপাস করে মেঝেতে পড়ে গেল ৷ পড়ে থাকা অবস্থাতেই ও অস্ফুট স্বরে বলতে লাগল,,,
ইনিয়ে বিনিয়ে বোঝানো এতো কঠিন হয় জানলে জীবনে প্রেমে পড়তাম না! মনে হচ্ছে এক্ষুণি অ্যাম্বুলেন্স ডেকে পাঠাতে হবে!
চলবে,,,

