চাঁদের_হাসি #লেখিকা_সিনথিয়া_জাহান #পর্বঃ৩২

0
14

#চাঁদের_হাসি
#লেখিকা_সিনথিয়া_জাহান
#পর্বঃ৩২

বাগানে নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে ৷ অলি দুই শ্বশুড় জামাইয়ের মাঝখানে আহাম্মক হয়ে বসে আছে ৷ একটু আগেই দুজনের মধ্যে বিরাট একটা মনোমালিন্য হয়েছে ৷ সেই মনোমালিন্যের পর এখন ভ*য়ঙ্কর নিরবতা বিরাজ করছে ৷ অলিও কিছু বলার সাহস পাচ্ছে না ৷ ক্ষণকাল বাদে আলমগীর প্রামানিক নিরবতা ভেঙে গজগজ গলায় বললেন,,,

আমাকে তুমি চাশুড় বলে ডাকো কোন সাহসে?

ইয়াসির প্রামানিক তৎক্ষণাৎ জবাব দিলেন,,, যে সাহস দিয়ে আপনার মেয়েকে বিয়ে করেছিলাম সে সাহস দিয়ে ৷

ভুল! বরং লুঙ্গি দিয়ে ফাঁস দেওয়ার কথা যে সাহসে বলেছিলে সে সাহসে আজ আমাকে চাশুড় বলেছো ৷

উহু ভুল ৷ আজ না বরং বিয়ের পর থেকেই আপনাকে চাশুড় বলে ডাকি ৷

আলমগীর প্রামানিক গ*র্জে উঠে বললেন,,, তোমার সাহস তো কম না! নিজের শ্বশুড়ের অপমান করছো তাও আবার এতো ঠান্ডা মাথায়?

ঠান্ডা মাথায় না বরং গরম মাথাতেই করছি ৷ বিশ্বাস না হলে আমার মাথা স্পর্শ করে দেখতে পারেন ৷

আলমগীর প্রামানিক অ*গ্নিদৃষ্টিতে ইয়াসির প্রামানিকের দিকে তাকিয়ে থাকলেন ৷ উনি এতোটাই রেগে গেছেন যে কথা বলতে পারছেন না ৷ তবুও ক্ষণকাল বাদে উনি অলিকে উদ্দেশ্য করে অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বললেন,,,

এ কেমন বাপ মানুষ করেছো তুমি? এর চেয়ে তো তোমার ছাগলগুলো বেশি ভদ্র ৷

অলি থতমত মুখে বসে ছিল ৷ ও এবার মনে মনে বলতে লাগল,,, আমি কিভাবে মানুষ করব? বাবার জন্মের সময় তো আমি ছিলাম না ৷ কোথায় যে ছিলাম সেটাও তো জানি না ৷

ইয়াসির প্রামানিক তেতে উঠে বললেন,,, আমাকে ইনডিরেক্টলি ছাগল বললেন?

ডিরেক্টলিই ছাগল বলেছি ৷ তোমার মতো বাপ অলি বাবু কিভাবে পেল সেটাই জাস্ট আমি ভেবে পাচ্ছি না ৷

অলি পড়ে গেছে ভীষণ ফ্যাসাদে ৷ ও এই দুই শ্বশুড় জামাইয়ের মাঝে কি বলবে সেটাই বুঝতে পারছে না ৷ একজনের পক্ষ নিলে আরেকজন ভয়ানক রেগে যাবে ৷ এই গরম গরম পরিস্থিতিতে অলিকে বাঁচানোর জন্য একজন চলে আসল ৷ সেই একজন হচ্ছে অনন্যা ৷ ও কয়েকটা ময়লার বস্তা নিয়ে বাইরে যাচ্ছে ৷

অলি চট জলদি বসা থেকে উঠে বলতে লাগল,,, আমি সাহায্য করে দিচ্ছি আপনাকে ৷

কথাটা বলেই ও তুফানের বেগে শ্বশুড় জামাইয়ের মাঝখানে থেকে উঠে এসে ছো মেরে অনন্যার হাত থেকে ময়লার বস্তা নিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল ৷ ওর কান্ডে অনন্যা হকচকিয়ে গেল ৷ কয়েক সেকেন্ড তব্দা মেরে দাঁড়িয়ে থাকার পর ও নিজেও বাইরে চলে গেল ৷ তবে যাওয়ার আগে একপলক দাদু আর ফুফামশাইয়ের দিকে তাকাল ৷

ময়লা ফেলা ডাস্টবিনের কাছে গিয়ে অলি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল ৷ অনন্যা ওর পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে ময়লার বস্তা ফেলতে ফেলতে বলল,,

ওখানে কি হয়েছে বলুন তো?

অলি চমকে উঠে বলল,,, কোনখানে?

কোথায় আবার বাগানে ৷ ফুফামশাই আর দাদুর মুখ ওমন থমথমে হয়ে আছে কেন?

অলি হতাশ শ্বাস ফেলে বলল,,, ঝগড়া লেগেছে ৷

কি নিয়ে?

চাশুড় ডাকা নিয়ে ৷

অনন্যা ভ্রু কুঁচকে বলল,,, হ্যাহ? চাশুড়?

চাচা আর শ্বশুড়ের সমন্বয়ে বাবা আলু দাদুকে চাশুড় বলে ডাকে ৷ কিন্তু আলু দাদুর সেটা পছন্দ হয়নি তাই বেঁধে গেছে তর্ক ৷

অনন্যা হেসে ফেলল ৷ হাসতে হাসতে বলল,,, আপনার বাবা মানে আমার ফুফামশাইয়ের কোনো তুলনা নেই আরাফাত ভাইয়া!

অলির হাসিহাসি মুখটা চুপসে গেল ৷ ও মিনমিন গলায় বলতে লাগল,,, আমি কাল আপনাকে একটা জিনিস করতে মানা করেছিলাম ৷ মনে আছে?

অনন্যা কপাল কুঁচকে অলির দিকে তাকাল ৷ অলি অন্যদিকে মুখ করে আছে ৷ ক্ষণকাল ওর দিকে তাকিয়ে থাকতেই অনন্যার সবকিছু মনে পড়ে গেল এবং সাথে সাথে ওর মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল ৷ একটু পর অলি কম্পিত গলায় বলল,,,,

প্লিজ ভাইয়া ডাকবেন না আমাকে ৷

কথাটা বলেই অলি যেভাবে ওর থেকে ময়লার বস্তা নিয়ে পালিয়েছিল ঠিক সেভাবেই ওর সামনে থেকে পালিয়ে গেল ৷ অন্যদিকে অনন্যা এখনও ভ্রু কুঁচকে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকল ৷ ও এতোটা অবুঝ না যে অলির কথার মানে বুঝবে না তবুও নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায় আছে ও ৷

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°

অলি নিজের রুমে এসে ফট করে দরজা লাগিয়ে দিল ৷ তারপর বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে থাকল বেশ কিছুক্ষণ ৷ নিজের নিরবতা ভেঙে ও বিরবির করে বলতে লাগল,,,

না আমার দ্বারা বলা হবে না ৷ এতোটুকুতেই যে অবস্থা হয়েছে তাতে ভালোবাসার কথা বলা অসম্ভব ব্যাপার বটে ৷

কিছু একটা ভেবে অলি শোয়া থেকে উঠে বসল ৷ তারপর মাহিকে ফোন দিল ৷ কয়েকবার রিং পড়তেই মাহি রিসিভ করল ৷ ও রিসিভ করার সাথেই অলি মিনমিন গলায় বলতে লাগল,,,,

মাহি রেএএএ!

অনন্যা মে*রেছে? কি দিয়ে মে*রেছে? লাঠি না ঝাটা?

অলি মুখটা গম্ভীর করে কাটকাট গলায় বলল,,, তুই কিভাবে আমার বেস্ট ফ্রেন্ড হয়ে গেলি? আমার বিশ্বাস হচ্ছে না ৷

কিহ! তুই আমাদের বন্ধুত্বের উপর প্রশ্ন তুলছিস ছ্যাহ অলি ছ্যাহ!

তো কি করব? তুই কি সাহায্য করবি তা না বলছিস অনন্যা আমাকে কি দিয়ে মে*রেছে?

সাহায্য করার জন্যেই তো জিজ্ঞাসা করেছি ৷ কি দিয়ে মে*রেছে সেটা জানলে সেই অনুযায়ী মলম নিয়ে যেতাম ৷

অলি বিরক্তিতে চ কারান্ত উচ্চারণ করে বলল,,, তোর সাথে কথা নেই শালাহ!

মাহি হেসে ফেলে বলল,,, আচ্ছা রাগ করিস না ৷ বল কি হয়েছে?

অলি নিজের রাগকে ঠান্ডা করে বলল,,, আমার দ্বারা ভালোবাসার কথা বলা সম্ভব হবে না রে ৷ অন্য কোনো উপায় বল ৷

মাহি পাক্কা এক মিনিট চুপ থেকে বলল,,,

ছাগলের লাদি বেঁচে দিতে হবে কর
তুই দূরে গিয়ে ম*র
মারো তালি;

বলেই মাহি ঠাশ করে ফোন কেটে দিল ৷ অলি কানে ফোন হাতে আহাম্মক হয়ে বসে থাকল ৷ ক্ষণকাল বাদে কান থেকে ফোন নামিয়ে বিরবির করে বলল,,,

দূরে না গিয়ে কাছে কোথাও গিয়ে ম*রলে হয় না?

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°

কয়েকদিন কেটে গেছে ৷ অলিকে পেয়ে সকলের জীবন রঙিন হয়ে উঠেছে ৷ যদিও ইয়াসির প্রামানিকের সাথে আলু দাদুর প্রায় প্রায় ঝগড়া শুরু হয়ে যায় ৷ সেই ঝগড়া সবাই দেখেও না দেখার ভান করে অন্যদিকে চলে যায় ৷

অনন্যা ওর মায়ের সাথে উঠানে আলুর পাপড় শুকাতে দিচ্ছে ৷ এমন সময় কয়েকজন অপরিচিত মানুষ বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করল ৷ অপরিচিত মানুষ বলতে একজন মধ্যবয়স্কা মহিলা, কমবয়সী মেয়ে আর একটা প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে ৷ উনারা এসেই সালাম দিলেন ৷

রিনা বেগম অবাক চোখে সালামের জবাব দিয়ে বললেন,,,, আপনাদের তো ঠিক চিনতে পারলাম না ৷

ছেলেটা সামান্য হেসে বলল,,, চেনার কথাও না আন্টি ৷ আজ আমাদের প্রথম দেখা হলো ৷

কোনো প্রয়োজন আছে? কিছু লাগবে আপনাদের?

গোলগাল মুখের রুপবতী মহিলা টা বলে উঠলেন,,, লাগবে তো অবশ্যই ৷ আমার ছেলের জন্য আপনার মেয়ের হাত চাইতে এসেছি ৷

অনন্যার হাত থেকে আলুর পাপড় পড়ে গেল ৷ বিয়ের কথা শুনলেই ওর মুখটা আ*তঙ্কে ছেঁয়ে যায় ৷ আজও তার ব্যতিক্রম হলো না ৷ রিনা বেগম ক্ষণকাল অবাক চোখে তাকিয়ে থেকে সকলকে বসতে দিলেন ৷ তারপর বাড়ির পুরুষ মানুষদের ডাকতে লাগলেন ৷

আলমগীর প্রামানিক এসে সকলের সাথে কথা বলতে লাগলেন ৷ অনন্যা বিয়ের কথা শোনার সাথেই নিজের রুমে গিয়ে বসে আছে ৷

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°

অলি অনেক ভেবে একটা বুদ্ধি বের করেছে ৷ এই বুদ্ধি বের করতে ওর এক সপ্তাহ সময় লেগেছে ৷ সেই বুদ্ধিটা হচ্ছে চিঠি লিখে অনন্যাকে নিজের মনের কথা জানানো ৷ আইডিয়া টা খুবই উত্তম ৷ কিন্তু এই সামান্য চিঠি লিখতে অলির অর্ধেক মাস সময় লেগেছে ৷ তাও যে চিঠি লিখতে সক্ষম হয়েছে এটাই অনেক ৷

আজ ও মাহিকে চিঠিটা দেখাতে নিয়ে এসেছে ৷ ওরা আজও কফিশপে দেখা করেছে ৷ মাহি অত্যন্ত মনোযোগের সহিত ওর লেখা চিঠিটা পড়ছে ৷ চিঠিটা পড়ার সময় মাহির ভ্রু কখনো কুঁচকে যাচ্ছে তো কখনো সরু হয়ে আসছে ৷

অলি দম আটকে চাতক পাখির মতো ওর থেকে ইতিবাচক জবাবের আশায় বসে আছে ৷ পাক্কা আধা ঘন্টা চিঠিটা খুটিয়ে খুটিয়ে দেখার পর মাহি বলে উঠল,,,

কোষ্ঠকাঠিন্য মানে হা*গা কষা
অলির চিঠি হয়েছে সেই খাশা
মারো তালি;

অলি তালি মারল না ৷ এমন কুৎসিত ভাষায় তালি মারলে তালির মান সম্মান বেঁচে থাকবে না ৷ ওকে বাঁচানোর জন্য হলেও অলি চুপ করে থাকল ৷ একটু নিরবতার পর ও চিঠিটা মাহির হাত থেকে ছো মেরে নিয়ে নিল ৷ তারপর সেটা অতি যত্নের সহিত নিজের শার্টের পকেটে রেখে মাহির থেকে বিদায় নিল ৷

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°

বাড়িতে পৌঁছে লোকসমাগম দেখে অলির ভ্রু কুঁচকে গেল ৷ অবশ্য মনে মনে একটু খুশিও হলো এই ভেবে যে হয়তো নতুন কোনো আত্মীয়ের সাথে ওর আজ সাক্ষাৎ হতে চলেছে ৷ ওর ভাবনা ভুল ছিল না ৷ ওকে দেখতেই আলমগীর প্রামানিক বললেন,,,

এই যে আমার নাতী চলে এসেছে ৷

ইয়াসির প্রামানিক তৎক্ষণাৎ বললেন,,, এই যে আমার ছেলে চলে এসেছে ৷

অলি হেসে ফেলল ৷ এই দুই ব্যক্তির খুনসুটি ওর বেশ ভালো লাগে ৷ ও বাপ দাদার দিকে এগিয়ে এসে বলল,,,

এনারা কে?

আলমগীর প্রামানিক উচ্ছ্বসিত গলায় বললেন,,, নতুন আত্মীয় ৷ আমার লালকুমারীর জন্য বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছে ৷ ছেলে অত্যন্ত ভালো ৷ অনন্যার খুঁত নিয়ে ছেলের কোনো আপত্তি নেই ৷

অলির মুখটা সাথে সাথেই র*ক্তশূণ্য হয়ে গেল ৷ ও কোনো জবাব না দিয়ে সামনের দিকে হাঁটতে লাগল ৷ তা দেখে আলমগীর প্রামানিক বললেন,,,

আরাফাত বাবু কোথায় যাচ্ছ? তোমার বোনের বিয়ে ৷

ইয়াসির প্রামানিক বললেন,,, ডাকবেন না বাবা ৷ ও হয়তো ক্লান্ত ৷ সবেমাত্র বাইরে থেকে আসল ৷

আলমগীর প্রামানিক কিছু বললেন না কারন এই প্রথমবার উনি নিজের জামাইয়ের কথায় সম্মত হয়েছেন ৷ অন্যদিকে অলি যন্ত্রের মতো হেঁটে চলেছে ৷ ওর মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে ৷ কিছুই বুঝতে পারছে না ৷ শুধু বারবার ঘুরে ঘুরে ছেলেটাকে দেখে চলেছে যে তার অনন্যাকে বিয়ে করার জন্য এসেছে ৷

ছেলেটা বেশ সুদর্শন ৷ এতো সুদর্শন ছেলেকে কোনো রমনীই প্রত্যাখ্যান করার সাহস দেখাবে না ৷ এসব ভাবতে ভাবতে অনন্যার রুমের সামনে গিয়ে ওর কদম থেমে গেল ৷ রিনা বেগম অনন্যাকে বলছে,,,

তুমি রাজি আছো তো অনু?

অনন্যা কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,,, আমাকে রিজেক্ট করার ক্ষমতা বাকিরা দেখালেও আমি কি সেই ক্ষমতা দেখাতে পারি?

এভাবে বলছো কেন? ছেলে নিজেই তোমাকে পছন্দ করেছে ৷ সে শুধু তোমাকে চায়, কোনো প্রকার সম্পত্তির লোভ নেই ৷

অনন্যা ক্ষীণ গলায় বলল,,, তোমরা যা ভালো মনে করো তাই করো ৷ আমার কোনো আপত্তি নেই ৷

আর দাঁড়াতে পারল না অলি ৷ ওর পা দুটো কেমন যেন অদ্ভুত আচরণ করছে ৷ ও চট জলদি অনন্যার রুমের সামনে থেকে দূরে সরে গেল ৷ কম্পিত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে হাঁটতে লাগল ৷ নিজের রুমে প্রবেশ করে ও দরজা লাগিয়ে দিয়ে ধপ করে ওখানেই বসে পড়ল ৷ তারপর অসহায় গলায় বলল,,,

কে বলেছে আপনার রিজেক্ট করার ক্ষমতা নেই? এই তো আমাকে রিজেক্ট করলেন!

চলবে,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here