#মন_হারালো_বেঘোরে
#লেখনীতে_মেহেরীন
#পর্ব_১০
দুপুরের কড়া রোদ জানালার কাঁচ ছুঁয়ে ইনায়ার ঘরের মেঝেতে এসে পড়েছে। রিমি বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে পা দোলাতে দোলাতে শাফিনের প্রসঙ্গ তুলে ইনায়াকে নাজেহাল করে ছাড়ছিল।
“আচ্ছা ইনায়া, শাফিন যখন সবার সামনে তোর দিকে ওভাবে তাকায়, তোর হার্টবিট কি তখন ডাবল হয়ে যায় না?”
রিমির এই বাঁকা প্রশ্নে ইনায়া লজ্জায় লাল হয়ে বালিশ দিয়ে মুখ ঢাকলেও একসময় ধৈর্য হারিয়ে ফেলল। ও বালিশটা সরিয়ে রিমির দিকে এক ঝটকায় ঘুরে বসে বলল…
“খুব তো আমায় নিয়ে হাসাহাসি করছিস রিমি, কিন্তু তোর খবরটা কি? শাফিন কিন্তু সেদিন বলছিল যে আবিদ তোকে ভীষণ পছন্দ করে। এমনকি ও তোকে ইদানীং পাগলের মতো খুঁজছে।”
ইনায়ার এই হঠাৎ আক্রমণে রিমির সেই চঞ্চল হাসিটা যেন মুহূর্তেই বাতাসে মিলিয়ে গেল। ভার্সিটির সেই প্রোগ্রামের দিন আবিদ যখন আবিদ ওকে সরাসরি ‘ভালোবাসি’ না বললেও সেই অপ্রত্যক্ষভাবে বলেছিলো যে ও রিমিকে পছন্দ করে। রিমি সেদিন কোনো উত্তর না দিয়ে কেবল নীরবতা বজায় রেখেছিল। আবিদ ছেলে হিসেবে যথেষ্ট ভালো, তবুও সেদিন রিমি ওকে উত্তর দিতে পারেনি। পারেনি বললে ভুল হবে, হয়তো কোনো এক অজানা কারণে উত্তর দিতে চায়নি! দুই বান্ধবী মিলে গল্পগুজব করে ও ঘরেই ঘুমিয়ে গেছিলো, সন্ধ্যায় সুরভী বেগম নাস্তা বানাতে আসছিলেন কিন্তু আজকে রিমি সন্ধ্যার নাস্তা বানাবে বলে ওনাকে আবার ঘরে পাঠিয়ে দেন। তো ওরা দুজনে যখন রান্নাঘরে যাচ্ছিলো তখন ড্রইং রুমে সোফায় বসে আয়ান ফোনে ওর বন্ধুর সঙ্গে প্রায় আর্তনাদ করছিল। ইংরেজিতে দুর্বল হওয়ার কারণে আসন্ন দিনগুলো নিয়ে ও বেশ চিন্তিত। রিমি তখন আয়ানের এই করুণ দশা দেখে নিজেকে আর আটকে রাখতে পারল না। ও ধীর পায়ে আয়ানের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে খুব শান্ত আর মায়াবী গলায় বলল…
“তুমি চাইলে আমি তোমাকে একটু হেল্প করতে পারি। আমি অনেক সহজেই তোমার ইংরেজির সমস্যার সমাধান করিয়ে দেবো”
আয়ান কথাটা শুনেই ভ্রু কুঁচকে রিমির দিকে তাকাল। এমনিতে ও রিমিকে একদম সহ্য করতে পারে না, তার ওপর রিমির কাছ থেকে সাহায্য নেওয়াটা ওর ইগোতে বেশ লাগল। ও মুখ ফিরিয়ে নিয়ে গম্ভীর গলায় বলল….
“লাগবে না, আমি নিজেই সামলে নেব।”
“আমার কাছে কিছু নোটস আছে, সেগুলো দেখে একবার বুঝে যদি প্রাকটিস করো তাহলে দেখবে আর কঠিন লাগবেনা”
“বলছি তো লাগবে না”
ঠিক তখনই ইনায়া পাশ থেকে এসে ফোড়ন কাটল….
“আয়ান, অতো ভাব দেখাস না বুঝেছিস? আমি হেল্প করতে চাইলে তো পাত্তা দিবি না কিন্তু রিমি অনেক সহজে আর ভালোভাবে বোঝাতে পারে। ফ্রীতে তোরই লাভ হবে”
ইনায়ার কথা শুনে আর নিজের অবস্থার কথা ভেবে আয়ান এবার একটু নড়েচড়ে বসল। ইনায়ার কাছে আগেও ও পড়াশুনার ক্ষেত্রে রিমির বেশ প্রশংসা শুনেছে। আয়ান মনে মনে হিসেব মেলাল রিমিকে অপছন্দ করা এক পড়ায় সাহায্য নেওয়া দুটো ভিন্ন বিষয়। শেষমেশ নিজের লাভের কথা চিন্তা করে ও অনিচ্ছাসত্ত্বেও ও রাজি হয়ে গেলো।
__________________________________
রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা। পুরো বাড়িতে একটা থমথমে নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। আজ সবাই একটু আগেই ঘুমিয়ে গেছে। একটু আগে আরশান বাড়ি ফিরেছে, এসে ফ্রেশ না হয়েই কিছু জরুরি মেইল করতে বসে গেছে। ওর ঘরের ভারী মখমলের পর্দাগুলো টেনে দেওয়া, যার ফাঁক দিয়ে বাইরের জ্যোৎস্নার এক চিলতে আলোও ভেতরে ঢোকার অনুমতি পায়নি। ঘরের কোণে রাখা নীলচে শেডের ল্যাম্পটা জ্বলছে, যা আসবাবপত্রের ওপর দীর্ঘ আর অদ্ভুত সব ছায়া ফেলছে। আরশান তার বিশাল পড়ার টেবিলের সামনে স্থির হয়ে বসে আছে। সামনে ল্যাপটপ খোলা থাকলেও ওর আঙুলগুলো কিবোর্ডে চলছে না। ড. জুবায়েরের সেই কণ্ঠস্বরটা ওর কানের কাছে বারবার আছড়ে পড়ছে….”Let yourself involve with her”। আরশান অনুভব করছে, ওর ভেতরে এতদিন ধরে তিল তিল করে গড়ে তোলা সেই যুক্তির দেয়ালগুলোতে আজ বড় বড় ফাটল ধরেছে। ও রিমিকে শুধু একটা ‘ডিসট্রাকশন’ বা বিরক্তি হিসেবে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল, কিন্তু এখন দেখছে রিমি ওর অবচেতন মনের প্রতিটি কোষে বিষের মতো নয়, বরং কোনো এক ওষুধের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। ও এখন আর রিমিকে এড়াতে চায় না বরং এই নিঝুম রাতেও ওর অবাধ্য মনটা বারবার রিমির উপস্থিতি কামনা করছে। এটা কেমন অনুভূতি ও জানে না, তবে রিমির প্রতি ওর এই তীব্র অবসেশন ওকে আর শান্তিতে থাকতে দিচ্ছে না। ওদিকে…আজ সন্ধ্যায় রিমি নাস্তা হিসেবে গাজরের হালুয়া বানিয়েছিল তখন জানতে পেরেছিল যে আরশানের এই হালুয়া অনেক পছন্দ। আরশান আজ দেরিতে বাসায় ফিরেছে তাই হালুয়া মিস করে গেছে। কিন্তু ওর জন্যে আলাদা করে রাখা ছিলো, তো রিমি নিজের পড়া শেষ করে কি একটা ভেবে গিয়ে ফ্রিজ থেকে হালুয়ার বাটি নিয়ে এলো। ঠিক করলো আজ নিজেই আরশনকে এটা দেবে। হালুয়ার বাটি নিয়ে এসে আরশানের বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রিমি কিছুক্ষণ ইতস্তত করল। ও জানে আরশান বিনা কারো প্রবেশ পছন্দ করেন না। ও খুব মৃদুভাবে দরজায় নক করল কিন্তু ভেতরে কোনো সাড়াশব্দ নেই। রিমি আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আবার নক করল। এবারও নীরবতা। রিমির মনে হলো আরশান সাহেব হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছেন অথবা ল্যাপটপে কাজ করতে করতে বাইরের জগৎ ভুলে গেছেন। এক ধরণের অভিমান আর বিষণ্ণতা ওর মনে দানা বাঁধল। ও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে যেই না ট্রেটা নিয়ে ফিরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল, ঠিক তখনই ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে ভারী কাঠের দরজাটা খুলে গেল। রিমি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়েই দেখলো আরশান দরজায় দাঁড়িয়ে। ওর গায়ের সাদা শার্টটা সামান্য কুঁচকানো, কলারের ওপরের বোতামটা খোলা, যার ফলে ওর গলার কাছের শক্ত পেশিগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। হাতাগুলো কনুই পর্যন্ত গোটানো। মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট তবুও তাকে দেখতে দারুন লাগছে। রিমি নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণে রাখার সম্পূর্ন চেষ্টা করলো যাতে আরশান বুঝতে না পারে যে এই মুহূর্তে রিমি কেমন অনুভব করছে। আরশান এক দৃষ্টিতে রিমির দিকে তাকিয়ে আছে, তার সেই তীক্ষ্ণ আর শীতল চোখের চাহনি আজ যেন আরও বেশি প্রখর। রিমিকে হাতে ট্রে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ওর ভ্রু জোড়া সামান্য কুঁচকে এল। আরশান কোনো ভূমিকা ছাড়াই খুব গম্ভীর আর ভারী গলায় প্রথম প্রশ্নটা করল — “তুমি কথা বলতে পারো না?”
রিমি থতমত খেয়ে গেল। বড় বড় চোখ করে ও ভয়ার্ত গলায় উত্তর দিল — “পারি”
আরশান ওর দিকে আরও এক পা এগিয়ে এল। ঘরের সেই মায়াবী অন্ধকারে আরশানের দীর্ঘদেহী উপস্থিতি রিমির চারপাশের বাতাসকে যেন আরও সংকুচিত করে দিল। আরশান এবার কিছুটা শাসনের সুরে, কিন্তু চাপা অস্থিরতা নিয়ে বলল — “তাহলে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বোবার মতো শুধু নকই কেন করছিলে? কথা কেন বলোনি?”
রিমির ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল। ও মাথা নিচু করে খুব নিচু স্বরে বলল….
“আসলে… আমি আজকে হালুয়া বানিয়েছিলাম। শুনলাম এটা নাকি আপনার প্রিয় তাই নিয়ে এসেছিলাম। আপনি হয়তো কাজে ব্যস্ত ভেবে আর ডাকতে সাহস পাইনি”
আরশান এক মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেল। রিমি নিজের হাতে বানানো হালুয়া নিয়ে এসেছে? এতো ক্লান্তির মাঝেও আরশান মনে মনে খানিকটা খুশি হলো। ও খুব স্বাভাবিকভাবে রিমির হাত থেকে বাটিটা নিজের হাতে নিল। নেওয়ার সময় ওর আঙুলগুলো রিমির কোমল আঙুলে সামান্য ছুঁয়ে গেল। আরশান সেই স্পর্শ সরাল না, বরং স্থির চোখে রিমির দিকে তাকিয়ে থেকে আরও নিচু স্বরে বলল — “পরের বার থেকে নক করবে না। সরাসরি ডাকবে”
“ঠিক আছে, এবার থেকে তাহলে বলবো। ভাইয়া, দরজাটা খুলুন”
“ভাইয়া” শব্দটা শোনা মাত্রই আরশানের চোখেমুখে এক ধরণের বিরক্তি ফুটে উঠল। ও ভ্রু কুঁচকে খুব শক্ত গলায় বলল — “You are not my sister.”
রিমি অপ্রস্তুত হয়ে বলল, “ইনায়া আপনাকে ভাইয়া বলে, সে হিসেবে আমিও…”
আরশান এবার রিমির খুব কাছে ঝুঁকে এল। ওর শরীরের দামী পারফিউম আর পৌরুষদীপ্ত ঘ্রাণে রিমির দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম। ও রিমির চোখের গভীরে তাকিয়ে খুব ধীর স্বরে বলল — “আমি যেটা বলেছি সেটাই করবে। আরেকবার যদি তোমার মুখে ওই শব্দটা শুনি, I’ll give you a new punishment”
রিমি থমকাল না। গত কয়েকদিনের অভিজ্ঞতায় ও আরশানের এই মেজাজটার সাথে কিছুটা অভ্যস্ত হয়ে গেছে। ও নিজের সাহস সঞ্চয় করে আরশানের চোখের দিকে তাকিয়েই পালটা প্রশ্ন করল — “কী করবেন? সেদিন ঝাল খাইয়ে যেমন পানিশমেন্ট দিয়েছিলেন, তেমন কিছু? ওসব আমি আর এখন ভয় পাই না।”
রিমির মুখে এই ঝটপট উত্তর শুনে আরশান মুহূর্তের জন্য থমকাল। ওর ঠোঁটের কোণে খুব সূক্ষ্ম একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। আরশান এক পা পিছিয়ে গিয়ে দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়াল। রিমির এই হঠাৎ বেড়ে যাওয়া সাহসটা ও যেন বেশ উপভোগ করছে। আরশান খুব নিস্পৃহ গলায় বলল — “ঝাল? ওটা তো শুধু একটা শুরু ছিল রিমি। তুমি কি আসলেও মনে করো আমার পানিশমেন্টের দৌড় অতটুকুই?”
রিমি যদিও এতক্ষণ সাহস দেখাচ্ছিল কিন্তু এই মুহূর্তে আরশানের চাহনি দেখে ওর আর এখানে দাড়ানোর সাহস হচ্ছেনা। ও যেই না যাওয়ার এক পা বাড়িয়েছে, ঠিক তখনই আরশান খুব দ্রুতগতিতে নিজের খালি হাতটা বাড়িয়ে রিমির কবজিটা শক্ত করে চেপে ধরল। আরশানের এই আকস্মিক পদক্ষেপে রিমি চমকে উঠল। ও বড় বড় চোখ করে আরশানের দিকে তাকাল। আরশানের চোখে যেনো হঠাৎই এক ভয়ংকর আচ্ছন্নতার ছাপ লক্ষ্য করলো রিমি। আরশান কোনো কথা না বলে, এক ঝটকায় রিমিকে নিজের ঘরের ভেতরে টেনে নিয়ে এল। করিডোরের সেই নীরবতা আরশানের ঘরের নীলচে অন্ধকারে হারিয়ে গেল। অকস্মাৎ আরশান যে এমনকিছু করে বসবে রিমি ভাবেনি। আরশান রিমির হাত ধরেই হালুয়ার বাটিটা সাইডের এক টেবিলে রাখলো। এরপর রেখে রিমির দিকে এক নজর তাকিয়েই ধপ করে ওকে দেওয়ালের সঙ্গে সেঁটে দাঁড় করিয়ে খুব কাছে এসে দাঁড়াল। ঘরের সেই মায়াবী নীল অন্ধকারে আরশানের দীর্ঘদেহী উপস্থিতি রিমির চরাপাশের বাতাসকে যেন আরও সংকুচিত করে দিল। ওর শরীরের দামী পারফিউম আর পৌরুষদীপ্ত ঘ্রাণ রিমির দম বন্ধ করে আসার উপক্রম। এই মুহূর্তে মনের মধ্যে মেয়েটার এক অদ্ভুত ভয় কাজ করতে শুরু করেছে, বুকটা এতো জোরে কাঁপছে যে নিঃশ্বাস নিতেও আরশান কোনো ভূমিকা ছাড়াই খুব গম্ভীর আর ভারী গলায় প্রথম প্রশ্নটা করল — “So, you’re not scared of my punishments anymore, huh?”
আরশানের কথা শুনে রিমির এই মুহূর্তে নিজের ওপরই করুণা হচ্ছে, কেনো যে এত সাহস দেখাতে গেলাম ভেবেই আফসোস করছে মেয়েটা। ও কিছু বলার আগেই আরশান ফিসফিসিয়ে বললো — “Let’s see how you handle this one. Any guesses what it is?”
চলবে…
আগের পর্বের লিংক: https://www.facebook.com/share/p/1AiVpL3nBN/?mibextid=oFDknk

