মন_হারালো_বেঘোরে #লেখনীতে_মেহেরীন #বোনাস_পর্ব

0
26

#মন_হারালো_বেঘোরে
#লেখনীতে_মেহেরীন
#বোনাস_পর্ব

আয়ান পালিয়ে যাওয়ার পর ড্রয়িংরুমে এক ভারী নীরবতা নেমে এল। কেবল দেয়াল ঘড়ির টিকটিক শব্দ, রান্নাঘরে ইনায়ার জিনিসপত্র সরানোর শব্দ আর রিমির বুকের ধুকপুকানি স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে! রিমি আরশানের শক্ত হাতের বাঁধন থেকে নিজের হাতটা ছাড়ানোর বৃথা চেষ্টা করে নিচু স্বরে বলল — “আয়ান কী ভাবল বলুন তো? ছাড়ুন এবার আমাকে, ইনায়া চলে আসবে।”

আরশান ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ সরালো না। ওর ঠোঁটের কোণে সেই বাঁকা হাসিটা আরও চওড়া হলো। ও খুব শান্ত অথচ গম্ভীর গলায় বলল — “Let him think whatever he wants. As for Inaya, she would know about us anyway”

রিমি চমকে উঠলো — “আমাদের সম্পর্কে জানবে মানে? আমাদের মধ্যে এমনকিছুই নেই, আপনি কি জানানোর কথা বলছেন?”

“আমাদের মধ্যে কিছু যদি নাই থেকে থাকে তাহলে what was that last night?”

রিমি স্তব্ধ হয়ে গেল! আরশান এবার ফোনটা পাশে রেখে রিমির দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাতেই রিমি কুঁকড়ে গিয়ে চিবুক নামিয়ে রাখল। আরশান হঠাৎ রিমির আরও একটু কাছে সরে এল, রিমির উচুঁ করে বাঁধা চুলগুলোর দিকে একনজর চোখ বুলিয়ে বললো — “আমি দেখছি তুমি কিভাবে আমায় দেখে পালিয়ে বেড়াচ্ছ। আমার গলার আওয়াজ পেলেই ইঁদুরের মতো গর্তে ঢুকে যাচ্ছ। Why are you trying to avoid me, Rimi?”

রিমি একটা ঢোক গিলল। ওর গলার ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। ও আরশানের চোখের দিকে না তাকিয়েই অস্ফুট স্বরে বলল — “আপনার হয়তো বুঝতে ভুল হচ্ছে, আমি আপনাকে এভয়েড করছি না। আসলে কদিন ধরে ভার্সিটির অনেক চাপ…”

আরশান রিমির কথা কেড়ে নিয়ে বললো — “ওহ! ভীষণ ব্যস্ত দিন কাটাচ্ছ?”

রিমি আর কিছু বলার সাহস পাচ্ছেনা, এর মধ্যে আরশান ওর হাতটা আরও একটু জোরে চেপে ধরল, যেন বুঝিয়ে দিল পালানোর কোনো পথ নেই। আরশানের ঠোঁটে আবার সেই রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। ও রিমির কানের খুব কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল — “You are an adult, Rimi. Then why are you reacting like this? As if that kis’s was a c’rime!”

রিমির সারা শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। ও ভাবতেই পারেনি আরশান এত সরাসরি ওই বিষয়টা নিয়ে কথা বলবে। লজ্জায় ওর কান যেনো ঝাঁ ঝাঁ করতে শুরু করল। ও একটু কেঁপে উঠলো! — “ওটা…ওটা ভুল ছিল। প্লিজ ওসব নিয়ে কথা বলবেন না।”

আরশান ওর থুতনিটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরল। ওর চোখে এখন এক ধরণের বিচিত্র নেশা। ও খুব শান্তভাবে বলল — “ভুল? আমার ডিকশনারিতে ‘ভুল’ বলে কিছু নেই। যা করেছি, আমি করেছি আর ভেবেচিন্তেই করেছি। আর যা আমি একবার নিজের করে নিই, সেটা কোনোদিন ভুল হয় না”

রিমি ঢোক গিললো, এ মুহূর্তে আরশানের আচরণ ও কথাবার্তাগুলো অন্যান্য দিনের তুলনায় সম্পূর্ন অন্যরকম লাগছে, যেনো নিজের আড়াল করে রাখা নতুন রূপটা হুট করেই প্রকাশ করতে আছে করেছে। রিমি একটু সাহস নিয়ে জিজ্ঞাসা করলো — “আপনি ইচ্ছে করে করেছেন মানে? কি বলতে চাইছেন?”

“I just want to say, stop running”

এ মুহূর্তে আরশানের চোখমুখের প্রতিক্রিয়া যেনো রিমিকে সতর্ক বার্তা দিচ্ছে যে আরশানের থাবা থেকে ও আর বেরোতে পারবে না। আরশানের প্রতি রিমির মনে যে ভালো লাগার অনুভূতি জেগেছিল সেটা যেনো হঠাৎই ভয়ের কারণে পরিণত হলো! এ মুহূর্তে নিজের চোখের সামনে এ কোন আরশানকে দেখছে সেটা নিয়েও সন্দেহ হচ্ছে! রিমির মনে হচ্ছে যেনো আরশানের ওই জটিল মন মানসিকতা বোঝা ওর সাধ্যের বাইরে!
_______________________________

ইনায়ার বানানো ভাজাপোড়াগুলো মোটামুটি মুখরোচকই হয়েছিলো। বেগুনি আর আলুর চপ বানিয়েছিলো। সবাই মিলে সেগুলো সাবাড় করলো। খাওয়ার সময় আয়ান বারবার নিজের ভাইয়ের দিকে তাকাচ্ছিল। ভাইয়ের নয়া রূপ দেখে ফেলেছে বলে কথা, তাই একটু ভালোভাবে পরখ করে নিলো আসলেই এটা ওর ভাই কিনা! রিমি খাচ্ছিলো ঠিকই সঙ্গে নিজের অস্থিরতাকে সামলানোর চেষ্টা করছিলো। একটু আগে আরশানের বলা কথাগুলো এখনো ওর কানে ভোঁ ভোঁ করছে।নাস্তা শেষ হতেই আয়ান হুট করে বলে উঠল — “উফ! এই সন্ধ্যায় ভাজাপোড়া খেয়ে জমে গেছে। ভাইয়া, রাতটা আরও স্পেশাল করা যায় না? অনেকদিন তো বার্বিকিউ করা হয় না। চলো আজ করি”

ইনায়াও সাথে সাথে তাল মেলাল — “ঠিক বলেছিস আয়ান! আম্মু-আব্বুও বাসায় নেই, এই সুযোগ। ভাইয়া, তুমি তো সেরা বার্বিকিউ বানাতে পারো। আজ হয়ে যাক?”

আরশান ভাইবোনের আবদার শুনে ও ভ্রু কুঁচকে তাকাল। ওর সেই চিরাচরিত গম্ভীর গলায় বলল — “কাল আমার জরুরি মিটিং আছে। আজ রাত বিরাতে এসব করতে পারবো না আমি”

ইনায়া তো নাছোড়বান্দা, ও আরশানের কাঁধ জড়িয়ে ধরে বলতে লাগল — “আরে ভাইয়া, প্লিজ! মাত্র তো কয়েকটা ঘণ্টা। সব প্রিপারেশন আমরা তিনজন মিলে করে দেব, তুমি শুধু মশলা আর গ্রিলিংটা দেখবে।”

ভাইবোনের এতো জোরাজুরিতে রাজি হলো আরশান! — “ঠিক আছে। তবে আমার একটা শর্ত আছে। ডিনারের আগে এসব নিয়ে কোনো মাতামাতি চলবে না। আগে সবাই ডিনার শেষ করবে, তারপর ছাদে বার্বিকিউ সেটআপ হবে”

ইনায়া আর আয়ান খুশিতে চিৎকার করে উঠল। ইনায়া বলল — “ডান ভাইয়া! আমরা এখনই সব নামিয়ে রাখছি।”

ডিনারটা রিমি বানিয়েছিলো, বাসার সবার সম্মতি নিয়েই আজ রাতের খাবার শুধু ভাজি ভর্তা দিয়েই শেষ করা হয়েছে। ডিনার শেষেই বার্বিকিউ এর প্রস্তুতি নেওয়া হলো। রান্নাঘরে গিয়ে রিমি আর ইনায়া মিলে মুরগি ম্যারিনেট করার তোড়জোড় করলো। রিমি আগে কোনোদিন কোনো বার্বিকিউ পার্টি দেখেনি তাই ও অনেক উৎসাহিত ছিলো! রাতের অন্ধকার আকাশটা আজ মেঘলা, মাঝে মাঝে হালকা বাতাসের ঝাপটা এসে গায়ে লাগছে। ছাদের এক কোণে বার্বিকিউ গ্রিলটা বসানো হয়েছে। কয়লার লালচে আগুন থেকে ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। আরশান একমনে মশলা মাখানো চিকেনগুলো গ্রিলের ওপর সাজিয়ে দিচ্ছে। আয়ান পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল, ওর অতি উৎসাহ আজ আরশানের বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আরশানের কপালে ঘাম জমেছে, ও একবার হাত দিয়ে সেটা মুছতে যাবে—ঠিক তখনই আয়ান ওর পাশে এসে বলল — “ভাইয়া, মশলা কি আরও একটু দেব? এই দেখো না বাটিতে অনেকগুলো বাকি রয়ে গেছে!”

বলেই আয়ান হাত বাড়িয়ে মশলা মাখানো হাতটা অজান্তেই আরশানের টি-শার্টের কাঁধের কাছে লাগিয়ে দিল। আরশান থমকে গেল। ওর সেই চিরাচরিত খুঁতখুঁতে স্বভাবটা মুহূর্তেই চাড়া দিয়ে উঠল। ও দাঁতে দাঁত চেপে গম্ভীর স্বরে বলল —”আয়ান! আমার কাজ বাড়াস না!”

আয়ান ভয় পেয়ে হাতটা সরিয়ে নিল। ও মুখ গোমড়া করে বিড়বিড় করতে করতে ছাদের অন্য প্রান্তে চলে এল। যেখানে ইনায়া আর রিমি দাঁড়িয়ে অরেঞ্জ জুস খাচ্ছিল। আয়ান এসে সোজা ইনায়ার হাত থেকে জুসের গ্লাসটা নিয়ে এক চুমুক দিয়ে বলল — “বুঝলি তোরা! আমার ভাইটা না দিন দিন আস্ত একটা হিটলার হয়ে যাচ্ছে। একটু মশলা লেগেছে বলে এমন করছে যেন আমি ওর কোটি টাকার প্রজেক্ট জ্বালিয়ে দিয়েছি!”

ইনায়া হেসে ফেলে বলল, “তুই জানিস না ভাইয়া কেমন? তাহলে কেনো অযথা ভাইয়াকে রাগাতে যাস?”

ওদের আলাপ শুনতে শুনতে রিমি জুস খাচ্ছিলো। এক পর্যায়ে আরশানের দিকে নজর যেতেই ও নিজের অজান্তেই থমকে দাঁড়াল। ওর মনে হলো, এই আগুনের শিখার চেয়েও বেশি উত্তাপ ছড়াচ্ছে আরশানের ওই শান্ত অথচ শক্তিশালী উপস্থিতি! আরশানকে এ মুহূর্তে রিমির কাছে অসম্ভব আকর্ষণীয় লাগছে, এক ধরণের নিষিদ্ধ সৌন্দর্যের মতো, যা ছোঁয়ার এর সাধ্য আবার ওদিক থেকে চোখ ফেরানোও দায়। রিমি বুক ভরে একটা দীর্ঘশ্বাস নিল। আরশানের এই অগোছালো রূপটা কেন জানি ওর বুকের ভেতর এক অদ্ভুত কম্পন সৃষ্টি করছে। ও যতবার নিজেকে বোঝাচ্ছে যে এই মানুষটা বিপজ্জনক, ততবারই ওর মন অবাধ্য হয়ে আরশানের এই মায়াবী আচ্ছন্নতায় ডুবে যেতে চাইছে। আরশান চিকেনগুলো উল্টাতে উল্টাতে হঠাৎ মুখ তুলল। রিমির চোখের দিকে তাকিয়ে খুব নিচু স্বরে, প্রায় আদেশ দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল — “Don’t just stand there and stare, Rimi. Come here & help me with these.”

রিমি প্রথমে যেতে চায়নি কিন্তু আরশান দ্বিতীয়বার তাকাতেই ও হাতের আধখাওয়া জুসের গ্লাসটা সিমেন্টের তৈরি টেবিলটার ওপর রেখে ধীরপায়ে আরশানের দিকে এগিয়ে গেল। আরশান যে রিমিকে ডেকেছে, সেটা ইনায়ার কানে গেলেও ও খুব একটা গুরুত্ব দিল না। ও একমনে ফোনের স্ক্রিনে কার সাথে যেন চ্যাট করতে ব্যস্ত। কিন্তু পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আয়ানের চোখ এড়ালো না কিছুই। আয়ান ইনায়ার আরও একটু কাছে সরে এল। ইনায়ার কনুইয়ে একটা ধাক্কা দিয়ে ফিসফিস করে বলল — “ঐ দেখ! ভাইয়া আমাকে তাড়িয়ে দিলো ঠিকই কিন্তু রিমিকে ডেকে নিলো”

ইনায়া ফোন থেকে চোখ না সরিয়েই দায়সারাভাবে উত্তর দিল — “তো কী হয়েছে? ভাইয়া বার্বিকিউ করছে, সাহায্য লাগবে বলেই তো ডেকেছে। তুই গিয়ে তো আর কাজ বাড়িয়ে দিয়ে আসলি, তাই হয়তো ওকে ডাকল।”

আয়ান এবার উত্তেজিত হয়ে ইনায়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে চাপা স্বরে বলতে লাগল — “আরে, তুই কিচ্ছু বুঝিস না। তুই কি জানিস এই বাড়িতে আসলে কী হচ্ছে? তোর নাকের ডগায় এতকিছু ঘটে যাচ্ছে আর তুই কিছুই টের পাচ্ছিস না?”

ইনায়া এবার ফোনটা নামিয়ে ভ্রু কুঁচকে আয়ানের দিকে তাকাল। ওর চোখেমুখে একরাশ বিরক্তি। ও নিচু গলায় বলল — “কী বলতে চাস তুই পরিষ্কার করে বলবি? হেঁয়ালি করছিস কেন?”

আয়ান সরাসরি বলতে চাইছে না কিছু, আবার ইনায়াকে বোঝাতেও পারছেনা। ইনায়া তখন শাফিনের সঙ্গে চ্যাটিংয়ে ব্যস্ত ছিল, ইদানিং শাফিনের সঙ্গে ভালোই গল্পগুজব হচ্ছে ওর। তো আয়ানের কথায় বিশেষ পাত্তা না দিয়ে ও ছাদের আরেক কোণে চলে গেলো শাফিনের সঙ্গে ফোনে কথা বলতে। ইনায়াকে দাঁড় করাতে পারলো না আয়ান, চোখ ঘুরিয়ে যেই আরশানদের দিকে তাকিয়েছে ওমনি ও আরেক দফা ধাক্কা খেলো! আরশান প্রথম গ্রিলটা তুলেই রিমিকে নিজ হাতে খাইয়ে দিতে প্রস্তুত হয়েছে! — “টেস্ট করে বলো কেমন হয়েছে”

রিমি হাত দিয়ে খেতে চাইলো — “আমি নিজেই খাচ্ছি”

আরশান ওর হাতে দিলো না! — “I will feed you”

আরশান কেমন সেটা রিমির অজানা নয়, জোর করে হলেও খাইয়ে দিয়েই ছাড়বে। অগত্যা রিমি নিজের মুখ খুলতে বাধ্য হলো, মেয়েটা হার মেনে নিয়েছে দেখে আরশান মনে মনে আনন্দ পেলো। এটাই তো ও চায়, মেয়েটা ওর নিয়ন্ত্রণে থাকুক। ও রিমিকে খাইয়ে দিলো, ওদিকে শকে আয়ানের পা টলমল করছে! ও বিড়বিড় করে বলতে শুরু করলো — “আল্লাহ! আমার ভাইয়ের মতো দেখতে এ কোন জ্বীন আমাদের বাসায় ঢুকেছে? এটা আমার ভাইয়া হতে পারে না!”

চলবে…

আগের পর্বের লিংক: https://www.facebook.com/share/p/1DtChaaAiB/?mibextid=oFDknk

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here