#প্রভামঞ্জরী☜
#নওরোজ_মীম
কপি করা নিষিদ্ধ
পর্বঃ ১৫
_________________________
কুমিল্লার ওয়ার সিমেট্রি এলাকার সেই নিরব জলাশয়ের তীরের ছোট্ট আধাপাকা বাড়িটা ঘিরে রয়েছে স্থানীয় মানুষের দ্বারা। এমনকি দূরদূরান্ত থেকেও এমন লা*শের ঘটনা শুনে কৌতুহলী মানুষের আনাগোনা বেশ লক্ষ্যনীয়। ঘটনা আসলে কি তা নিজ চোখে দেখতে ভীড় করেছে অনেকে। গুনগুনিয়ে চলছে মানুষের আলাপ আলোচনার ঝড়। সবাই নিজের মতো করে মতামত রাখছে তা কেউ শুনতে আগ্রহী হোক বা না হোক। সেই আলাপ আলোচনার ঝড়ে থমথমে পরিবেশ হয়েছে মনুষ্য স্বরে মুখর। নিরবতা ছিন্ন করতেই যেন এই মনুষ্য স্বরের ঝড় উঠেছে চারপাশে।
প্রথমে পুলিশের তদন্ত চললেও পরে কুমিল্লা সেনানিবাসের থেকে সেনাবাহিনীর একটা টীম এসে সিলগালা করে পুরো বাড়ি। সাথে কে*সের দায়িত্ব তুলে নেয় নিজেদের কাঁধে। চক্র খু নে র সাথে জড়িত থাকার আশংকায় তারা ওই কে*সের সাথে জড়িত মেজর এএকের সাথে যোগাযোগ করে জায়গাটা পাহারায় রাখে। যাতে একচুল কোনোকিছু নড়াচড়া না হয়।
ঢাকা সেনানিবাস থেকে দুইটা কালো গাড়ি এসে থামে কুমিল্লা ঘটনাস্থলে। প্রথম গাড়ি থেকে থমথমে অবস্থায় বের হলেন মেজর জেনারেল নারায়ণ কর্মকার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হামিদুর রহমান, মাস্ক আর আর্মি ক্যাপ পরিহিত মেজর এএকে আর ক্যাপ্টেন তাহমিদ।
দ্বিতীয় গাড়ি থেকে নামলেন ওয়ারেন্ট অফিসার ফারিহা আঞ্জুমান সহ কিছু সন্য যারা চক্র খু*নের কে*সের সাথে ওতোপ্রোতো ভাবে জড়িত। এতো উচ্চপদস্থ সেনাকর্মকর্তা দেখে নিমিষেই স্তব্ধ হয় কিছুক্ষণ আগের গুঞ্জন। পিনপতন নীরবতা ছেয়ে যায় চারপাশে। থাকে শুধু সেনাবাহিনীর বুটে শব্দ করে হেঁটে চলার শব্দ।
মেজর জেনারেলের মেয়েকে এখানে ধ র্ষ ণ করে খু ন করা হয়েছে। একজন সেনাকর্মকর্তা হিসেবে যাই হোক কিন্তু একজন পিতা হিসেবে এই ঘটনা মেনে নেওয়া অসম্ভব। তাই ব্রিগেডিয়ার জেনারেল অনুরোধ করে বাড়ির ভিতরে যাওয়া থেকে আটকায় নারায়ণ কর্মকারকে। এমনকি সে নিজেও থাকে বাইরে। ঘরের ভিতর প্রবেশ করে মেজর এএকে আর ক্যাপ্টেন তাহমিদ। সাথে ওয়ারেন্ট অফিসার ফারিহা আঞ্জুম আর কিছু সন্য। ভিতরে ঢুকেই দাম্ভিক পা জোড়া হুট করেই অসহনীয় ভারী হয় মেজরের। দুটো পা নিয়ে আর এক পাও সে ফেলার সাহস পাচ্ছে না।
একই অবস্থা ক্যাপ্টেন তাহমিদ, ওয়ারেন্ট অফিসার ফারিহা আঞ্জুম আর অন্যদেরও।
ঘরের ভিতর একটা চেয়ার রাখা সাথে রয়েছে মোটা দড়ি আর দড়িতে রয়েছে র ক্ত। যা দেখে খুব সহজেই অনুমান করা যায় যে এই দড়িতেই বেঁধে রাখা হয়েছিলো অর্পা কর্মকার নামের মেজর জেনারেলের মেয়েকে। সামনে তাকিয়ে আরও দেখা যায় ফ্লোরে একটা তোশক এবং তার উপর একটা বিছানার চাদর বিছানো রয়েছে কিন্তু এখন তার অবস্থা প্রচন্ড এলোমেলো। দেখেই বোঝা যাচ্ছে এখানে ঠিক কতখানি ধস্তাধস্তি করেছে মেয়েটা বাঁচার জন্য। কিন্তু তাকে সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি। বাঁচতে দেওয়া হয়নি। বিছানার চাদরে র ক্তের দাগ গাড় হয়ে রয়েছে। পুরো শুকিয়ে যায়নি এখনো হাত দিলে হাতে লেগে যাবে এমন। এএকে হাত দিলো আলতো করে চাদরটায়। তার হাতে লেগে গেলো সেই আধা শুকনো আধা ভিজা র ক্ত। সেই র ক্ত মাখা হাত নিজের চোখের সামনে এনে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে হৃদয়হীন নিষ্ঠুর মেজরটা, এই জানো য়ারের কঠিন শা স্তির ব্যবস্থা সে নিজ হাতে করবে। আর যতক্ষণ না এঁকে শা স্তি দিবে সে শান্তির শ্বাস নিবে না।
রুম থেকে যা কিছু পাওয়া গিয়েছে সব ফরেনসিকে পাঠিয়ে দেয় ক্যাপ্টেন তাহমিদ। ঘর থেকে বের হলে মেজর জেনারেলের কাতর পিতৃ চোখে চোখ মেলাতে ব্যর্থ হয় আজ সর্বদা শিরদাঁড়া খাড়া করে নজর উঁচু করে চলা মেজর এএকে। আজ ওই পিতৃ নজরে নজর রাখা অসম্ভব হয়। দৃষ্টি নিচু করেই এগিয়ে যায় লা-শ ভেসে ওঠা সেই জলাশয়ের কাছে। চারপাশ পরিক্ষা করে ওখানের সব কাজ মিটিয়ে নেয়। পুলিশ এবং কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট এর সেনাদের সাথে সৌজন্যতার শেষ করে আবারও গাড়িতে বসে রওনা হয় ঢাকা সেনানিবাসের উদ্দেশ্যে। বাকি কাজ ওখানে থেকেই করা সম্ভব।
.
.
.
.
কুমিল্লা থেকে ফিরে অনেক অফিসিয়াল কাজ মিটিয়ে মেজর এএকে গিয়েছে সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ। আর ক্যাপ্টেন তাহমিদ গিয়েছে ফরেনসিক বিভাগে। কে স যত দ্রুত সম্ভব তারা সমাধান করেই ছাড়বে মনে মনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ সকলে। তাদের ওতোপ্রোতো ভাবে সাহায্য করছে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হামিদুর রহমান।
সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজের অডিটোরিয়াম রুমে অবস্থান করছে প্রথম বর্ষের সকল শিক্ষার্থী সাথে শিক্ষকরা। সম্পুর্ণ আর্মি ইউনিফর্ম পরিহিত মাস্ক, ক্যাপ পরা মেজর এএকের সাথে রয়েছে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হামিদুর রহমান। একে একে প্রত্যেকের সাথে কথা বলে কুমিল্লা ট্যুর সম্পর্কে সবকিছু জেনে এএকে জানতে পারে যে শুধু অর্পা নয় তাদের আরও একজন স্টুডেন্ট মিসিং। এবং সেও অর্পার সাথেই মিসিং হয়েছে। মেয়েটা এতিম আপন বলতে কেউ নেই তাই তার খোঁজ কেউ নিচ্ছে না।
হতভম্ব হওয়ার সুযোগ পর্যন্ত পায়নি মেজর এএকে ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হামিদুর রহমান। তার আগেই মেজরের অফিসিয়াল ফোনে একটা কল আসে সামনে ধরলেই দেখা যায় স্ক্রিনে বড় হাতের ইংরেজি অক্ষরে লেখা ‘CAPTAIN TAHMID’।
সবার থেকে কিছুটা দূরে যেয়ে রিসিভ করলে ওপাশ থেকে ক্যাপ্টেন বলে,
“বিছানার চাদরে যে র ক্ত পাওয়া গিয়েছে তা অর্পা কর্মকারের কিন্তু, কিন্তু চেয়ারে বাঁধা যে দড়ি পাওয়া গিয়েছে তাতে লেগে থাকা র ক্ত কিন্তু অর্পা কর্মকারের নয়। তা অন্য কারো। আর ডাক্তার ইবনাত শাহরিয়ার এর ভাষ্যমতে দড়িতে লেগে থাকা র ক্ত কোনো মেয়ের। যার বয়স অর্পা কর্মকারের কাছাকাছি। মানে বিশ কিংবা একুশ বছর হবে। মেয়েটাকে এতটা জোরে বেঁধে রাখা হয়েছিলো যে দড়িটা পর্যন্ত র ক্তাক্ত হয়েছে।”
জোরে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মেজর এএকে ক্যাপ্টেন তাহমিদকে জানায়,
“হুম আমিও এরকমই জানলাম। মেয়েটা অর্পা কর্মকারের বন্ধু। একই সাথে পড়ে। ওর নাম নাঈমা হাসান। মেয়েটা এতিম কেউ নেই। অর্পাই ওর পড়াশোনার খরচ চালায়। জানিনা মেয়েটা এখন কোথায়? আদোও বেঁচে আছে কি না?”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে ক্যাপ্টেন তাহমিদ বলে,
“ওহ মেজর আপনাকে আরও জানানোর আছে। ডক্টর বলেছে অর্পা কর্মকারকে প্রথমে অজ্ঞান করে সারারাত ধরে ধ*র্ষণ করে তারপর গলায় মাটির কলসি বাঁধা অবস্থায় পানিতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে। মৃ ত্যু র কারণ পানিতে ডু বে শ্বাস রোধ হওয়া।”
মেজর এএকে বলে,
“বুঝেছি ক্যাপ্টেন। এখন আমাদের নাঈমা হাসানকে খুঁজতে হবে। যদি জী বিত পাওয়া যায়! আপনি টীম নিয়ে বের হন ক্যাপ্টেন। আমি আসছি।”
“রজার দ্যাট স্যার।”
ফোন কেটে মেজর এএকে গাড়িতে উঠে বসে ব্রিগেডিয়ার জেনারেলের পাশে। এবং তাকে সবকিছু বলে।
.
.
.
.
সেনানিবাসে ফিরে মেজর জেনারেলের কাছে হেঁটে যায় ক্যাপ্টেন তাহমিদ, মেজর এএকে ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হামিদুর রহমান। র ক্ত লাল চোখ নিয়ে নিষ্প্রাণ বসে থাকা মেজর জেনারেলের সামনে যেয়ে তাকে সম্মান প্রদর্শন করে অনিল বলে,
“আমি মেজর এএকে আমার সিনিয়র মেজর জেনারেল নারায়ণ কর্মকার নয় বরং একজন পিতা নারায়ণ কর্মকারকে প্রতিজ্ঞা করছি যে আগামী চব্বিশঘণ্টার মধ্যে তার মেয়ের খু নী কে তার সামনে হাজির করবো। না হলে আমার প্রাণের চেয়ে প্রিয় এই আর্মি ইউনিফর্ম আর কখনো নিজের শরীরে জড়াবো না।”
ক্যাপ্টেন তাহমিদ,
“আমিও একই মতামত জানাচ্ছি স্যার। এখন আপনার অনুমতির অপেক্ষা।”
চোখ মেলে নিজের দুই রত্নকে দেখে নিয়ে বলেন মেজর জেনারেল নারায়ণ কর্মকার,
“অনুমতি দেওয়া হলো ক্যাপ্টেন। আমি অপেক্ষা করবো। আমি জানি মেজর এএকে আর ক্যাপ্টেন তাহমিদ প্রাণ থাকতে নিজেদের ওয়াদা খেলাফ করে না।
আজ মেজর জেনারেল নয় একজন বাবা আপনাদের অপেক্ষা করবে। কাজ শুরু করুন।”
“রজার দ্যাট।”
একই সাথে বলে ক্যাপ্টেন তাহমিদ আর মেজর এএকে। তারপর স্যালুট করে বেরিয়ে যায়।
..
..
..
চলবে___
(আগেই বলেছি এটা ক্রা ইম থ্রি লার ভরপুর গল্প। তাই কাঠখোট্টা হৃদয়হীন নিষ্ঠুর মেজরকেই বেশি পাবেন আপনারা।)

