প্রভামঞ্জরী☜ #নওরোজ_মীম পর্বঃ ১৪

0
21

#প্রভামঞ্জরী☜
#নওরোজ_মীম
পর্বঃ ১৪
___________________________

মাথায় আলতো হাতের ছোঁয়া পেয়ে মুখ তুলে অনিল তার বাবা আবরার খানের দিকে তাকায়। তারপর সে উঠে বসে বাবাকে বসার জন্য জায়গা করে দেয়। আবরার খান বসতেই অনিল তার কোলে মাথা রেখে আবারও শুয়ে পড়ে। পরম আবেশে তার চুল গুলো টেনে দিতে থাকে তার বাবা।
দুপক্ষের নিরবতা ভাঙে আবরার খান।

“অনি।”

চোখ বুজে নিজের হৃদয়ে শীতলতা টুকু গোগ্রাসে গিলতে থাকে অনিল। দুনিয়ায় তার বাবা আর মা তাকে অনি বলে ডাকে। মা যাওয়ার পর এখন শুধু বাবাই আছে এই নামে ডাকার জন্য। অথচ তার কাঠিন্যের আবরণে বদ্ধ মন আকুল হয়ে থাকে এই অনি ডাক শোনার জন্য। তাইতো বাবার এই ডাক প্রতিবার তার হৃদয় শীতল করে। নিজের অস্থিরতা সামলে বাবার সাথে কথোপকথন চালায় অনিল।

“হুম। এই এতো রাতে না ঘুমিয়ে তুমি এখানে কেন?”

“কত বছর পর আমার মানিক আমার সাথে থাকে। জানিনা কদিন থাকতে পারবে। আমার কি ইচ্ছে করে না আমার বাচ্চাদের সাথে সময় কাঁটাতে?”

“দেশের জন্য নিজের নাম লিখিয়েছে তোমার মানিক বাবা। তাইতো তোমার জন্য বরাদ্দকৃত সময় কমে গিয়েছে। আপনার মানিককে মাফ করা যায় না বাবা?”

বাবার কোলে শুয়েই তার দিকে তাকিয়ে ছোট বাচ্চার মতো আবদার করে তথাকথিত হৃদয়হীন নিষ্ঠুর মেজরটা।
এদিকে ছেলের কথায় প্রাণবন্ত হাসেন আবরার খান। হাসি মুখেই ছেলের মুখে হাত বুলিয়ে বলেন,

“আমার মানিক আমার কি পরিমাণ গর্বের কারণ তা কি কেউ জানে? অন্যরা যখন আমার সামনে বলে মেজর এএকের মতো ছেলে সেই বাবা তো অঢেল সম্পদের মালিক। তাকে যে মা গর্ভে ধরেছে সে তো রত্নগর্ভা। তখন এই সাধারণ বিজনেসম্যান এর আড়ালে লুকানো মেজর এএকের বাবা হওয়ায় আমার সিনা কতটা চওড়া হয় তা তুমি বুঝবে না আব্বা।
আমি আমার মানিককে নিয়ে কতটা প্রাউড ফিল করি তা শুধু আমিই জানি।”

অনিলের মাথাটা এবার বাবার পেটে চেপে যায় নির্দিধায়। নিষ্ঠুর মেজর আবার বাবা মায়ের কাছে একদম পাঁচ বছরের শিশু যেন। নিজের বয়স, নিজের পেশা, নিজের কঠিন ব্যক্তিত্ব সবই কোন দূরে ঠেলে ফেলে সে বাবা মায়ের সামনে। এখন তো মা নেই তাই মায়ের শুন্যস্থান ও এখন বাবাই সব। অনিলের কান্ডে ঝাপসা চোখে হাসেন আবরার খান। তারপর বলেন,

“মন খারাপ কেন আব্বা?”

“মায়ের কথা মনে পড়ছে বাবা।”

দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন আবরার খান।

“দুনিয়ায় কেউ চিরকাল থাকে না আব্বা। তুমি তো অবুঝ নও।”

“অবুঝ না হলে কি হবে বাবা। মন টা বুঝ মানে না।”

“বুঝেছি। এখন উঠে বসো খাবার এনেছি।”

অনিল উঠে বসলে নিজের হাতে তাকে ভাত খাওয়াতে থাকে আবরার খান। অনিলও ছোট বেলার মতো একদম চুপটি করে খেতে থাকে বাবার হাতে। এই যুগে ছেলেরা মায়ের সাথে সহজ হতে পারলেও বাবার সাথে যেন একটা ফারাক থেকেই যায়। অথচ অনিল কি নির্দিধায় বাবার হাতে খাবার খাচ্ছে ঊনত্রিশ বছর বয়সে। খেতে খেতেই অনিল বলে,

“আরিবার গ্রাজুয়েশন শেষ। এখন ওকে দেশে ফিরিয়ে আনবে বাবা? আমরা নাহয় এবার একসাথে থাকি।”

ছেলের কথায় ঘাড় নাড়েন আবরার খান। মেয়ে আরিবা আবরার খান কে যে দেশে ফেরানোর কথা তিনি ভাবেন নি এমনটা নয়। কিন্তু একা একা থাকতে হবে আর লেখাপড়ার কথা ভেবেই তিনি না করেছেন এতোদিন। এদিকে মেয়েও তার ফেরার জন্য পাগলামি করছে। এখন ছেলেটা ও চাচ্ছে বোন ফিরে আসুক। এবার নাহয় তাই হোক। এই বয়সে নিজের দুই মানিককে বুকে নিয়ে থাকুক নাহয় কিছু বছর সে। ছেলেটা সেই ক্লাস সেভেনে থাকতে ক্যাডেট কলেজের জন্য বাড়ি ছাড়া হয়েছে। মেয়েটাকেও এসএসসির পরে কানাডা পাঠিয়ে দিয়েছেন কোনো এক কারণে। এবার নাহয় দুজনেই ফিরুক। খাঁখাঁ করা মরুভূমির মতো শুন্য বুক টা তার ভরে উঠুক আবারও। তার অনি ফিরেছে। এবার নাহয় তার আরু ফিরুক।

.
.
.
.

রোজকার মতো নাস্তা শেষ করে হাতে এক কাপ চিনি ছাড়া চা নিয়ে ড্রয়িং রুমের টিভিতে সকাল দশটার খবর দেখছেন জলিল সাহেব। ওই যে খুন, খুনী আর খুনের তদন্ত থেকে শুরু হয়েছে তার এই খবর দেখার নেশা যা এখন তার চুরি করে চায়ে চিনি খাওয়ার নেশার মতোই জোরালো হয়েছে। আগে এই নেশা অবশ্য তার ছিলো না।

আজকের খবরে আবার নতুন চমক অপেক্ষা করছে তা অজানা জালাল সাহেবের। নিজের মিষ্টতা হীন চা মিষ্টি করার জন্য স্ত্রীকে লুকিয়ে চুপিচুপি মেয়েকে একটা ম্যাসেজ করেন- ‘তোমার আম্মুকে লুকিয়ে একটু চিনি দিয়ে যাও আমাকে তনু। অসহায় বুড়ো বাবার এই অনুরোধ কি রাখবে না?’

আজ দুপুরের পরে একটা মাত্র ক্লাস থাকায় ভার্সিটি যেতে দেরি হবে। তাই এই সুযোগ আর সময় কাজে লাগিয়ে ডিপার্টমেন্ট টপার তনিমা চোখমুখ বুজে পড়ছিল। ফোনে থাকা একটা দরকারী ডকুমেন্ট দেখার জন্য ফোন হাতে নিতেই ‘Drama King Baba’ দিয়ে সেভ করা নম্বর থেকে উক্ত ম্যাসেজ দেখে ফিক করে হেসে ফেলে সে। শুধু শুধু তো আর সে তার বাবাকে ড্রামা কিং ডাকে না!
ছোট্ট করে একটা ফিরতি ম্যাসেজ ‘আসছি’ বাবার নম্বরে সেন্ড করে চেয়ার ছেড়ে উঠে নিজের ড্রয়ারে লুকানো স্যাসে সুগার থেকে দুই স্যাসে নিয়ে যায় তার ড্রামা কিং বাবার আবদার পূরনের জন্য।

_”কুমিল্লা সামরিক এলাকা থেকে কিছুটা দূরে এক জলাশয়ে মাছ ধরা জালে মাছের বদলে উঠে এসছে এক কিশোরীর লাশ। স্থানীয় এক জেলের জালে গলায় মাটির কলসি বাঁধা লাশ দেখে ভয় পেয়ে পুলিশকে ঘটনা জানালে পুলিশ তদন্ত শুরু করে। প্রাথমিক দর্শনে বোঝা যাচ্ছে যে ধর্ষণ করে তারপর মেরে ফেলা হয়েছে। লাশটি উদ্ধার করে ফরেনসিক বিভাগে পাঠানো হয়েছে। এবং কেস হস্তান্তর হয়েছে চক্র খুনের তদন্তের প্রধান মেজর এএকের নিকট।

লাশটি শনাক্ত করে পাওয়া গিয়েছে মেজর জেনারেল নারায়ণ কর্মকারের সদ্য সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হওয়া একুশ বছরের মেয়ে অর্পা কর্মকার। অর্পা গতকাল তার মেডিক্যাল কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষা সফরে ঢাকা থেকে কুমিল্লা গেলেও ঢাকায় আর ফেরা হয়নি তার।
মেজর জেনারেল যেহেতু চক্র খুনের কেসের সাথে সরাসরি জড়িত তাই আশংকা করা হচ্ছে যে সেই খুনী অথবা খুনের সাথে জড়িত কেউ হুমকি দিতেই এই কাজ করেছে। এবার দেখা যাক সেনাবাহিনীর পরবর্তী পদক্ষেপ কি হয়?
ক্যামেরায় আশিকের সাথে আমি সাদাফ আদনান বলছি কুমিল্লা থেকে। পরবর্তী খবর জানতে সাথেই থাকুন।”

বাবার চায়ে চিনি মেশাতে থাকা হাত স্তব্ধ হয় তনুর। জলিল সাহেব মূর্তি বনে বসে থাকেন টিভির দিকে তাকিয়ে।
.
.
.
.
ধর্ষণের খবরে আরও একজন পাথর হয়ে গিয়েছে এবারেও সর্বদার ন্যায়। মীম আজও তার সাথে ঘটতে যাওয়া সেই ঘটনা ভুলতে পারে না। তিন বছর আগে সেই দিন তার বাবা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হামিদুর রহমান আর কিছু সময় পরে আসলে তখন এমনই এক খবর আসতো যে ‘ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হামিদুর রহমানের সদ্য এইচএসসি পাস করা মেয়েকে তার নিজের বাড়িতে ধর্ষণ করা হয়েছে।’ হয়তো সেদিন আল্লাহ তার উপর সদয় ছিলেন তাই এমন কিছুই হয়নি। কিন্তু আজ অর্পা নামের মেয়েটার উপর হয়নি কোনো দয়া। অর্পাকে সে চেনে। চারবছর আগে অর্পার জন্মদিনে সে গিয়েছিল বাবা মায়ের সাথে। যেহেতু তাদের বাবারা কলিগ তাই পূর্ব পরিচয় ছিলো। কি ফুটফুটে মেয়েটা তার সাথে কি ঘটে গিয়েছে তা ভাবতেই শিউরে ওঠে মীম।
ইশ জীবন কি নির্মম!
.
.
.
.
অনিল, তাহমিদ নিজেদের টিম নিয়ে রওনা দিয়েছে কুমল্লা ঘটনাস্থলে। সাথে রয়েছে মেজর জেনারেল নারায়ণ কর্মকার আর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হামিদুর রহমান। পেশাদারী ভাবে গাড়িতে বসা মেজর জেনারেল নারায়ণ কর্মকার এর দিকে কেন জানি আজ চোখ তুলে কেউ তাকাতেই পারছে না। নারায়ণ বাবুর চোখদুটো এতোটাই লাল আর ফোলা যে মনে হচ্ছে এখনই তা মার্বেলের ন্যায় ছুটে বেরিয়ে আসবে। নিজেকে পেশাদারিত্বের খোলসে আবৃত করলেও লুকায়িত বাবার চেহারা উঁকি দিয়ে যাচ্ছে বারবার। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হামিদুর রহমান কি বলবেন বুঝতে পারছেন না। তাইতো চুপচাপ হয়ে নিজের শক্ত হাত রাখেন নারায়ণ বাবুর কাঁধে। ইশারায় বোঝান যে এই লড়াইয়ে সেও রয়েছে সাথে। নারায়ণ কর্মকার একা নন।

অনিল ড্রাইভারের পাশের সিটে বসে ভিউ মিররে এই অসহায় বাবার মুখের দিকে একবার তাঁকিয়ে চোখ সরিয়ে নেয়। বারবার নিজের বাবার মুখটা মনে পড়ছে তার। যতই শক্ত হোক একটা মানুষ কিন্তু তার ভিতরের বাবা সত্ত্বাটিকে কি সেই শক্ত আবরণ ছুঁতে পারে? তার মন বলে ‘উহু মোটেই পারে না।’
তারও তো একটা বোন আছে। কিছুটা হলেও যে সে বোঝে।

..
..
..
চলবে___

(আগের কয়েকটা পর্বে হয়তো হামিদুর রহমানকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল না লিখে মেজর জেনারেল লিখেছি। কিন্তু তা ভুলে হয়েছে। পরে ঠিক করে দেয়া হবে। কারণ প্রথম থেকেই হামিদুর রহমান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আর নারায়ণ কর্মকার মেজর জেনারেল হিসেবে লিখেছি।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here