#প্রভামঞ্জরী☜
#নওরোজ_মীম
পর্বঃ ১৩ (কপি করা নিষেধ)
__________________________________
কুমিল্লা ওয়ার সিমেট্রি যা কুমিল্লা শহর থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এখানে ব্রিটিশ ও ভারতীয়দের কবর দেওয়া হয়েছে। কুমিল্লা জেলায় রাতে ডাকাতির ঘটনা অহরহ হলেও এই এলাকা যেন এসবের বাইরে। কুমিল্লা শহর থেকে ভিতরে আর সেনানিবাসের কাছাকাছি হওয়ার দরুন এই এলাকায় সরাসরি প্রভাব রয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর। এই এলাকায় ভা আশেপাশের কোথাও অন্যায় হওয়ার চান্স যথেষ্ট কম।
অথচ এই নিরাপত্তা বলয় ভেঙে এই শেষ রাতে ওই এলাকায় একটা র*ক্ত রঙা গাড়ি তার আপন গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। শফট টোনের মিউজিকের সাথে গলা মিলিয়ে কেউ সুনিপুণ ভাবে গেয়ে চলছে সেই গান। যেন আজ কতটা না আনন্দের রাত! কি মহান কাজটাই না করতে চলেছে!
ঢাকার বিখ্যাত সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজের সদ্য ভর্তি হওয়া ব্যাচের পিকনিক ছিলো আজ। সময়ের সল্পতার জন্য তাদের পূর্বনির্ধারিত স্থান কুমিল্লা ঘুরতে বের হয় তারা। কিছু শিক্ষক আর প্রথম বর্ষের সকল ছাত্র-ছাত্রী মিলে একটা বাস ভাড়া করে ভোরবেলা কুমিল্লার উদ্দেশ্যে ঢাকা থেকে রওনা করে। সারাদিন কাটিয়ে সন্ধ্যায় আবার ঢাকা ফেরার পালা। একুশজন মেয়ে আর বাকিরা ছেলে মিলে সারাদিন অনেক আনন্দ করে পুরো কুমিল্লা শহর ঘুরে বাসে ওঠে। কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট এরিয়ার একটু আগেই ময়নামতির দিকে যাওয়া সরু চিকন রাস্তায় গাছ পড়ে রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। রোড সাইডের সামান্য আলো, গাড়ির আলো আর সবার একান্ত সহযোগিতায় গাছা সরিয়ে আবারও বাস যাত্রা শুরু করে। কিন্তু নিজেদের এই ক্লান্তির লগ্নে ঘোর অন্ধকারে কেউ খেয়ালই করলো না যে ময়নামতি থেকে বাসে একুশটা মেয়ে উঠলেও এখন রয়েছে ঊনিশ জন। তাহলে বাকি দুজন গেলো কোথায়?
.
.
.
.
বাড়ি ফিরে ফ্রেশ হয়ে ছাদে টাঙানো বড় দোলনায় টানটান হয়ে শুয়ে আছে অনিল। আগের রাতে হটাৎ করে একদমই অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে মাশফিয়া মীমের সাথে দেখা হওয়ার পর থেকেই সমস্ত হিসাব মেলানোর চেষ্টায় রয়েছে সেনাবাহিনীর এই চৌকস মস্তিষ্কের মেজর। এই মেয়ের ব্যাপারে সমস্ত তথ্য সে বার করে ফেলেছে কিছু সময়ের মধ্যেই। আর সেই ফাইল নিয়েই মায়ের প্রিয় দোলনায় শুয়ে আছে অনিল। দোলনা তার মায়ের অনেক পছন্দের বস্তু ছিলো বলে বিয়ে করে এই বাড়ি নিয়ে আসার পরে তার বাবা আবরার খান নিজের ষোল বছর বয়সী বউ অনুরিমার জন্য ছাদে এই বিশাল দোলনা টাঙিয়ে দেয়। এতো বছরে বহুবার এই দোলনার পরিবর্তন হলেও নির্দিষ্ট এই জায়গায় দোলনা থাকা এখন খান নিবাসের অলিখিত নিয়ম। এখন অবশ্য এসবের কারণ সেই মানুষটা আর নেই দুনিয়ায় তবুও অনিলের এক টুকরো শান্তির জায়গা এই দোলনা। এখানে শুয়ে থাকলে সে অনুভব করে যে মায়ের ওই মায়াময় কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে । তাইতো অশান্ত মনকে নিয়ে সে দৌড়ে ঝাপিয়ে পড়ে এই দোলনায়। যেমনটা ঠিক তিন বছর আগে পর্যন্ত মায়ের কোলে পড়তো।
সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগলে মায়ের একটু মমতায় সে নিজেকে শান্ত করতে পারে।
এই যেমন এই মূহুর্তে অনিল আবরার খান প্রচন্ডরকম সিদ্ধান্তহীনতার স্বীকার। কি করবে সে?
মন যা বলছে তাই কি করবে? নাকি আরও সময় দিয়ে সব পাকাপোক্ত করে তবেই সামনে পা রাখবে?
.
.
.
.
একই সময় নিজের বাড়ির ছাদের মেঝেতে শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে মীম। লম্বা চুলগুলো এলোমেলো করে মাথার চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অবহেলায়। একটু পর পর দমকা হাওয়ায় সেই অতি অবাধ্য, বেয়াড়া চুলগুলো উড়ে এসে পড়ছে ওই নিষ্ঠুর মানবীর চোখ মুখের উপর। অথচ নিষ্ঠুর মানবীর ধ্যান, জ্ঞান কিছুই এখন আর সেই অবাধ্য চুলে নেই। সে গভীর ভাবনার জগতে বিচরণ চালাচ্ছে বর্তমানে। যেখানে জাগতিক এই অবাধ্য চুলের করা বিরক্তির কোনো জায়গা নেই।
অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে ভেবে চলছে নিজেকে নিয়ে। নিজের নিয়ন্ত্রণহীন রাগ নিয়ে। নিজের মধ্যে থাকা সাই*কোপ্যা*থ আচরণ গুলো নিয়ে।
আচ্ছা এসবের শেষ কোথায়? তার এই জীবন নামক যন্ত্র*ণারই বা শেষ কোথায়? আর কতকাল, আর ঠিক কতখানি অপেক্ষা করতে হবে তাকে?
গগনতলে শুয়ে থাকা মানবী চোখ বন্ধ করে লম্বা একটা শ্বাস নেওয়ার উদ্দেশ্যে। কিন্তু বিধিবাম! লম্বা শ্বাসের সুযোগ না দিয়েই অবচেতন মন তার বন্ধ চোখের পাতায় এক সুদর্শন সর্ব*নাশের প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তুলেছে। বিশ্রী ভাবে বন্ধ করা ওই চোখ দুটো টেনে খুলে নজর কালো আকাশেই তাক করে মীম। এইমাত্র এ কি হলো তার সাথে?
স্বল্পপরিচিত হলেও ওই মুখ তার চেনা। কিন্তু আজ বিনা নিমন্ত্রণে তার চোখের পাতায় তার রাজত্বের কারণ খুঁজে পেলে তো অনুভূতিহীন মেয়েটা!
.
.
.
.
অনিল আর মীমের মতো আরও কেউ খোলা আকাশের তলে দাঁড়িয়ে স্বপ্ন বুনে যাচ্ছে। স্বপ্ন দেখছে এমন এক রাতে এমন ভাবে খোলা ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে প্রিয় পুরুষের ওই চওড়া বক্ষে মাথা গুজে একে অপরের দিকে তাকিয়ে ভালোবাসার আদান-প্রদান হবে। কবে আসবে সেই দিন? সারাজীবন নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা তনুর তনু মন আর কেউই ওর কথা শোনে না। তীব্র ভাবে ওই লোকের দেখা চায় তারা। চায় সেই পুরুষের একটু যত্ন, ভালোবাসা আর একটুখানি সংস্পর্শ।
যেখানে সে নিজেকে হারিয়েছে সেই পুরুষের কাছে কিন্তু পুরুষ বেমালুম। কবে সে পুরুষের চোখে চোখ রেখে বলার মতো শক্তি পাবে তনু? কবে সে বলতে পারবে যে,
‘অনিল ভাই আমি সুরাইয়া তনিমা জালাল ভালোবাসি আপনাকে। ভালোবেসে আপনাতে বিলীন হয়েছি। ছড়িয়ে ছিটিয়ে গিয়েছি আমি। আপনি কি পরম যত্ন সেই ছিটিয়ে থাকা তনুকে আগলে নিবেন না?’
.
.
.
.
ওয়ার সিমেট্রি ফেলে রেখে আরও গ্রামের মধ্যে যেয়ে অনেক রাস্তা পাড়ি জমিয়ে শেষে গন্তব্যে পৌঁছল। একটা ছোট্ট একতালা মতো টিন শেডের বাড়িটার সামনে থামে সেই র*ক্ত রঙা গাড়িটা।
ড্রাইভার সিটের দরজা খুলে এক পুরুষ বেরিয়ে ব্যাক সিট থেকে অজ্ঞান এক মেয়েকে নামিয়ে কাঁধে তুলে নিয়ে বাড়ি ঢুকে এক রুমের মধ্যে রেখে আসে। তারপর কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে চারপাশে নজর বুলিয়ে দ্বিতীয় মেয়েটিকেও একই ভাবে কাঁধে তুলে নিয়ে যায় অন্য রুমে।
লোকটা বেরিয়ে এসে র*ক্ত রঙা গাড়ির উপরে লাফ দিয়ে উঠে বসে। চারপাশে ধুঁ ধুঁ করা মাছ চাষের জন্যে ঘের করা যার একদম মাঝেই এই বাড়ি। সামনে দিয়ে রাস্তা। সেই রাস্তায় গাড়ির উপর শুয়ে অজ্ঞাত এক লোকের অট্টহাসিতে কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা। কেঁপে ওঠে ঘুটঘুটে অন্ধকারে এই শেষ রাতে নিজেদের অবস্থানে থাকা অজ্ঞাত সে মেয়ে দুটিও।
এই ভয়ানক হাসিই বুঝিয়ে দিচ্ছে এবারের খেলা কোনো ছোট খাটো খেলা নয়। এবারে বিরাট কিছু ঘটবে। ঘটবেই।
.
.
.
চলবে ___

