প্রভামঞ্জরী☜ #নওরোজ_মীম পর্বঃ ১২

0
22

#প্রভামঞ্জরী☜
#নওরোজ_মীম
পর্বঃ ১২ (কপি করা নিষেধ)
_________________________________________

ক্যাম্পাসের পাশেই থার্ড ফ্লোরে ‘গ্রীন গার্ডেন’ নামক কফিশপের একদম কর্নারে তিনটা টেবিল একসাথে করে তাতে গোল হয়ে বসে আছে অনিল আর তনিমার সব বন্ধুরা। এই গোল টেবিলের মূখ্য বিষয় অবশ্য মেজর জেনারেলের দুই কন্যা। ভার্সিটির ঝামেলা মিটতেই অনিল আর তনিমার সকল বন্ধুরা একত্রিত হয়। পরিচয় হয় সকলের সঙ্গে। অনিলের মনে কি চলছে তা আঁচ করার ক্ষমতা কারো নেই। সে নিশ্চুপ হয়ে সকলের কথা শুনছে ঠিকই কিন্তু ভাবনা তার অন্যকিছু। একই অবস্থা তাহমিদ, ইবনাত, সাদাফ আর রনির ও। বন্ধুমহলে বাচাল খ্যাত রনিও আজ কেমন চুপচাপ। কারণ অবশ্য আছে গুরুত্বপূর্ণ যা সামনে বসে এই জুনিয়র ছেলে মেয়েগুলোকে জানানো সম্ভব নয়।

অনিলের দিকে তাকিয়ে তনিমা জানালো-

“এই মেয়ে দুটো আমার বন্ধু।”

“কি বলিস তনু? কথা তো হয়নি ওদের কারো সাথে। যা কান্ডটা ঘটিয়েছে মেয়ে দুইটা বাবা রে বাবা! তবে ভালোই করেছে। শয়তান আয়াজকে সোজা করে দিয়েছে ওই শর্ট করে মেয়েটা।” (চিত্রা)

‘চ’ বর্গীয় শব্দ করে অন্যরা। যাতে রীতিমতো ঘাবড়ে যায় চিত্রা। এতোগুলা মানুষের একই সাথে আওয়াজেই হয় এমন।

“আশ্চর্য চিত্রা! এভাবে উচ্চতা বা শারীরিক কোনো কিছু নিয়ে কথা বলাকে বডি শেমিং বলে ডোন্ট ইউ নো! এসব কি ধরনের বিহেভিয়ার?” (নির্জন)

ছেলেটার ব্রাইট চিন্তাভাবনার জন্য মনে মনে বাহবা দিতে ভোলে না ছদ্মবেশী ‘পাঁচ তারকা’।

“আরে আমি ওইভাবে বলিনি। নাম টা মনে নেই তাই ওভাবে বলেছি।” (চিত্রা)

“মীম। মাশফিয়া রহমান মীম।”

অন্যমনস্ক ভাবে বলে উঠলো সাদাফ। নিজের ওপর সবার দৃষ্টি অনুভব করেই সে বলে-

“অন্য মেয়েটা মৌনতা শেখ। ওখানেই ভিসি স্যার বলেছিলেন। খেয়াল করলে সবাই জানতে পারতে। আচ্ছা ওসব বাদ দাও। তনিমা তুমি এটা বলো যে ওরা তোমার বন্ধু মানে? আজই না প্রথম দেখা? আর কথাও তো বলতে দেখলাম না তোমাদের।”

হালকা হাসে তনিমা। তারপর একটা লম্বা শ্বাস ছেড়ে বলে-

“আজ প্রথমবার নয় ভাইয়া। প্রথম দেখা কাল রাতে হয়েছিল। ওই যে অগ্নিকন্যা দেখলেন না মীম! সে বাঁচিয়েছে আমায়। মৌনতা সাথে ছিলো ওর।”

নড়ে উঠতে দেখা যায় অনিল কে। যে এতটা সময় নির্লিপ্ত ভাবে ছিলো সে এবারে আগ্রহের সর্বোচ্চ নিয়ে বলে-

“মানে? কি বলছো তনু? খুলে বলো।”

বন্ধুর এই উৎকন্ঠা আড়াল হয় না কারো। তবুও চুপ থাকা শ্রেয় মনে করে সবাই। এখন কিছু বললে অনিল আবরারের লাথি বসাতে দেরি হবে না। নিজেরা নিজেরা থাকলে তারা আবার তোয়াক্কা করেনা কোনো কিছুর। কিন্তু বাচ্চা বাচ্চা ছেলে মেয়েদের সামনে তো আর সম্মান খোয়ানোর প্রশ্ন ওঠে না।

তনুর মনে শীতলতা ছেয়ে যায় নিজের জন্য মনের মানুষের ব্যাকুলতা অনুভব করে। সন্তুষ্ট চোখে সে অনিলের চোখে তাকায় সাথে সাথে চোখাচোখি হয় দুজনের। ওই ধারালো চোখে তাকিয়ে থাকার ক্ষমতা আছে বুঝি তনুর! সে দৃষ্টি নামিয়ে নেয়। তারপর গাজীপুর রিসোর্ট থেকে শুরু করে কালরাত মীম আর মৌনতা বাঁচানোর সমস্ত ঘটনা খুলে বলে সবাইকে। ‘পাঁচ তারকা’ র আর বুঝতে বাকি থাকে না যে কাল রাতে ওই দুই মেয়ে কি করে ফেরার সময় তাদের সাথে দেখা। অনিলের প্রচুর রাগ হচ্ছে ভিতরে ভিতরে। কিন্তু বাইরে সে নির্বিকার। সাদাফের মীমের প্রতি মুগ্ধতা কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

“ওদের নামে থানায় কে*স করেছো তনু?” (অনিল)

“কে*স করে কি লাভ অনিল ভাই? আইনের প্রতি আমার ভরসা নেই।”

কপাল কুঁচকে যায় তাহমিদের। মেয়েটা চুপচাপ হয়ে বসে থাকে সবসময়। কীসের এতো অনীহা আইন নিয়ে তাই বুঝতে চেষ্টা করে। খুব কষ্ট করে মেকি হেসে বলে-

“তা আইনের প্রতি এতো অনীহার কারণ?”

“তাদের দ্বারা কোনো উপকার পায়নি কখনো তাই হয়তো।” (তনিমা)

“কখনো আইনের দ্বারস্থ হয়েছিলে?” (ইবনাত)

আসলে এরা আইনের সাথে যুক্ত বলে তনুর কথা তাদের বেশ গায়ে লেগেছে। যদিও তারা জানে বর্তমানে অনেক আইনের লোক আছে যাদের আসলেই ভরসা করা যায় না। এবং চারপাশে তাদের সংখ্যাই বেশি।

“তবে ওদের কি এভাবে বিনা শাস্তিতে ছেড়ে দিবি?” (অয়ন)

“মীম যেভাবে পিটিয়েছিলো মনে হয়না এক মাসের আগে আর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাবে।” (তনিমা)
______________________

ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, সন্ধ্যা ৭ টা বেজে পয়ত্রিশ মিনিট।

মেজর জেনারেলের কক্ষে বসে আছে অনিল। ইউনিফর্মড অবস্থায় ছেলেটার সৌন্দর্য যেন কয়েকশত গুণ বেড়ে যায়। রোদে পুড়ে যাওয়া দাগ। শারীরিক অমানবিক পরিশ্রমের চিহ্ন মুখ জুড়ে থাকার পরেও বিন্দুমাত্র কমেনি তার ঔদ্ধত্য পর্যায়ের সৌন্দর্য। ছেলে মানুষ এতটা স্নিগ্ধ হয় নাকি! মেজর জেনারেল হামিদুর রহমান চেয়ারে বসে তার সামনে ল্যাপটপের উপর দক্ষতার সাথে আঙুল চালাতে থাকা মেজর এএকে কে দেখছে। এই মেজরের কাজে তার ব্যক্তিত্বে তিনি মুগ্ধ। শুধু মুগ্ধ বললে ভুল হবে বাড়াবাড়ি রকমের মুগ্ধ।

যশোর থেকে ঢাকা ফেরার আগে যে কে*সটা সলভ করেছে অনিল তারই রিপোর্ট পাঠানোর জন্য অর্ডার এসেছে। তাই সেই কাজের জন্য তাকে ডেকেছে মেজর জেনারেল। সেই রিপোর্টের কাজেই ব্যস্ত এখন অনিল।

অনিল নিজের উপর তার স্যারের নজর অনুভব করে। সে তাও চোখ তুলে তাকায় না। সে জানে এই মানুষটা তাকে ঠিক কতখানি পছন্দ করে। কিন্তু সে সামনে যা করতে যাচ্ছে তার মেয়ের সাথে এতে এই মুগ্ধতার বদলে ওই দুচোখে ঘৃ*ণা থাকবে। হয়তো আর কখনো কথাও বলবে না। অনিলের খারাপ লাগে। এই মানুষটাকে সে সর্বদা নিজের আইডল মেনে এসেছে। তার আদর্শে নিজের মধ্যে কতরকম যে পরিবর্তন ঘটিয়ে তবেই না আজ সাধারণ একটা ছেলে অনিল আবরার খান থেকে এএকে হয়েছে। কিন্তু সেও যে নিরুপায়। তার হাতে যে কিছুই নেই। সবকিছু অনেক আগেই হাত থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে অনিল। মনে মনে বলে-

“অনেক হয়েছে আড়ালে আবডালে। এবার যে তোমার আমার মুখোমুখি হওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে। আর যে বেশি দেরি নেই। be ready to face Anil Abrar Khan. Be ready Mashfiya Rahman Mim. See you soon.”

“যতদিন তুমি ভার্সিটি আছো আমার মেয়েদের একটু দেখে রেখো বাবা।”

কিবোর্ড চালাতে থাকা হাত থামে কিঞ্চিৎ। তারপর আবারও তা পূর্ব রুপে চলছে।

“অবশ্যই স্যার। আপনি না বললেও আমি আপনার মেয়েদের খেয়াল রাখবো।” (অনিল)

“তোমার স্যার হয়ে বলিনি আমি অনিল। আমি একজন ব্যর্থ, অসহায় বাবা হয়ে বলছি।” (হামিদুর রহমান)

“স্যার এসব আপনি কি বলছেন?” (অনিল)

“সে অনেক ঘটনা। ভয়াবহ অতীত। সেসব বাদ দাও।
মৌনতা অনেক শান্তশিষ্ট কিন্তু আমার মীম প্রচন্ড জেদি। প্রচন্ড ডানপিটে তা তো দেখেই নিয়েছো। মেয়েটা কাউকে ভয় পায় না। কারো কথা শোনে না। যা নিজে ভালো বোঝে তাই করে। আমার ফুলের মতো মেয়ের আগুনে রুপান্তরিত হওয়ার জন্য অবশ্য এই আমি দায়ী।

সে যাই হোক অনিল। একটু দেখে রেখো বাবা। এতগুলো বছর পরে দেশে ফিরেছে। আমি আর দূরে যাক তা মানতে পারবো না।”

অনিল এতক্ষণ চুপচাপ শুনছিলো মেজর জেনারেলের কথা। সে ভাবে বাবারা বুঝি এমনই হয়! তার বাবাও তো ব্যতিক্রম নয়। সে আস্বস্ত করে যে সে মীম আর মৌনতার খেয়াল রাখবে।

নিজের মেয়ের জন্য মেজর জেনারেলের আকুলতা দেখে অনিল আরও নিশ্চিত হয় যে সে যা করবে তারপর এই মানুষটা প্রচন্ড আঘাত পাবে মনে। কিন্তু সে ই বা কি করবে? কিইবা করার আছে অনিলের?

আপাতত সমস্ত ভাবনা চিন্তা গুলো দূরে সরিয়ে নিজের কাজে মন দেয় অনিল। যখন সেই পরিস্থিতি হবে তখন না হয় দেখা যাবে।

..
..
চলবে___

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here