প্রভামঞ্জরী☜ #নওরোজ_মীম পর্বঃ ১১

0
23

#প্রভামঞ্জরী☜
#নওরোজ_মীম
পর্বঃ ১১ (কপি করা নিষেধ)
_________________________________

কালো রঙের একটা আর্মি জীপ সাঁই করে ভার্সিটির মেইন গেট দিয়ে ঢুকতে দেখেই হতবাক সবাই। অনিলরাও সেখানে দাঁড়িয়ে। সবাই অবাক হলেও নির্বিকার আর্মির দুই নির্ভীক মানব ক্যাপ্টেন তাহমিদ আর মেজর এএকে ওরফে অনিল আবরার খান। তাদের মুখ দেখে ভেতরের পরিস্থিতি বোঝে কার সাধ্যি!

জীপ ক্যাম্পাসে ঢুকে বিশাল অডিটোরিয়াম এর সামনে থামলেই আর্মি ড্রাইভার নেমে জীপের দরজা খুলে দিলে পুরোদস্তুর আর্মি পোশাকে নেমে আসেন মধ্যবয়সী সিনা টানটান হওয়া মেজর জেনারেল হামিদুর রহমান। পোশাকের ঠিক বুক বরাবর এতো এতো প্রাপ্তির চিহ্নই তার সফলতার জানান দিচ্ছে যেন গলা ফাটিয়ে। তার দৃড়তা, নির্ভীক চলাচল, সিনা টানটান তার অটল ব্যক্তিত্ব মুগ্ধ চোখে চেয়ে চেয়ে দেখছে ক্যাম্পাস ভর্তি ছেলেমেয়ে, শিক্ষকবৃন্দ, সকল স্টাফ। সে পা বাড়াতেই কেন জানি সবাই মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় দুপাশে ভাগ হয়ে জায়গা করে দেয় তাকে। হামিদুর রহমান একবার সবার দিকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে চোখ এনে থামায় তার দুই ছদ্মবেশী অমূল্য রত্ন এক ক্যাপ্টেন আর এক মেজরের দিকে। দুই সেকেন্ডে চোখ সরিয়ে তাকিয়ে দেখেন স্বীয় কন্যাদের দিকে। আহত হয়ে ব্যান্ডেজে মুড়ে চেয়ারে বসা এক ছেলেকে দেখে তার আর বুঝতে বাকি নেই এভাবে জরুরি তলবের।

বুট পরা পায়ে গটগট করে হেঁটে অডিটরিয়ামে বসা ভিসির সামনে গেলে সে উঠে প্রথমে করমর্দন করেন হাসিমুখে। হামিদুর রহমান ভিসিকে উদ্দেশ্য করে বলেন-

“আমাকে হটাৎ জরুরি তলবের নিশ্চয়ই কারণ আছে। জানতে পারি কি মিস্টার ইকবাল?”

চমৎকার হাসেন ইকবাল মাহমুদ নামের অত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি।

“অবশ্যই মিস্টার রহমান। জানানোর জন্যই তো ডেকে পাঠানো। বসুন প্লিজ।” ( সিট দেখিয়ে)

“এখানে মনে হচ্ছে পুরো ইউনিভার্সিটি উপস্থিত মিস্টার ইকবাল। গুরুতর কিছুই বোধহয়।”

“হ্যা মিস্টার রহমান গুরুতরই বটে। আপনার মেয়েদের নিয়ে অভিযোগ উঠেছে মেজর জেনারেল সাহেব।”

প্রত্যেকে বেশ অবাক হয় এতে। মৌনতা আর মীমের দিকে তাকিয়ে দেখে সবাই। বাদ যায়না রনি আর তনিমারাও। কিন্তু সাদাফ, ইবনাত, তাহমিদ আর অনিল নির্বিকার। তাদের মুখে কোনো অবাকতার লেশমাত্র নেই। পেশাদারিত্ব তাদের শিখিয়েছে এমন আচরণ তা পরিষ্কার। কিন্তু এখানে এতো ঘটনার মাঝে কারো আর তাদের নির্বিকার অবস্থার দিকে মনোনিবেশ করার প্রশ্নই আসে না।
এদিকে এই মেয়ে দুটো মেজর জেনারেলের তা শুনেই এতোক্ষণ চোটপাট করতে থাকা আয়াজের গার্ডিয়ান আর বন্ধুদের মুখ চুপসে গিয়েছে। অঢেল টাকা হলেও আয়াজের বাবা মা সহ পুরো দেশ জানে মেজর জেনারেল হামিদুর রহমানের ব্যাপারে। তার কঠোরতার, সততার সঙ্গে পরিচিত সবাই। কিন্তু দমে গেলে তো আর চলবে না তাই আয়াজের মা খ্যাঁক করে ওঠেন।

“আপনার গু*ণ্ডা মেয়েরা আমার ছেলেকে মে*রে কি অবস্থা করেছে দেখতেই পাচ্ছেন হয়তো। মেয়েদের এই কুশিক্ষা দিয়েছেন নিজে একজন আইনের লোক হয়ে ভাবতেই অবাক হচ্ছি আমি।”

দৃশ্যমান রুপে চোয়াল শক্ত হয় হামিদুর রহমানের। মীম জ্বলন্ত চোখে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকলেও মৌনতার চোখ ছলছল করে ওঠে। সে মাথা নামিয়ে নেয়। এভাবে তার জন্য তার বড়বাবার অপমান সে কিছুতেই মানতে নারাজ। এই মানুষটা যে কখনো নিজের মেয়ে আর তার মধ্য পার্থক্য করেনি। সামান্য ড্রাইভারের মেয়ে হিসেবে কখনো ট্রিট হয়নি মৌনতার সুখ নীড়ে। জন্ম থেকেই মীমের সমমানের আচরণ করা হয়েছে তার সাথে। সেও কখনো এদের নিজ থেকে আলাদা ভাবেনি। দুফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে তার। আর এটা দেখেই মনে মনে ক্ষেপে ওঠেন মেজর জেনারেল হামিদুর রহমান। দুনিয়ার সব মানতে রাজি তিনি শুধু নিজ সন্তানদের কষ্ট ছাড়া।

স্ত্রীর আচরণে রাগ হয় আয়াজের বাবা কমরউদ্দিন জোয়ারদারের। কটমট করে তাকান স্ত্রীর দিকে। এতে কিছুটা দমে যান কিন্তু থেমে যান না আয়াজের মা।

নিজের রাগ সংবরণ করা কোনো ব্যাপারই নয় হামিদুর রহমানের কাছে। এবারেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। সে নির্লিপ্ত কণ্ঠে ভিসির দিকে তাকিয়ে বলেন-

“এসব আলোচনা তো আপনার অফিস রুমে হওয়ার কথা মিস্টার ইকবাল। এভাবে পাবলিক প্লেসে…. ”

“আমার ছেলেকে অ*মানুষের মতো মা*রা হয়েছে সবার সামনেই তাই সে ন্যায়বিচার ও পাবে সবার সামনে।”

হামিদুর রহমানের মুখের কথা ছিনিয়ে নিয়েই বলেন আয়াজের মা। এবারেও স্বামীর থেকে অসহ্য দৃষ্টি অনুভব করেন তিনি। কিন্তু তাতে থেমে থাকলেই তো হবে না। তার ছেলেকে মে*রেছে এই মেয়েরা। বিচার তো হবেই।

ভিসি কিছু বলতে নিলেই তাকে সুযোগ না দিয়ে হামিদুর রহমান বলেন-

“তা বেশ মিসেস জোয়ারদার সবার সামনেই না হয় হোক বিচারকাজ।”

সবাই উৎকন্ঠা নিয়ে তাকিয়েই আছে সামনে। হামিদুর রহমান এগিয়ে এসে মেয়েদের সামনে দাঁড়ায়। দুই মেয়ের দিকে নজর রেখেই বলে উঠলো-

“আমার মেয়েদের অপরাধ?”

“দেখছেন না আমার ছেলের কি হাল করেছে? শিক্ষার অভাব হলে যা হয় আরকি। শুনেছি আজই প্রথম এসেছে ভার্সিটি আর এসেই গু*ণ্ডামি শুরু করেছে। এতো বছর নাকি বিদেশে রেখেছিলেন, তা বিদেশে কি এসব অসভ্যতামো শিখিয়ে ফেরত এনেছেন?”

আয়াজের মায়ের কথায় মৌনতার নিচু মস্তক আরও নিচু হয়ে গলদেশে যেয়ে থামে তা। এদিকে সবার আড়ালেই চোয়াল শক্ত হয় মেজর অনিল আর ক্যাপ্টেন তাহমিদের। স্বীয় সম্মানিয় বাবার সমতুল্য মেজর জেনারেলের অসম্মান মানা তাদের পক্ষে খুব একটা সহজ নয়। অনিল নিজেকে সামলে নিলেই তাহমিদ এগিয়ে যেতেই অনিল তাকে বাঁধা দেয়।

এদিকে মেজর জেনারেল হামিদুর রহমান মৌনতার নিচু মাথায় স্নেহের হাত রেখে তা সরিয়ে নিয়ে বলেন-

“আমার মেয়ের মাথা নিচু কেন? সে কি কোনো অন্যায় করেছে?”

মৌনতা মাথা তুলে ভেজা চোখে দুপাশে নেড়ে না বোঝায়।

স্ফীত হেসে আবারও তার মাথায় হাত রাখে হামিদুর রহমান। এদিকে মেজর জেনারেলের এহেন কোমল রুপে হতবাক সবাই। হেসেই হামিদুর রহমান বলেন-

“তবে মাথা নিচু কেন? নজর লোকানো কোনো কাজ আমার মেয়েরা করতে পারেনা এ বিশ্বাস আছে আমার।”

“কিন্তু বড়পাপা তোমাকে এতো কথা শুনতে হচ্ছে যে।?

কাঁদোকাঁদো গলায় বলে মৌনতা। আলতো করে জড়িয়ে নেন হামিদুর রহমান মেয়েকে। তারপর হাসিমুখেই বলেন-

“তোমরা দুজন মাথা উঁচু রাখো। বাকিসব আমি সামলে নিবো।”

মৌনতাকে জড়িয়ে রেখেই মীমের দিকে তাকিয়ে তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন-

“আপনার কিছু বলার আছে আম্মা?”

সেই স্নেহময় দৃষ্টি থেকে নিজের চোখ সরিয়ে আহত আয়াজের দিকে কটমট করে তাকিয়ে বলে মীম-

“আমরা কোনো অন্যায় করিনি। এই ছেলে মৌনতাকে বাজে ভাবে ছুঁয়েছে। আর সেই বাজে ছোঁয়া সহ্য করার মতো সুশিক্ষা নিশ্চয় পাইনি আমরা। তাই কুশিক্ষার প্রয়োগ করেছি।”

আয়াজ আর তার মায়ের চোয়াল ঝুলে যায় এই মেয়ের এমন দৃঢ়তা দেখে। আয়াজের মায়ের কুশিক্ষা কথাটা এভাবে তার গালেই চড় হয়ে লাগবে তা ঘুনাক্ষরেও বোঝেন নি তিনি। মুচকি হাসেন হামিদুর রহমান। মেয়েটা তার একদম যেন তার নিজেরই প্রতিবিম্ব।

বাবার প্রতি অসীম রাগ থাকলেও তার বাবাকে কেউ অপমান করবে আর তা মুখ বুজে সহ্য করবে এতটা কঠোর নয় মীম। নিজে অবহেলা করে শাস্তি দিবে বাবাকে কিন্তু অন্যকেউ কিছু বললে তা মেনে নেবে না সে। কিছুতেই না।

এবার চেয়েরে বসেন হামিদুর রহমান। এরপর শুরু হয় বিচার কাজ। একে একে কয়েকজনের কাছে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সবাই আয়াজের বিপক্ষে কথা বলে। এরপর সিসিটিভি দেখে নিশ্চিত হয় যে দোষ আয়াজের। সবাই জানায় এভাবে ভার্সিটির সব মেয়েকেই বিরক্ত করে আয়াজ আর তার বন্ধুরা। নিজ ছেলের এহেন কান্ডের পরে আর কিছু বলতে পারেন না মিস্টার আর মিসেস জোয়ারদার। তারা যদি জানতো যে মেয়ে দুইটা মেজর জেনারেলের তবে কখনোই এই বিচার কান্ড হতেই দিতেন না। আর না হতো ভরা ক্যাম্পাসে তাদের সম্মানহানি।

আয়াজকে দুই মাসের জন্য সাসপেন্ড করা হয় ভার্সিটি থেকে। সাথে লাস্ট চান্স দেওয়া হয় যে যদি সে চরিত্র ঠিক না করে তবে তাকে রাসটিকেট করা হবে। ক্ষুব্ধ হয় আয়াজের মা। এতোক্ষণ চুপ থাকলেও বিচারের শেষ হতেই সবাই যখন ফিরতে নিবে তখনই আয়াজের মায়ের কথায় থামে সকলে।

“আপনার নিজের মেয়ের সাথে কিছু হলে নাহয় হতো কিন্তু সামান্য এক ড্রাইভারের মেয়ের জন্য এতটা বাড়াবাড়ি না করলেও পারতেন মিস্টার রহমান।”

ফুসে ওঠে মীম। ভদ্রতার সকল পর্দা ঠেলে ছুড়ে মারে দূরে। আঙুল তাক করে চিল্লিয়ে বলে-

“খবরদার মিসেস জোয়ারদার। মুখ সামলে কথা বলুন। নইলে আমি নিজ স্বরুপে ফিরলে আপনি আপনার ছেলে কারো জন্যেই ভালো হবে না। একটু আগে বললেন না বিদেশ ফেরত অভদ্র মেয়ে মেজর জেনারেলের। মেজর জেনারেলের মেয়ে আসলেই বিদেশের রুপে ফিরলে আপনার আর আপনার ছেলের জন্য যে কি ভয়ংকর হবে তা আপনি ভাবতেও পারেন না।”

পাঁচফুট এক ইঞ্চির মেয়ের লাল হয়ে যাওয়া চোখের দিকে তাকিয়ে দৃশ্যমান রুপে ঘাবড়ে যায় মিসেস জোয়ারদার। এদিকে এইটুকু মেয়ের তেজে হতবাক সবাই। কিন্তু মেজর এএকের মনের সন্দেহ যেন পানি পাওয়া চারাগাছের মতো সতেজ হলো। মেজর সাহেব নিজের সন্দেহ ভরা তার গাঢ় ব্রাউন দুচোখে বন্দী করে মেজর জেনারেলের মেয়ে মাশফিয়া রহমান মীম কে।

মৌনতাকে বুকে টেনে নিয়ে হামিদুর রহমান বলেন-

“ঔরসজাত না হলে যে নিজের সন্তান হয়না এটা আমার জানা নেই মিসেস জোয়ারদার। আর না আমি জানতে চাই। মৌনতা শেখ আমার মেয়ে, মেজর জেনারেল হামিদুর রহমানের মেয়ে। জন্ম থেকেই তার দুইজন বাবা। তার একজন বাবা তাকে অন্য বাবার আমানতে রেখে গিয়েছেন। ব্যস আর কিছুই ম্যাটার করে না আর না কখনো করবে। আসছি ভালো থাকবেন।”

মিসেস জোয়ারদার এর কটু কথা মোটেই গায়ে লাগেনি মৌনতার। সে জানে এই বড়পাপা মানুষটার কাছে সে কি! এখানে বাইরের কারো কথায় মন খারাপ করা মানে এই মানুষটার নিখাঁদ ভালোবাসাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। জীবন থাকতে মৌনতা শেখের পক্ষে তা সম্ভব বুঝি! কিন্তু বরাবরের মতো এবারেও মীম আর বড়পাপার উত্তরে তার হৃদয়ে কোমল বাতাস বইতে ভুল হয়নি। উহু মোটেই হয়নি।

নিজের দুই মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে যান তিনি। পিছনে ফেলে যান হতবিহ্বল মানুষদের। আর সন্দেহের উৎপত্তি হওয়া চৌকস মেজর অনিল আবরার খান সাহেবকে।

..
..
চলবে___

(দেরি হওয়ার জন্য দুঃখিত। আসলে এতটা ব্যস্ততা যাচ্ছে যে গল্পটা আগে থেকেই ডায়েরিতে লেখা থাকা সত্ত্বেও তা টাইপ করে পোস্ট করা কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে। তারপর মাঝখানে আবার ‘এক মুঠো শুভ্রতা’ শুরু করেছি। ওই গল্পটাও কন্টিনিউ করবো। আমি চেষ্টা করবো প্রতিনিয়ত গল্প পোস্ট করার। কিন্তু যদি এদিক ওদিক হয়ে যায় তাহলে আমি খুব সরি।

আর গল্পের রিচ দেখি বেশ ভালো ড্যাশবোর্ডে। তবে আপনারা যারা পড়ছেন তারা রিএক্ট কমেন্ট করছেন না কেন? যারা পড়ছেন তাদের নিশ্চয় মোটামুটি ভালো লাগছে বলেই পড়ছেন তবে তা লুকিয়ে কেন? পেজটা ফলো দিলে কি কোনো সমস্যা আছে আপনাদের বুঝতে পারছি না আমি। গল্পের রিচ খারাপ হলে না হয় বুঝতাম যে কারো পছন্দ হয়নি কিন্তু তা তো নয়। তবে…?)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here