#প্রভামঞ্জরী☜
#নওরোজ_মীম
পর্বঃ ১০ (কপি করা নিষেধ)
_____________________________
আজ বেশ তাড়াতাড়িই ভার্সিটি এসেছে অনিল, তাহমিদ। আর আশ্চর্যজনক ভাবে এসেই চমক পেয়েছে নিজ প্রাণপ্রিয় বন্ধুদের দ্বারা। মানে এতদিন যেখানে কর্তব্যের খাতিরে এই ঊনত্রিশ এর কোঠায় এসেও বাচ্চাদের সাথে ক্লাস করতে হচ্ছে অনিল, তাহমিদকে সেখানে ইবনাত শাহরিয়ার, সাদাফ আদনান, কল্লোল হাসান রনি নামের তিন দামড়া খোকা এসেছে স্বইচ্ছায় ক্লাস করতে। মানে প্রত্যেকটা আজব প্রাণী কি অনিলের কপালেই লেখা আছে? ভেবেই হতাশা মিশ্রিত চোখে দামড়া গুলোকে দেখে যাচ্ছে অনিল।
সাদাফ পরিচিত মুখ তাই সে মাথায় ক্যাপ আর মুখে মাস্ক পরে আছে কিন্তু বাকিরা নয়। রনি যদিও বিখ্যাত বিজনেসম্যান হিসেবে যথেষ্ট পরিচিত কিন্তু তাতে তো আর কে*সের কিছু যায় আসে না। তাই তার গোপনীয়তার কিছু নেই। কিন্তু সাদাফ তো সাংবাদিক তাও চক্র খু*নের সাথে সে যেভাবে জড়িত তাতে যে কেউ তাকে দেখে চিনে ফেলবে। ইবনাত তো ফরেনসিক ডাক্তার তাই তার কোনো চিন্তা নেই।
ভার্সিটির মেইন গেটের থেকে ডান দিকে একটু দূরেই রয়েছে একটা বড় নিম গাছ। গাছের চারপাশে গোল করে কংক্রিটের বসার জায়গা করা। জায়গাটার নাম নিমতলা। প্রায়ই ভার্সিটির স্টুডেন্ট দ্বারা পরিপূর্ণ থাকে এখানে। এভাবেই অনিল আর তাহমিদ এখানে বসা শুরু করে সাথে তনিমারাও। তাই আর তেমন কেউ এখানে এখন বসে না তারা ছাড়া। তাহমিদ আর অনিলের এখানে বসার কারণ একে তো মেইন গেটের কাছে জায়গাটা এখান থেকে কে ভার্সিটিতে ঢুকছে কে বের হচ্ছে সব স্পষ্ট দেখা যায়। তাছাড়া এখানে বসলে মোটামুটি পুরো ক্যাম্পাস দেখা যায়। আর নিজেদের তদন্তের জন্য এরচেয়ে ভালো জায়গা আর কোনটা হতে পারে?
নিমতলাতেই বর্তমান অবস্থান করছে ফেম স্টারস। তনিনারা এখনো কেউ এসে পৌঁছায়নি। তাইতো নিজেদের মধ্যে স্বাভাবিক কথাবার্তা বলতে পারছে এরা। এদিকে এদের কান্ডে হতাশ অনিল আর তাহমিদ। তারা চিন্তাও করে নাই তাদের লেজে লেজে এই বন্ধু নামক হনুমান গুলোও হাজির হবে উদ্ভট কান্ড ঘটিয়ে। অনিলের হতাশা বুঝেই এবার মুখ খোলে রনি।
“এমন চেতিস কেন? আমরা কি ভার্সিটি লাইফ উপভোগ করতে পেরেছি বল? সেই ক্যাডেট কলেজ থেকে আলাদা হয়েছি। তাই ভাবলাম সুযোগ যখন একটা এসেছে আর তোরা দুইজন এখানে কিছুদিন স্টুডেন্ট হয়ে থাকবি তাই আমরা আর বাদ যাবো কেন? আমরাও মাস্টার্সে ভর্তি হই। যদিও আমরা সবাই মাস্টার্স শেষ করেছি কিন্তু আলাদা আলাদা ভাবে সবার ক্যারিয়ারের পাশাপাশি। এখন যতদিন কে*স সলভ না হয় ততদিন তো একসাথে থাকা দোষের কিছুনা তাইনা? আর বেশি সময় লাগলে নাহয় সবারই সেকেন্ড মাস্টার্স হয়ে গেল।”
অনিল নির্বিকারে শুনে গেলো। কিছুই বললো না। এদিকে ভাবসাব ভালো না বুঝেই সাদাফ বলে,
“আমিও একমত। দেখনা কেমন ব্যবস্থা নিয়েই এসেছি। কেউই চিনবে না।”
অনিল, তাহমিদ একে অপরের দিকে একবার তাকিয়ে দুজনেই একসাথে বলে ওঠে,
“তুই ও!”
তাহমিদ রনিকে ইশারায় দেখিয়ে বলে,
” এটা না হয় একটা গাধা। নাটকবাজ। আর তোরাও ওর নাটকে অভিনয় করতে চলে এলি?”
এবার তাহমিদের কাঁধে হাত রেখে ইবনাত বলে,
“ধুর থামবি তোরা। আমরা থাকলে কি এমন মহাভারত অশুদ্ধ হবে তোদের শুনি?”
হতাশ হয়ে নিমতালায় বসে অনিল বলে,
“তাহলে আর কি করা। চল তবে বুড়ো বয়সে আবার বাচ্চা হয়ে।”
“বুড়ো হবি তুই ব্যাটা। আমি এখনো ইয়াংম্যান। আর তাছা………”
শেষ করতে পারেনা নিজের কথা রনি। তার আগেই মেইন গেটের দিকে চোখ যায় তার। তারপর বাকিদের উদ্দেশ্যে বলে,
“দেখ দেখ কাল রাতের সেই গুন্ডি দুইটা না? এখানেও?”
ওর কথায় সকলেই তাকালে দেখে কাল রাতেই সেই বাইকার মেয়ে দুটো আজও বাইক নিয়ে ভার্সিটি প্রবেশ করছে।
“আজ তো গুণ্ডি থেকে মেয়ে সেজে এসেছে।”
ইবনাতের কথায় তার দিকে র*ক্তচক্ষু নিয়ে তাকায় সাদাফ। কিন্তু তার সেই নজর কেউ দেখলোই না। এদিকে সাদাফের হার্ট আজকে আবারও একবার বিট করা বন্ধ হয়েছে পাউডার পিংক মেয়েলি পোশাক পরিহিত মেয়েটাকে দেখে। আর অনিল আবরার তো আবারও মেয়েটার খোলা লম্বা চুলে হারিয়েছে নিজ সত্ত্বা।
“ভাই রাতের বেলা ভালো মতো দেখতে পারি নাই। কিন্তু মেয়ে দুটো কিন্তু মাশাল্লাহ অনেক সুন্দর। সাদা টপস পরা মেয়ে তো মনে হচ্ছে কেউ একটু জোরে হ্যান্ডশেক করলেই চামড়া ছিড়ে র*ক্ত বের হবে এতো ফর্সা। আর পিংক মেয়েটা এমন ফর্সা না হলেও নজরকাড়া সৌন্দর্য তার বলতেই হবে।”
রনির বলা কথায় কেউই কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না। কারণ এখানে সবাই জানে এই ছেলের মনে কোনো দোষ নেই। আর না তো সে মেয়ে দুটোর দিকে খারাপ নজর দিয়েছে। কারণ রনি নামক আহাম্মককে এরা রন্ধ্রে রন্ধ্রে চেনে কিনা!
সমস্যা হচ্ছে রনি তার মনে চলা কথা অকপটে বলে দিতে পারে যেকোনো পরিস্থিতিতে। কিন্তু সে এমন শুধু তার এই বন্ধুদের সামনেই। বাইরের দুনিয়ায় বিজনেসম্যান কল্লোল হাসান রনি একজন কথা কম বলা অত্যন্ত রাগী আর গুরুগম্ভীর মানুষ।
_____________________
~কি মামনী নতুন নাকি?
~পথ ছাড়েন ভাইয়া দেরি হচ্ছে। (দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৌনতা।)
~পথ ছাড়ার জন্য কি আর আটকেছি নাকি? নতুন পাখি এসেছে স্বাগতম জানানো লাগবে তো? (বিশ্রী ভাবে হেসে আয়াজ ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা)
এভাবে অসভ্যতামো হচ্ছে দেখে আর পুরো ভার্সিটির সবাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে কেউই এগিয়ে যাচ্ছে না তাই রনি এগিয়ে যেতে গেলেই তার হাত টেনে পাশে বসিয়ে ইশারায় না যেতে বলে অনিল। রনির বিরক্ত লাগলেও বসে থাকে কারণ সে জানে বিনা কারণে তার বন্ধুরা এভাবে চুপচাপ এসব মেনে নেওয়ার মতো না।
এদিকে মৌনতার রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে গিয়েছে। তাও প্রথম দিন ঝামেলা হবে ভেবে কিছু না বলেই পাশ কাটিয়ে চলে যেতে গেলেই আয়াজ তার কোমরে হাত দেয়। সাথে সাথে ঘুরে তাকে থাপ্পড় মারতে যেয়েও হাত থামে মৌনতার।
ঠাস করে ভরা মজলিশে আয়াজের গালে থাপ্পড় মারে কেউ। স্তব্ধ পুরো ক্যাম্পাস। আয়াজ হচ্ছে ইউনিভার্সিটির একটা ত্রাস। তাকে সবাই ভয় পায়। এমন কোনো মেয়ে এই ভার্সিটিতে নেই যার সাথে আয়াজ আর তার গ্যাং অসভ্যতামি না করেছে। কিন্তু কেউই কিছু বলতে পারে না। কারণ কেউ কিছু বললেই তার জীবন ঝালাপালা করে দেয় আয়াজ। আজ প্রথমবার কেউ প্রতিবাদ করায় সবাই স্তব্ধ।
এদিকে মৌনতার কোমরে হাত দেওয়া দেখেই অনিল সহ বাকিরা উঠে এগিয়ে আসতে যেয়েও থেমে দাঁড়িয়ে আছে। কেবলমাত্র গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে তনু আর তার বন্ধুরা। এসেই তারা আয়াজের অসভ্যতামি দেখেছে। কিন্তু পরের ঘটনা সবাইকে যেন স্টাচু করে দিয়েছে।
মীম রাগে থরথর করে কাঁপছে। সে মৌনতাকে এগিয়ে যেতে বলে বাইক রাখতে গিয়েছিল। এসেই দেখে একটা ছেলে মৌনতার কোমরে হাত দিয়েছে। মৌনতা হচ্ছে মীমের সবচেয়ে বড় দূর্বলতা বর্তমানে। মৌনতার ব্যাপার জড়িত মানে মীমের হুশ জ্ঞান কিছুই কাজ করে না সেখানে।
আয়াজ তার গালে হাত দিয়ে কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। তার সাথে মাত্র কি ঘটেছে তা বোঝার চেষ্টায় আছে সে।
~এই এই মেয়ে তোমার সাহস হয় কিভাবে আমার গায়ে হাত দেওয়ার? তুমি জানো আমি কে? এর পরিনতি কি হবে তোমার সাথে কোনো ধারণা আছে তোমার? (চেঁচিয়ে বলে আয়াজ)
~সাহসটা আমার বরাবরই বেশি। আর তুই নিজের পরিচয় জানিস না যে আমার কাছে জিজ্ঞেস করছিস? (শক্ত গলায় বলে মীম)
~এই মেয়ে কি হবে ধারণা আছে তোমার? (আয়াজের বন্ধু)
~ওর কথা বাদ দিয়ে এখন তোদের কি হবে সেটাই ভাব। (মৌনতা)
কেউ উত্তর দেওয়ার আগেই আয়াজ নামের ছেলেটা এবার সরাসরি হাত বাড়ায় মীমের বুকের দিকে। আর বলতে থাকে ‘ওহ রিয়েলি? দেখি তবে কি হয়।’
কিন্তু সে হাত মীমের ত্রিসীমায় পৌঁছানোর আগেই মৌনতা এসে এক লাথি বসায় আয়াজের বুক বরাবর। এদিকে মীমের চোখ জ্বলে ওঠে। মীম ছাড়াও সেখানে উপস্থিত আরও দুইজোড়া চোখে আগুন জ্বলছে যেন।
মীম এবার মাটিতে পড়ে থাকা আয়াজের কোমর থেকে এক টানে বেল্ট খুলে হাতে পেঁচিয়ে নিতে থাকে। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই বেল্ট দিয়ে মারতে থাকে আয়াজকে। ওর গ্যাং বাঁধা দিতে গেলে ওদের সামনে মৌনতা এসে ব্যবস্থা করে। মারতে মারতে হুশ খুইয়ে ফেলে মীম। এতো মারছে যে র*ক্ত র*ক্ত হয়ে গিয়েছে আয়াজের পুরো শরীর। প্রতিবাদের সুযোগ তো সে সেই কখন হারিয়েছে। এদিকে আয়াজ আর আঘাত সহ্য করতে না পেরে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছে। তাও থামাথামির নাম নেই মীমের। এতো কিছু হয়ে যাচ্ছে তবুও কেউ বাঁধা দিচ্ছে না। টিচাররা পর্যন্ত দেখছে দাঁড়িয়ে। কেউই এগিয়ে এলো না আয়াজকে বাঁচাতে। এতদিন সবাই শুধু অত্যচারিত হয়েছে আয়াজের হাতে। তাই তাকে শাস্তি পেতে দেখে কারোই খারাপ লাগছে না।
অনিলের চোখে বিস্ময়। একটা মেয়ে এভাবে মারপিট করে? ডিফেন্সের কেউ তো এভাবে প্রাণঘাতী আঘাত করে না। এই মেয়ে তো মেরে ফেলেও থামবে বলে মনে হচ্ছে না। মেয়েটার চোখ মুখের অবস্থাও ভালো নয়। মেয়েটা তো পুরো একটা সাই*কো। কি যেন বিড়বিড় করে চলেছে। কি বলছে তা শোনার জন্য মীমের দিকে এগিয়ে যায় অনিল। কিন্তু যা শোনে তাতে চৌম্বকের সাথে লোহার ন্যায় স্তব্ধ হয় অনিল আবরার খান।
..
..
চলবে____

