প্রভামঞ্জরী☜ #নওরোজ_মীম পর্বঃ ০৯

0
29

#প্রভামঞ্জরী☜
#নওরোজ_মীম
পর্বঃ ০৯ (কপি করা নিষেধ)
_____________________________

শেষরাতের দিকে অনিল আর তার বন্ধুরা বের হয়েছে ফাঁকা রাস্তায় হাটার জন্য। এটা তাদের অনেক পুরনো অভ্যাস। যেদিন তারা পাঁচতারকা মিলে একসাথে সময় কাটায় সেদিন শেষরাতে বের হয়।
সেই যে স্কুলে একসাথে হয়েছিলো পাঁচটা নক্ষত্র, সেখানে স্কুলের টিচাররাই নাম দিয়েছিলেন এই গ্রুপের ‘পাঁচতারকা’ গ্রুপ। পাঁচটা ছেলে পাঁচটা তারাই তো। আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল পাঁচটা নক্ষত্র। যেমন পড়াশুনোয়, তেমন ব্যবহার, তেমন সৌন্দর্য, তেমন কাজ। যাদের নামে আজ অব্দি কোনো খারাপ রেকর্ড নেই। তার মানে এই না যে পাঁচতারকা গ্রুপ একদম সাধু-সন্ন্যাসী লেভেলের। তারা একসাথে হলে সবার উপরে যেন জ্বিন ভর করে এই পরিমাণে দুষ্ট তারা। পার্থক্য শুধু এটাই যে অন্যরা কিছু করলেই সবসময় ধরা খেয়েছে আর পাঁচতারকা দুনিয়ার সবরকমের দুষ্টুমি করেও কখনো ধরা পড়েনি। তাদের নিজেদের অবশ্য তাদের গ্রুপের জন্য আলাদা নাম আছে “ফেম স্টারস”।

পুরনো দিনের কথা বলে হাসতে হাসতে একজন অন্যজনকে ধাক্কা দিয়ে ফাঁকা রাস্তায় দৌড়াদৌড়ি করছে পাঁচটা লম্বাচওড়া যুবক। এমনকি এখন রোবট মেজরটার মুখেও নির্মল হাসির দেখা মিলছে। দেখে বোঝার উপায় নেই যে এই মেজরকে তার পুরো ডিপার্টমেন্ট ভয়ে কাঁপে। অপরাধীর ক্যান্টনমেন্ট এর সেলে গেলে অপরাধীরা ভয়ে চুপসে যায়। একেই হয়তো বলে নিখাঁদ বন্ধুত্ব। তাদের হাসির শব্দ তাদেরই কানে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে এই নির্জনতায়।

হাসতে হাসতেই সতর্ক হয় মেজরটার কান। হাত উঠিয়ে সবাইকে চুপ করার নির্দেশ দিলেই সবাই চুপ হয়। কারণ মেজর অনিলের বিচক্ষণতার বিপক্ষে কোনো রায় থাকতেই পারে না কারো কাছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই মেজর এএকের বিচক্ষণতার পরিচয় দিতেই যেনো নির্জনতা চূর্ণ করে আগমন ঘটে দুইটা বাইকের। সাই করে স্বাভাবিক গতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এগিয়ে আসছে দুইটা বাইক। কপাল কুঁচকে সেদিকেই চেয়ে অনিল। বাইক দুইটা যখন তাদের সামনে থেকে যাচ্ছে অনিল চেঁচিয়ে বলে,

“হেই স্টপ রাইট নাও।”

একটু সামনে এগিয়েই থেমে যায় বাইক দুইটা। ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে ফিরে এতো গুলো ছেলেকে একসাথে দেখে হেলমেট এর ভিতরেই কপালে ভাজ পড়ে মীমের। অনিল এগিয়ে এসে বলে,

“নামুন।”

বিরক্ত হয়ে মীম বাইক স্ট্যান্ড করে। তারপর অনিল থেকে একটু দূরে দাঁড় করানো বাইকের উপর বসেই নিজের হেলমেট খুলে তা এক হাতে কোমরের সাথে ধরে নেমে দাঁড়িয়ে যায়।

কালো প্যান্ট সাথে কালো টি-শার্ট এর উপর কালো জ্যাকেট। হাতে কালো রাইডিং গ্লাভস পায়ে কালো নাইকির জুতো আর বাসন্তী, কালো মিক্স হেলমেট। বাইকের রঙও কালো বাসন্তী মিক্স।
আরেকটা বাইকের দিকে তাকালে দেখা যায় কালো আর নীল রঙের বাইকের সাথে দ্বিতীয় রাইডারের হেলমেটও ম্যাচিং করা। হেলমেট খুলতেই সবাই দেখে যে দুইটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে তাদের সামনে। তারা ভাবতেও পারেনি যে এতো রাতে দুইটা মেয়ে তাও এই সাঙ্ঘাতিক স্পিডে নির্জন রাস্তায় বাইক নিয়ে ঘোরাফেরা করতে পারে। তাদের মনের ভাব যেন তাদের চেহারা দেখেই বুঝতে পারছে মীম।

বাসন্তী আর কালো বাইকের মেয়েটা হেলমেট খুললে তার চুলগুলো কোমর ছাড়িয়ে অনেকটা নিচে পড়ে। অনিল দেখে পুরোদস্তুর রাইডারস পোশাক পরিহিত এক কেশবতীকে।
মীম তাদের থেকে কিছুটা সামনে থাকায় মুখ দেখে নাই কেউ। মীম যখন নেমে পিছনে অনিলদের দিকে ফেরে তখন হুট করেই দমকা হাওয়ায় মীমের সামনে মুখের উপর পড়ে থাকা ছোট ছোট চুলগুলো উড়ে তার মুখ পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়। তাকে দেখার সাথে সাথেই হার্টবিট থেমে যায় সাদাফের।
সাদাফ খেয়াল করে মেয়েটির গায়ের রঙ শ্যামলা নয় আবার একেবারে ফর্সাও নয়। মাঝামাঝি বলা চলে। উচ্চতা পাঁচ ফুট বা খুব বেশি হলে পাঁচ ফুট এক ইঞ্চি হবে। চিকন রিনরিনে স্বাস্থ্যের অধিকারী কিন্তু চোখে রয়েছে দৃঢ়তা যেন কোনো কিছুই তাকে টলাতে পারবে না। মেয়েটা যখন সেই চোখে তাকায় সাদাফ আদনান সেই চোখে নিজের ধ্বংস দেখে ফেলে অনায়াসে।

এদিকে মীম এখনো কপালে ভাজ ফেলে দাঁড়িয়ে আছে। সে বুঝতে পারছে না লোকগুলো তাদের থামলো কেন?
তার কালো কুচকুচে চোখের মণি সে সরাসরি স্থাপন করে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ডার্ক ব্রাউন চোখের মালিক অনিল আবরার খানের চোখে। চোখে চোখেই যেন যুদ্ধের ঘোষণা করা হচ্ছে এখানে।

অনিলের দৃষ্টি অনড়। সেই অনড় দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে আছে মীমের কোমর ছাড়িয়ে পড়া চুলের দিকে।

এদিকে মীম মেজাজ হারিয়ে কর্কশ গলায় বলে,

“কারা আপনারা? এভাবে এতো রাতে আমাদের থামানোর মানে কি?”

মীমের ঝাঁজালো কণ্ঠে ধ্যান ভাঙে অনিলের। সে এতটা সময় মেয়েটার চুলের দিকে তাকিয়ে ছিলো? নিজের কাজে নিজেই বিরক্ত হয় সে। আসলে অনিলের মায়ের চুল এমন লম্বা ছিলো। মায়ের চুল আঁচড়ে দেওয়া, লম্বা চুলে বেণি করে দেওয়া, কতশত হেয়ার এক্সেসরিজ যে কিনেছে অনিল জীবনে তার মায়ের জন্য সে হিসাব নেই। ছোট থেকেই অনিল ছিলো তার মায়ের লম্বা চুলের পাগল। তাই মীমের চুল দেখে তার মায়ের কথা মনে পড়ায় চুপ হয়ে গিয়েছে সে। এদিকে প্রিয় বন্ধুর মনোভাব কিছুটা বুঝতে পারে তাহমিদ।

পরিস্থিতি সামলাতে তাহমিদ বলে,

“এতো রাতে দুইটা মেয়ে এতো স্পিডে বাইক চালাচ্ছে দেখে ভেবেছিলাম কোনো বিপদ হয়েছে হয়তো। তাই আপনাদের সাহায্য করার জন্য…. ”

তাহমিদকে কথা শেষ করতে না দিয়েই মীম বলে,

“এতো রাতে দুইটা মেয়েকে মাঝ রাস্তায় আটকানোয় যে আপনাদের কোনো খারাপ উদ্দেশ্য নেই তার কি নিশ্চয়তা?”

মেজাজ খারাপ লাগে অনিলের। কিন্তু তার চেহারা নির্বিকার। অঢেল ধৈর্যের পরীক্ষা সে দিয়ে তবেই আজ মেজর হয়েছে। সেখানে এই মেয়ে তো কিছুই না। কিন্তু তার মন মেয়েটাকে বেয়াদব উপাধি দিতে ভুললো না।

অনিল চুপ হয়ে থাকলেও সাদাফ এই পর্যায়ে এগিয়ে এসে বলে,

“মিস আমাদের দেখে কি আপনার তেমন ছেলে মনে হয়? আপনারা আইন ভঙ্গ করেছেন সেইজন্যই আপনাদের উপর নজর পড়েছে।”

মুখ ভেঙচি কাটে মীম। উত্তর দেয়,

“চেহারা দেখে মানুষ জাজ করা ছেড়ে দিয়েছি। তাছাড়া আপনারা কি পুলিশের লোক?”

কিছুতেই নিজেদের আসল পরিচয় রিভিল করবে না অনিল আর তাহমিদ। তাহমিদ বলে,

“না ম্যাডাম। আমরা সামান্য ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্ট। পুলিশের সাথে আমাদের দূর দূরান্ত পর্যন্ত কোনো সম্পর্ক নেই।”

এবার পিছন থেকে মৌনতা এসে বলে,

“তাহলে মাঝরাতে মানুষকে এভাবে হ্যারাসমেন্ট করছেন কেন? আশ্চর্য!”

বলেই মীমের হাত ধরে সেখান থেকে চলে যায় ওদেরকে বকতে বকতে। অনিলরাও ফিরতে থাকে নিজেদের গন্তব্যে।
______________________

বাসায় ফিরে ওই মাঝরাতেই জালাল সাহেবকে কল করে তনু। বাবার সাথে কথা বলেই নিজেকে শান্ত করে বিছানায় শুয়ে পড়ে ভাবতে থাকে তার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা।

গাজীপুরের সেই রিসোর্টে পরশ এ্যাপ্রোচ করে তনুকে। তনু নাকচ করে যা ইগো হার্ট করে পরশের। সেদিনই তনু তার বাবা মায়ের সাথে ঢাকা ব্যাক করে। পরশ তনু সম্পর্কে সব খোঁজ খবর নিয়ে ফাঁদ পাতে। আর সেই ফাঁদে পা রাখে বোকা তনু। জালাল সাহেবের এক্সিডেন্টের খবর দিলে কিছু না ভেবেই বেরিয়ে যায় তনু। আর বাড় থেকে বের হলেই তাকে জোর করে গাড়িতে তোলে পরশ। কিছুদূর গেলেই পরশ আর ওর বন্ধুদের নেশায় থাকার সুযোগ নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে পালানোর চেষ্টা করে তনু। কিন্তু বেশি দূর যাওয়ার আগেই তাকে ধরে আবারও গাড়িতে তোলার সময় ওই মেয়ে দুটো তাকে বাঁচিয়ে নেয়। আজ যদি মৌনতা আর মীম নামের মেয়ে দুইটা না থাকতো তবে হয়তো আত্মহত্যা করা লাগতো তনুর। মেয়ে দুটো এসে তার মহসিন হয়ে তাকে বাঁচিয়ে নিলো।

কথাগুলো ভাবতে ভাবতে বালিশে মুখ গুজে ফুপিয়ে ওঠে তনু। তার কিছু হয়ে গেলে তার বাবা মায়ের কি হতো? এ জীবনে বুঝি তার আর নিজের অনিল ভাইকে পাওয়া হতো না! ইশ! এতো আফসোস থেকে তাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে মেয়ে দুটো। এদের জন্য প্রয়োজনে তনু যা কিছু করবে যদি সুযোগ পায়। এসব নিজের মনে মনে বিড়বিড় করতে করতে চোখ দুটো লেগে যায় তনুর।
________________

পাউডার পিঙ্ক কালারের একটা লং কামিজ সাথে সাদা প্যান্ট পরে রেডি হয় মীম। লম্বা চুল গুলো খোলা রেখে সামনে থেকে ক্লিপ দিয়ে আটকে রাখা। কানে ছোট্ট সাদা দুল, হাতে পিঙ্ক বেল্টের একটা লেডিস ওয়াচ, পায়ে একটা পিঙ্ক স্লিপার গলায় একটা চিকন চেন। সেই চেনে একটা লকেট ঝুলানো যেই লকেট দেখলেই সে কয়েকবছর পিছিয়ে পড়ে প্রতিবার। আজও যার ব্যতিক্রম হয়নি। লকেট টা হাতে নিয়ে তাতে একটা চুমু খেয়ে সে ড্রেসের ভিতরে তা লুকিয়ে ফেলে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে।

আজ সে মৌনতার সাথে নতুন ভার্সিটি যাবে। মৌনতার রুমে যেয়ে দেখে যে সে একটা সাদা টপস এর সাথে সাদা প্যান্ট পরে রেডি। মৌনতার মাঝারি আকারের চুলগুলো বেণি করে একপাশে এনে রাখা। মৌনতা পূর্ণ দৃষ্টিতে দেখে তার বান্ধবীকে। কি সুন্দর লাগছে মেয়েটাকে। যেনো পাউডার পিঙ্ক কালারটা এই মেয়ের জন্যেই তৈরি। মৌনতা টকটকে ফর্সা হওয়ার পরেও সব কালারে তাকে ভালো লাগে না এদিকে মীম যা পরে তা দেখলেই মনে হয় শুধুমাত্র ওর জন্যেই সেই রঙ।

দুজনেই বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়ে ভার্সিটির উদ্দেশ্যে। কিন্তু আজ আর রেস করেনি কেউ। ভদ্র মেয়েদের মতো আস্তে ধীরে চালিয়ে যাচ্ছে।

..
..
..
চলবে__

.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here