প্রভামঞ্জরী☜ #নওরোজ_মীম পর্বঃ ০৬

0
25

#প্রভামঞ্জরী☜
#নওরোজ_মীম
পর্বঃ ০৬ (কপি করা নিষেধ)
_______________________________

“আবারও একটা খু*ন! একই স্টাইল একই ব্যক্তি আর একই মোটিভ। একের পর এক খু*ন। সেনাবাহিনীর সকল পরিকল্পনাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে খু*নী অনায়াসে তার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এবার তো মনে হচ্ছে খু*নীও মজা পেয়ে গিয়েছে এই মা*র্ডা*র মা*র্ডা*র খেলায়। সেনাবাহিনীর অন্যতম সফল এক সেনাকর্তা মেজর এএকের দায়িত্বে এই কে*স হস্তান্তর হয়েছে জেনে খু*নী লা*শে*র বস্তার উপর একটা নোট লিখে রেখেছে।

‘পুলিশের সাথে এই খেলায় বোর হচ্ছিলাম। এবার টক্কর দেওয়ার মতো কাউকে পেলাম। তোমার সাথে খেলা ভালোই জমবে মেজর। দুই পক্ষ সমান সমান না হলে খেলার আসল মজাই নষ্ট হয়ে যায়। তুমি আমাকে ধরার জন্য দৌঁড়াও মেজর, কিন্তু আমি তোমার ধরা ছোঁয়ার বাইরে।’

এই নোটের সাথে রয়েছে লা*শে*র কাঁটা মিডল ফিঙ্গার খানা। তবে কি আসলেই এই খু*নী সেনাবাহিনীর হাতের নাগালে নেই? সয়ং মেজর এএকে কে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। এবার দেখার পালা সেনাবাহিনীর পরবর্তী পদক্ষেপ কি হয়? তারা কিভাবে এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করে? কিভাবে মেজর এএকে পালটা জবাব দেবেন?

ক্যামেরায় আশিকের সাথে আমি সাদিফ আদনান। মোহাম্মদপুর ঘটনাস্থল, ঢাকা।

“ভাই আমরা সেই প্রথম থেকেই এই কে*সে*র সব খবরাখবর সংগ্রহ করে আসতেছি। আপনার কি মনে হয় এই কে*সে*র ব্যাপারে?”

ক্যামেরা বন্ধ করে নিজেদের কোম্পানির বরাদ্দকৃত গাড়ির দিকে যেতে যেতে সাদাফকে প্রশ্ন করে আশিক।

কালবিলম্ব না করেই জবাব দেয় সাদাফ-

“খু*নী একটা সা*ই*কো আশিক। না হলে কেউ এভাবে জীবন্ত মানুষকে টু*ক*রো টু*ক*রো করে কা*ট*তে পারে না। সম্ভব নয় একদম। এছাড়া আর কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। অন্তত আমি বুঝতে পারছি না।”

আশিক মানে না সাদাফের কথা। সে প্রতিবাদে বলে-

“আপনি যদি এই বলেন তাহলে কি মানা যায় ভাই? এর আগে কতো কে*স পুলিশ সমাধান করার আগেই আপনি আমাকে বলতেন আসল ঘটনা। আর কে*স সলভ হয়ে বের হতো তাই-ই যা আপনি আগেই বলে রাখতেন।”

আশিকের বাচ্চামিতে গাল ভরে হাসে সাদাফ। তারপর বলে-

“সেগুলো আর এই কে*স সমপূর্ন আলাদা আশিক। এই কে*সে*র ব্যাপারে যেখানে সেনাবাহিনী এখনো নিশ্চুপ সেখানে আমি একজন ক্রা*ই*ম রিপোর্টার হয়ে কিভাবে কিছু বলি বলোতো?”

গাড়ির কাছে এসে আশিক ভিতরে ঢুকে গেলো। সাদাফ নিচু হয়ে বলে-

“তুমি অফিসে চলে যাও আশিক। আজ আমার হাফ বেলা অফ।”
________________________

ফরেনসিক বিভাগে চোয়াল শক্ত করে হাতদুটো পিছনে রেখে সিনা টানটান করে দাঁড়িয়ে আছে মেজর এএকে। পাশে একই ভঙ্গিতে ক্যাপ্টেন তাহমিদ। তাদের মধ্যে পার্থক্য বলতে গেলে তাহমিদ রেগে চোখমুখ লাল করে দাঁড়িয়ে আছে আর মেজর নির্লিপ্ত। তাকে দেখে বোঝার উপায় নেই তার ভিতরে কিসের কি ধরনের অনুভূতি হচ্ছে।

ফরেনসিক ডাক্তার ইবনাত শাহরিয়ার নিজের কাজ শেষ করে একটা ফাইল হাতে এগিয়ে এসে তাদের সামনে দাঁড়ায়। কোনো প্রকার ভঙ্গিমা ছাড়াই বলে উঠলো-

“সেম ঘটনা। প্রথমে অজ্ঞান করে তারপর জীবন্ত কে*টে*ছে। তবে এবারের ভি*ক্টি*ম একটা মেয়ে। সাতাশ কিংবা তার সামান্য বেশি হবে বয়সে। ডিএনএ রিপোর্ট আমাদের ক্রি*মি*না*ল ডাটাবেজের সাথে মিলিয়ে জানা গেছে মেয়েটার নামে ক্রি*মি*না*ল রেকর্ড আছে। নিজের আঠারো বছরেই নে*শা করে রাস্তায় গাড়ি চালিয়ে এক পথশিশুকে মে*রে ফেলে। কিন্তু সেই বাচ্চার কেউ না থাকায় কে*স হয়নি। পুলিশ ধরে নিয়ে গেলেও উপযুক্ত সাক্ষী প্রমাণ আর মেয়ের বাবার টাকার জোরে বিনা শাস্তিতে বাড়ি ফেরে সেই মেয়ে। ও হ্যা মেয়েটির নাম অপর্ণা। আর গতবারের ভি*ক্টি*ম রনি নামের ছেলেটার সর্বশেষ গার্লফ্রেন্ড।”

ইবনাতের সাথে সৌজন্যতার শেষ করে ফরেনসিক ছেড়ে বেরিয়ে যায় ক্যাপ্টেন এবং মেজর। রাত হয়েছে বেশ। দিনটা শুক্রবার থাকায় বিকালে ঢাকা জুড়ে বিস্তর ট্রাফিক পার করে ক্যান্টনমেন্ট থেকে ঘটনাস্থল, ঘটনাস্থল থেকে নাইট ক্লাব তারপর ফরেনসিক সারাদিনই দৌঁড়ঝাপের উপর তারা। এখন ডিউটি শেষ। বাসায় যাওয়ার পালা। তাহমিদের রাগ হয়তো কিছুটা কমেছে। না হলে সারাদিন প্রয়োজনের অতিরিক্ত একটা কথাও যার মুখ থেকে বের হয় নি। সে হুট করেই মেজরকে বলে উঠলো-

“আমার বাসায় চল। ওরাও আসবে।”

কোনো কথা না বলে মাথা নাড়িয়ে হ্যা বোধক উত্তর করে মেজর। তাহমিদ গাড়ি তার বাড়ির পথে ঘুরিয়ে নেয়।
______________________

মোহাম্মদপুর পাওয়া লা*শে*র খবর দেখছে টিভির সামনে বসে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হামিদুর রহমান। দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন তিনি। কি হচ্ছে দেশে কিভাবেই বা এর সমাধান হবে বুঝে উঠতে পারছেন না তিনি।

ড্রয়িং রুমে টিভির সামনে বসেই দেখতে পেলেন তার মেয়ে রেডি হয়ে বাইরে যাচ্ছে। রাতের বেলা নিজের মেয়েকে উদ্ভট পোশাকে বাইরে যেতে দেখেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। সে হুংকার ছেড়ে মেয়েকে ডেকে উঠলো,

“মীম….”

বাবার ডাকে রহস্যময় হেসে তার দিকে ঘোরে মীম।

“আরে মিস্টার রহমান। কেউ কোথাও যাওয়ার জন্য বের হলে তাকে পিছু ডাকতে নেই জানেন না দেখছি।”

মেয়ের বেয়াদবিতে রাগ হয় বিগ্রেডিয়ার সাহেব এর। কিন্তু মেয়ের বেলায় সে অত্যাধিক নমনীয়। নিজের পিতৃতান্ত্রিক চরিত্র ধরে রেখেই সে বলে,

“এই রাতের বেলা এধরণের পোশাকে কোথায় যাচ্ছো তুমি? দেশের এই অবস্থা আর তুমি….”

তাকে শেষ করতে না দিয়েই উচ্চসরে হেসে ওঠে মীম।

“ওহ-হো মিস্টার রহমান, আপনি দেখি আমার জন্য চিন্তিত? আপনার এতো সময় আছে বুঝি?”

“মীম…..!”

“আর হ্যা আমার বন্ধুর জন্মদিন। সেই পার্টিতে যাচ্ছি। রাতে ফিরবো না। আপনি আজ রাতে শান্তিতে ঘুমাতে পারবেন।”

বাবাকে আর কিছু বলতে না দিয়েই গটগট করে বেরিয়ে যায় মীম। হামিদুর রহমান একজন অত্যন্ত কঠোর প্রকৃতির মানুষ। না হলে হয়তো মেয়ের এসব রোজকার আচরণে তার চোখে জলকণা দেখা যেতো। কিন্তু তিনি তেমন কিছুই করেন না। ফোন হাতে নিয়ে কাউকে কল দেন। ওপাশ থেকে রিসিভ হলে তিনি বলেন,

“মীম বাইরে যাচ্ছে। ছায়ার মতো তার পিছনে থাকবে। কিন্তু সে যেন কিছু বুঝতে না পারে। আমার মেয়ের যেনো বিন্দুমাত্র ক্ষতি না হয়।”

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হামিদুর রহমান ভাবেন,
তার মেয়ে মাশফিয়া রহমান মীম। তৃতীয় বর্ষে পড়ালেখা করছে। আর এই যে তার এমন আচরণ এর পেছনে যে সে নিজেই দায়ী। নয়তো মেয়ে তো তার এমন ছিলো না। মীমের মতো ভদ্র, চুপচাপ মেয়ে সে তার জীবনে কখনো দেখে নাই। অথচ সে নিজের কাজের মাধ্যমে তিন বছর আগে মেয়েটাকে পুরোপুরি পালটে দিয়েছে। এখন মীম নিজেকে যে পর্যায়ে খারাপ বানিয়েছে তেমন অভদ্র মেয়েও তিনি দ্বিতীয়টি দেখেন নি। কখনো কি তার মেয়েটা আবার আগের মতো হবে না? কখনো কি আবারও তাকে বাবা বলে ডাকবে না? মেয়ের মুখে বাবার ডাক শোনেন না তিন বছর পেরিয়েছে। আর কি কখনো শুনতে পারবেন না? তার জীবনের আর এই একটাই চাওয়া। তার মেয়ে তাকে ক্ষমা করুক। তার মৃ*ত্যু*র আগে তাকে অন্তত একবার আবারও বাবা বলে ডাকুক।

দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনি বারান্দায় যেয়ে রকিং চেয়ারে নিজের শক্তপোক্ত শরীর এলিয়ে দিলেন। আজ রাতে আর তার ঘুম হবে না। মেয়েটা বাইরে যে।
_______________________________

“আরে আসুন আসুন মেজর সাহেব। সাথে দেখি ক্যাপ্টেন সাহেব ও আছেন। আসুন আসুন আপনাদের জন্যই তো অপেক্ষা করছিলাম এই অধমেরা।”

তাহমিদের বাসায় ঢুকতে ঢুকতে বন্ধুদের এহেন খোঁচা বেশ মুখ বুজে সহ্য করেই সোজা তাহমিদের রুমে ঢুকে বিকট শব্দ করে দরজা বন্ধ করে দেয় মেজর। এদিকে মেজরের মেজাজের হাল দেখে সোফায় বসা রনি যেন আকাশ থেকে পড়লো।

কল্লোল হাসান রনি। দেশের প্রথম সারির শিল্পপতিদের একজন ছিলেন তার বাবা। উত্তরাধিকার সূত্রে সেই বিজনেস এখন তার হাতে আর সে বেশ সুনামের সাথেই তা চালিয়ে যাচ্ছে। গত চার মাস ধরে সে ব্যবসার কাজে নরওয়ে ছিলো। দেশের খবর জানলেও এতটা গুরুত্বপূর্ণ তা তার জানা ছিলো না। তার দুই সেনাকর্মকর্তা বন্ধু এখন ঢাকায় পোস্টিং এ খবর পেয়েই মুলত তার সকল কাজ শেষ করে জলদি ফিরেছে সে দেশে। না হলে হয়তো আরও কয়েকমাস তাকে সেখানেই থাকতে হতো।

রনির চেহারার অবস্থা দেখে তাকে ঘটে যাওয়া সকল ঘটনা খুলে বললো ইবনাত আর সাদাফ। সবকিছু শুনে বন্ধুদের এহেন অবস্থার কারণ বেশ ভালো করেই বুঝতে পারছে রনি। সে আর কথা বাড়ায় না। অপেক্ষা করে।

পাঁচ বন্ধু তারা সেই ছোটবেলা থেকেই। সেই যে যার যার মায়ের হাত ধরে স্কুল যাওয়া থেকে বন্ধুত্বের সূচনা তা এখনো বিদ্যমান। প্রয়োজনে যে এই পাঁচজন একে অপরের জন্য নির্দিধায় নিজের প্রা*ণ দিয়ে দিবে তা কেউ মুখে না বললেও জানে পাঁচজনেই।

এদিকে মেজরকে নিজের রুম দখল করতে দেখে তাহমিদ অন্যরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বের হয় একটা কালো ট্রাউজার আর সাদা টিশার্ট পরে। সে বসে বাকি তিন বন্ধুর সাথে। তাদের কথার মাঝেই খট করে খুলে যায় তাহমিদের ঘরের দরজা। সাদা ট্রাউজার সাদা টি-শার্ট পরে গলায় তোয়ালে ঝুলিয়ে তা দিয়েই ভেজা মাথা মুছতে মুছতে এগিয়ে আসছে মেজর এএকে। বাকিরা হা করে তাকিয়ে আছে। এই ছেলে এতো রোদে পোড়ে এতো পরিশ্রম করে তাও তার রুপের ঝলক যেন কমেই না কিছুতেই। তারা তার বন্ধু হয়েও প্রতিবার এভাবেই তাঁকিয়ে থাকে এর পানে। তাহলে বেচারি তনিমার কি দোষ বুঝে উঠতে পারে না তাহমিদ।

মাথা মোছা শেষ করে তোয়ালে চেয়ারের উপর হালকা ভাবে মেলে দিয়ে সোফার সামনে রাখা বিন ব্যাগে বসে বন্ধুদের দিকে তাঁকায় মেজর। এগুলোর এমন হতবিহ্বল মুখের অবস্থা দেখে বলে,

“ভূত দেখার মতো তাঁকিয়ে আছিস কেন তোরা?”

“তোকে দেখে আমরাই নজর সরাতে পারি না ভাই। সেখানে তনিমার দোষ কিভাবে দেই বল তো মেজর এএকে ওরফে অনিল আবরার খান”

AAK = Anil Abrar Khan.
.

..
..
চলবে____

[নিজের নামের একটা চরিত্র বের করেছি মানে সে যে নায়িকা এটা ভাবার কিছুই নেই। আমি মোটেও তনিমার চরিত্র সাইড ক্যারেক্টর করিনি। এতে আমি তনিমার চরিত্র নিয়েই সবচেয়ে বেশি ভাঙা গড়া করেছি। কিন্তু নতুন চরিত্রটাও বেশ ইন্টারেসটিং তাই তার নাম নিজের নামে দিয়েছি।

এবার হয়তো আপনাদের অনিল ভাই আর মেজর এএকের মধ্যে সংশয় দূর হয়েছে। পরের পর্বে অনিল কেন ভার্সিটিতে তাও ক্লিয়ার হয়ে যাবে।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here