প্রভামঞ্জরী #নওরোজ_মীম পর্বঃ ৩২

0
17

#প্রভামঞ্জরী
#নওরোজ_মীম
পর্বঃ ৩২ (কপি করা নিষেধ)
_____________________________________

মাথার উপর জ্বলছে হলুদ আলোর একটা কম পাওয়ারের লাইট। লাইটের চারপাশে আবার বেস্টনী দেওয়া। সেই বেস্টনীর ছায়া পড়েছে অপরপ্রান্তে বসে সাথে আর্মি ইউনিফর্ম পরিহিত লোকটার উপর। তাইতো তার চেহারা দেখা যাচ্ছে না। লোকটা হয়তো বুঝতে পারছে রাসেলের মনোভাব। তাইতো হেলান দিয়ে বসা থেকে টেবিলের দিকে কিছুটা এগিয়ে আলোর নিচে নিজের মুখ নিয়ে এসে বসে।

এদিকে আর্মি ইউনিফর্ম পরে বসা মেজরের মুখ দেখেই রাসেলের মুখ থেকে না চাইতেও বেরিয়ে যায়,

“অ..অ..অনিল আবরার!”

মেজরের ঠোঁট ছুইয়ে গেল অদেখা অদ্ভুত এক হাসি। সে হাতের পি*স্ত*ল টেবিলের উপর রেখে তা গোল গোল ঘুরিয়েই যাচ্ছে। অথচ তার বাজপাখির মতো নজর সামনে বসা রাসেলের দিকে।

“আপনি ভার্সিটির স্টুডেন্ট ছদ্মবেশ নিয়েছিলেন?”

“কি করবো বল! তোদের পাকনামির জন্য এখন বুড়ো বয়সে আবারও লেখাপড়া করতে হচ্ছে। শান্তি দিলি না রে তোরা শান্তি দিলি না।”

শেষের লাইন এমন ভাবে বলে যেন তার জীবনে খুব দুঃখ। মেজরের কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ক্যাপ্টেন তাহমিদ মনে মনেই মেজরের প্রশংসা করে বলে,

“অনিল আবরার খান অভিনয়ে তুই সেরা রে, সেরা।”

অথচ তার মনে মনে বলা কথাগুলো পৌঁছাতে পারে না কারো কাছে।

রাসেল মূলত অনিল আবরারকে চেনে। দুই একবার তার সাথে দেখাও হয়েছে ভার্সিটির স্টুডেন্ট হিসেবে। কিন্তু এখন এই মূহুর্তে তার সামনে বসা আর্মি ইউনিফর্ম পরিহিত অনিল আবরারকে সে চেনেনা। ভার্সিটির অনিলের সাথে এই অনিলের কোন মিল নেই। ভার্সিটির অনিলও গম্ভীর, খুব একটা হাসে না। খুব একটা কি মোটেই হাসে না। কথাও মেপে মেপে বলে। তবে এই অনিলের মতো নয়। এই অনিলের চেহারা দেখেই রাসেলের প্রাণ যায় যায় অবস্থা। এই অনিলের চোখের দিকে তাকালে যেন সয়ং নিজের মৃত্যু দেখতে পাচ্ছে রাসেল। সে ভয়ে আবারও শুকনো ঢোক গিলে গলা ভেজানোর চেষ্টা করে। কিন হায়! তা সম্ভব হয় না। টেবিলের আড়ালে রাখা তার হাত উঠাতে চাচ্ছে সে টেবিলের উপর কিন্তু তার হাত পা সহ পুরো বডি যেন বরফ জমে গিয়েছে। কি যে অসহায় লাগছে তার!
কম পাওয়ারের লাইটের ক্ষীণ আলোয় অনিলের ইউনিফর্ম এর বুকের দিকে তাকায় রাসেল। সেখানে ইংরেজি অক্ষরে জ্বলজ্বল করছে যে লেখা তা দেখেই অস্ফুট স্বরে রাসেল বলে উঠলো

‘মেজর এএকে’।

অনিলের পি*স্ত*ল ঘোরানো হাত থামে টেবিলের উপর। সে এবার ভণিতা ছাড়াই বলে,

“রাসেল সাহেব তোমার জম বসে আছে তোমার সামনে। বাঁচতে চাইলে মুখ খোল।”

“ক..কিসের কথা ব..বলছেন? আ..আমি কিছু জানি ন..না।”

অনিল জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে দেখে রাসেলকে। তারপর জোরে তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তাহমিদকে উদ্দেশ্য করে বলে,

“ক্যাপ্টেন তাহমিদ অতিথি আপ্যায়ন ভুলে গিয়েছেন আপনি? আপনার মেহমান মুখে তালা ঝুলিয়ে রেখেছে। অথচ আপনি জানতেন এই তালা মেজরের হাতে খুলতে হলে আপনার মেহমান আর আগের মতো থাকবে না।”

মেজরের হুংকারে কেঁপে ওঠে রাসেল। এদিকে তাহমিদ দুই কদম এগোলে তাকে দেখেও চমকে ওঠে রাসেল। মানে এই ব্যক্তিও কোন স্টুডেন্ট না। এও আর্মি!
তাহমিদ বলে,

“স্যার আমি যথেষ্ট আপ্যায়ন করেছি। কিন্তু মেহমান তাও মুখ খোলেনি। সে মেজর এএকের আপ্যায়ন ডিজার্ভ করে। তাই আমি আপনার অপেক্ষায় ছিলাম।”

“তবে তাকে মেজরের অতিথিশালায় স্বাগতম।”

রাসেল আরও ভয়ানক ভাবে কেঁপে ওঠে। কিন্তু সে কিছুতেই মুখ খুলবে না বলে প্রতিজ্ঞা করে।

এদিকে অনিল তেমন কিছুই করেনা শুধু একটা ডাণ্ডা দিয়ে রাসেলের শরীরের মাংসাশী জায়গা গুলোতে ইচ্ছামত পিটাই। কিন্তু এমনভাবে কাজটা করে যেন শরীরের কোথাও কেঁটে না যায়। আবার হাড়েও মারে না। তারপর ওই ভাবেই বরফ ঠান্ডা পানিতে রাসেলকে নামিয়ে তাকে আটকে রাখে। রাসেল প্রচন্ড চেঁচামেচি করেও, বারবার মাফ চেয়েও, মেজরের হাত পা ধরেও মুক্তি পায় না। রাসেলকে পানিতে নামানোর ঘন্টাখানেক পরেই সে রাজি হয় স্বীকারোক্তি দেওয়ার জন্য। হাসি ফোটে সেনা টিমের মুখে। অথচ তখনও নির্বিকার মেজর।
.
.
.
.
রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকার চারপাশে। রোডলাইটের আলো ছাড়া একদম গ্রামের মতো মনে হচ্ছে সবকিছু। অথচ ঢাকা শহরের অলিগলিতে মানুষ আর চায়ের দোকানের টুংটাং শব্দ আসছে ভেসে। ইলেক্ট্রিসিটি চলে গিয়েছে মিনিট পাঁচ হবে। এই অন্ধকারে তনু তার বন্ধুদের সাথে-অয়ন, নির্জন লিপি মিলে পান্থপথের ফুটপাতে হেটে যাচ্ছে বসুন্ধরার দিকে। ওদের সাথে অবশ্য চিত্রা নেই। কিন্তু আরও চারজন ওদের বয়সী ছেলে-মেয়ে ও রয়েছে। যাদের সাথে বেশ সাবলীল ভাবেই কথা বলে যাচ্ছে ওরা। এমনকি স্বল্পভাষী তনুও তাদের সাথে কথা বলছে। দেখে মনে হয় তারাও বহু পুরনো বন্ধু এদের।
এমন সময়ে জেনারেটর জ্বলে ওঠে আবারও আলোকিত হয় চারপাশে। হুট করেই আলো চোখে পড়াতে চোখমুখ কুঁচকে নেয় তনু। অথচ চোখ খোলা রাখলে বুঝতো ওদের পিছন থেকে কি অবলীলায় এক ছায়ামূর্তি সরে গেল। যা এতক্ষণ ধরে তনু ও তার বন্ধুদের অনুসরণ করছিলো। কি জানি কি উদ্দেশ্য তাদের! কি জন্য নির্ভেজাল চলাচল করা তনুদের নজরে রেখেছে কেউ! যা থেকে সম্পূর্ণ অজ্ঞ এরা।
.
.
.
.

অনিল বাড়ি ফেরে তখন রাত ১১:৫০ মিনিট। সে দ্রুত পায়ে নিজের রুমে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দরজার সামনে এসেই পা থামিয়ে দেয়। আসলে দিতে বাধ্য হয়েছে। কারণ তার রুমের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে তার বন্ধু গুলো, তার নিজের মায়ের পেটের বোন আর মৌনতা বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এদের উদ্দেশ্য ভালো করেই জানে অনিল। কিন্তু অবাক হয়েছে তাহমিদকেও এদের সাথে দেখে। তার থেকে দশমিনিট আগে বেরিয়েছে তাহমিদ ক্যান্টনমেন্ট থেকে। অন্যসময় একসাথে বের হয়। আজকের কারণ তবে তাকে শায়েস্তা করা।

“কি চাই?”

কিছু জানে না এমন ভাবেই প্রশ্ন করে অনিল। এদিকে এর চাব দেখেই ভ্রুকুটি করে সামনে থাকা সবাই।

“টাকা ফেলো মামা। না হলে আজ আর ঘরে যেতে পারছো না।”

রনির কৌতুক পূর্ণ কথায় আলতো হাসি ছেয়ে যায় অনিলের মুখে। কিন্তু কেউই তা বুঝতে সক্ষম হয় না।

“নিজের ঘরে যাওয়ার জন্য তোদের টাকা দিতে হবে কেন?”

অনিলের কথায় ঘোর প্রতিবাদ করে বলে আরিবা,

“তোমার জন্য ভিতরে উপহার আছে ভাইয়া। সেই উপহারের আয়োজন করেছি আমরা অনেক কষ্ট করে। এর মূল্য দিবে না? এতো কৃপণ তো আমার ভাই নয়।”

এবার হেসেই ফেলে অনিল। বলে,

“কত চাই।”

“ত্রিশ ঝাড়। আমাদের ভাগে পাঁচ করে পড়বে তবে।

সাদাফের কথায় সবাই সহমত প্রকাশ করে। অনিল একবার ঘড়িতে চোখ বুলিয়ে নেয়। ১১:৫৪ বেজে গিয়েছে অলরেডি। তার হাতে একদম সময় নেই। সে তর্ক না করে পকেট থেকে ওয়ালেট বের করে ত্রিশ হাজার টাকা বের করে ওদের হাতে দেয়। মনে মনে ভাবে ভাগ্যিস এসব ধারণা করে আগেই ক্যাশ উঠিয়ে এনেছে আসার সময়। না হলে এখন সময় নষ্ট হতো।

এদিকে টাকা পেয়ে সবাই সুরসুর করে কেঁটে পড়ে। থেকে যায় রনি। সে অনিলের কানের কাছে যেয়ে বলে,

” ঊনত্রিশ বছরের সিঙ্গেল জীবনের সমাপ্তি হয়ে বিবাহিত জীবনের শুভেচ্ছা বন্ধু। শুভ বাসর।”

অনিল কটমট করে তাকালেই হাসতে হাসতে দৌড়ে পালায় রনি। এদিকে রনি যেতেই দরজা খুলে নিজের ঘরে প্রবেশ করে অনিল।
রুমের লাইট বন্ধ করে জিরো লাইট জ্বালিয়ে দেওয়া। সেই আবছা আলোতেই দেখে নেয় সে তার ঘরে ফুলের বাগান বানিয়ে ফেলেছে তার বিচ্ছু বন্ধুরা। সাদা বেড কভারের উপর লাল গোলাপের বন্যা করে দিয়েছে। পুরো ফ্লোরেও বেলুন আর গোলাপ দিয়ে ভরা। তার ঘরের গাড় নীল রঙের দেয়ালের যে সাইড আছে সেখানে বেলী ফুলের লম্বা লম্বা মালা বানিয়ে এমন ভাবে ঝুলিয়েছে যা দেখেই চোখ ধাঁধিয়ে যায়। নীল আর সাদার মিশেলে তা এক অবর্ণনীয় সুন্দর লাগছে। কিন্তু এতো কিছু যার জন্য সে কই? অনিল আবরার খানের বউ কই? যার থাকা সবচেয়ে বেশি বাঞ্চনীয় সেই মিসিং! এতো সৌন্দর্য ফিকে মনে হয় অনিলের কাছে মূহুর্তেই।

তার ব্যালকনির দরজা খোলা দেখে সেদিকে এগিয়ে যায় অনিল। দরজা দিয়ে ব্যালকনিতে পা রেখেই ৪৪০ ভোল্টের ঝটকা খাওয়ার মতো ঝটকা খায় অনিল আবরারের খোলসে আবৃত হৃদয়। তার সামনে সে যা দেখছে এর বর্ণনা তার দ্বারা সম্ভব নয়। এ জীবনে এর থেকে আকর্ষণীয়, এর থেকে সুন্দর কিছু দেখেছে বলে অনিল মনে করতে পারলো না।
.

..
..
..
..
চলবে____

.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here