প্রভামঞ্জরী #নওরোজ_মীম পর্বঃ ৪৬

0
19

#প্রভামঞ্জরী
#নওরোজ_মীম
পর্বঃ ৪৬ (কপি করা নিষেধ)
_____________________________________

“এখন কেমন লাগছে তোমার?”

“….”

“এবার তোমাকে ঢাকায় নিয়ে যাবো। নিজেকে মনে মনে রেডি করে নাও।”

এবার এই কথা শুনে বালিশে গোজা মুখ আস্তে আস্তে সাদাফের দিকে তোলে। সাদাফ তাকিয়েই ছিল। এলোমেলো চুলে মুখ কিছুটা ঢেকে গেলেও ওই মুখের মালিককে চিনতে সময় লাগেনি সাদাফের। নিজের চোখকে বিশ্বাস কর‍তে পারছে না সে।
কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে বলে,

“তু..তুরিন ত..তুই?”

“…..”

“তুই বেঁচে আছিস? তাহলে এই ক’বছর কোথায় ছিলি?”

প্রথমবারের মতো মুখ খুলে কিছু বলে তুরিন।

“চলে এসেছিলাম চট্টগ্রাম। তোমাদের থেকে দূরে।”

এই কোথা কর্ণকুহরে যাওয়ার সাথে সাথেই প্রচুর রেগে যায় সাদাফ। সে রেগেমেগেই বলে,

“তুই জানিস তোর জন্য আমার বন্ধুটার কি অবস্থা হয়েছে? তোকে এমন পাগলের মতো ভালোবাসে তাও সব ফেলে তুই চলে গেলি?”

মাথা নিচু করে নেয় এবার তুরিন। এই প্রশ্নের উপর নেই তার কাছে। কারণ এই প্রশ্নের উত্তর সে দিতে চায় না। যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। যা যাওয়ার তা চলেই গিয়েছে। এখন অতীত আঁকড়ে ধরে বাঁচতে পারবে না ইবনাত আর না পারবে সে।

“আর তুই এই হাসপাতালে এই কেবিনে কি করছিস? এখানে তো আমার ব…..”

বাক্য শেষ করার আগেই মাথায় কিছু আসে আর সাদাফ ইন্সট্যান্ট সতর্ক চোখে তাকায় তুরিনের দিকে। তুরিন এবার ছলছল চোখে চেয়ে আছে তার দিকে। মাথা ঘুরে ওঠে সাদাফের। দু’পা পিছিয়ে যেতে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়ায়। শরীর কাঁপছে তার।
তুরিন আধশোয়া হয়ে সবই দেখছে। তার তো জানা ছিলো এমন দিন আসবে। সাদাফ যেদিন জানবে সেদিন কিভাবে কি সামলাবে ভেবেই তো কত রাত নির্ঘুম পার করেছে সে। এরা পাঁচ বন্ধু একে অন্যের জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত। ভুলবশত ও এরা একে অন্যকে কষ্ট দেওয়ার ভাবনাও আনে না মনে। সেখানে ইবনাতের সাথে এমন সিরিয়াস সম্পর্ক থাকার পরেও সাদাফ যে দূর্ঘটনার স্বীকার হয়ে তুরিনকে বিয়ে করেছে এটা জেনে কিছুতেই স্বাভাবিক থাকবে না সাদাফ আদনান।
সাদাফের অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে নিজের ছলছল দৃষ্টির মিলন ঘটিয়ে ভাঙা ভাঙা কন্ঠে কিছু বলতে চায় তুরিন। কিন্তু হায় তার কণ্ঠনালী ভেদ করে একটা শব্দও বের হচ্ছে না। শব্দেরাও আজ তার সাথে বেঈমানী করছে কি নিদারুণ ভাবে। হাজার চেষ্টা করেও কিছুই বলতে না পেরে এবার কেঁদেই ফেলে। উপর নিচ মাথা ঝাকিয়ে হ্যা বোঝায়। সাদাফকে বোঝানোর চেষ্টা করে যে সে যা ভাবছে তাই সত্যি। সেই সাদাফ আদনানের সহধর্মিণী।
সাদাফ এবার দেয়াল ঘেঁষে বসেই পড়ে মেঝেতে। মাথা নিচু করে মেঝেতেই চোখ নিবদ্ধ রেখেছে। কি ভাবছে বুঝলো না তুরিন। শুধু ওভাবেই বসে থাকতে দেখলো।

এক মিনিট, দুই মিনিট, পাঁচ মিনিট, দশ মিনিট, ত্রিশ মিনিট করে করে পাক্কা চল্লিশ মিনিট পর মেঝেতে নিবদ্ধ দৃষ্টি উপরে তোলে সাদাফ। সোজা তাকায় তুরিনের দিকে। তুরিন আগে থেকেই তাকিয়ে থাকায় চোখে চোখ মেলে। অথচ সর্বদা শান্ত থাকা, হাসিখুশি থাকা সাদাফের শক্ত চোয়াল, র*ক্তবর্ণ চোখ দেখেই ভয় পেয়ে যায় তুরিন। তাহমিদের ছোট বেলার বন্ধু সাদাফ। ভাইয়ের বন্ধু হওয়ায় খুব ভালো করেই তাকে চেনে তুরিন। তার স্বভাব সম্পর্কে ও ভালো করেই অবগত। এমন সাদাফের সাথে তার কখনো সাক্ষাৎ হয় নি। কখোনোই না।

“বিয়ে যে সিচুয়েশনে হয়েছিল আমি জানতাম না যে সেই মেয়ে তুই ছিলি। জানলে প্রাণ থাকতে এমন আমি কিছুতেই করতাম না ভালো করেই জানিস তুই।
তুই কি জানতিস তুরিন?”

এমন প্রশ্ন করবে বুঝতে পারেনি তুরিন। তাই হকচকিয়ে যায়। কিন্তু প্রশ্ন যখন করেছে তাই এর উত্তর সে দেয়,

“বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর বরের নাম দেখে কিছুটা সন্দেহ হয়েছিল। কিন্তু যখন তুমি নতুন ফ্ল্যাটে নিয়ে গেলে তখন তোমাকে দেখেছিলাম। আর তখনই নিশ্চিত হই।”

“সেইজন্যই কি নিজেকে লুকিয়ে রেখেছিস আমার থেকে?”

“এছাড়া আর কোন উপায় ছিলো না যে।”

এরপরে আর দুজনের আর কোন কথা হয়নি। তুরিনের কানে শুধু সাদাফের আফসোস বাণী পৌঁছালো, ‘এ আমি কি করলাম! এ আমি কি করলাম! ইবনাতকে ফেস করবো কিভাবে! তাহমিদকে কি জবাব দেবো!’

এসব বিড়বিড় করতে করতেই কেবিন ছেড়ে বেরিয়ে যায় সাদাফ। আর কেবিনে একা অসহায় ভাবে পড়ে থাকে তুরিন। যার জীবনের কোন কূলকিনারা নেই। ভবিষ্যতে কি হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। ভাগ্য এখন উপরওয়ালার হাতে। সে যা চাইবেন তাই হবে।
.
.
.
.
রাত আটটা বেজে ঊনত্রিশ মিনিট।
ফুলবাগ রিসোর্ট, গাজীপুর।

বেইজ শার্টের সাথে কালো ফরমাল প্যান্ট ইন করে পরে। কোমরে দামী বেল্ট। পায়ে কালো সুজ। শার্টের গোটানো হাতার নিচে বাদামী বেল্টের ঘড়ি শোভা পাচ্ছে। ক্লিন সেভ করা মুখে পেশাদারি দক্ষতা যেন চিৎকার করে জানান দিচ্ছে সবাইকে।
কিন্তু ফুলবাগ রিসোর্ট এর বেজমেন্টে থাকা এই পার্টি সেন্টারে মাতাল হয়ে থাকা পুরুষ রমণী গণের চোখে তাহমিদের এই পেশাদারিত্ব চেহারার জায়গায় মনে হচ্ছে অত্যন্ত নিপুণ রুচিসম্মত কোন যুবক। যাকে তারা এক কথায় হ্যান্ডসাম, ড্যাশিং উপাধি দিতে দিতে মুখে ফেনা তুলে ফেলছে।

এখানকার অবস্থা নিজ চোখে না দেখলে হয়তো তাহমিদ কখনোই বিশ্বাস করতে পারতো না যে এমন একটা স্বনামধন্য পারিবারিক রিসোর্ট এর বেজমেন্টে এমন মাদকের কারখানা থাকতে পারে। এখানে সুশীল সমাজের মানুষেরা এভাবে নেশায় বুদ হয়ে পড়ে থাকে। ভুলে যায় দিন দুনিয়া। এখানেই তাদের ব্যাভিচার, যৌ*না*চার চলে কি অবিচারে। স্যামুয়েল রোজারিওর সাথে বন্ধুত্বের নাটক, তার ব্রেসলেটের সাথে মাইক্রো চিফ ক্যামেরা না সেট করে দিলে এতো সহজেই এসব ধরতে পারতো না সে। আর না পারতো স্বয়ং কুখ্যাত খু*নী, মা*দ*ক ব্যবসায়ী, নারী পাচারকারী, ধ*র্ষ*ক শামসু মিয়ার খোঁজ। যে দেশ-বিদেশে বিখ্যাত ব্যবসায়ী স্যামুয়েল রোজারিও এই পরিচয়ে বেঁচে আছে। মূলত আইনের চোখ ফাঁকি দিতেই দুনিয়ার চোখে শামসু মিয়াকে মে*রে সে হয়েছে বিদেশি স্যামুয়েল রোজারিও। কিন্তু মেজর এএকে কিভাবে যে এসব আগে থেকেই আন্দাজ করেছে তা জানা নেই ক্যাপ্টেনের। তবে মেজর এএকে যে এভাবে শতভাগ সঠিক হবে তা সে কল্পনাও করেনি।

এএকের প্ল্যান মোতাবেক মিশন পরিচালনা করেই আজ দুপুরে স্যামুয়েল রোজারিও ওরফে শামসু মিয়াকে গ্রেফতার করে ঢাকা সেনানিবাসে পাঠিয়েছে ক্যাপ্টেন তাহমিদ। এবার তার থেকে পাওয়া তথ্য মতেই এই বেজমেন্টে এসেছে। সঙ্গে এনেছে পুরো টীম।
এখানকার সবাইকে গ্রেফতার করে, মা*দ*ক সহ অন্যান্য খারাপ সবকিছু উদ্ধার করে বেরিয়ে যাওয়ার সময় কানে কেমন জানি গোঙানির শব্দ পায় তাহমিদ। সেই শব্দের সূত্রে এগিয়ে বেজমেন্টের শেষ মাথার একটা রুমে ঢুকে দেখে একটা মেয়েকে হাত পা মুখ বেঁধে রেখেছে খাটের ওপর। মেয়েটার পরনে না থাকার মতোই সামান্য কাপড়। সাথে সাথেই সেই দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নেয় তাহমিদ সহ অন্যান্য অফিসাররা। একজন লেডি সৈনিক ডেকে মেয়েটিকে উদ্ধার করা হয়। তারপর গায়ের পোশাক পরিবর্তন করে সে আসে তাহমিদের সামনে। এবার তাহমিদ তাকালে দেখে মেয়েটা একদম বাচ্চা একটা মেয়ে। আর মেয়েটা ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপছে।

“দেখুন ভয় পাবেন না। আমি একজন আর্মি ক্যাপ্টেন। আপনি এখন নিরাপদ।”

মেয়েটাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে বিশ্বাস করেনি। তাই তাহমিদ পকেট থেকে তার আইডি কার্ড বের করে মেয়েটার হাতে দেয়। নিজ চোখে দেখেই মেয়েটা একটু যেনো আস্বস্ত হয়। এবার মনে হলো তার ভীতু ভাবটাও একটু কমেছে। হয়তো সেনাবাহিনীর সাথে নিজেকে নিরাপদ ভাবছে তাই।

“আমি রুমা। বাবা মায়ের সাথে ট্রেনে করে ময়মনসিংহ যাচ্ছিলাম আমাদের গ্রামের বাড়ি। তবে কি হলো জানিনা ট্রেনে হুট করেই সব আলো নিভে গেলো। রাত হওয়ায় আর কিছুই দেখা যাচ্ছিলো না। তারপর মনে হলো কেউ আমার মুখে কিছু কাপড়ের মতো চেপে ধরে। তারপর যখন চোখ খুললাম তখন দেখি আমাকে এখানে কারা নিয়ে এসেছে। আর উদ্ভব পোশাক পরিয়ে রেখেছে। জ্ঞান ফেরার পরে কান্নাকাটি করছিলাম তাই অনেক মেরেছে। আর জোর করে ওভাবে বেঁধে রেখেছিল।”

বলতে বলতেই মেয়েটা ঠোঁট উল্টে কেঁদে ফেলে। তাহমিদের মাথায় আগুন ধরে যায়। যদি আজ সে না আসতো তাহলে এই বাচ্চা মেয়ের সাথে যে কি হতো ভেবেই তার রাগ তরতর করে বাড়তে থাকে।
কি যেন ভেবে জিজ্ঞেস করে,

“বয়স কত?”

“স..সতেরো।”

“বাড়ির ঠিকানা মনে আছে?অথবা বাবা মায়ের ফোন নাম্বার? ”

রুমা মাথা নাড়িয়ে হ্যা বলে। তারপর তাকে নিয়েই ক্যাপ্টেন তাহমিদ আর তার টীম বেরিয়ে পড়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে। এখানের কাজ শেষ আপাতত।
.
.
.
.
মীমকে নিয়ে মামা বাড়ি এসেছে অনিল। তার মামারা মামীরা, মামাতো ভাই বোন গুলোর সে কি আনন্দ তাদের পেয়ে! দুই মামী গিয়েছে রান্নাঘরে হরেকরকম রান্নার জন্য। বড় মামা মাত্রই বের হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ের জন্য। না গেলেই নয়। পার্টি অফিসে যেতেই হলো। ছোট মামাকে দুই মামী ধরে বেঁধে পাঠিয়েছে বাজারে।
ড্রয়িংরুমে এখন শুধু ছোটরাই। মীমকে তো একপ্রকার ঘিরেই বসে রয়েছে তার তিন মামাতো বোন। দুইজন জমজ গল্প আর কথা। ওরা মাত্র ক্লাস সেভেনে পড়ে। আর আরেকজন তাদের বড় বোন কবিতা। কবিতা এবার এসএসসি দিবে। এদিকে কলেজ পড়ুয়া মামাতো ভাই শেহজাদ ও রয়েছে নতুন ভাবীর পাশেই। শুধু আলাদা সোফায় বসে বিচ্ছুগুলোর কান্ডকারখানা দেখছে অনিল আর শাহমীর। তারা বড় আর গম্ভীর হওয়ায় তাদের কাছে কেউই ঘেঁষছে না। অথচ ভাবী তাদের চুপচাপ তাতে কোনো সমস্যাই নেই। বিচ্ছুগুলো নিজেদের মধ্যেই কি কি যেন বলছে আর খিলখিলিয়ে হাসছে। মীম তাদের সাথে না হাসলেও সে যে বেশ উপভোগ করছে বিচ্ছুগুলোর সঙ্গ তা দেখেই বুঝতে পারছে অনিল। তাইতো এখনো কিছুটা অসুস্থ থাকার পরেও তাকে রুমে রেস্ট করতে না পাঠিয়ে আনন্দ করার সুযোগ দিচ্ছে।

..
..
..
..
চলবে____

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here