বিপরীত_মেরুর_টানে #আরিবা_নাওশীন #পর্ব_৩৪

0
13

#বিপরীত_মেরুর_টানে
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_৩৪

আরাভ এক মুহূর্তও দেরি করল না। হাতের দামী ল্যাপটপ, কোটি টাকার ব্লু-চিপের কোডিং সব ওখানেই পড়ে রইল। সে ঝড়ের বেগে কেবিন থেকে বেরিয়ে নিজের গাড়িতে স্টার্ট দিল। ওর বুকের ভেতরটা আজ কোনো প্রসেসরের স্পিডে নয়, বরং এক আদিম ভয়ে কাঁপছে।

সে পা-গলের মতো গাড়ি ছুটিয়ে ফাহিমের গাড়ির পিছু নিল। সামনেই হাইওয়ের মোড়। আরাভ দূর থেকে দেখতে পেল ফাহিমের সাদা গাড়িটা। সে চিৎকার করে বলতে চাইল, “জেরি! দাঁড়াও! আমি আসছি! আমি ভুল করেছি জেরি!”

কিন্তু ভাগ্যের লিখন হয়তো আজ অন্য কোনো কালিতে লেখা ছিল।

কিন্তু ও খেয়াল করল না, রাস্তার উল্টো পাশ থেকে একটা দানবীয় দশ চাকার ট্রাক কোনো হেডলাইট না জ্বালিয়ে সরাসরি ফাহিমের গাড়িটার দিকে ধেয়ে আসছে। ওটা কোনো সাধারণ দুর্ঘটনা ছিল না ওটা ছিল ড্রাগনের শেষ এবং নৃশংসতম চাল। ড্রাগন জানত আরাভকে ভাঙতে হলে ওর আত্মাকে গুঁড়িয়ে দিতে হবে।

আরাভের চোখের সামনে ট্রাকটা গিয়ে সজোরে ধাক্কা মা-রল ফাহিমের গাড়ির ড্রাইভ সাইডে। গাড়িটা বাতাসের তোড়ে খড়কুটোর মতো কয়েকটা পল্টি খেয়ে রাস্তার পাশের ঢালু খাদে গিয়ে পড়ল।

সময়টা যেন থমকে গেল। গাড়িটা যখন উল্টে যাচ্ছিল, রিন্নি জানালার কাঁচের ওপাশে আরাভকে দেখতে পেল। ঠিক সেই এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশের জন্য ওদের দুজনার চোখাচোখি হলো। রিন্নির চোখে কোনো অভিযোগ ছিল না, ছিল এক আকাশ অভিমান আর বুকফাটানো বিদায়ের হাহাকার। ওর ঠোঁট দুটো নড়ে উঠল, যেন ও বলতে চাইল, “বলা হলো না স্যার… আমাদের ছোট্ট আইকিউ (IQ) জিরোটা আর মনে হয় এল না।”

গাড়ির ভেতরে ফাহিম যখন বুঝতে পারল আজরাইল দরজায় দাঁড়িয়ে, ও নিজের কথা এক মুহূর্তও ভাবল না। নিজের শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে ও রিন্নিকে জাপটে ধরল, যাতে ট্রাকের ধাক্কাটা ওর ভাবীর গায়ে সরাসরি না লাগে। ও রিন্নিকে নিজের বুকের নিচে চাপা দিয়ে চিৎকার করে বলল, “ভাবী! কিছু হতে দেব না আপনার! আমি আছি তো!” রিন্নির পেটের দিকে তাকিয়ে অস্পষ্ট স্বরে বলল,” চিন্তা করো না চ্যাম, চাচ্চু আছে!”

একটা বিকট ধাতব শব্দ… আর সব নিস্তব্ধ।

আরাভের চোখের সামনে সবটা হলো। সে দেখল ফাহিমের গাড়িটা কয়েকটা পল্টি খেয়ে রাস্তার পাশের খাদে গিয়ে পড়ল।

“জেরিইইই! ফাহিমমম!” আরাভের গলার শিরা ছিঁড়ে এক বুকফাটানো চিৎকার বের হয়ে এল। সে ব্রেক কষার সময়টুকুও পেল না। গাড়ি থেকে নেমেই সে পা-গলের মতো খাদের দিকে দৌড়ে গেল। ওর পা কাঁপছে, চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। চশমাটা রাস্তার কোনো এক কোনায় ছিটকে পড়ে রাইল।

নিচে তাকিয়ে দেখল সাদা গাড়িটা এখন লোহার দলা হয়ে গেছে।

ধুলো আর ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হাইওয়ের সেই বাঁকটা মুহূর্তেই এক নরককুণ্ডে পরিণত হলো। ট্রাকের সেই প্রচণ্ড ধাক্কার শব্দটা যেন বাতাসের বুক চিরে বহুদূর পর্যন্ত প্রতিধ্বনিত হলো। রাস্তার দুপাশে থাকা পথচারী আর স্থানীয় লোকজন ভয়ে আর্তনাদ করে উঠল।

মুহূর্তের মধ্যে একদল মানুষ হন্তদন্ত হয়ে দুর্ঘটনাস্থলের দিকে দৌড়াতে লাগল। কারো মুখে চিৎকার, “ওরে আল্লাহ! গাড়িটা তো গুঁড়ো হয়ে গেল!”, কেউবা বলছে, “বাঁঁচাও! ভেতরে মানুষ আছে!”

আরাভের পা জোড়া যেন নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই। ওর চোখের সামনে দাউদাউ করে জ্বলছে ট্রাকের তেলের ট্যাঙ্কার, আর খাদের গভীরে পড়ে আছে ওর কলিজার টুকরো দুটো।

আরাভ কোনো সিঁড়ি বা ঢালু পথ খুঁজল না। ও পা*গলের মতো খাদের খাড়া ঢাল বেয়ে নিচে নামতে লাগল। পাথরের ঘষায় ওর হাত-পা ছিলে যাচ্ছে, কোটটা ছিঁড়ে কাদা আর র-ক্তে মাখামাখি হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু ওর সেদিকে খেয়াল নেই। ও শুধু চিৎকার করছে, “জেরিইই! ফাহিমমম! তোরা কোথায়? কথা বল!”

নিচে নেমে ও যা দেখল, তা কোনো মানুষের পক্ষে সহ্য করা অসম্ভব। উল্টো সাদা রঙের গাড়িটা এখন এক দলা দুমড়ানো লোহা। চাকাগুলো এখনো শূন্যে ঘুরছে একটা বীভৎস ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে। গাড়ির ভেতর থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে। আরাভ নিজের শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে দুমড়ানো দরজাটা টেনে খোলার চেষ্টা করল। ওর নখ ফেটে র-ক্ত বের হচ্ছে, লোহার ধারালো কোণায় হাতের তালু কেটে যাচ্ছে, কিন্তু ও থামল না।

অবশেষে দরজাটা যখন মড়মড় করে খুলে এল, আরাভ ভেতরে উঁকি দিয়েই পাথর হয়ে গেল। ফাহিম… ওর আদরের ছোট ভাইটা, যার মুখে সবসময় দুষ্টুমি লেগে থাকত, সে এখন একটা র-ক্তাক্ত মাং-সপিণ্ড।

ফাহিমের পিঠের দিকটা পুরোটা চিরে গেছে, ট্রাকের লোহার রড ওর শরীর ফুঁড়ে বের হয়ে গেছে। ও রিন্নিকে নিজের বুকের নিচে এমনভাবে জাপটে ধরে আছে, যেন আজরাইলকেও ও মাঝপথে আটকে দিতে চায়।

আরাভ ফাহিমকে সরাতে গিয়ে দেখল ছেলেটার আঙুলগুলো রিন্নির জামা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আছে। আরাভ ডুকরে কেঁদে উঠল, “ফাহিম! ছেড়ে দে ভাই! আমি এসেছি তো! তোর ভাইকে ক্ষমা করে দে! ওরে আমার ছোট ভাইটা রে… তুই কেন আসতে গেলি?”

ফাহিমকে সরিয়ে ও যখন রিন্নিকে বের করল, রিন্নির অবস্থা দেখে আরাভের কলিজা যেন ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইল। রিন্নির সেই মায়াবী মুখটা কাঁচের কুঁচিতে ক্ষতবিক্ষত। ওর কপাল বেয়ে র-ক্তের ধারা নেমে ওর সাদা ড্রেসটাকে লাল করে দিয়েছে। রিন্নির হাতটা নিস্তেজ হয়ে ঝুলে আছে। পেটের নিচের ভাগটা রক্তাক্ত হয়ে আছে৷ আরাভ রিন্নিকে কোলে তুলে নিয়ে খাদের মাটিতে বসে পড়ল।

ঠিক সেই মুহূর্তে ওর পকেট থেকে সেই প্রেগন্যান্সি রিপোর্টটা মাটিতে পড়ে গেল। কাদায় মাখা সেই কাগজে রিন্নির তাজা র-ক্ত টপটপ করে পড়তে লাগল। আরাভ ওই কাগজটার দিকে তাকিয়ে পা-গলের মতো হাসতে শুরু করল, আবার পরক্ষণেই কান্নায় ভেঙে পড়ল।

“জেরি! ও জেরি! চোখ খোল না সোনা! দেখ, আমি ওই রিপোর্টটা পেয়েছি! আমি তোকে কত বকা দিলাম জেরি… তুই কেন আমার জেদ সহ্য করলি? আমাদের ওই ছোট্ট মানুষটা… যে আমার আইকিউ (IQ) জিরো করতে আসছিল, সে কি এখনো আছে জেরি? কথা বল না!”

আরাভ রিন্নির পেটে কান পেতে শুনল। কোনো স্পন্দন নেই। শুধু নিস্তব্ধতা। ও রিন্নির কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে হাহাকার করে উঠল, “আল্লাহ! তুমি আমার সব জ্ঞান নিয়ে নাও! আমার সব পাওয়ার কেড়ে নাও! বিনিময়ে শুধু আমার বাচ্চাটাকে ফিরিয়ে দাও! আমার জেরি’র কোল খালি করো না খোদা! আমি কী জবাব দেব ওকে? ও যখন জ্ঞান ফিরে আমাকে খুঁজবে, আমি কী বলব? আমি ওর কোল উজাড় করে দিয়েছি?”

আরাভের আর্তনাদে খাদের ধারের মানুষগুলোও স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। শক্ত হৃদয়ের গ্রাম্য লোকগুলোও গামছা দিয়ে চোখ মুছতে লাগল। আরাভ রিন্নির রক্তমাখা হাতটা নিজের গালে ঘষতে ঘষতে বলতে লাগল
“আমি তোকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম জেরি! আমি ড্রাগনকে হারাতে চেয়েছিলাম! কিন্তু আমি যে তোকেই হারিয়ে ফেললাম! ফাহিম… তুই কেন আমাকে একা করে দিলি? তোরা ছাড়া আমি এই ডিজিটাল জগত দিয়ে কী করব? জেরি… প্লিজ একবার ‘স্যার’ বলে ডাক! আমি আর কোনোদিন তোকে ধমক দেব না!”

আরাভের এই বুকফাটানো হাহাকারে ওই নির্জন হাইওয়ের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। ও রিন্নি আর ফাহিমকে জাপটে ধরে ওই খাদের নিচেই পড়ে রইল। ওর চারপাশের পৃথিবীটা যেন আজ ডেটা ক্র্যাশ করে ধ্বংস হয়ে গেছে। যে মানুষটা লজিক দিয়ে মহাবিশ্ব মাপতে চেয়েছিল, আজ সে এক ফোঁটা প্রাণের স্পন্দনের জন্য ভিখারির মতো কাঁদছে।

চলবে,,,,
(৩৭ পর্ব পর্যন্ত লেখা শেষ। ২-৩ লাইনের কমেন্ট করলে পরের পর্ব রাতেই পাবেন)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here