#বিপরীত_মেরুর_টানে
#নবম_পর্ব
#লেখনীতে_আরিবা_নাওশীন
আজ রিন্নি আর আরাভের গায়ে হলুদ। রিন্নিদের বাড়িটা সকাল থেকেই হলুদ আর কমলা গাঁদা ফুলে সেজেছে। রিন্নি সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের গাল টিপে দেখল। মনে মনে হাসল, “আজ হিটলার সাহেবের বারোটা বাজাব! এমন হলুদ মাখাব যে ওনার গাম্ভীর্য ল্যাবের অ্যাসিডের মতো পুড়ে ছাই হয়ে যাবে।”
সকাল দশটা বাজতেই রিন্নি তার মিশনে নেমে পড়ল। তার আজকের মিশনের নাম ‘প্রজেক্ট ইচিং পাউডার’। সে জানে আরাভের এলার্জি আছে । তাই রিন্নি কৌশলে তানিয়াকে দিয়ে আরাভের জন্য পাঠানো হলুদের পাঞ্জাবিটার কলারের ভেতর সূক্ষ্মভাবে একটু চুলকানি পাউডার আর লাল মরিচের গুঁড়ো মিশিয়ে দিয়েছে।
তানিয়া একটু ভয় পেয়ে বলল, “রিন্নি, স্যার যদি বুঝতে পারে তবে কিন্তু আমাকে ল্যাব থেকে বহিষ্কার করবে!”
রিন্নি চোখ রাঙিয়ে বলল, “চুপ থাক! উনি বুঝবেন কী করে? উনি তো ভাববেন ওটা কোনো অ্যালার্জিক রিঅ্যাকশন।”
দুপুরবেলা আরাভদের বাড়িতেও সাজসাজ রব। আরাভ তার ঘরে বসে ল্যাপটপে কী যেন দেখছিল। আফজাল চৌধুরী ঘরে ঢুকে ধমক দিলেন, “হারা*মজাদা! আজও ল্যাপটপ? আজ তোর গায়ে হলুদ, লোকে গান-বাজনা করছে আর তুই এখানে ফিজিক্সের গ্রাফ আঁকছিস?”
আরাভ নির্বিকার গলায় বলল, “আব্বু, গান-বাজনা মানেই তো ডেসিবল লেভেল বাড়ানো, যা কানের পর্দার জন্য ক্ষতিকর। আর এই হলুদ মাখানোটা আস্ত একটা আন-হাইজেনিক প্রসেস।”
আফজাল সাহেব মুখ বাঁকিয়ে বললেন, “তোর ওই হাইজিন আমি বের করছি। জলদি এই পাঞ্জাবিটা পর। রিন্নিরা পাঠিয়েছে।”
আরাভ পাঞ্জাবিটা হাতে নিল। সে খেয়াল করল কলারের কাছে কেমন একটা সাদাটে গুঁড়ো। সে তার চশমাটা ঠিক করে এক চিমটি পাউডার হাতে নিয়ে পরীক্ষা করল। তারপর একটা ধূর্ত হাসি দিয়ে বিড়বিড় করল, “মিস হবু গিন্নি, আপনার এক্সপেরিমেন্ট এতই কাঁচা? আপনি ভুলে গেছেন আপনি যার সাথে পাঙ্গা নিচ্ছেন সে নিজেই একজন ল্যাব ইনচার্জ!”
আরাভ পাঞ্জাবিটা না পরেই ব্যাগ থেকে একটা সাকশন মেশিন বের করে কলারের সব পাউডার পরিষ্কার করে ফেলল। তারপর আলমারি থেকে তার নিজের কেনা হুবহু একই রকম একটা পাঞ্জাবি বের করে তাতে রিন্নির দেওয়া সেই ইচিং পাউডার ভালো করে লেপে দিয়ে একটা প্যাকেটে ভরে ফেলল। ওর টার্গেট রিন্নি নিজেই।
বিকেলে অনুষ্ঠান শুরু হলো। রিন্নি হলুদ শাড়ি আর গয়না পরে স্টেজে বসে আছে। তাকে সত্যিই খুব মিষ্টি লাগছে, কিন্তু তার মাথায় শুধু চিন্তা আরাভ কেন এখনো চুলকাতে চুলকাতে আসছে না?
কিছুক্ষণ পর আরাভ এলো। পরনে হলুদ পাঞ্জাবি, কিন্তু সে একদম স্বাভাবিক। রিন্নি অবাক! লোকটা কি পাথর নাকি? তার তো এখন বাঁদরের মতো নাচার কথা!
আরাভ স্টেজে উঠে রিন্নির পাশে বসল। খুব নিচু স্বরে বলল, “কী ব্যাপার মিসেস চৌধুরী? আপনাকে খুব চিন্তিত মনে হচ্ছে। কোনো কেমিক্যাল রিঅ্যাকশন কি কাজ করছে না?”
রিন্নি থতমত খেয়ে বলল, “না… মানে… আপনি কি সুস্থ আছেন স্যার?”
আরাভ বাঁকা হেসে বলল, “আলহামদুলিল্লাহ! আপনার পাঠানো পাঞ্জাবিটা পরে খুব আরাম লাগছে। তবে আমি আপনার জন্য একটা বিশেষ গিফট এনেছি।”
আরাভ পকেট থেকে একটা ছোট কৌটা বের করল। “এটা বিশেষ এক ধরনের অর্গানিক হলুদ। এটা মুখে দিলে গ্লো বাড়ে। একটু মাখিয়ে দিই?”
রিন্নি না করার আগেই আরাভ খুব যত্ন করে রিন্নির দুই গালে হলুদ মাখিয়ে দিল। মাখানোর সময় আরাভের হাতের আঙুলগুলো রিন্নির গালে একটু বেশিই সময় ধরে থাকল। রিন্নি এক মুহূর্তের জন্য ইমোশনাল হয়ে পড়ল। মনে মনে ভাবল, “ইশ! লোকটা কত ভালো, আর আমি ওনার ক্ষতি করতে চাইলাম?”
কিন্তু সেই ইমোশন পাঁচ সেকেন্ডও টিকল না। হঠাৎ রিন্নির গালে অদ্ভুত এক জ্বালাপোড়া শুরু হলো। যেন কয়েকশ পিঁপড়ে একসাথে কাম*ড়াচ্ছে!
রিন্নি ছটফট করে উঠল। “উফ! স্যার! একি মাখালেন? আমার গাল তো জ্বলছে!”
আরাভ খুব শান্তভাবে বলল, “জ্বলছে? হওয়ার তো কথা না। হয়তো আপনার ন্যাকামির লেভেল এত বেশি যে অর্গানিক জিনিস সহ্য করতে পারছে না। এটাকে বলে রিভার্স অ্যাকশন।”
রিন্নি এবার বুঝতে পারল। “আপনি… আপনি কি ওই ইচিং পাউডারটা এই হলুদে মিশিয়েছেন?”
আরাভ কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, “নিউটনের থার্ড ল, ডার্লিং। আপনি যা দেবেন, তাই ফেরত পাবেন। এখন চুপচাপ বসে হাসুন, গেস্টরা তাকাচ্ছে।”
রিন্নি রাগে আর চুলকানিতে অস্থির হয়ে স্টেজেই ছটফট করতে লাগল। আফজাল চৌধুরী দেখে হাসতে হাসতে বললেন, “দেখুন হাসান সাহেব! আমার ছেলের হাতের ছোঁয়ায় রিন্নি মা কেমন খুশিতে নাচছে!”
রিন্নি আর সহ্য করতে না পেরে উঠে গেল আর মাকে বলল একটু ওয়াসরুমে যাবে। এটা দৌড় দিল। এদিকে আরাভ মুখে হাসছে।”তুমি যে কলেজের ছাত্রী আমি সেই কলেজের টিচার গিন্নি। আমার সাথে চালাকি খাটে না”
হলুদের অনুষ্ঠানের এক কোণায় তানিন মনম*রা হয়ে বসে একটা লাল গোলাপের পাপড়ি ছিঁড়ছিল আর বিড়বিড় করছিল, “রিন্নি, তুমি নীল মলাটের বই হলে আমি হতাম তার বুকমার্ক…”
ঠিক তখনই হাতে এক গ্লাস কাঁচা আমের শরবত নিয়ে তানিয়া সেখানে এসে হাজির। তানিয়া রিন্নির বেস্ট ফ্রেন্ড হলেও স্বভাবটা একটু চঞ্চল। সে বেশ কিছুক্ষণ ধরে তানিনকে অবজার্ভ করছিল। তানিনের ওই এলোমেলো চুল আর দেবদাস মার্কা লুকটা কেন জানি তানিয়ার মনে লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট-এর মতো ধাক্কা দিল।
তানিয়া গ্লাসটা তানিনের সামনে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “এই যে কবি সাহেব! শুধু পাপড়ি ছিঁড়লে হবে? একটু ভিটামিন-সি ও তো দরকার, নাহলে তো বিরহ সহ্য করার শক্তি পাবেন না।”
তানিন চমকে মুখ তুলে তাকাল। তানিয়ার টানা টানা চোখ আর হলদে সাজ দেখে সে এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল, তবে পরক্ষণেই সামলে নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “শরবত দিয়ে কি হৃদয়ের দহন মেটে হে বালিকা? রিন্নি আজ অন্যের হওয়ার পথে, আর আমার হৃদয় মরুভূমির মতো খাঁ খাঁ করছে।”
তানিয়া একটা চেয়ার টেনে তানিনের পাশে ধপাস করে বসল। সে তানিনের চোখের ওপর চোখ রেখে বলল, “শুনুন তানিন ভাই, মরুভূমিতে বৃষ্টি নামানোর জন্য সঠিক মেঘের দরকার হয়। আপনি ভুল মেঘের পেছনে ছুটছেন। রিন্নি তো আগ্নেয়গিরির মুখে ঝাঁপ দিচ্ছে, আপনি কেন শুধু শুধু ঝলসাতে চাচ্ছেন?”
তানিন একটু অবাক হয়ে বলল, “তুমি কি আমার কবিতা বুঝবে? রিন্নি তো আমার সুর বোঝে না।”
তানিয়া বাঁকা হেসে বলল, “সুর বোঝার জন্য কানের চেয়ে মনের জোর বেশি লাগে। আপনি বরং রিন্নির শোক বাদ দিয়ে আমার এই শরবতটা টেস্ট করে দেখুন। গ্যারান্টি দিচ্ছি, আপনার বিরহ দশ পারসেন্ট কমে যাবে।”
তানিন অনিচ্ছাসত্ত্বেও শরবতে চুমুক দিয়ে বলল, “স্বাদটা মন্দ না, তবে রিন্নির হাসির মতো মিষ্টি নয়।”
তানিয়া মনে মনে বলল, “হায়রে বলদ! সামনে জ্যান্ত রসগোল্লা দাঁড়িয়ে আছে আর সে এখনো পচা আচারের পেছনে ঘুরছে!” সে মুখে বলল, “ঠিক আছে, আপনি শোক পালন চালিয়ে যান। তবে মনে রাখবেন, পাশে কিন্তু একটা জ্যান্ত ব্যাকআপ আছে!”
তানিয়া এক চোখ টিপে দিয়ে সেখান থেকে গটগট করে চলে গেল। তানিন হা করে তাকিয়ে রইল। সে বিড়বিড় করল, “মেয়েটা কে? কথা তো বলে যেন তিতাস গ্যাস! কিন্তু ঝাঝটা বেশ ভালোই ছিল।”
সন্ধ্যায় গানের আসর বসল। তানিন গিটার নিয়ে এসে আবার শুরু করল, “হৃদয় তোমার নীল মেঘের মতো…”
আরাভ এবার আর সহ্য করল না। সে আফজাল সাহেবের কানে গিয়ে কিছু একটা বলল। আফজাল সাহেব ঘোষণা করলেন, “আজ কবি সাহেবের গিটারের বদলে আমার ছেলে আর রিন্নি মা মিলে একটা ডুয়েট পারফরম্যান্স দিবে!”
রিন্নি তো আকাশ থেকে পড়ল। “আমি গান গাব? তাও আবার এই হিটলারের সাথে?”
আরাভ রিন্নির হাত ধরে একরকম জোর করেই মাইক্রোফোনের সামনে নিয়ে গেল। রিন্নির গাল তখনো হালকা চুলকাচ্ছে। আরাভ মাইক্রোফোন নিয়ে গাইতে শুরু করল “এক চিলতে রোদ্দুর আমি তোর জন্য এনেছি…”
আরাভের গম্ভীর কণ্ঠস্বরের সাথে রিন্নি বাধ্য হয়ে সুর মেলাল। গান গাইতে গাইতে আরাভ হঠাৎ রিন্নির কোমরে হাত দিয়ে তাকে নিজের দিকে টেনে নিল। রিন্নি থমকে গেল। পুরো আসর তালি দিয়ে ফেটে পড়ল।
আরাভ গলার স্বর নিচু করে গানের মাঝেই বলল, “পরের বার যখন প্র্যাঙ্ক করবেন, তখন মনে রাখবেন আপনার টিচার আপনার চেয়ে দশ ধাপ আগে ভাবে।”
রিন্নি ঝাড়ি দিয়ে বলল, “ছাড়ুন! মানুষ দেখছে!”
“দেখুক না। আমি তো আমার স্টুডেন্টকে প্র্যাকটিক্যালি মিউজিক থেরাপি শেখাচ্ছি,” আরাভ আরও একটু শক্ত করে ধরল।
রাত এগারোটা। মেহমানরা বিদায় নিয়েছে। রিন্নি বারান্দায় দাঁড়িয়ে একা একা গালে বরফ ঘষছিল।
রাগে ওর চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে আসছে। ঠিক তখন ফোনের স্ক্রিনে আরাভের মেসেজ ভেসে উঠল,
“আপনার ঘরে একটা আইস প্যাক আর একটা অ্যান্টি-অ্যালার্জি ক্রিম পাঠানো হয়েছে। ওটা লাগিয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন। আর হ্যাঁ, আপনার গালটা কিন্তু লাল হয়ে থাকলে নীল শাড়ির সাথে দারুণ কনট্রাস্ট করবে। শুভ রাত্রি, মিসেস চৌধুরী।”
রিন্নি প্যাকেটে হাত দিয়ে দেখল সত্যিই একটা দামী ক্রিম। সে বিড়বিড় করল, “খাটাস একটা! একদিকে কষ্ট দেয়, আরেকদিকে সেবা করে। কাল বিয়ের দিন যদি ওর শেরওয়ানি আমি আঠা দিয়ে আটকে না দিয়েছি তবে আমার নামও রিন্নি না!”
নিচ থেকে আফজাল চৌধুরীর গলার আওয়াজ পাওয়া গেল, “আরাভ! তুই রিন্নির ঘরে ক্রিম পাঠিয়েছিস নাকি ফিজিক্সের নোট?”
আরাভের গলা পাওয়া গেল, “আব্বু! তুমি ঘুমাও তো! সব কিছুতে নাক গলাতে এসো না।”
রিন্নি ক্রিমের টিউবটা হাতে নিয়ে হাসল। টম আর জেরির এই হলুদ পর্ব শেষ হলো এক চিমটি জ্বালা আর এক পাহাড় অভিমানে।
চলবে,,,

