#একটা_ছিলো_সোনার_কন্যা
#শ্যামলী_রহমান
#পর্ব—২৬
নিশি রাত। নিঃস্তব্ধতার ঘেরা চারপাশ। সকলে যখন ঘুমে মগ্ন তখন কারো চোখে ঘুম নেই। নিজের করা কর্মফল। যা কেড়ে নিয়েছে রাতের ঘুম,মনের শান্তি।
নুরুম আলম মধ্যরাতে বসে আছে চেয়ারে। ঘুম নেই চোখে। মতিষ্কে কিছু একটা চলছে। চোখ বন্ধ করে দুলছে চেয়ারে। কালকে মাহাদের কথাগুলো কানে বাজছে অবিরত। চোখ খুলে আশে পাশে তাকালো। আসলেই কেউ নেই। ফাঁকা ঘর। নেই স্ত্রীও। সাহেল নেশায় বুদ হয়ে ঘরে পড়ে থাকে। মুহূর্তে তিনি উঠে পড়লেন চেয়ার থেকে। এতোদিনের দম্ভ চুর্ণ হয়ে যেতে দিতে পারে না, মানুষ মাতবর বাড়ির দিকে আঙুল তুলছে তা মানতে পারছেন না। বাহিরে গেলে কিছু কথা কানে আসে। সম্মুখে বলার সাহস না করলেও আড়ালে ফিসফিস করে।
“নুরুল আলম এতো বছরের জীবনে ভালো কি করেছেন? যোগ্য পিতা,স্বামী,মানুষ কোনটা হতে পেরেছেন?”
নুরুল আলম আশে পাশে তাকালো কেউ নেই অথচ কানের কাছে শব্দ গুলো উচ্চারিত হচ্ছে। কে বলছে? নুরুল আলম কান চেপে ধরলো। চিৎকার করে বলল,
“দম্ভ আমাকে মানবিক হতে দেয়নি। আমি ও হতেও চাইনি।”
”আমি ঘুমাতে চাই, শান্তি চাই।” এতটুকু তার ভেতর বললো। চাইলেই কি সবকিছু পাওয়া যায়?
সালেহা ঘর থেকে বেরিয়ে আসলো। স্বামীর চিৎকার কানে পৌছেছে ঘুমের ঘোরেই। এসে দেখলো নুরুল আলম জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে। গর্জাচ্ছে অবিরত। তিনি গিয়ে চিন্তিত হয়ে শুধালেন,
“কি হয়েছে এমন করতাছেন কেন? বসুন।”
নুরুল আলম এক পলক তাকিয়ে বসে পড়লো। সালেহা ঘর থেকে বেরিয়ে কলপাড় হতে বালতি ভর্তি ঠান্ডা পানি নিয়ে আসলো। বলল,
“মাথা নিচু করুন পানি ঢাললে ভালো লাগবে।”
নুরুল আলম কোনো প্রশ্ন ছাড়াই এই প্রথম মেনে নিলো। মাথা নিচু করতেই সালেহা বেগম পানি ঢালতে শুরু করলো। মাথা মুছে দিয়ে ঠান্ডা কদুর তেল মাথায় মালিশ করলো। নুরুল আলম এবার শান্তি কন্ঠে বলে উঠলো,
“ সালেহা অনেক তো অত্যাচার করেছি তবুও কেন আছো? আর কেউ তো নেই আমার পাশে।”
সালেহা বেগমের হাত থেমে গেলো। খানিক আগে দোলাচালে ভেসে বেড়ানোর মানুষটার দিকে তাকালো। এখন একদম ভিন্ন লাগছে। চোখে মুখে অস্থিরতা ও ভয় দেখতে পাচ্ছে। তিনি হেসে উত্তর দিলেন,
“ এতোদিন সহ্য করতে পারলে এখন কেন নয়?
আপনি আমার স্বামী, চার সন্তানের পিতা। ভালোবাসার প্রাপ্তি না থাকলেও দায়িত্বের আছে।
বিয়ের পর নারীর শেষ সম্বল হয় তার স্বামী।”
“তবে দায়িত্ব পালন করছো?”
“ তাছাড়া আর কি? এই সংসারের আমার অবস্থান তো ছিলো শুধু দায়িত্ব আর কর্তব্য পালন করাই।”
নুরুল আলম চুপ হয়ে গেলো। অনুশোচনা আর একাকিত্ব জেঁকে ধরলো হঠাৎ করে। শান্তিতে বসে, ঘুমাতে পারছে না। এক ছেলে বাড়ির বাহিরে আরেকজন ঘরের ভেতর পড়ে। মেয়েটাও গেছে চলে। অবশ্য এর জন্য তিনি নিজেই দায়ী। নিজের ভুল অন্য দিকে দম্ভ বজায় রাখতে সত্তার আহবান।
দুই মিলিয়ে চলছে হাতাহাতি। একটা সময় সালেহা বেগম পাশে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন। তিনি জেগে রইলেন সারারাত। ভাবতে থাকলো প্রতিটা ঘটনা।
___________
নাজিরের বাড়িতে আসর বসেছে। শিউলি, মালা আর নিধি মিলে গল্প জুড়েছে। সাথে হাতের আঙুলে শাক বাঁচছে। নাজির মাহাদ,সাঈর তখনই কতগুলো নারকেল হাতে বাড়িতে প্রবেশ করলো। তিনজনে সেদিকে তাকালো। মালা হা হয়ে বলল,
“হায় আল্লাহ গাছের সব নারকেল পাইড়া আনছেন?”
“ না আরো আছে। শশুর আব্বা বলছিলো আরো পাড়তে।”
নাজির উত্তর দিয়ে নারকেল গুলো রাখলো উঠোনে। মাহাদের হাতেও দুটো আছে তবে এগুলো ডাব সম্ভবত। নাজির দা এনে প্রথমে ডাব গুলো কাটলো তার পর নারকেল ছোলাতে শুরু করলো। ডাবের পানি মাহাদ অর্ধেক খেয়ে শিউলির দিকে বাড়িয়ে দিলো। শিউলি না চাইতেও মাহাদের চোখ রাঙানিতে নিয়ে নিলো। আরেকটা মালা আর নিধি কে দিলো। সাঈদ পাশ থেকে দুষ্টুমি করে সুর টেনে বলল,
“সালার যাকে বন্ধু মহলে সবচেয়ে নিরামিষ ও খিটখিটে মেজাজের ডাক্তার জানতো সে এখন
প্রেমের ডাক্তার হয়ে গেছে কি আশ্চর্যকর বিষয়!”
সকলে হেসে উঠলো। সাঈদের কথায় শিউলি লজ্জা পেলো। মাহাদ ওকে ঘাড়ে চাপড় মেরে বলল,
“ সবচেয়ে ভিতু ছেলেটা মেয়ে দেখলে পালাতো সেও কারো প্রেমে পড়লো আবার বিবাহ করলো এটা আরো বেশি আশ্চর্যের তাই নাজির?”
নাজির মাথা দোলালো। হাসতে হাসতে সম্মতি জানিয়ে বলল,
“আমি ভাই সমোন্ধি হই সম্পর্কে এসে কথা না বলাই ভালো।”
মালা এবার মাহাদ কে শুধালো,
“ভাইজান আপনারা কবে যাইবেন শহরে?”
মালার সঙ্গে শিউলিও আগ্রহে তাকালো। দিন গেলেও জানা হয়নি সে কথা। মাহাদ উত্তর দিলো,
“কাল পরশু। বাবা তো কাল চলে গেলেন আমাদের ও যেতে হবে। এক সপ্তাহ বিয়ের জন্য ছুটি নিয়ে এসেছিলাম। যেতে হবে শিগগিরই। ডাক্তারি পেশা বড় দায়িত্বের।”
“ওহ।” মালার মুখটা একটুখানি ভার হলো। শিউলি তা খেয়াল করলো। জড়িয়ে ধরলো প্রিয় সখি কে। যেন সে শান্তনা দিতে আগলে নিলো তাকে। মালা কেবল হাসলো সকলের সামনে।
_______
হঠাৎ করে করিম মিয়া ঘুম লেগে পড়ে যায় আঙ্গিনায়। আমেনা দেখে দৌঁড়ে আসে। শিউলি আর মাহাদ ও চিল্লাচিল্লিতে দৌড়ে আসে সঙ্গে প্রতিবেশী রাও ছুটে আসে। মাথায় পানি ঢাললে কিছুক্ষণ বাদে জ্ঞান ফিরে। মাহাদ দেখে জানালো শরীর দূর্বল এজন্য মাথা ঘুরে পড়ে গেছিলো। নিয়মিত খাবার খান না বোধ-হয়। বিশ্রামে থাকতে হবে। ভিটামিন, আয়রন যুক্ত খাবার খেতে হবে। সম্ভব হলে গ্রাম্য ডাক্তারের থেকে ঔষুধ এনে খাওয়ান।
কিন্তু করিম মিয়া সেসবে কান দিলো না উঠে পড়লো তক্ষণৎ । বলল,
“ধান লাগাইতে হইবো বাবা। কাঁদো করা হইছে গতকাল আজ না লাগাইলে কাঁদা শক্ত হইয়া যাইবো তখন আরো কষ্ট হইবো ধান লাগাইতে।”
আমেনা বাঁধা দিলো। শিউলি কপট রাগ দেখিয়ে বলল,
“ আব্বা শরীর আগে। ধান দুদিন পর লাগাও। নইলে কাউরে দিয়ে লাগাই নেও।”
তখনই নাজির পিছন থেকে বলে উঠলো,
“চাচা আপনি বিশ্রাম নিন আমি আর শাহিন ধান লাগিয়ে দিবো চিন্তা করতে হবে না।”
করিম মিয়া মানতে না চাইলেও সকলের জোরাজুরিতে রাজি হলো। নাজিরের নিজের ও ধান লাগাতে হবে। আজ লাঙ্গল বয়ে আসলো সকালে। কাল থেকে লাগাবে বলে ভেবে রেখেছে। আজ তবে শিউলিদের ধান লাগাতে গেলো। তবে সঙ্গে হাঁটা দিলো মাহাদও। পরনে শার্ট আর লুঙ্গি। গ্রামের কিছুজনই আলাপ করতে এগিয়ে এলো। চিকিৎসা করাতে এসেছিলো এজন্য কৃতজ্ঞতা জানালো কেউ। মেঠোপথ পেরিয়ে মাঠের কাছাকাছি যেতেই জিহানের দেখা মিললো। ও মাথা নিচু করে ধান লাগাচ্ছিলো। মাহাদ আর নাজিরের কন্ঠে তাকালো। বলল,
“তোমরা ওখানে? ”
“ করিম চাচা অসুস্থ তার জমিতে ধান লাগাতে আসলাম।”
“ মাহাদ কি ধান লাগাবে? শহুরে মানুষ ধান লাগাতে দেখেছে কখনো?”
নাজির বলল,
“না আমি আর শাহিন লাগাবো ও এমনি আসলো।”
নাজিরের উত্তর শেষ হতেই মাহাদ বলে উঠলো,
“ চেষ্টা করে দেখি। শহরে বড় হলেও দু একবার দেখেছি।”
নাজির মাহাদ কে নামতে মানা করলো তবুও সে নামলো। কোনো বারণ শুনলো না। নাজির আর শাহিনের দেখে ধান কাঁদায় গুঁজতে লাগলো। প্রথমে একটু অসুবিধা ও দেরি হলেও পরে, পরে ঠিকই পারলো। তিনজনে সকাল থেকে দুপুরের মধ্যেই অর্ধেকের বেশি ধান লাগিয়ে ফেললো। দুপুর হয়ে আসাতে রোদের তাপ বেশি। গরমে ঘামছে বেশি মাহাদ। নাজির বলল,
“ চলো বাড়ি যাই খেয়ে আবার না-হয় আসবো।”
তিনজনে উঠে পড়লো জমি থেকে তবে বাড়ি যেতে হলো না। দেখতে পেলো মালা আর শিউলি তাদের দিকে আসছে। হাতে গামছায় বাঁধানো ভাতের গামলা আর পানির জগ। শাহিন বলল,
“ ভাত খাইতে বাড়ি যাওন লাগবো না শিউলি আর মালা আইসা পড়ছে।”
মাহাদ আগে আগে আইল দিয়ে হেঁটে চললো। নাজির আর শাহিন পিছনে রইলো। মেঠোপথের দুপাশে গাছ লাগানো আছে। ওরা সকলে একটা গাছের ছায়ায় গিয়ে বসলো। শিউলি মাহাদের ঘামার্থ মুখশ্রী দেখে শাড়ির আঁচল দিয়ে মুছে দিলো বলল,
“এসবে আপনার অভ্যস্ত নেই কষ্ট হইতাছে নিশ্চয়ই?”
মাহাদ বসে পড়লো সবুজ ঘাসের উপর। ততক্ষণে নাজির আর শাহিন ও আসলো। মাহাদ বলল,
“কষ্ট সকলের হয় শিউলি। কৃষিকাজ করতে এসে একটা জিনিস বুঝলাম আমরা টাকা দিয়ে যা সহজে কিনতে পারি তা আসলে কৃষকের কঠোর পরিশ্রমের ফল। অথচ কৃষকেরা নায্য মূল্য পায় না।
অতঃপর খাওয়া শেষে তিনজনে আবারো কাজে লেগে পড়লো। শিউলি আর মালা আইলের মাথায় কিছুক্ষণ বসে রইলো। নাজির হুঙ্কার ছাড়লো,
“বাড়ি যাও রোদ লাগতাছে না?”
মালা শিউলির হাত টেনে নিয়ে যেতে লাগলো। শিউলি গালে হাত দিয়ে মাহাদের দিকে তাকিয়ে ছিলো। কাজের সময় মাহাদ মনযোগ দিয়ে কাজ করে। এজন্য খেয়াল করেনি সে। মাহাদ কোমর খাঁড়া করে দাঁড়ালো। দূরে শিউলি আর মালা যাচ্ছে। সবুজ,হলুূদ শাড়ি আর দুজনে দুটো করে বিনুনি করা চুলে।
“ কি ভায়া কৃষিকাজ সহজ নাকি ডাক্তারি?”
জিহানের কন্ঠে মাহাদ তাকালো তার পানে। প্রতিত্তোর করল,
“দুটোই কঠিন তবে কৃষিকাজে পরিশ্রম বেশি।”
“ভালো লাগছে? ”
“অভিজ্ঞতা নিচ্ছি। জীবনে সব কাজের অভিজ্ঞতা রাখা ভালো।”
সন্ধ্যা হতেই ধান লাগানো শেষ করে বাড়ি ফিরলো মাহাদ। কাঁদা লেগে আছে শার্টে। আমেনা হা-হুতাশ করে বলল,
“নতুন জামাই হইয়া ধান লাগাইতে গেছো কেন বাবা? মানুষ কি মনে করবো?অসম্মান করতাছি তোমার।”
মাহাদ কলপাড়ে গিয়ে মুখ ধুয়ে বাহির হয়ে আসলো। শিউলি গামছা এগিয়ে দিলো। মুখ মুছতে মুছতে বলল,
“আম্মা কোনো কাজে সম্মান যায় না। ধরুন সখে করলাম।”
“তাও বাবা তুমি বড় ঘরের ছেলে এসব কাজ কখনো করো নাই জীবনে।”
“আমার দাদাও এক সময় মাঠেও কাজ করেছে। বাবার থেকে গল্প শুনেছি। সময়ের পরিবর্তনে ঘুরে দাঁড়িয়েছে কৃষি কাজের টাকায় লেখাপড়া করে ডাক্তার হয়েছে। আমি এসবে অভ্যস্ত নয় ঠিকই তবে করা যাবে না এমন কোথাও লেখা নেই।”
আমেনা সন্তোষ্টি হলো মাহাদের কথায়। বড় ঘরের হয়েও নেই কোনো অহংকার। এমন জামাই পেয়ে ভাগ্য বড় ভালো মনে করলো।
চুলায় রান্ধন বসিয়েছে মনে পড়তেই আমেনা ছুটলো সেখানে। শিউলি শার্ট আর লুঙ্গী বাহির করে দিলো তাকে। বলল,
“ বদলে আসুন ঘর থেকে। নইলে গোসল করুন।”
“চলো নদীতে গোসল করবো আজ।”
শিউলি লুঙ্গি, গামছা আর সাবান নিয়ে মাহাদের পিছু পিছু গেলো। নদীর পানি কম। নেমে পড়লো অনেকটা গিয়ে বুক সমান পানি পেলো। মাহাদ ডুব দিলো কিন্তু কিছুক্ষণ হলেও না উঠাতে হুট করে মনে ভয় লাগলো। তাকালো চারপাশে। মানুষটা সাঁতার জানে না নিশ্চয়ই পানিতেও ডুব দিয়েও থাকতে পারবে না বলে ভাবলো। ভয় আরো দৃঢ় হলো। তখনই হুট করে পায়ের কাছে পানি থেকে উঠার ছলাৎ শব্দ হলো। শিউলি তাকালো। মাহাদ তার দিকে চেয়ে হাসছে আর বলছে,
“ ভয় পেয়েছিলে?”
“তো পাবো না? আপনি পানির নিচে থাকতে পারেন?”
“ চেষ্টা করলাম, পারলাম।”
“এবার উঠে পড়ুন।”
“ভয় নেই প্রেম পুকুরে ডুবে মুরেছি নদীতে ডুববো না সহজে। একটা কথা শোনোনি’ “ প্রেমের মরা জলে ডুবে না।”
অহেতুক কথায় শিউলি চোখ পাকিয়ে তাকালো। শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজে হনহনিয়ে চললো বাড়ির পথে। মাহাদ ও উঠে পড়লো। হাসতে হাসতে বলল,
“ এগুলো তো কেঁচে নাও। থাক যাও আমিই কেচে নিয়ে আসছি।”
__________
সময়ের তালে দিনক্ষণ চলে যাচ্ছে অতি দ্রুত। কখন কার খারাপ সময় আসে নিজেও বলতে পারে না কেউ। কালকের অহংকার আজকের পতন।
সাহেল ঘরের ভেতর বসে আছে। চোখ টকটকে লাল হয়ে আছে। কাজের মহিলা গুলোও ভয়ে আসে না এ ঘরে। চোখ মুখ শুঁকিয়ে গেছে এই চার-পাঁচদিনেই। খায়নি গত দুদিন। দোর খোলেনি কারো কথায়। নিজের ব্যর্থতা ভুল বুঝতে পারছে ধীরে ধীরে। অন্য কে ঠকালে, অবহেলা করলে নিজের কপালেও এক সনয় তা জুটে। এটা দেরিতে হলেও এখন বুঝতে পারছে। তখনই দরজায় ঠকঠক আওয়াজ হলো। সাহেল তাকালো সেদিকে। চুপচাপ দরজা খুলে দিলো কন্ঠ শুনে বসলো আবারো আগের স্থানে মেঝেতে পা গুটিয়ে। সাহেলা বেগম খাবারের থালা হাতে বসে পড়লো ছেলের পাশে। তার পর মুখের সামনে ধরলো খাবার। সাহেল মুখে নিলো না। তাকালো মায়ের পানে।
“পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ সন্তান আমি। যাকে জন্ম দিয়েও পাপ মনে হয়েছে তাই না আম্মা?”
সালেহা বেগম উত্তর দিতে পারলেন না কেবল বললেন,
“খেয়ে নেও।”
সাহেল বাঁধ্য মতো মুখে নিলো। নিমিষেই সব খাবার শেষ করলো। তৃপ্তি নিয়ে খেলো যেন। কতদিন মায়ের হাতে খায়নি। খাওয়া মতো যোগ্য কিংবা সম্মান করতে পারেনি।
খাওয়া শেষে সালেহা বেগম মুখ মুছিয়ে দিলো আঁচলে। সাহেল হুট করে সালেহা বেগমের পা জড়িয়ে ধরলো। কেঁদে উঠলো হু হু করে। তিনি হতভম্ব হয়ে গেলেন। কাঁদতে কাঁদতে সাহেল বলে উঠলো ,
“আম্মা আমি ক্ষমার অযোগ্য পারলে ক্ষমা করে দিও। আমার মতো সন্তান পৃথিবীর বুকে না জন্মাক এই প্রার্থনা আমি নিজেই করছি।”
সালেহা বেগম ছেলের মাথায় হাত রাখলেন। গলে গেলেন মুহূর্তে। বুঝতে পারলেন ছেলের মনের অবস্থা। মা চোখের দিকে তাকালেই সবটা বুঝতে পারে। তিনি টলমল চোখে পা ছাড়িয়ে বললেন,
“ক্ষমা সৃষ্টিকর্তার কাছে চাও সাহেল। আমি মা সন্তানের ভালো চাই ক্ষমার আগে প্রার্থনা করি যতই খারাপ হও। সবচেয়ে অন্যায় পাপিয়ার সঙ্গে করেছো তার কাছে ক্ষমা পাবে না হয়তো।”
___________
“তুমি আমি থেকে আমরা হয়েছি। আমাদের ছোট একটা সংসার হবে। সে সংসারে সময়ের অতলে নতুন কারো আগমন ঘটবে। আমার সঙ্গে নিজেকেও ভালোবাসতে শিখো শিউলি। তুমি ভালো থাকলে আমিও ভালো থাকবো আবারো বলছি।”
শিউলি শুনলো। কাটা আঙ্গুলে মাহাদ যত্ন করে পরিষ্কার কাপড় বেঁধে দিলো। তার আগে কাটা স্থানে গ্রাম্য রক্ত বন্ধ করা লাল চিতার পাতা ডলে দিয়েছে। এখানে তো শহরের মতোন হাতের লাগালে সবকিছু পাওয়া যায় না। মাহাদের কথার প্রতিত্তোরে শিউলি মিনমিনে কন্ঠে বলে উঠলো,
“আমাকে ভালোবাসার জন্য আপনি আছেন তো। এক জীবনে আপনার ভালোবাসা ব্যতীত আর কিছু চাই না। বাবা মায়ের পরে এতো ভালোবাসা যত্ন আপনিই দিতাছেন যা আমি কখনো কল্পনাও করি নাই।”
“কথার জালে ফাঁসাচ্ছ মেয়ে? আচ্ছা যদি কখনো আমি না থাকি তবে কি করবে?”
শেষের প্রশ্নটা মাহাদ ওর দিকে চেয়ে ভাবুক চিত্তে করলো। শিউলির বুক কেঁপে উঠল। হারানোর ভয় পেলো। মুহূর্তে মনে হলো সত্যি সত্যিই হারিয়ে ফেলবে। চোখে জল আসতে সময় নিলো না। তড়িৎ গতিতে সামনের মানুষকে জাপ্টে জড়িয়ে ধরলো। বুকে মাথা রেখে হাত দুটো কাঁধ আঁকড়ে ধরলো। মাহাদ এহেন কান্ডে খনিকের জন্য হতভম্ব হয়ে গেলো। শিউলি কাঁদছে বুঝতে সময় নিলো না। শার্টের বুকের অংশ ভিজে অনুভব করছে। কান্নার শব্দ হচ্ছে ধীরে। মাহাদ মুঁচকি হাসলে এই ভেবে ভুল মানুষ কে ভালোবাসেনি সে।
শিউলি বুকে চেপে শান্তনার সহিত চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
“কাঁদছো কেন? আমি তো শুধু পরীক্ষা করছিলাম ভালোবাসো কতটুকু? তা জানতে। কিন্তু তুমি তো কেঁদে একা কার করলে। তবে বুঝতে পারলাম সোনার কন্যা আমায় ভীষণ ভালোবাসে।”
শিউল বুক থেকে সরে আসলো। রাগ অভিমান মিশ্রিত কন্ঠে কান্না স্বরে বলল,
“এতোদিন জানেননি ভালোবাসি কিনা? না জাইনা বিয়ে করেছেন?”
“তোমাকে রাগলেও সুন্দর লাগে,অভিমানে একটু বেশি।”
শিউলি গললো না। শক্ত কন্ঠে বলল,
“আপনাকে ফাজলামোতে একটু ভালো লাগে না।”
মাহাদ উচ্চ স্বরে হেসে উঠলো। জানতে চাইলো,
“তাহলে কিসে ভালোলাগে শুনি?”
“বলবো না।”
বলেই শিউলি মুখ ফিরিয়ে নিলো। বসলো গিয়ে চৌকিতে। মাহাদের বিপরীত দিক হয়ে। মাহাদ বুঝতে পারলো রাগ আজ কঠিন রুপ ধারণ করেছে। ও এসে বসলো শিউলির পাশে। গলা খেকড় দিয়ে নরম কন্ঠে অনুতপ্তের ন্যায় বলল,
“দুঃখিত আর বলবো না কখনো। তোমার মুখে ভালোবাসি শুনতে ভালো লাগে উপেক্ষার শব্দ নয়।”
শিউলি মাহাদের দিকে তাকালো। অনুতপ্তের দৃষ্টি দেখে কিছুটা নরম হলো। সোজাসুজি হয়ে বলল,
“আপনাকে উপেক্ষা করার সাধ্যি আমার নাই।
উপেক্ষা করার হলে অপেক্ষা করতাম না আপনার জন্যে। আমার সমস্ত অপেক্ষা আপনাকে নিজের করে পাওয়ার জন্য ছিলো। যা আমি পেয়ে গেছি। উপেক্ষা কে অপেক্ষায় তার পর পূর্নতায় পরিনত করেছেন আপনি।”
মাহাদ নিঃশব্দে হাসলো। শিউলির হাত টেনে বলল,
“চলো ঘুমিয়ে পড়লো। ভোর রাতে ঢাকার উদ্দেশ্য রওনা দিতে হবে।”
শিউলির মন খারাপ হয়ে গেলো এক মুহূর্তে। একটি শব্দতে কত মন খারাপ লুকিয়ে আছে। এক নজরে পুরো ঘরটা একবার দেখে নিলো। কাল এই ঘর, গ্রাম, বাবা মা পরিচিত সকলকে রেখে চলে যেতে হবে ভিন্ন এক শহরে। ভাবতেই কান্না পেলো। কিন্তু নারী হয়ে যখন জন্মেছে মানিয়ে নিতে হবে।
মাহাদের সঙ্গে ঘুমাতে উদত হলো সে।
মেঠোপথে ছুটে চলা চঞ্চল চড়ুই কিভাবে শহরে থাকবে এই চিন্তায় ঘুম নেই করিম মিয়ার চোখে। একমাত্র মেয়ে থাকবে বহুদূরে এটা ভেবেই মন খারাপ। আমেনা স্বামী কে এপাশ ওপাশ করতে দেখে বলল,
“তখন থেকে এপাশ ওপাশ করতাছেন কেন? শরীর খারাপ লাগতাছে?”
“ না রে ঘুম আসতাছে না। তুই ঘুমাস না কেন?”
“ আমি জানি আপনার ঘুম আসতাছে না কাল শিউলি চইলা যাইবো বইলা। একই কারণে আমারো মন খারাপ হইতাছে। শিউলির বাপ মাইয়ার এতদূর বিয়ে না দিলেও পারতাম বোধ-হয় ।”
হঠাৎ এসে আফসোস হলো। করিম মিয়া ওপাশ থেকে স্ত্রী’র দিকে ফিরলো। বলল,
“ শিউলির ভালোর জন্য এতটুকু কষ্ট সহ্য করতে হইবো আমেনা। মেয়ের চোখে ভালোবাসা দেখেছিলাম কিভাবে আলাদা করতাম ক?”
আমেনা চুপ হয়ে গেলো। এই সময়ে এসে আফসোস হলেও এমন কথা বলা উচিত হয়নি বুঝতে পারলো। মাহাদের মতো দায়িত্বশীল একজন ছেলে পাওয়া বড় কঠিন। বয়সের তফাৎ হলেও মানিয়ে নিতে পারবে এতটুকু ধারণা কয়দিনে হয়েছে। করিম মিয়া আবারো বলল,
“ দোয়া কর ওরা সুখে থাকুক। আমরা আর কয়দিন থাকমু? দূরে থাকলেও কি? মেয়ে সুখে থাকলেই আমাদের শান্তি।”
করিম মিয়া স্ত্রী কে শান্তনা দিতে এই কথা বলল। আমেনা বুঝতে পারলো তা। নিজে কতটুকু মানলো তা উনার চোখ দেখলেই বুঝা যাচ্ছে।
চলবে………………….?

