#একটা_ছিলো_সোনার_কন্যা
#শ্যামলী_রহমান
#পর্ব—১৮
অতিরিক্ত আনন্দে এবং অপ্রত্যাশিত কোনো ঘটনা ঘটলে মানুষ সাময়িকের বাকহারা হয়ে যায়। শব্দ খুঁজে পায় না কি বলবে আর কি করবে। মনে হয় সবটাই দিবাস্বপ্ন। শিউলির ও হয়েছে তাই। চেনা মানুষটাকে চোখের সামনে দেখে কথা হারিয়ে ফেলেছে। চোখে আনন্দে জল টলমল করছে। ঠোঁট নড়তে চাচ্ছে কিন্তু শব্দ বাহির হচ্ছে না। ততক্ষণে চারপাশে ঘেরাও করলো সন্ধ্যার আঁধার। মাহাদ ও নৌকা থেকে নেমে এসে দাঁড়ালো শিউলির সামনে।
কোনো কথা না বলে তাকালো ওর মুখপানে। চোখ টলমল, অঁধর কাঁপছে যেন কত কথা জমে আছে ওই ঠোঁটের কোনে। চোখে আছে কত,কত অভিমান, অভিযোগ।
মাহাদ শিউলি দুজনে একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখের তৃষ্ণা কত,কত দিনের। হৃদয় খাঁ খাঁ করেছে দেখার আশাতে। কারো মুখে কথা নেই। মাঝি ওপারেও হওয়ায় চলে গেছে তখনই। মাহাদ এবার নিরবতা ভেঙে বলে উঠলো,
“ কেমন আছো?”
একটি প্রশ্নেই শিউলির অভিমান আর অভিযোগ গড়গড়িয়ে নামলো।
“ আপনি ভালো থাকতে দিছেন কই? আসবেন বলে কথা দিয়েও আসেন নাই। জানেন কত কি ঘইটা গেছে এতোদিনে।”
মাহাদ দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলল,
“ এলাম তো…”
মাহাদ কে পুরো কথা শেষ করতে না দিয়ে শিউলি বলে ফেললো,
“একমাস পর আসবেন বলে কথা দিয়ে সেই এলেন ছয়’মাস মাস পর। জানেন কতটা পুড়েছি আমি? কতটা ভেঙেছে আমার হৃদয়?”
“ তুমি অপেক্ষায় পুড়েছো আর আমি অনুশোচনায়, আঘাত, দুঃখ কষ্টেও পুড়েছি শিউলি। যাওয়ার আগে বলেছিলাম যদি কখনো না ফিরি তবে ভেবে নিও আমি মরে গেছি। হ্যাঁ আমি বেঁচে আছি তবে মায়ের আদর-ভালোবাসা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়ে মরেছি তিনমাস আগে। মা ছাড়া পৃথিবী আমার কাছে মৃতপ্রায় ছিলো। ধীরে ধীরে বুঝলাম নিজেকে। আল্লাহ যা করেন তা ভালোর জন্য হয়তো, যদিও এমন ভালো চাইনি কখনো।”
কথাগুলো বলতে গিয়ে মাহাদ প্রায় কেঁদে ফেললো। চশমা খুলে চোখের কোনে আসা জল মুছে নিলো। শিউলি অবাক চিত্তে তাকিয়ে রইলো। তার পরিবার সম্পর্কে জানেনা কিছু। কথা শুনে স্পষ্ট ধারণা না পেয়ে ও শুধালো,
“ কি হইয়াছে আপনার মায়ের?”
“ মা আর পৃথিবীতে নেই। তিনমাস আগে চলে গেছে পরপারে। যেখান থেকে আর কখনো ফিরে আসবে না, দেখতে পাবো না, পাবো না মায়ের আদর যত্ন ভালোবাসা।”
চোখের জল গড়িয়ে পড়লো এবার। শিউলির বুক কেঁপে উঠল। মানুষটার চোখের জল তাকে ব্যর্থিত করলো। কত শক্ত মানুষটা আজ কাঁদছে। তিনমাস থেকে নিশ্চয়ই আরো কত কেঁদেছে। অথচ আমি ভুল বুঝে বসে আছি।
শিউলির খারাপ লাগলো। কি বলে শান্তনা দিবে বুঝতে পারলো না। মা ছাড়া পৃথিবী ভাবলেই শিউলির নিজেরও কান্না পেলো। তার পর জানতে চাইলো,
“ উনি মারা গেলেন কিভাবে? ”
মাহাদ নিজেকে শক্ত করলো। চশমা টা পরিষ্কার করে চোখে দিয়ে উত্তর দিলো,
“মাঝে মাঝেই তার শ্বাস নিতে কষ্ট হতো।
সিঁড়ি ভাঙলে হাঁপিয়ে উঠতেন, কখনো কখনো বুকের ভেতর চাপ চাপ ব্যথাও অনুভব করতো। তবে সবসময় হাসিমুখে বলতো “বয়স তো হচ্ছে এসব স্বাভাবিক।”
মা ওতো বলতো না আমরা স্বল্প জেনে ভেবেছিলাম। এটা হয়তো সাধারণ দুর্বলতা, কাজের ক্লান্তি আর হালকা হার্টের সমস্যা। নিয়মিত কিছু ওষুধও চলছিল। কিন্তু কেউ বুঝতে পারেনি, তার হার্টের রক্তনালীগুলো ভেতরে ভেতরে ভয়ংকরভাবে ব্লক হয়ে যাচ্ছিল।
সেদিন ফজরের নামাজ পড়ে উঠে দাঁড়াতেই বুকের মাঝখানে তীব্র ব্যথা অনুভব করলে মা। মুহূর্তের মধ্যেই নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এলো। কপাল ভিজে গেল ঠান্ডা ঘামে। কয়েক সেকেন্ড পরই মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে। বাবা দেখে দৌড়ে গিয়ে কোলে নিয়ে আমাকে ডাকলেন। দিশেহারা হয়ে আমাদের হসপিটাল বাদ দিয়ে শহরের সবচেয়ে বড় এবং ভালো হসপিটালে নিয়ে যাই। তার পর হাসপাতাল জরুরি পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ধরা পড়ে মায়ের হার্টের তিনটি প্রধান রক্তনালীই মারাত্মকভাবে ব্লক হয়ে আছে।
আমার হাতটা কেঁপে উঠেছিলো রিপোর্টটা দেখে।
বাবা আর আমি নির্বাক হয়ে শুধু মায়ের নিস্তেজ মুখটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম।বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না এতদিন ধরে এত বড় একটা রোগ চোখের সামনে থেকেও বুঝতে পারিনি কেউ।
তৎক্ষণাৎ মা’কে আই সি ইউ তে নেওয়া হয়। সবকিছুর মাঝেও অবস্থার খুব একটা উন্নতি হচ্ছিল না। সিনিয়র কার্ডিয়াক বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট জানিয়ে দেয় রোগ এবং বর্তমান অবস্থা খুবই জটিল। উন্নত চিকিৎসার জন্য দ্রুত দেশের বাইরে নিতে হবে।
সেই রাতেই বাবা আর আমি সিদ্ধান্ত নিলাম হয় ভারতের চেন্নাইয়ে মা কে নিয়ে যাবো । এক সপ্তাহ পর অজানা ভয় আর একফোঁটা আশাকে বুকের ভেতর নিয়ে বাবা, আমি মায়ের স্ট্রেচারের পাশেই বসেছিলাম পুরো ফ্লাইটজুড়ে। তখন একজন চিকিৎসক হিসেবে নয়, বসেছিলাম শুধুই অসহায় এক সন্তান হয়ে।
বিদেশের হাসপাতালে বাইপাস সার্জারি করা হলো। প্রথম কয়েকদিন আমরা আশার আলো দেখতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু হার্ট অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গিয়েছিল আগেই। ধীরে ধীরে শরীরের অন্যান্য অঙ্গও দুর্বল হয়ে পড়তে লাগল।
একমাস ধরে আই সি ইউ এর কেবিনের মাঝখানে চলল জীবন-মৃত্যুর যুদ্ধ। শেষদিকে মা খুব আস্তে আস্তে কথা বলতেন। একদিন আমার হাত ধরে ফিসফিস মতো ধীর কন্ঠ করে বলেছিলো,
“আমি বাঁচবো না টের পাচ্ছি বাবা। দেশের মাটিতে মরতে পারলে শান্তি পেতাম আরেকটু। আমার ভয় ও করছে তোকে আর তোর বাবাকে রেখে যেতে সব সময় শক্ত থাকিস। তোর বাবাকে দেখে রাখিস। মানুষটা উপরে কঠোর হলেও ভেতরে অনেক নরম। এখান থেকে ফিরে মেয়েটা ঘরে তুলিস। তোর বাবাকে মানিয়েছিলাম কিন্তু আমার সাঁধ পূর্ণ হলো না। ছেলের বিয়ে এবং বউ দেখার সৌভাগ্য হবে না।”
“ আম্মা এসব বইলো না তুমি ঠিক হয়ে যাবে।” কথাটা শান্তনা দিতে বলেছিলাম। অথচ আমিও টের পাচ্ছিলাম মায়ের শরীরের অবস্থা। বুক ফেটে যাচ্ছিলো তবুও মায়ের সামনে হাসতাম। বাবাও মায়ের হাত ধরে শান্তনা দিতো।
তারপর এক ভোরে মনিটরের শব্দ ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে যায়। অক্সিজেন ও বন্ধ হয়ে যায়। চিরতরে হারিয়ে যায় আমার অর্ধেক সুখ ও শান্তি। বাবা কঠোর রূপ থেকে বেরিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো কত মানুষের সামনে। আমি স্তদ্ধ হয়ে নিরবে দাঁড়িয়ে ছিলাম। নিজেকে ব্যর্থ মনে হচ্ছিলো। পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় মানুষ সেদিন নিজেকে লেগেছিলো যে ডাক্তার হয়েও সে নিজের প্রিয় মানুষটাকে বাঁচাতে পারেনি। যে মায়ের খেয়াল রাখতে পারেনি,বুঝতে পারেনি অসুস্থতার ভার।”
মাহাদ থামলো। বলতে বলতে কত জল বিসর্জন দিলো সে নিজেও জানেনা। শিউলি নিজেও কেঁদে ফেললো মাহাদের কথা শুনে। মাহাদ ওর দিকে চেয়ে আশে পাশেও তাকালো। রাত হয়েছে তাই-তো বলল,
“ ঘরে যাও শিউলি। আমি ফিরেছি যখন কথা কাল হবে। নিরালায়ে বসে তোমার অভিযোগ শুনবো না হয়।”
শিউলি তড়িৎ গতিতে জবাব দিলো,
“ অভিমান, অভিযোগ কিছু নেই। যতটুকু ভুল বোঝা আছিলো সবটুকু মিটে গেছে। আপনার কষ্টের কাছে আমার অভিযোগ নিছক। ”
শিউলি যেতে নিলো। মাহাদ নিষ্পলক তাকিয়ে রইলো। সে কিছুটা গিয়েই আবারো দাঁড়ালো। বলল,
“আপনি থাকবেন কোথায়?”
“ নাজির বাড়ি আছে? ওর কাছে নয়তো জিহান থাকলে তার কাছে।”
“ দুজনেই আছে। তবে নাজির ভাই নতুন বাড়ি বানাইছে। নতুন সংসার হয়েছে মালার সঙ্গে। আপনি চলুন আমি দেখাই দিতাছি। আরো কত ঘটনা ঘটছে যাইতে যাইতে কাইতাছি আসেন।”
মাহাদ পা বাড়ালো শিউলির পিছু। হঠাৎ কিছু মনে পড়তেই বলল,
“ আমি তো মা কে নিয়ে যাওয়ার আগে একটা চিঠি পাঠিয়েছিলাম তোমাকে, পাওনি? অপেক্ষার দিন বাড়াতে বলেছিলাম সেই চিঠিতে।”
শিউলি অবাক হলো। মাথা নাড়ালো। মুখেও বলল,
“ কই পাই নাই তো। আপনার ঠিকানা জানিনা বলে চিঠি পাঠাতে পারি নাই। নাজির ভাই অনেক চেষ্টা করছিলো আপনার ঠিকানা যোগাড় করার কিন্তু পায়নি।”
“ কিন্তু আমি তো নাজিরের নামে চিঠি পাঠিয়েছিলাম।”
“নাজির ভাইজান পেলে তো দিতো আমারে। অন্য কেউ পাইছে নাকি?”
“ হতে পারে।”
মাহাদ এ বিষয়ে আর কিছু না বলে হাঁটতে থাকলো। যেতে যেতে শিউলি এতোদিনে ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনা শিউলি মাহাদ কে বলতে শুরু করলো। কষ্টের মাঝেও মাহাদ বহুদিন পর একটুখানি শান্তি অনুভব করলো।
______________
দীর্ঘ শ্বাস আর যন্ত্রণা নিয়ে পার করা সময় বেশ দীর্ঘ হয়। মনে হয় রাত পেরোয় না, চোখে ঘুৃম আসে না। দু-চোখ চেয়ে থাকে। অনিশ্চিত জীবনের গতি আর বাস্তবতার কষাঘাতে জর্জরিত হয়ে উঠে জীবন।
পাপিয়া ভোররাতে উঠে পড়েছিলো। নামাজ পড়ে বাড়ি থেকে একা বেরিয়ে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকা আম গাছটার নিচে তাকিয়ে ছিলো অনেকক্ষণ। ভাবনায় দোলাচল চললো খানিকক্ষণ। পরমুহূর্তেই সৃষ্টিকর্তার ভয় জেঁকে ধরলো। আত্মহত্যা মহাপাপ। পৃথিবীতে শান্তি পায়নি মরার পরেও তো পাবে না।
আরেকবার ভাবলো, এমন জীবন নিয়ে বেঁচে থাকা যে কঠিন।
তখনই হুট করে না চাইতেও মনে পড়লো বিয়ের আগে মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছে আরবি শিক্ষা নিয়েছিলো। একদিন কথায় কথায় তিনি বলেছিলো, ‘ আল্লাহ তায়ালা আমাদের পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন পরীক্ষা নিতে। কে কতটা সৃষ্টির সেবা এবং তার ইবাদত করছেন তা দেখতে। কষ্ট ছাড়া জীবন খনিকের জন্য এই পৃথিবীতে আরামদায়ক কিন্তু ওপারে নয়। আল্লাহ তাকেই কষ্টে রাখেন যাকে তিনি বেশি ভালেবাসেন। কষ্টের পর স্থায়ী সুখ দিবেন বলে।’
ইমাম সাহেব এই কথাটা ওকে থামিয়ে দিলো এই মহাপাপ থেকে। যেন সৃষ্টিকর্তা নিজেই মনে করিয়ে দিলো। পাপিয়া আবারো আগের মতো বাড়ি চলে আসে। কাল রাতে ওর বাবা বলেছে আবারো বিয়ে দিতে চায়। কোনো এক লোক ও নাকি রাজি হয়েছে তবে বয়স ৪০ এরও বেশি। তার তো সবে উনিশ। সন্তান তার লাগবে না কারণ আগের পক্ষের সন্তান ও আছে তাই। পাপিয়া বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তার পর আর কিছু বলতে পারে না। এই খবর কোনোভাবে জিহানের কাছে পৌছায়।
পাপিয়া সবে সকালে বাসি থালাবাসন মাজছিলো তখনই শিউলি আর মালার আগমন ঘটলো। ওদের দেখে পাপিয়া হাসলো। উঠে দাড়িয়ে মালা কেই প্রথম শুধালো,
“ কেমন চলছে নতুন সংসার জ….
বলতে গিয়ে থেমে যায়। জা বলার অধিকার আর সম্পর্ক কি আছে? না তাহলে বলবে কিভাবে?
মালা হেসে এগিয়ে আসলো। বলল,
“ ভালা। এখন চলো দেখি।”
পাপিয়া শাড়ির আঁচল কোমর থেকে ছাড়িয়ে দিয়ে শুধায়,
“ কোথায় যাবো?”
“ মালা আর নাজির ভাইয়ের নতুন সংসার আর বাড়ি দেখতে। নাজির ভাই তোমারে যাইতে কইছে আপা।”
শিউলি বলেই থামলো। সম্পর্ক যখন পরিবর্তন হয়েছে তখন সম্মোধন ও হবে। পাপিয়া এক পলক ওর ভাবির দিকে চায়। মুখচোখ গম্ভীর করে তাকিয়ে আছে এদিকেই। ও স্বাভাবিক ভাবেই রাজি হলো। বলল,
“চল যাই কিন্তু ফিরবো শিগগি। কাজ আছে মেলা।”
কথাটা হয়তো ভাবিকে শোনার জন্য জোরে বলল। তার পর শিউলি আর মালার সঙ্গে বেরিয়ে পড়লো।
নাজিরের বাড়ির উঠোনে বসে আছে জিহান নাজির আর মাহাদ। তাদের ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে আছে জিহানের বাবা শফিকুল। মুখ বেজার। মাহাদ কে তিনি এবার কড়া করে বললেন,
“তুমি শহর থেকে এসেছো তোমারে সম্মান করি কিন্তু এমন কথা মানতে বলিও না বাবা। সমাজে চলতে হলে সমাজ মানতে হবে।”
মাহাদ নিজেও এবার দাঁড়িয়ে গেলো। এতো কথা বলেও বুঝতে চাইছেন না তিনি তবুও মাহাদ হাল ছাড়লো না। বলল,
“ সমাজ মানতে নিষেধ করিনি। সমাজে চলতে হলে মানতে হবে আমিও বলছি। কিন্তু কুসংস্কার তো নয়। এই গ্রামে আসার পর বুঝতে পারি চারদিকে কুসংস্কারের বাস। অধিক কুসংস্কার কেবল নারীর জন্য বরাদ্দ কিন্তু কেন? কুসংস্কার কেন পুরুষদের বেলায় নেই? কলঙ্ক, কুসংস্কার সবই নারীর ভূষণ বলে কিছু মানুষ চলাই দেয়।”
মাহাদ একটু থামে। দম ফেলে আবারো বলতে শুরু করে ,
“ আপনি শিক্ষিত মানুষ এটা তো জানার কথা সন্তান না হওয়ার জন্য শুধু নারীর দোষ থাকে না। এটা পুরুষের ও হতে পারে আবার উভয়ের ও। এমন ও হতে যে ঘরে সন্তান হয়নি আরেক ঘরে হলো। এর জন্য চিকিৎসা ও আছে কিন্তু আপনারা ঝাড়ফুঁক বিশ্বাস করে ডাক্তারের চিকিৎসা নেননা।”
শফিক সাহেব এবার একটু চুপ হলেন। এর মধ্যে জিহান বলে উঠলো,
“ আব্বা আপনি যদি পাপিয়াকেও না মানেন তাহলে ঠিক আছে। বংশধর চান? আমি পাপিয়াকে বিয়ে না করলেও অন্য কাউকে বিয়ে করবো না জীবনেও। তখন ভালো লাগবে?”
শফিক সাহেব ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কেমন বিষন্ন চোখমুখ। এর মধ্যে পাপিয়া আর মালা কেও দেখতে পেলো দুয়ারে দাঁড়িয়ে আছে। হয়তো কিছু কথা শুনতেও পেয়েছে।
মালা পাপিয়ার হাত ধরে ভেতরে নিয়ে আসলো। ওর এতক্ষণে আসল খবর জানা হয়ে গেছে। ভয় করছে একটু। পা কাঁপছে অযথাই। জিহানের দিকে নজর পড়তেই শিথিল হলো দৃষ্টি। কি ভালোবাসা ওই চোখে অথচ জুটেনি ওর কপালে।
শিউলি তখনই ছুটে আসলো। তার মনে ভীষণ আনন্দ। শফিক সাহেব অনেক ভেবে নিরবতার মধ্যে গম্ভীর কন্ঠে বললেন,
“ঠিক আছে জিহান যখন চায় ওর জন্য আমি রাজি হলাম। আমি কথা বলবে পাপিয়ার বাবার সঙ্গে।”
মুহূর্তেই চারপাশে উচ্ছাস ছড়িয়ে পড়লো চারদিকে। জিহান অবাক হয়ে তাকালো। নাজির হাসছে। মাহাদের মুখেও চাপা হাসি। সে যেন জানতোই রাজি হবে। শিউলি আর মালা পাপিয়াকে আলতো করে জড়িয়ে অভ্যুত্থা জানানের মতো অনুভব করালো। পাপিয়া স্তদ্ধ, নিশ্চুপ। কি বলবে বুঝতে পারছে না। শফিক সাহেব ইতিমধ্যে বেরিয়ে গেছেন।
মাহাদ এবার পাপিয়ার দিকে চাইলো। বলল,
“এবার অন্তত রাজি হন। জিহান আপনার জন্য ভালবাসার ময়দানে লড়াই করলো। জয়ী হওয়ার দ্বারপ্রান্তে শুধু আপনার রাজি হওয়াতেই জয় নিশ্চিত।”
পাপিয়া জিহানের দিকে চাইলো। ও আশায় চেয়ে আছে। কত আশা ভেঙেছে। সুখের কারণ না হলেও দুঃখের কারণ হয়েছে। এবার কি একটু সুখ পাওয়া উচিত নয়? পাপিয়া ভাবলো সবকিছু। দুয়ারে দাঁড়িয়ে যেহেতু জিহানের স্পষ্ট স্বীকারোক্তি শুনেছে তাই সাহস নিয়ে বলেই ফেললো,
“ জয় যদি হয় আমার কারণেই তবে আমি রাজি।”
পাপিয়ার উত্তরে সকলে খুশি হলো তবে সবচেয়ে খুশি জিহানই হলো। বেচারা খুশিতে কথা বলতে ভুলে গেলো। কেবল মাহাদ কে জড়িয়ে পিঠে হাত রেখে কৃতজ্ঞতা জানালো।
_________
সময়টা দুপুর। মাহাদ মাতবর বাড়ির দিকে পা বাড়ালো। নাজির কে আসতে বললে সে এলো না তাই একাই বেরিয়ে পড়লো। পথে শিউলির মায়ের সঙ্গে দেখা। ভালোমন্দ শুধিয়ে তিনি বাড়িতে যাওয়ার জন্য বললেন ও। মাহাদ হেসে রাজি হলো। পরে যাবে বলে বিদায় নিলো।
মাতবর বাড়িতে প্রবেশ করতেই প্রথমে একজন অচেনা অতিব সুন্দরী নারীকে নজরে পড়লো। সে ছাঁদে দাঁড়িয়ে ওকে দেখেই বলছে,
“ কেডা? এখানে কি চাই?”
মাহাদ উপরে এক পলক তাকিয়ে কোনো উত্তর না দিয়ে ভেতরের দিকে গেলো। অচেনা হলেও সাহেলের নতুন বউ বুঝতে অসুবিধা হলো। বর্ননা শুনেছে তাতেই চিনতে পেরেছে।
মাতবর বাড়ির উঠোনে পা রাখতেই সাহেলের সঙ্গে দেখা হয়। ওকে দেখেই একটু ভড়কে যায়। মাহাদ ওর অবস্থা দেখে হেসে উঠলো।
“ ভয় পাচ্ছেন? কই আল্লাহ কে তো পান না। তাহলে কি এমন কাজ করতে পারতেন? যে যোগ্য সন্তান এবং স্বামী হতে পারেনি সে কি করে যোগ্য পিতা হবে?”
সাহেল আশে পাশে তাকালো। চোখ মুখ শক্ত করে চুপ করে রইলো। কিছু বলতে পারছে না যেন জবান কিছুতে আঁটকে আছে। মাহাদ ওর মুঠো করা হাতের দিকে তাকালো। আবারো বলল,
“ জুয়ার নেশায় নিজ বাড়িতে চুরি করে অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপাতে লজ্জা করে না অথচ সত্যি কথা বলাতে রক্ত টগবগিয়ে উঠে?”
সাহেলের ধৈর্য এবার ভাঙলো। দাঁত খিঁচিয়ে রেগে বলে উঠলো,
“ দূর্বলতা জেনে গেছিস বলে ভাব বেড়েছে? এই গ্রামে আবার কেন এসেছিস?”
অভদ্র আচরণে মাহাদ অসন্তুষ্ট হলো। ঠোঁট চেপে ধরলো। কিছু একটা ভেবে বলল,
“এর চেয়েও বড় দূর্বলতা জানি। সঠিক সময় আসলে ফাঁস করে দিবো। শুধু অপেক্ষা করুন।”
মাহাদের হুমকি সরূপ কথায় সাহেল ভয় পেলো না কিনা তা না দেখেই চলে গেলো ভেতরের দিকে। সাহেল না চাইতেও ভয় পেলো কেন যেন। হয়তো কিছু লুকিয়ে আছে আরো গভীরে।
মাহাদ নুরুল আলমের সঙ্গে দেখা করে বেরোনোর সময় নীরার সঙ্গে দেখা হলো। গায়ে পড়া ভাব যায়নি এখনো। মাহাদ অগ্রাহ্য করে চলে এলো। মাতবর বাড়িতে কর্মরত একটা মহিলা কে নিধি কোথায় আছে শুধালো। জানালো পুকুর পাড়ে নাকি আসে আছে। মাহাদ সেদিকে গেলো। গিয়ে দেখলে নিধি পুকুর পাড়ের সিঁড়িতে বসে পানিতে ঢিল ছুঁড়ছে অনবরত। সে মাহাদ কে লক্ষ্য করেনি।
“কেমন আছেন?”
অনাকাঙ্ক্ষিত কন্ঠে চমকালো নিধি। তড়িৎ গতিতে পিছনে ফিরলো। মাহাদ কে দেখে উঠে পড়লো। মনে হলো আশার আলো দেখলো। প্রতিত্তোরে বলল,
“ আছি ভালো।”
“ এতো বিষাদ নিয়ে বলছেন কেন?
এই নিন আপনার উপহার। ”
মাহাদ বাড়িয়ে দিলো একটা ব্যাগ। তার ভেতরে আছে হয়তো কিছু। নিধি শুধু তাকালো। জিজ্ঞেস করাই আগেই মাহাদই উত্তর দিলো,
“ সাঈদ পাঠিয়েছে আপনার জন্য। আপনাকে বলে গিয়েছিলো উপহারের কথা তাই পাঠালো।”
নিধি মাহাদের সামনে হাসার চেষ্টা করলো। ঠোঁটের কোনে ধরে রাখলো হাসি। যেন সে উপহার পেয়ে ভীষণ খুশি। তবে ব্যর্থিত হলো হৃদয়। হয়তো সাঈদ আসবে ভেবেছিলো। কিন্তু এটা ভাবা বোকামি সে নিজেও জানে। তবে ভদ্রতায় বলল,
“আমার হয়ে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে দিবেন উনাকে। উপহার পেয়ে আমি খুশি হয়েছি।”
“ খুলে তো দেখেননি। কি আছে না জেনে খুশি? ”
মাহাদের প্রশ্নে ভড়কালো নিধি। চতুর মাহাদ বুঝতে পেরেছে নিধির ছলচাতুরী। নিধি ওর কথা ভুল প্রমাণ করতে বলল,
“উপহার যাই আসুক তা আনন্দের সহিত গ্রহণ করা উচিত বলেই জানি।”
“ সত্যিই আনন্দিত আপনি?”
আরেকবার থমকালো নিধি। একের পর এক আশ্চর্যজনক আর বিভ্রান্তিকর প্রশ্ন করছো মাহাদ।
আসলেই খুশি সে? নিজেকে প্রশ্ন করলো।
কিছু উপহার আনন্দের চেয়ে দুঃখ দেয় বেশি এটাও ওর কাছে তেমনই হবে। আফসোসের স্মৃতি হিসাবে রয়ে যাবে।
“ হ্যাঁ খুশি।” নিধি হাসতে হাসতে বলল। মাহাদ যেন আর কিছু বলতে না পারে এজন্য প্রসঙ্গ পাল্টালো।
“ আপনি আসাতে খুশি হয়েছি। শিউলি আপনার জন্য কত মন খারাপ করে থাকতো। অপেক্ষা করতো রোজ।”
“ আপনি কারো অপেক্ষা করেন না?”
“ আমি? না তো। অপেক্ষা করার মতো কেউ নেই। অপেক্ষায় কেউ রাখেনি কখনো।”
নিধি এবার পা বাড়ালো। পিছন থেকে মাহাদের কন্ঠে শুনতে পেলো,
“ সাঈদের বাবা মা নেই। বড় হয়েছে মামা মামির কাছে। এক র্দুঘটনায় ওর মামা মারা যায় তখন নিজ কাঁধে দায়িত্ব পড়ে যায়। মারা যাওয়ার আগেই বলেছিলো পড়াশোনা শেষ হলে উনার মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিবে। যেহেতু ছেলের মতো মানুষ করেছে, পড়াশোনা করিয়েছে। উনার জন্য আজ ডাক্তার সে তাই ভালোলাগা, ভালোবাসা বিসর্জন দিয়ে হলেও মূল্যায়ন করছে নিজের সফলতার সবচেয়ে অবদান রাখা মানুষটার। এই যুগে কে এমন করে বলুন?”
নিধি আর দাঁড়ালো না চলে গেলো ধীরে ধীরে। যেতে যেতে এতটুকুই কান পর্যন্ত পৌঁছালো। হুট করে মনে পড়া মানুষটার স্মৃতি আবারো জেগে উঠলো। সময়ের তালে মনে পড়া কমেছিলো এভাবে একদিন বহুবছর পর হয়তো মনেও পড়তো না। তবে এখন তা সম্ভব হলো না।
চলবে……………….?

