#একটা_ছিলো_সোনার_কন্যা
#শ্যামলী_রহমান
#পর্ব—২৯
চৈত্রের শেষ প্রায়। বসন্তের এবার মলিন হবার পালা। গ্রীষ্মের আগমনী বার্তা গরম আর কড়া রোদ। তবুও এখনো চারদিক এখনো বসন্তের গন্ধে লেগে আছে। শান্তি নীড় থেকে সামান্য দূরে স্কুল মাঠে একটা কৃষ্ণ চূড়াগাছ আছে। লাল রঙা ফুল বড় মুগ্ধ করে শিউলি কে। মাহাদ একদিন একগুচ্ছ কৃষ্ণচূড়া হাতে সামনে এসে বলল, “শোনা সোনার কন্যা এই বসন্তে আমার হৃদয় রাঙানোর জন্য উপহার স্বরূপ তোমাকে একগুচ্ছ কৃষ্ণচূড়া।”
শিউলির সে কি খুশি। মাঠ-ঘাট, নদী আর ফুল ভালোবাসা মেয়েটা স্বল্পতেই হয় মহাখুশি।
দিন, সপ্তাহ ফুরিয়ে বিয়ের প্রায় দুমাস হতে চললো।
শহরে আসা দেড় মাস পেরিয়েছে। কত কি পরিবর্তন হয়েছে। শিউলি মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার জন্য এখানের স্কুলে ভর্তি হয়েছে। শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে অভ্যাস করেছে। মন চাইলে মাঝে মধ্যে মাহাদের সঙ্গে গ্রাম্য ভাষায় কথা বলে। চারপাশের মানুষজনের মতো সমাজ ও পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সালোয়ার কামিজ পরে এখন সে। শাড়ি ও মাঝে মধ্যে যখন মন চায় আনন্দে মাততে। নথ রেখে কেবল নাক ফুল পরে। এখানে আসার দুদিন পর নিধি, সাঈদ, আরহাম এসেছিলো। তার পরেও কিছুদিন বাদে শিউলিকেও রেখে এসেছিলো নিধির কাছে। দূরত্ব খুব বেশি নয়,আবার খুব কাছেও নয়। রিকশায় বিশ মিনিটের পথ। মাঝে মধ্যে আসা যাওয়া, দেখা হয়।
আজই মালা একটা চিঠি পাঠিয়েছে। মাহাদ হসপিটালে গিয়েছে। হাতের সব কাজ শেষ করে শিউলি বসলো খানিক আগে ডাকপিয়নের দিয়ে যাওয়া চিঠি নিয়ে। ভাঁজ খুললো উচ্ছাস নিয়ে। পুরো চিঠি পড়ে খনিকের জন্য মন খারাপ হলো। বাবা,মা, দাদি এমনকি মালার নিজের তাকে সঙ্গী হিসাবে না পাওয়ার দুঃখ প্রকাশ করেছে। তবে শেষের অংশটুকু পড়ে সবচেয়ে বেশি খুশি হলো। মুখের হাসি সরলো না একটুও। খুশিটা ভাগ করতে শিউলি দৌঁড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে বসার ঘরে আসলো। টেলিফোনে পরিচিত নাম্বার খানা ডায়াল করলো। কিন্তু ধরবো না কেউ। তিনবার দিয়েও না ধরলে শিউলি আর দিলো না। হয়তো ব্যস্ত ভেবে নিলো। সোফা ছেড়ে উঠে ভিজিয়ে রাখা কাপড়গুলো কেচে নেড়ে দিলো ছাঁদে। তপ্ত রোদেলা দুপুর। চৈত্রর কাঠফাঁটা রোদ্দুর। একেলা সময় কে ব্যস্ত করতে সিডি প্লেয়ারে ‘একটা ছিলো সোনার কন্যা’ গানটা চালু করলো। এখন পর্যন্ত কতবার শুনেছে তার ঠিক নেই। প্রথমবার যখন সিনেমা সহ এই গানটা দেখে তখন অবাক হয় নায়িকার সঙ্গে তার সাজ পোশাক এমনকি গ্রামের ও মিল আছে।
এখন স্পষ্ট বুঝতে পারে মাহাদ কেন সোনার কন্যা ডাকতো তাকে।
এর মধ্যে টেলিফোন বেজে উঠলো। শিউলি সিডি প্লেয়ার বন্ধ করে টেলিফোন কানে নিলো।
“ হ্যাঁলো।”
“ হুম বলো শিউলি।” কন্ঠ শুনে মনে হলো ব্যস্ততায় আছে। শিউলির উচ্ছাসিত কন্ঠ ক্ষীন হলো। বলল,
“ আপনার ব্যস্ততা আজকাল এতো বেড়েছে কেন ডাক্তার সাহেব?”
কন্ঠে স্পষ্ট অভিযোগ। সঙ্গে বোধ-হয় অভিযোগ ও। মাহাদের হাত থেমে গেলো। সে ওই মুহূর্তে কিছু একটার মনোযোগ দিয়ে মেলানোর চেষ্টা করছিলো। হঠাৎই তার মনে হলো তাই-তো। কিছুদিন যাবত বাড়িও ফিরে রাতে। তবে এতো প্রেসার পেসেন্টদের জন্যে। শহরের আশে পাশে হঠাৎ করে গুটি বসন্ত রোগের দেখা দিয়েছে। হসপিটালে একের পর এক রোগী আসতে আছে। চারপাশে রোগীর হিড়িক লেগেছে। বলা হয়নি শিউলি কে তাই অভিমান কর স্বাভাবিক। মাহাদ সবে কিছু একটা বলতে নিলো,
“ আস…
কথা শুরুর আগেই লাইন কেটে গেছে মাহাদ তা টের পেলো মাত্র। চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। তখনই কেউ একজন এসে বলল,
“স্যার আপনাকে উজান স্যার ডাকছেন জুরুরি।”
“ঠিক আছে যাও আমি আসছি।”
মাহাদ এক পলক টেলিফোনের দিকে তাকিয়ে বেরিয়ে গেলো জুরুলি তলবে। একরাশ অভিমান জমা পড়লো তার অপরপ্রান্তের হৃদয়ের ঘরে।
_________
সাঈদ আজ দুপুরেই বাড়ি এসেছে। আজ আর ডিউটি নেই হসপিটালে। মাহাদ আর সে ভিন্ন হাসপাতালে। আরহাম আর সাঈদের একই স্থানে।
নিধি আর সাঈদ দুপুরের পর ঘরে বসে গল্প জুড়েছিলো। তখনই স্নিগ্ধার আগমন ঘটলো। দরজায় ঠকঠক করে অনুমতি চাইলো,
“ আসবো?”
“ আরেহ হ্যাঁ এসো।”
নিধি উত্তর ভেতরে আসলো। সাঈদ কিছু একটা মনে পড়তেই ঘর থেকে বেরিয়ে ডাকতে শুরু করলো, “ মামি মা?”
স্নিগ্ধা নিধির পাশে বসলো। এই দু-মাসে ওদের সম্পর্ক বন্ধুত্বে পরিনত হয়েছে। অবসর সময়ে সঙ্গী হিসাবে মেয়েটাকে পায়। কলেজে গেলে অপেক্ষা করে কখন আসবে গল্প করবে দুজনে। এর মধ্যে কখনো সখনো মামি মাও থাকেন।
স্নিগ্ধা আশে পাশে তাকাচ্ছে চোরের মতো। নিধি তা লক্ষ্য করে বলল,
“ কি হয়েছে বলো তো? এভাবে তাকাচ্ছো কেন?”
স্নিগ্ধা দরজা থেকে নজর সরিয়ে ফিসফিস কন্ঠে বলল,
“কাল তোমার সঙ্গে নির্ঝরের দেখা করাবো। তুমি যাবে কিন্তু। তোমার পছন্দ হবে পাক্কা। তার পর ভাই কে বলবে। খোঁজ নিয়ে খারাপ তথ্য দিতে পারলে বিয়ে দিবে না। আমি জানি নির্ঝর ভালো ছেলে। তোমার মতামত পেলেই ওকে জানাবো তখন বিয়ের সম্মন্ধ পাঠাবে। বেকার প্রেমিক কিছুদিন হয়েছে চাকরি পেয়েছে এজন্য তার ভালোবাসাকে সম্পর্কে পরিনত করার তাড়া বেড়েছে। বেকার প্রেমিক থেকে এবার দায়িত্বশীল স্বামী হতে চায় সে।”
কঠিন বিশ্বাসের সহিত হেসে হেসে কথাগুলো শেষ করলো স্নিগ্ধা। উচ্ছাস প্রতিটি শব্দে। নিধি আশ্বস্ত করলো। দোনোমোনো করেও বলল,
“ঠিক আছে যাবো না-হয়। তুমি বরং এ নিয়ে পরে কথা বলিও। তোমার ভাইজান আসছে দেখো।”
স্নিগ্ধা তাকালো সাঈদ আসছে তাদেরই দিকে। ও বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে। সাঈদ এসে শুধালো,
“সারাদিন কি গল্প করো বলোতো? এতো কথা বোধ-হয় আমার সঙ্গেও বলো না।”
নিধি মুখ বেঁকিয়ে ঠাড্ডা করে উত্তর দিলো,
“ডাক্তারদের প্রেমালাপ চলে রোগের সঙ্গে, হৃদয়ের কথা কি আর মনে থাকে?”
সাঈদ ঘাড়ে মাথা রেখে প্রতিত্তোরে বলল,
“রোগী তুমি হলে রোগ বাদ দিয়ে রোগীর সঙ্গে প্রেমালাপ করবো, তার হৃদয়ের কথা শুনবো চুপটি করে। বসবো কিছুক্ষণ নিরব পাশে।”
নিধি সরে গেলো ইচ্ছে করে। সাঈদ বিছানায় মাথা হেলে পড়ে গেলো মুহূর্তে। দাঁড়িয়ে বলল,
“ বাড়িতে চিঠি পাঠিয়েছেন?”
“ জ্বী মহা রানী।”
“আর ফিরতি চিঠি আসেনি?”
“না সাহেবা।”
নিত্য নতুন নামে নিধি ভ্রু উঁচু করে তাকালো। বলল,
“ আর কোনো সম্মোধন বাকি আছে?”
সাঈদ উঠে পড়লো বিছানা থেকে। নিধির সামনে কাছাকাছি দাঁড়িয়ে চোখের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলো,
“একটা নাম বাকি আছে।”
“ কি?”
“আমার সন্তানের মা। এই সম্মোধনে তোমাকে বেশ মানাবে নিধি।”
নিধি কেবল লাজুক হাসলো। সাঈদের স্থির দৃষ্টি। অনুভূতি প্রকাশ পাচ্ছে মানুষটার চোখে মুখে। কত সম্মান,ভালোবাসা সে চোখে। গত দুই সপ্তাহ আগে থেকে আপনি থেকে তুমি সম্মোধন করে। নানান নাম তো আছেই। নিধির বেশ ভালো লাগে শুনতে।
প্রিয় মানুষের মুখে নানান নামে ডাক শুনতে সবারই ভালো লাগে।
_____
মালা মাতবর বাড়ির পেছনের পুকুর পাড়ে বসে আছে। আশে পাশে কেউ নেই। নীরার সঙ্গে তার ভাব নেই। কথাই বলে না আর ভাব তো দূর। ওর অবশ্য বিয়ের কথা চলছে হয়তো ক’দিনের ভেতর বিয়েও দিবে।
নিশ্চুপ মালার পাশে নিঃশব্দে এসে নাজির বসলো। মালা টের পেলো তাকালো ডানপাশে। আন্দাজ করার চেষ্টা করলো স্ত্রীর ভাবমূর্তি। শুধালো,
“মন খারাপ?”
“উহু।
“তাহলে?”
“শিউলি কে মনে পড়ছে, কতদিন আমরা একসাথে গল্প করিনা,মেঠো পথে ছুটিনা,নদীর পাড়ে নাইতে যাই না। কত স্মৃতি চারপাশে ঘোরে মনে হয় এখনো আমরা ছুটছি গ্রামের প্রতিটি প্রান্তে।”
নাজির কেবল শুনে গেলো। সঙ্গীহীন দুটো পাখি দুই দেশে যেন। মালার ভার মুখশ্রী উজ্জ্বল করতে নাজির প্রচেষ্টা চালালো। বলল,
“ শিউলি চারটে চিঠি পাঠিয়েছে জানো? একটা তোমার জন্য বরাদ্দ কিন্তু তুমি কি তা পড়বে? নাকি মন খারাপ করে বসে থাকবে?”
“কোথায় দিন।” মালা কিছুটা খুশি হয়ে চাইলো। নাজির শর্ত দিলো।
“আরেকটু হাসো তাহলে দিবো।”
প্রথমে চোখ পাঁকালেও চিঠির লোভে হেসে ফেললো তার দিকে চেয়ে। নাজির চিঠি খানা দিলো মালার মেলে রাখা হাতে। সে চটপট খুলতে শুরু করলো চিঠির ভাঁজ। মনে হয় দেরি করলে প্রতিটি শব্দ উধাও হয়ে যাবে। নাজির শুধু তার কান্ড দেখছে। মালার তার প্রতি ভালোবাসা বোনের মতোই। সে চিঠির শব্দ গুলো নিঃশব্দে উচ্চারণ করছে। প্রথমে মুখ ভার হলেও শেষে মন ভালো হয়ে গেলো। তাকে ঘিরে কত কথা লেখা। শিউলি ভালো আছে এটাও জানিয়েছে। এই ভালো থাকাই প্রতিটা আপনজন চায়। করিম মিয়া পড়ালেখা জানে না তেমন। নাজির চিঠি পড়ে শুনিয়ে এসেছে। মেয়ের জন্য মন আকুপাকু করে।
_______
সময়টা তখন সন্ধ্যা। শিউলি আর মাহাদ বেরিয়েছে বাড়ি থেকে। নির্জন পথ চলছে দুজনে হেঁটে। বাড়ির পাশে একটা রাস্তা আছে এদিকটায় মানুষের চলাচল দিনে হলেও সন্ধ্যার দিকে কম থাকে গলি পথ বলে। শিউলি হাঁটছে আগে আগে মাহাদ তার পেছনে। নীল শাড়ি পরিহিত নারী কে দেখে আলগোছে এগিয়ে গেলো। শাড়ির আঁচল হাতে নিয়ে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বলল,
“এবার একটু কথা বলো। ব্যস্ততা ছিলো অযুহাত নয়। আজ পুরো রাত তোমার নামে দিলাম। আমার প্রিয় নায়কের সিনেমা দেখাবো, ঘুরাবো শহরের অলিগলি। তোমার পছন্দের চুড়িও কিনে সত্যি বলছি।”
মাহাদের কথায় শিউলি আর রাগ করে থাকতে পারলো না হেসে দিলো মিটিমিটি। একটু আগে ফিরে শাড়ি পরার আদেশ করলো চুপচাপ মেনে নিয়ে বেরিয়ে আসলো। শিউলি এবার বলল,
“ আপনার মাঝে কি আছে বলুন তো ডাক্তার সাহেব?”
“ কি আছে? ” একটু ঝুঁকে অবুঝের ভান করে সে নিজেও জানতে চাইলো।”
“ রাগ করে থাকতে পারিনা কেন?”
“ আপনার জন্য অঢেল ভালোবাসা বেগম সাহেবা।”
শিউলির হাসি এবার শব্দ ছড়ালো। খিলখিলিয়ে হেসে উঠা শ্যামলা মেয়েটার দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইলো। কিছুটা পথ পেরনোর পর রিকশায় উঠলো। শিউলি এবার শুধালো,
“কোথায় যাচ্ছি আমরা?”
“মধুমিতা সিনেমা হলে। আমার প্রিয় নায়ক সালমান শাহ এর সিনেমা দেখতে।”
“ সিনেমার নাম কি শুনি?”
“ তোমাকে চাই।”
“মজা করছেন?”
“ না সত্যি বলছি। আমি তো তোমাকে পেয়েছিই আবার চাইবো কেন? সিনেমার নামই তোমাকে চাই।”
হুট করে শিউলির মনে পড়লো একটা কথা। উচ্ছাসিত কন্ঠে বলল,
“শুনেছেন একটা খুশির খবর? পাপিয়া আপা সন্তান সম্ভাবা। মালা চিঠিতে লিখেছে আমার কি যে আনন্দ লাগছে!”
“যাক তবে এবার প্রতিবেশীদের মুখ বন্ধ হবে। দোষ তার নয় প্রমাণ পাবে। আল্লাহ কপালে সুখ লিখে রাখলে কি আঁটকে রাখতে পারে?”
________
সিনেমা দেখা শেষ করে হল থেকে বেরোলো ওরা। শিউলি এই প্রথম সিনেমা হলে এসেছে। চারদিকে কত মানুষের ঢল সিনেমা দেখতে। মাহাদ এবার জানতে চাইলো,
“কেমন লাগলো সিনেমা?”
“ দারুন। অভিনেতার অভিনয় এবং চলন,কথা বলার ধরন সবই সুন্দর। আগে কখনো এতো সুন্দর অভিনয় দেখিনি।”
মাহাদ কিঞ্চিৎ হিংসাত্মক কন্ঠে বলল,
“আমায় রেখে নায়কের প্রেমে পড়িও না আবার। ‘হ্যাঁ সালমান শাহ এর মতো কিংবদন্তী অভিনেতা দেশে আর জন্ম নিবে না। তার রহস্যময় মৃত্যু লক্ষ,লক্ষ দর্শক কে কাঁদিয়েছে।”
“এক জীবনে আপনার প্রেমে পড়েই কুল কিনারা পেলাম না আর অন্য কেউ? সে তো অভিনেতা হিসাবে ভালোলাগা মাত্র।”
__________
রাইসুল রহমান আজ বাড়িতে আছেন। ঘরে বসে উপন্যাসের বই পড়ছেন। মাহাদ দুপুরে এসেছিলো, ছিলো কিছুক্ষণ তার পর খাবার খেয়ে আবার বেরিয়ে গেছে হাসপাতালের উদ্দেশ্য। শিউলি সময় পার করতে সেলাই করে নকশীকাঁথা। অর্ধেকটা হয়ে এসেছে প্রায়। এটা শেষ হলে ছোট দু একটা কাঁথা সেলাই করবে জিহান আর পাপিয়ার বাবুর জন্যে এটা ভেবে রেখেছে সে। সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে মন খারাপ কমলেও হুট হাট মনে পড়ে মায়ের শাসন আর বাবা আহ্লাদ। এই তো দুপুরেও মনে পড়ছিলো। শালিকের কথা ভেবেও মন পুড়ছিলো। আকাশে উড়ন্ত পাখি দেখলেও মনে পড়ে।
বিকেল গড়িয়ে গেছে। শিউলি ছাঁদে কিছু ফুলের গাছ লাগিয়েছে। পানি দিতে গেলো সেখানে। শান্তির নীড় থেকে স্বল্প দূরে আরেকটা দুই তলা বিশিষ্ট বাড়ি আছে। ওখানে একটা মেয়ে থাকে নাম রিমঝিম। তার সঙ্গে আলাপ হয়েছে কিছুদিন হয়েছে। কখনো আসে ডাকলে খনিকের সঙ্গী হয় সে। ছাঁদে উঠতেই তাকে দেখতে পেলো বসে আছে কাঠের বেঞ্চে মলিন মুখে।
“ কি হয়েছে রিমঝিম?”
মেয়েটা তাকালো মুখ তুলে। শিউলি কে জানালো অভিযোগ।
“বাড়িতে অশান্তি আমাকে ঘিরে। ভালো লাগে না কিছু। আমি একটা মানুষই কেন সবার বোঝা বলতে পারো? মা তার সঙ্গে করে আমায় নিয়ে গেলেও পারতো। নিত্যদিন খোঁটা শুনতে শুনতে মরে যেতে করে।”
বলতে গিয়ে কেঁদে ফেললো মেয়েটা। বয়সে শিউলির মতোই হবে। মা মারা গিয়েছে ছোটোবেলায়। বড় হয়েছে সৎ মায়ের সংসারে। বাবা থাকেন চারকি সুবাদে দূরে। অত্যাচার আর কথার আঘাতে রোজই কাঁদে। প্রায় সব কাজ করেও খেতে নিতে কথা শুনাতে ছাড়েন না মহিলা।
শিউলির কেবল শান্তনা দিলো। বলল,
“ দুঃখের দিন শেষ হয়ে জীবনে সুখের ঘর সাজিয়ে কেউ নিয়ে যাক। শুধুমাত্র এই দোয়াই রইলো। তুমি ভেঙে পড়ো না। বাবা এবার ছুটিতে থেকে আসলে বলে দিও তাকে। চুপ করে থাকলে তিনি জানবেন কি করে?”
“ঝামেলা বরং বাড়বে ভাবি। তাই চুপ থাকি।”
তখনই নিচ থেকে ডাক আসলো। রিমঝিম তড়িঘড়ি করে দাঁড়ালো। শিউলি বুঝতে পারলো তার সৎ মা ডাকছেন। ও যেতে যেতে বলল,
“আসি।দেরি হলে আবার বকবে মা।”
রিমঝিম চলে গেলেও শিউলি তাকিয়ে রইলো ওদের ছাঁদের দিকে। মেয়েটার কষ্টের কথা শুনে খারাপ লাগলেও কিছু করার নেই। তবে ভেবেছে মাহাদ কে বলে একদিন ওর বাবা কে বলবে সবটা। দরকার পড়লে নানা বাড়ি রাখবে। সেখানে অন্তত এর চেয়ে সুখে থাকবে। মেয়ের জন্য বিয়ে করা অথচ সেই মেয়ে থাকে অবহেলায় অযত্নে।
শিউলি দীর্ঘ শ্বাস ফেলে ফুলের গাছগুলো পানি দিলো। বেলি ফুলের গাছে তিনটে ফুল ফুৃঁটেছে। গাছে সুন্দর লাগছে বিধায় ছিড়লো না।
বিকেল গড়িয়ে যাচ্ছে দেখে সে নিজেও নেমে আসলো ছাঁদ থেকে। রাইসুল রহমান বসার ঘরে বসে হয়তো তারই অপেক্ষা করছিলেন। বললেন,
“এক কাপ চা দিও তো মা।”
“ আচ্ছা বাবা অপেক্ষা করুন আনছি বানিয়ে।”
শিউলি রান্ধন ঘরে না যেতেই দরজায় কড়া নাড়লো কেউ। ফিরে আসলো ও। রাইসুল রহমান সবে উঠতে চাচ্ছিলেন শিউলি কে দেখে আর উঠলো না। হেসে জানালো তুমিই যাও। শিউলি আপাতত নিদিষ্ট কাউকে আশা করেনি কারণ মাহাদের আজ ফিরতে দেরি হতে পারে বলেই গিয়েছে।
তবে শিউলি দরজা খুলে স্তদ্ধ হয়ে গেলো। হা হলো মুখ। অবিশ্বাস্য চাহনি ওর। সামনে অপ্রত্যাশিত দুজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। শিউলি আনন্দ এবং কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বলে উঠলো,
“ আব্বা।”
করিম মিয়া মেয়ের মাথায় রাখলেন। হাসছেন মেয়েকে দেখে। কতদিন পর দেখছে। চোখ জুড়ালে বুঝি এবারে। শিউলি আনন্দে কেঁদে দিলো। শুধালো মা, দাদির কথা। নাজির পাশ থেকে বলল,
“ আমাকেও দেখ শিউলি। বড় ভাইয়ের দায়িত্ব পালন করছি বোনের বাড়ি এসেছি কিন্তু বোন দেখছেও না।”
শিউলি কান্না রেখে হাসলো। বলল,
“কেমন আছেন ভাইজান? মালা ভালো আছে?”
“ হু ভালো আছে তবে তার সখীর জন্য মন পুড়ে। যাইতে বলেছে শিগগিরই। মাঠ ঘাট ছুটতে,নদীর পাড়ে গল্প করতে।”
শিউলি নাজিরের সঙ্গে হেসে ফেলো। করিম মিয়া রাইসুল রহমানের সঙ্গে গল্প জুড়েছেন। শিউলির আজ আনন্দের শেষ নেই। বাবা কে দেখে আত্মহারা। এই আনন্দ আরো গাঢ় করতে হাজির হলো মাহাদ সঙ্গে শালিক কে নিয়ে। মূলত সেই নাজির কে বলেছিলো আনতে। শিউলি শালিক কে দেখে ছুটে গেলো। মাহাদের ঘাড় থেকে উড়ে শিউলির ঘাড়ে পড়লো। যেন সে মালিক কে ভুলেনি আজও। শিউলি মাহাদ কে শুধালো,
“আপনি কোথায় পেলেন?”
“তোমার বাবার থেকে নিয়ে বাহিরে অপেক্ষা করছিলাম শেষে আরেক দফায় চমকে দিবো বলে।”
“বাবা আসবে আপনি জানতেন?”
“জ্বী আমিই আসতে বলেছি।”
“আমি ভীষণ খুশি।”
“এই খুশি দেখার জন্যই সবটা করেছি। তোমার হাসি আমার খুশির কারণ শিউলি।”
চলবে…………….?

