#এক_মেঘলা_দিনে
#পর্ব-০২
#আনিকা_আফসা
বর্তমান,,
চোখটা লেগে গিয়েছিল ভোরের দিকে। সকাল হতে না হতেই দরজায় জোরালো কড়া নাড়ার শব্দে বিরক্ততে মুখ কুঁচকে নিলাম। আস্তে আস্তে চোখ খুললাম মাথাটা ধরেছে। চোখ খুলতেই নিজেকে ঐ জানালার সামনেই পেলাম। আশেপাশে তাকিয়ে দেখলাম লাচ্ছি বিছানায় আরাম করে শুয়ে ঘুমিয়ে আছে। আমি মাথা চেপে ধরে দরজার কাছে গেলাম। তারপর দরজা খুলতেই দেখতে পেলাম আপুকে। আপু আমার দিকে তাকাতেই আঁতকে উঠে বলল,
“কিরে বোন? তোর চোখে মুখের এই অবস্থা কেন?”
আমি কিছু না বলে ভিতরে এসে বিছানায় বসলাম। ভিতর থেকে এখনো কান্না দলা পাকিয়ে আসছে। আপু এসে পাশে বসে কাঁধে হাত রেখে বলল,
“রুদ্র কিছু বলেছে?”
আমি মাথা নেড়ে দৃষ্টি ফ্লোরের দিকে তাকিয়েই বললাম, “না উনি আর কি বলবে?
আপু থুতনিতে হাত রেখে বলল,”তাহলে চোখ মুখ এমন ফুলে আছে, তারউপর লাল কেন? ”
আমি বিরক্ত চোখে তাকিয়ে বললাম,” ঘুমের থেকে উঠেছি তো কেমন থাকবে চোখ মুখ”
আপু গাল ধরে তার দিকে ফিরিয়ে বলল,”তাকা এদিকে”
আমি তাকাতেই বলল,”কি হয়েছে? বলবিনা আপুকে?”
আমার হঠাৎ কেন যেন কান্না পেল। এই একজন যাকে আমি খুব ভালোবাসি, সবকথা তার কাছে শেয়ার করি তবে আজ রুদ্রের ব্যাপারটা লুকিয়ে যাচ্ছি। এমনিই রুদ্রের জন্য খারাপ লাগছে তারউপর আপুর সাথে এই নাটক। আমার কান্নারা বাঁধ ভেঙে এলো। আপুকে জড়িয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলাম। আপু কিছুই বললো না , শুধু পিঠে আর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। অনেকক্ষণ চলল এই কান্নাকাটি। আমি যখন হুশে এলাম তখন তাড়াতাড়ি আপুকে ছেড়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়লাম। আপু বিছানায় থম মেরে বসে রইল এবং বিড়বিড় করে বলল,
“রুদ্র!! এসব ঠিক করছিস না”
আপু উঠে আমার ওয়াশ রুমের দরজায় হাত রাখলো এবং বলল,
“তাড়াতাড়ি ডাইনিং রুমে আয়, মা ডাকছে খাবার খেতে”
এই বলে চলে গেল। আমিও মুখ ধুয়ে বেড়িয়ে এলাম। বাইরে আসতেই দেখলাম লাচ্ছিকে। কোলে উঠিয়ে গালের সাথে ওর গাল মিশিয়ে ধরলাম এবং হালকা হেসে বললাম,
“আমার সাথে সবসময় থাকবি তো লাচ্ছি? ছেড়ে যাস না কখনো হ্যাঁ? তাহলে প্রমিস করছি আর কাঁদবো না। আরে তোর সামনে তো শাহ্ রুখ খান, সালমান খান ফেইল, তাহলে ঐ রুদ্র আফতাব চৌধুরী কি চিজ বলতো? আমার লাচ্ছি,,,”
এই বলে ওর ঘাড়ে চুমু খেলাম , তারপর ওকে কোলে নিয়েই রুম থেকে বের হলাম। ডাইনিং স্পেসে এসে দেখলাম বাবা ও আপু চেয়ার দখল করে বসে আছে। আম্মু নিজেও এসে তখনই আরেক চেয়ার দখল করে নিলো। আমি গিয়ে রান্নাঘর থেকে লাচ্ছির জন্য ক্যাটফুড বের করে ওকে খাবার দিয়ে হাত ধুয়ে নিজে খেতে এলাম। দুই টুকরা রুটি মুখে নেয়ার পরই শুনতে পেলাম আম্মু আপুকে বলছে,
“কি রে? রুদ্র নাকি দেশ ছাড়ছে?”
এই কথা শুনে আমি থমকে গেলাম, হতবাক চোখে আপুর দিকে তাকালাম। আপু একবার আমার দিকে তাকিয়ে আম্মুর কথার উত্তরে বলল,
“হ্যাঁ, ঐ আসলে বাইরে গিয়ে পড়াশোনা শেষ করে নিজের বাবার বিজনেস সামলাতে চায়। ”
আম্মু বললো,”ওহ্”
তখনই বাবা ভ্রু কুঁচকে বলল,”তা কয়বছরের জন্য? কোনো কিছু বলেছে এই বিষয়ে?”
আপু মিনমিন স্বরে বলল,”এইতো পাঁচ বছর”
“ওহ্, কবে যাবে?”
“যাওয়ার কথা আরো পরে ছিল তবে কাল ফোন করে জানিয়েছে আজই বিকালে ফ্লাইট, সব আগে থেকেই ঠিক করা ছিল তাই প্রবলেম হয়নি। তোমাদের সাথে দেখা করে যাবে চিন্তা করো না”
এই কথা শুনতেই উঠে দাঁড়ালাম। আম্মু এই দেখে বলল,”কিরে কোথায় যাচ্ছিস?”
চোখে জল টলমল, তাই দৃষ্টি লুকাতে চোখ ফ্লোরে রেখেই উত্তর দিলাম ,
“আমার খাওয়া হয়ে গেছে, শরীর ভালো লাগছে না পরে খাবো।”
এই বলে ঘরের দিকে ছুট লাগালাম। সেই দিক তাকিয়ে শুনলাম আম্মু আপুকে বলছে,
“তোর বোনকে কিছু শেখাবি বলে দিচ্ছি আনিশা। এমন খামখেয়ালি আমার সংসারে চলবে না”
আমি দরজা হালকা ভিজিয়ে বিছানায় ধপাস করে শুয়ে পড়লাম। ফ্যানের দিকে তাকিয়ে বললাম,
“আপনাকে তাহলে আর চোখের দেখাও দেখা হবে না রুদ্র ভাই? এটা কেন করলেন? আমার জন্য? উফ্, ভুলেই তো গিয়েছি আমি আপনার জীবনে কোনো মানে রাখি না। আমি বদলাবো রুদ্র ভাই, নিজেকে সম্পূর্ণ বদলে নিবো। যেভাবে আপনি দূরে সরে যাচ্ছেন ঠিক ওভাবে। এতটা দূরে সরে যাবো আমি যে আপনি আমার ছায়াকেও চিনতে না পারেন”
বলার সময় চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। উল্টো হয়ে শুয়ে বালিশে মুখ গুঁজে কান্না করে দিলাম। কে জানে আর কত অশ্রু বিসর্জন দিতে হয়। চেষ্টা তো করছি, মনকে বোঝাচ্ছি। আর কি করবো বলতে পারো কেউ? কাল রাতে ঘুমায়নি ফলে কান্নার মাঝেই কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম তা টেরও পায়নি।
*******
বিকেল কিংবা হয়তো বিকেলে আপুর হাঁক ডাকে চোখ খুললাম। দেখলাম আপু আমাকে ডাকছে প্লাস আমার আয়নায় তাকিয়ে ইয়াররিং লাগাচ্ছে। ড্রেসিং টেবিলের উপর লাচ্ছি বসে আপুকে অবলোকন করছে। আমি হাই দিয়ে আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসলাম এবং জিজ্ঞেস করলাম,
“কি হলো আপু? তৈরি হয়ে কোথায় যাচ্ছো তুমি?”
আপু একবার আমার দিকে তাকিয়ে বলল,”বললাম না আজ রুদ্রের ফ্লাইট আছে? ওকেই ড্রপ করতে এয়ার পোর্টে যাব। তুইও রেডি হ, আমার সাথে যাবি তুই!”
আমি যাব? তারমানে আবার ঐ লোকটার সামনে? না , নাহ্ ঐ লোকটার সামনে একটুও যাব না, যেতে চাই না। আমাকে কি সুন্দর কাল বলেছে তার সাথে আমার যায় না, স্ট্যাটাস মিলে না যাতা। আমি আপুকে বললাম,
“তোমার যাওয়া তুমি যাও, আমি যাব না”
“বেশি মুখে মুখে কথা বলিস না। তোকে আমি আস্ক করিনি, আমার সাথে যেতে বলেছি। আর তুই যাবি ও। তো চুপচাপ রেডি হ”
আমি মুখ লটকে তাকালাম, চোখে হালকা অভিমান। আপু আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেঁসে বলল,
“যা বাচ্চা, রেডি হয়ে নে”
আমি আর কিছু না বলে ড্রেস নিয়ে ওয়াশ রুমে গেলাম। থাক যাই বরং, লোকটাকে তো আর দেখা হবে না। শেষ দেখাই দেখে আসি বরং। তাই আপুর সাথে আর তর্কে জড়ালাম না । একটা গোলাপী গাউন পড়ে বের হলাম। গলায় ওড়না পেঁচিয়ে বললাম,
“হয়েছে আমি রেডি”
আপু অবাক হয়ে বলল,”একটু সাঁজবিও না?”
আমি বাঁকা চোখে তাকিয়ে বললাম,”আমার কি বিয়ে ? তাহলে বলো একেবারে ব্রাইডাল লুক নিয়ে আসি?”
আপু হালকা হেঁসে বলল,”না থাক, এমনিই চল। তুই এমনিতেই সুন্দর!”
তখনই লাচ্ছি ম্যাও বলে ডাকলো। আমি বললাম ওকেও নিয়ে যাব কিনা? আপু বলল,
“না থাক, ওকে মার কাছে দিয়ে আয়”
আমিও ওকে কোলে তুলে আদর করে মায়ের কাছে রেখে এলাম। তারপর আপুর সাথে বেরিয়ে পড়লাম। বাসার নিচে আসতেই হৃদস্পন্দন বেড়ে গেল। কারণ গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রুদ্র। চোখে সানগ্লাস। আমাদের দেখে চোখ থেকে তা বুকপকেটে রাখলো স্টাইল করে। তাকে দেখেই আমি দৃষ্টি নামালাম। যে আমার নয় তাকে দেখে আমার কি লাভ?
রুদ্রের সাথে নিকি আপু ও নিহান ভাইয়া রয়েছে। আমাকে দেখেই নিহান ভাইয়া মুখে গাঢ় হাঁসি ফুটিয়ে বলল,
“কি খবর শালীকা সাহেবা? দিনকাল কেমন চলে?”
আমি দৃষ্টি নত রেখেই হালকা কন্ঠে জবাব দিলাম,”ভালো”
তখনই আপু গর্জে উঠে বলল,”ও তোর শালী না বেয়াদব”
নিহান ভাইয়া বলল,”সমস্যা নেই হয়ে যাবে, একবার তুই হ্যাঁ বলে দিলেই তো হয়”
নিকি আপু হেঁসে দিলো। অন্যসময় হলে আমিও তারসাথে তাল মেলাতাম, ভাইয়ার সাথে মিলে আপুকে খেপাতাম কিন্তু আজ আমার কোনো হাঁসিই পেল না, আপুর হাত ধরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। শরীরটা কেন যেন খারাপ লাগছে। চোখের কোণ তুলে রুদ্রের দিকে তাকাতেই আবার চোখ নামিয়ে নেই কারণ ডায়নোসরটা আমার দিকে তাকিয়েই আগাগোড়া পরখ করছে আমার। এমনভাবে তাকানোর কি আছে? নিহান ভাইয়া ও আপু কথাকাটাকাটি করছে। শেষমেষ রুদ্র ওদের থামালো, বলল,
“যাবি , নাকি ঝগড়া করবি? আমার ফ্লাইটের কিন্তু বেশি সময় বাকি নেই। তাড়াতাড়ি পৌঁছাতে হবে”
কথাটা শুনতেই কেন যেন গাঁয়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো। চোখে জল এলো, তবে কৌশলে তা সবার আড়ালে মুছে নিই। আপু গিয়ে বসলো ফ্রন্ট সিটে। আপুর দেখাদেখি নিহাল ভাইয়াও ড্রাইভিং সিটে উঠে বসলো। নিকি আপু উঠে বসলো পিছনের কোণার সিটে তারপর রুদ্র উঠে বসলো মাঝে। আমি হা হয়ে তাকালাম। ঘটনাক্রমে আমার সিট রুদ্রের পাশে। জীবনেও বসবো না এই ডায়নোসরের পাশে। আপু আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলল,
“কিরে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? বসে পড়!!”
আমি কিছু বলতেই যাবো তখনই রুদ্র,,,,
চলবে,,,
(বর্তমানে বড় আপু নাই দেখে আজ একটা রুদ্র নাইরেএএ 😭😭😭)

