#এক_মেঘলা_দিনে
#পর্ব_৩
#আনিকা_আফসা
“কিরে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? বসে পড়!!”
আমি কিছু বলতেই যাবো তখনই রুদ্র বলে উঠলেন,
“আমার এতো সময় নেই নিশা, যে বসবে তাড়াতাড়ি বসতে বল আর নাহলে বাড়ি যেতে বল”
আমি ভ্রু কুঁচকে তাকালাম। আপু রুদ্রের কথা শুনে রুদ্রের দিকে রাগী চোখে তাকিয়ে তারপর আমার দিকে তাকিয়ে ধমক দিল,
“কি হলো বসছিস না কেন?”
আমি হাত কচলে থমথমে মুখে বলল,
“আপু আমি এই সিটে বসবো না”
আপু ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কেন?”
“এমনিই”
রুদ্র নিহান ভাইকে বলল,
“নিহান গাড়ি স্টার্ট কর তো, কারো মনে হয় যাওয়ার ইচ্ছা নেই”
নিহান ভাই ভ্রু কুঁচকে রুদ্রকে ধমক দিয়ে বলল,
“তুই চুপ কর! দেখছিস মেয়েটা দাড়িয়ে আছে বাইরে? গাধা কোথাকার!!”
নিকি আপু বললেন,
“সমস্যা নেই রে আনি, চলে আয়। উঠে পর , এয়ার পোর্ট বেশি দূরে না। তাড়াতাড়ি বসে পড়”
আপু ধমকে বলল,
“এই সবাই তোকে বসতে বলছে না? মাইর খাবি তুই? তাড়াতাড়ি উঠ”
নিহান ভাইয়া বলল,”আহা বকছো কেন? শালিকা সাহেবা উঠে বসো। বুঝতে পারছি কিছু মানুষের সাথে বসলে গা চুলকায়। তবে তুমি চিন্তা করো না আমি রকেটের গতিতে গাড়ি চালিয়ে তোমাকে তাড়াতাড়ি চুলকানো থেকে নিস্তার দিবো”
এই বলে আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো। দেখলাম নিকি আপু ও আমার আনিশা আপু হাত দিয়ে মুখ চেপে হাসছে আর রুদ্র আগুন চোখে তাকিয়ে আছে নিহান ভাইয়ার দিকে। ভাইয়া বলায় আমি আর কথা বাড়ালাম না, একটুখানিই তো রাস্তা। আর তারউপর ভাইয়াকে আমি অনেক সম্মান করি । অনেক ভাবনাচিন্তা করে উঠেই পড়লাম শেষমেষ। দূরত্ব তো চাইলেই ঘোচানো যায় না। কারি কারি এই দূরত্বের মাঝে হালকা কাছাকাছি আসলে ক্ষতি কি? চলেই তো যাবে লোকটা।
গাড়িতে উঠে দরজা লাগিয়ে দরজার সাথে সেঁটে বসলাম। আগের আমি হলে রুদ্রের সাথে কিভাবে পাশাপাশি বসা যায় এই নিয়েই থাকতাম। রুদ্রের সাথে ঝগড়া হতো খুব। দুজনে এমন কোনো দিন নেই ঝগড়া করে থাকতাম না বোধহয়। ঝগড়া না হলে আমাদের দিনই শুরু হতো না এমন। তারপর একদিন কিভাবে কিভাবে যেন রুদ্রের প্রতি আসক্ত হলাম। রুদ্রের আচরণও আমাকে বুঝাতো সে আমাকে পছন্দ করে তবে কাল ভালোবাসার কথা বলায় কেমন যেন পাল্টে গেল।
আসল কথা হলো, ব্যবহার ডিপেন্ড করে কার সাথে তোমার সম্পর্ক কেমন হবে। কারো সাথে সুন্দর ব্যবহার করলে , তার সাথে মিষ্টভাষী হলে সে গলে যায় আবার ঐ একই জনকে অপমান করলে, খারাপ কথা বললে সেও মুখ ফিরিয়ে নিবে। এইযে, যেমন আমি আগে রুদ্র ভাইয়ের পাশে বসার জন্য পাগল ছিলাম প্রায়। আর এখন যখন সে কাল আমাকে আমার জায়গা দেখিয়ে দিল এখন তার ছায়া দেখেও দূরত্ব রাখতে চাই।
এসব ভেবেই ভেতর থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। রুদ্রের দিকে তাকাইনি। দরজার সাথে সেঁটে , জানালার দিকে মুখ করে বসে আছি। চোখ দিয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়তেই মুছে নিলাম আড়ালে। আপুদের ও ভাইয়ার কথা শুনতে পাচ্ছি তবে রুদ্র চুপ।
হঠাৎ আমার মনে হলো কেউ গভীর চোখে আমাকে দেখছে। হাজার হলেও মেয়ে, বুঝতে পারার ক্ষমতা একটু আছে বইকি। পাশে তাকাতেই দেখলাম রুদ্র অন্যদিকেই তাকিয়ে আছে। আমার খোলা চুলগুলো তার মুখে গিয়ে তাকে বিরক্ত করা শুরু করে দিয়েছে। সর্বনাশ!! এই লোক এই অছিলায় আবার না অপমান করে। তাড়াতাড়ি চুল সরিয়ে অপর পাশের কাঁধে ফেলে রাখলাম। মাথা নেড়ে আবার জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। আমিও না? ভাবছিলাম রুদ্র বোধহয় দেখছে আমায়। মাথা খারাপ আমার। কিন্তু আমারো কি দোষ, কিশোরী বয়সের ভালোলাগা, তারপর মনে প্রাণে তাকে ভালোবাসা। জীবনে তাহলে একটা আফসোস রয়েই গেল তাই না ? সমস্যা নেই, কিছু জিনিসের আফসোস থাকা ভালো।
দেখতে দেখতে এয়ার পোর্টে পৌঁছে গেলাম। সবাই নামতেই আমিও নামতে যাব তখনই আমার ওড়না টান খেল। আমি কাঁধে হাত দিয়ে পিছন ফিরে দেখলাম রুদ্রের ঘড়িতে তা আটকে গেছে। রুদ্র আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি শুকনো ঢোক গিললাম। এটা আবার ওখানে কিভাবে আটকে গেল? ধুর, জ্বালা!!
আমি এগিয়ে এসে ওটা ছাড়াতে নিলাম কিন্তু আচ্ছা একটা জ্বালা হলো কিছুতেই খুলছে না। মনে হচ্ছে কেউ ইচ্ছে করে শক্ত করে ঘড়ির সাথে এমন কুদ্দুস মার্কা প্যাঁচ মারছে। আমি আড়চোখে রুদ্রকে দেখলাম ঐ ডায়নোসরের বাচ্চা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। এটার থেকে চোখ সরিয়ে নিলাম। বেডার এমন চাহুনি দেখলেই আমার হৃদযন্ত্রের ধুকপুক বেড়ে যায়। এই চোখ দেখেই তো প্রেমে পড়ছিলাম। আর তাকানো যাবেনা। শেষমেষ কষ্ট করে ছাড়াতে গিয়ে ছিঁড়েই ফেললাম ওড়নার প্রান্ত। যাইহোক, ছাড়াতে যে পেরেছি এই অনেক। ওড়না ছাড়িয়ে পেছনে এক কদম ফেলতেই শুনতে পেলাম,
“গায়ে পড়া স্বভাবটা তোর যাবে না আনি?”
আমি কথাটা শুনে চোখ তুলে তাকালাম। মুখে এমন কুৎসিত কথা বললেও চোখ যেন অন্য কথা বলছে। তবে আমার শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠলো এমন কুৎসিত কথা শুনে। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
“আমি গাঁয়ে কখন পড়লাম?”
“এইযে ইচ্ছে করে আমার ঘড়ির সাথে নিজের ওড়নাটা আটকে দিলি, এখন ছাড়াতে ছাড়াতেও তোর নাটক দেখা লাগবে আমার? বলেছি না দূরে থাকবি আমার থেকে? তাহলে এসেছিস কেন বেহায়ার মতো? কি চাস তুই? তোকে ভালোবাসবো আমি? স্বপ্ন এটা, কোনোদিন তোর হবো না আমি”
আমি পাথর বনে গেলাম। রুদ্র ভাই আরো কিছু বললেন বোধহয়, তবে আমার কানে আর কিছুই ঢুকলো না। কয়েকটা শব্দ শুধু বাজতে লাগলো কানে,”গায়ে পড়া, বেহায়া” ইত্যাদি। চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো, রুদ্র ভাই আরো কথা শুনাতেই চিল্লিয়ে বললাম,
“ব্যাস!!”
আপুরা ও ভাইয়া এগিয়ে এলো এদিকটায়। রুদ্র ভাইয়া চুপ হয়ে গেলেন। আমি চোখে জল সমেত বললাম,
“অনেক বলেছেন আপনি আর অনেক শুনে নিয়েছি আমি। আমি আর পারছি না রুদ্র ভাই। আর পারছি না বিশ্বাস করুন। আমি এখানে আসতে চাইনি, আপুর জন্য এসেছি। আমাকে জোর করে আনা হয়েছে। আর এইযে বললেন না, আমি আঁটকে দিয়েছি নিজের ওড়না!! এটা আপনিও জানেন আমি এমন নই। ২ বছর ধরে চিনেন আমাকে , এমন ধারণা কি করে তৈরি হতে পারে আপনার? আর ইউ সিরিয়াস? আমি বেহায়া? আমি গাঁয়ে পড়া? আপনি আমার সম্পর্কে এসব ভাবেন? ভাবলে ভাবতেই পারেন, কারণ আপনার ভাবনা আমি আটকাতে পারবো না। কিন্তু নিজেকে আপনার ভাবনা ভাবার থেকে বিরত রাখতে পারবো!! আপনি এই কথাগুলো বলে আমার চোখে আরো নিচে নেমে গেলেন। কারো অনুভূতিকে অসম্মান করার স্পর্ধা আপনার নেই কিন্তু তবুও আপনি করেছেন। কিসের এতো অহংকার আপনার? এতো অহমিকা ভালো না, গুঁড়িয়ে যাবে দেখবেন। আপনার এই আচরণের পর আমি, এই আনিকা আপনাকে আমার মন , আমার অস্তিত্ব আর আমার জীবন থেকে চিরতরে মুছে দিলাম। কখনো আপনার ছায়াও যাতে দেখতে না হয় এই দোয়া করি। ভালো থাকবেন মিস্টার রুদ্র আফতাব চৌধুরী, বিদেশে গিয়ে যদি কেউ আপনাকে পছন্দ করে তবে এড়িয়ে গেলেও তার অনুভূতিকে সম্মান দেয়ার চেষ্টা করবেন ”
এই কথা বলে আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালাম না, ছুটে এলাম সেখান থেকে। পেছন থেকে শুনতে পেলাম আপুর ডাক। নিহান ভাইয়াও ডাকলো তবে কারো কথা না শুনে চোখের পানি মুছে কাঁদতে কাঁদতে ছুটে আসলাম সেখান থেকে। যাকে বেশি ভালোবেসেছিলাম সেই যখন নিজের আত্মসম্মানে আঘাত করে তখন মনে হয় নিজের হৃদপিন্ড খুবলে বের করে ফেলি, যেটি ভালোবাসার মানুষটির জন্য ধুকপুক করে।
******
আনিকার যাওয়ার দিকে রুদ্র তাকিয়ে রইলো। চোখ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়তেই চশমার আড়ালে সেটা মুছে নিলো। তখনই আনিশা, নিহান ও নিকি ফিরলো তার দিকে। আনিশা আপু বলল,
“শান্তি হয়েছে রুদ্র? শান্তি হয়েছে তোর ওকে কষ্ট দিয়ে? কত কাঠখড় পুড়িয়ে ওকে নিয়ে এসেছিলাম এখানে তাও তোর কথায় , নিজেই অপমান করে তাড়িয়ে দিলি? এমন কেন করছিস রুদ্র তুইও তো ওকে ভালোবাসিস।”
রুদ্র পকেটে হাত গুজে অন্যদিকে তাকিয়ে বলল,”সবসময় সবকিছু প্রকাশ করতে হয় না”
নিহান বলল,”তুই এটা ভালো করলি না। আনি যেমন মোমের মতো নরম হতে পারে তেমন পাথরের চেয়েও বেশি শক্ত হতে পারে। ওর মনে আঘাত করা উচিত হয়নি। যা বলার সোজাসুজি বলতেই পারিস”
নিকি সহমত প্রকাশ করলো। রুদ্র দূর ঐ আকাশে তাকিয়ে বলল,
“কি আর বলবো?”
আনিশা রেগে গেল এবং বলল,”ফালতামি কম কর রুদ্র, মাথা আমার এমনিতেই গরম। তুই আমার বোনের সাথে খারাপ ব্যবহার কর কিন্তু আজ একটু বেশিই অপমান হয়ে গেল না? তোর ধারণা আছে তুই ওকে কি বলেছিস?”
রুদ্র চিল্লিয়ে বলল,”তো কি করবো বলতে পারিস? আমি শুধু চাই ও এখন আমার থেকে দূরে থাকুক। এটাই ওর জন্য মঙ্গল ”
হঠাৎ রুদ্র শান্ত হয়ে গেল, শান্ত কন্ঠে বলল,
“ও আমাকে ভালোবাসে আমি জানি। সারাদিন আমার চিন্তাই ওর মাথায় ঘুরে। এই জন্যই তো এসএসসি তে ৩ পয়েন্ট পেয়েছে মাত্র। জানতাম ও আমায় ভালোবাসে, কিন্তু এর জন্য ওর ক্যারিয়ার নষ্টের পথে। এমনকি এখন পর্যন্ত ও এসব ওভারটেক করতে পারছে না। আমি চাইনা আমাকে ভালোবাসার কোনো প্রভাব ওর ক্যারিয়ারে দাগ কাটুক। তাইতো নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও চলে যাচ্ছি, জানি ওকে দূরে সরানোর উপায়টা খারাপ কিন্তু অনেক সময় খারাপ কিছুও ভালো কিছু নিয়ে আসে। তাই ওকে ভালোবাসা সত্ত্বেও তা স্বীকার করতে পারছি না, আরো ওকে অপমান করতে হচ্ছে। আজকেও ওকে ডাকতাম না, চলে যাবো পাঁচ বছরের জন্য তাই একবার দেখতে চাইছিলাম। নিজেই নিজের ঘড়ির মাঝে ওর ওড়না লাগিয়েছিলাম যাতে ওর কাছে আরেকটু খারাপ হতে পারি, যাতে ও এই মানুষটিকে ভুলে যেতে পারে। দেখেছিলাম গাড়িতে আমার জন্য ওর অশ্রু। চাইনা আমার জন্য ওর কোনো অশ্রু আসুক তাই ওর চোখে এই পাঁচ বছর সবচেয়ে খারাপ ব্যাক্তি হয়েই থাকতে চাই ”
কথাগুলো বলে দম নিলো রুদ্র। আনিশা বলল,
“জানি , সব জানি। আর জানি বলেই তোর সাপোর্ট করছি কারণ এটা আমার বোনের ক্যারিয়ারের বিষয়। নাহলে, আমার বোনের সাথে এমন খারাপ আচরণ করার পরও তুই এখানে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারতি না।”
রুদ্র শীতল চোখে তাকালো। আনিশা বুকে হাত গুজে দাঁড়িয়ে রইল, চোখে তার রাগ। রুদ্র তখন পিছনে তাকিয়ে তারপর হাত ঘড়ি দেখলো , হতাশ কন্ঠে বলল,
“আমায় যেতে হবে গাইস”
নিহান এসে জড়িয়ে ধরলো রুদ্রকে। রুদ্র নিহানের কাঁধে দুইটা চাপড় মেরে বলল,
“আমারটা আর তোরটার খেয়াল রাখিস। কিছু হলে দায়ভার সম্পূর্ণ তোর।”
নিহান হেঁসে বলল,”আমারটা তো বুঝলাম বাট তোরটা আবার কে?”
রুদ্র নিহানের পেটে কনুই দিয়ে গুঁতো দিলো। নিহান হেঁসে উঠল। নিকির সাথেও বিদায় পর্ব শেষ করে আনিশার কাছে দাঁড়ালো। আনিশা রেগে তাকিয়ে আছে রুদ্রের দিকে । রুদ্র আনিশার দুই বাহু ধরে বলল,
“চলে যাচ্ছি, এবার অন্তত মুখটা ঠিক কর। মনে হচ্ছে মরিচ খেয়ে এমন মুখের হাল করেছিস। এখন তো চলেই যাচ্ছি, আর তোকে জ্বালাতে আসবো না। এবার একটু হাঁস”
আনিশা মুখটা স্বাভাবিক করলো তারপর হঠাৎ বলল,
“রুদ্র তোর সাথে আমি একমত তো হয়েছি কিন্তু দেখিস এতোটাও দেরী করিস না মনের কথা জানাতে যে ততক্ষণে অপর জন তোকে মন থেকেই উঠিয়ে ফেলল। মন একটা কাঁচের মতো, ভেঙে ফেলা সহজ হলেও জোড়া কঠিন ব্যাপার”
রুদ্রের মুখের হাসি সরে গেল, অন্য এক চিন্তা ধরা দিল মাথায়। তারপর মাথা ঝেড়ে সেসব মুছে ফেলে হালকা হেঁসে বলল,
“এ,,এমন ক,,কিছুই হবে না। জাস্ট রিল্যাক্স। আসছি , সময় হয়ে গেছে। তার খেয়াল রাখিস”
এই বলে আনিশা ও বাকি সবার থেকে বিদায় নিলো। সবাই এয়ার পোর্টের ভিতরে আর গেলো না, রুদ্র নিষেধ করেছে ,যাওয়ার দরকার নেই। রুদ্রের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আনিশা বিড়বিড় করলো,
“আমাকে রিল্যাক্স হতে বললি না নিজেকে সান্ত্বনা দিলি? পাঁচ বছর অনেকটা সময়!!”
এই বলে একটা হতাশ শ্বাস নিলো। কে জানে পরবর্তীতে কি হবে?
***********
আমি দৌড়াতে দৌড়াতে কখন এয়ারপোর্টের ভিড়ের বাইরে চলে এসেছি নিজেও বুঝতে পারিনি। বুকটা ধকধক করছে, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। চোখের পানি যেন থামতেই চাইছে না।
রাস্তার পাশে একটা বেঞ্চে বসে পড়লাম। দু’হাত দিয়ে মুখ ঢেকে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলাম।
“কেন? কেন এমন করলো?”
নিজের কাছেই প্রশ্ন করলাম, কিন্তু উত্তর তো জানা নেই।আমি কি এতটাই খারাপ? এতটাই বিরক্তিকর?
হঠাৎ ফোনটা কাঁপতে শুরু করলো। স্ক্রিনে ভেসে উঠলো, আপু কলিং,,,
আমি একবার তাকিয়ে ফোনটা সাইলেন্ট করে দিলাম। এখন কারো সাথে কথা বলার মতো অবস্থায় নেই আমি।
মাথার ভেতর শুধু একটা কথাই ঘুরছে,
“আমি বেহায়া,,,আমি গায়ে পড়া,,,”
হাসি পেয়ে গেল নিজের উপর। কাঁদতে কাঁদতেই হেসে উঠলাম।
“ভালোই তো আনিকা! যাকে এত ভালোবাসলি, তার কাছেই আজ তোর আসল পরিচয় জানা হয়ে গেল!”
প্রায় অনেকক্ষণ বসে কাঁদলাম। হঠাৎ মাথার উপর দিয়ে একটা প্লেন আকাশে উড়ে গেল শাঁ শাঁ শব্দ করে। কি বিকট শব্দ তার। আমি সেদিকে তাকিয়ে রইলাম। জানি ঐ প্লেনে আছে রুদ্র আফতাব চৌধুরী। কিভাবে জানি তা জানি না তবে মনে হলো। প্লেনের দিকে তাকিয়ে বললাম,
“আনিকা পাল্টাবে রুদ্র ভাই, আপনার যন্ত্রণাদায়ক ভালোবাসা সে রাখতে চায়না। ”
প্লেনটা আকাশের বুক চিরে দূরে মিলিয়ে যেতে লাগলো। আমি তাকিয়ে রইলাম, যতক্ষণ না সেটাও ছোট হয়ে একটা বিন্দু হয়ে গেল।
ঠোঁট কাঁপছিল, চোখ ভিজে ছিল, তবুও জোর করে নিজেকে সামলে নিয়ে ধীরে ধীরে বললাম,
“আজ থেকে আমি আর তোমায় ভালোবাসবো না রুদ্র ভাই, কারণ ভালোবাসা যদি বারবার আত্মসম্মানকে হত্যা করে, তবে সেটা ভালোবাসা না, সেটা কষ্টের আরেকটা নাম।”
একটু থেমে গভীর নিঃশ্বাস নিলাম। বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। তারপর খুব ধীরে, কিন্তু ভীষণ ভাঙা গলায় ফিসফিস করে বললাম,
“তুমি আমার না হয়েও যতটা কষ্ট দিলে,, যদি কোনোদিন সত্যিই আমার হতে, তাহলে হয়তো আমি বাঁচতেই পারতাম না”
চোখের পানি মুছতে মুছতে ঠোঁট কামড়ে বললাম,
“তুমি ভালো থেকো রুদ্র ভাই, কারণ তোমার খারাপ থাকার দোয়া করার অধিকারটাও আমি হারিয়ে ফেলেছি”
একটু থেমে, বুকের ভেতরটা চেপে ধরে ফিসফিস করে বললাম,
“আমি তো শুধু তোমায় ভালোবেসেছিলাম,,কিন্তু তুমি এমনভাবে আমাকে ঘৃণা করলে, যেন ভালোবাসাটা ছিল আমার সবচেয়ে বড় অপরাধ!”
#চলবে

