Soulmate_to_Enemy #পর্ব_১৭

0
2

#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_১৭
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম

জেনিন আজ বিশেষ এক ‘বিজনেস ডিনার’-এর আয়োজন করেছে যেখানে তার কিছু গোপন ইনভেস্টর আসার কথা। তবে জেনিনের আসল উদ্দেশ্য হলো ইউজি এবং নোবারার মধ্যকার ভারসাম্য বজায় রাখা। দুজন একসাথে হলে এমনভাবে যুক্তির উপর যুক্তি দিয়ে কথা বলে যেন তার বাড়িটা কোন পার্লামেন্ট! আর সেখানে জেনিন নুরশাদ কার পক্ষে থাকবে তা নিয়ে বিতর্ক চলছে!

জেনিন বলরুমের দীর্ঘ ডাইনিং টেবিলের প্রধান চেয়ারে বসে আছে। তার পরনে মেরুন রঙের একটি ভেলভেট ব্লেজার, যা তাকে কোনো কর্পোরেট সিইও নয় বরং এক মধ্যযুগীয় সম্রাটের মতো দেখাচ্ছে। তার ডান পাশে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইউজি। ইউজির পরনে কালো টাক্সিডো, কানে লেটেস্ট কমিউনিকেশন ডিভাইস। সে জেনিনের কান আর চোখের মতো কাজ করছে।

নোবারা যখন সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এল, তখন বলরুমের আলো যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। নোবারা আজ পরেছে একটি নেভি ব্লু জর্জেট শাড়ি, যা জেনিনের পছন্দের রঙ। আর কানে জেনিনের দেওয়া সেই বিশেষ হীরের দুল। নোবারার চোখে এখনো গতরাতের সেই ‘মান-অভিমানের’ রেশ। সে ভেবেছিল আজ জেনিন কেবল তার সাথেই সময় কাটাবে, কিন্তু নিচে নেমে ইউজিকে সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার মেজাজ আবার বিগড়ে গেল।

“আপনি কি আজ সারারাত এখানেই মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকবেন মিস্টার গালিব?” নোবারা টেবিলের কাছে এসে তীক্ষ্ণ স্বরে জিজ্ঞেস করল।

ইউজি মাথা তুলে তাকালো না। সে খুব নিরাসক্ত গলায় বলল, “বস-এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমার দায়িত্ব, মিস আকারি। আপনি আপনার চেয়ারে বসুন আর দয়া করে খাবারের মানের দিকে নজর দিন। বস আজ খুব একটা ভালো মুডে নেই।”

জেনিন কফির কাপে চুমুক দিয়ে নোবারার দিকে তাকালো। নোবারার সেই গাল ফোলানো রূপটা জেনিনের ভেতরে আবার সেই বিচিত্র ভালো লাগার ঢেউ তুলল। কিন্তু সে আজ ‘সিইও’ মোডে আছে। সে চায় না ইউজির সামনে সে খুব বেশি নরম হোক।

“মিস আকারি, আজ আমাদের কিছু বিশেষ গেস্ট আসবে। আপনি ইউজির সাথে কোনো তর্কে জড়াবেন না,” জেনিন খুব গম্ভীর গলায় নির্দেশ দিল।

নোবারা চেয়ার টেনে বসল। সে দেখল টেবিলের ওপর তিনটি প্লেট সাজানো, জেনিন, সে এবং ইউজির জন্য। নোবারা অবাক হলো। “ইউজি কি আমাদের সাথেই ডিনার করবে?”

ইউজি এবার জেনিনের দিকে তাকালো। জেনিন মাথা নাড়ল। “ইউজি কেবল আমার ডান হাত নয়, ও আমার পরিবারের মতো, আমার ভাই। ও যেখানেই থাকে, আমার টেবিল শেয়ার করে।”

নোবারার ভেতরে আবার সেই হিংসে জ্বলে উঠল। সে ভাবল, জেনিন কি ইচ্ছা করেই তাকে এভাবে ছোট করছে? যে জায়গাটা কেবল নোবারার ছিল, সেখানে ইউজিকে জায়গা দেওয়া মানে নোবারার অস্তিত্বকে অস্বীকার করা। নোবারা কাঁটাচামচ দিয়ে প্লেটে শব্দ করতে লাগল।

“আপনি কি কিছু বলবেন নোবারা?” জেনিন আড়চোখে তাকে দেখল।

“কিছুই বলার নেই। আমি তো স্রেফ আপনার এক কর্মচারী। আপনি আপনার ‘পরিবার’ নিয়ে সুখে থাকুন,” নোবারা মুখ ঘুরিয়ে নিল।

জেনিন মনে মনে হাসল। সে উপভোগ করছে নোবারার এই জ্বলুনি। সে জানে নোবারা তাকে কতটা ভালোবাসে, আর সেই ভালোবাসার মাপকাঠি হলো এই তীব্র হিংসে। ঠিক তখনই ভিলার প্রধান ফটকে একটি কালো গাড়ি এসে থামার শব্দ পাওয়া গেল। ইউজি সাথে সাথে তার হাতের ডিভাইসটা অন করল।

“বস, ডেলিভারি এসে গেছে। কিন্তু কোনো গেস্ট আসেনি। কেবল একটি বড় কাঠের বাক্স,” ইউজি ফিসফিস করে বলল।

জেনিনের ভ্রু কুঁচকে গেল। “বাক্স? আমি তো কোনো পার্সেল অর্ডার করিনি।”

ইউজি সাথে সাথে সতর্ক হয়ে গেল। সে তার হাতটা কোটের ভেতরে রাখা পিস্তলের বাঁটের কাছে নিয়ে গেল। “আমি চেক করছি বস। আপনি মিস আকারিকে নিয়ে একটু পেছনে সরুন।”

জেনিন নোবারার হাতটা শক্ত করে ধরল। সে নোবারাকে নিজের পেছনে টেনে নিয়ে দেয়ালের আড়ালে চলে গেল। ইউজি খুব সাবধানে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দুইজন বডিগার্ড একটি বিশাল কাঠের বাক্স নিয়ে ভেতরে ঢুকল। বাক্সটি দেখতে বেশ প্রাচীন, যেন কোনো মিউজিয়াম থেকে চুরি করা হয়েছে।

“খোল ওটা,” জেনিনের আদেশ।

ইউজি নিজের হাতে একটি ছুরি বের করে বাক্সের ঢাকনাটা আলগা করল। ভেতরে কালো কাপড়ে মোড়ানো কিছু একটা আছে। ইউজি খুব সন্তর্পণে কাপড়টা সরালো। সাথে সাথে পুরো বলরুমে এক অদ্ভুত দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল, যেন পচা মাংস আর বারুদের সংমিশ্রণ।

ইউজি শিউরে উঠল। “বস, এটা…”

জেনিন এগিয়ে এল। নোবারা জেনিনের শার্ট খামচে ধরে আছে। বাক্সের ভেতরে রাখা আছে একটি সাদা পাথরের মূর্তি, মূর্তিটি অবিকল জেনিন নূরশাদের মতো দেখতে, কিন্তু তার বুকের মাঝখানে একটি আসল খঞ্জর বিঁধিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর মূর্তির পায়ের কাছে একটি চিরকুট রাখা।

ইউজি চিরকুটটা তুলে নিল এবং জেনিনের দিকে তাকালো। তার চোখে এখন ভয়ংকর খুনে চাউনি। “চিরকুটে লেখা আছে, ‘সিংহাসনে বসা রাজা সবসময় সুরক্ষিত থাকে না। পরের খঞ্জরটা পাথরে নয়, রক্তে বিঁধবে।'”

বলরুমের আবহাওয়া এক সেকেন্ডে বরফশীতল হয়ে গেল। জেনিনের ইগো আজ এক বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখে। কেউ তার ভিলার ভেতরে ঢুকে তাকে মৃত্যুর হুমকি দিয়ে গেছে! জেনিন মূর্তির সেই খঞ্জরটা এক ঝটকায় টেনে বের করল। তার হাত দিয়ে তখনো ঘামছে না, বরং তার চোখ দুটো থেকে আগুনের স্ফুলিঙ্গ বেরোচ্ছে।

“কে?” জেনিনের গর্জন সারা প্রাসাদে প্রতিধ্বনি তুলল।

নোবারা কাঁপছে। সে জেনিনের এই রূপটা আগে দেখেনি। সে দেখল জেনিন মূর্তির সেই খঞ্জরটা মেঝেতে ছুড়ে মারল। ইউজি সাথে সাথে পুরো ভিলা লকডাউন করে দিল।

“মানিক! সিকিউরিটি গ্রিড চেক করো! সিসিটিভি ফুটেজ বের করো! এই বাক্সটা গেট পর্যন্ত এল কীভাবে?” ইউজি ওয়াকিটকিতে চিৎকার করছে।

নোবারা জেনিনের কাছে গিয়ে তার হাতটা ধরল। “চলুন আমরা পুলিশকে ডাকি। এটা কোনো সাধারণ কেউ নয়, এটা খুনি!”

জেনিন নোবারার দিকে তাকালো। তার চোখে এখন কোনো মায়া নেই, কেবল এক ভয়ংকর অন্ধকারের রাজত্ব। সে নোবারার মুখটা দুহাতে ধরল। “চিন্তা করো না‌। যে এই দুঃসাহস দেখিয়েছে, সে নিজের কবর নিজেই খুঁড়েছে।”

ইউজি জেনিনের পাশে এসে দাঁড়ালো। “বস, ফুটেজ বলছে ডেলিভারি বয়টা পুলিশ এর বুট পরে ছিল।”

“পুলিশ এত কাঁচা কাজ করবে না ইউজি,” জেনিন শান্তভাবে বলল। “এটা অন্য কেউ। কেউ যে আমাদের ঘরের ভেতর থেকে খবর লিক করছে। আজ রাতে কেউ এই ভিলা থেকে বের হবে না, আর কেউ ভেতরে ঢুকবে না। ইনভেস্টিগেশন শুরু করো।”

***জেনিন তার বিশাল কালো চামড়ার সোফায় বসে আছে। তার হাতে একটি গ্লাস, তবে তাতে আজ কোনো পানীয় নেই। সে গ্লাসটি ঘোরাচ্ছে আর তার ধারালো নজরে পর্যবেক্ষণ করছে সামনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা ভিলার বারোজন বিশ্বস্ত পরিচারক এবং রাঁধুনিকে। এদের প্রত্যেকেই দশ বছরের বেশি সময় ধরে নূরশাদ পরিবারের সেবা করছে। জেনিনের ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে আছে ইউজি, তার হাতে একটি মেটাল ডিটেক্টর আর জেনিনের সেই এনক্রিপ্টেড ডিজিটাল ট্যাব।

ইউজির চোখে আজ কোনো মায়া নেই। সে প্রতিটি কর্মীর সামনে গিয়ে তাদের চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। সে জানে, জেনিন নূরশাদের রাজত্বে বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি কেবল মৃত্যু। এবং তাদের কবর দেওয়া হয় না, সাগরের অতল গভীরে ফেলে দেওয়া হয়।

“বস, ডেলিভারি ভ্যানটি যখন গেটে আসে, তখন গেটের সিকিউরিটি কোড স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে গিয়েছিল,” ইউজি তার ট্যাব থেকে ডেটা পড়তে পড়তে বলল। তার কণ্ঠস্বর পাথরের মতো শীতল।

“এর মানে হলো, এই ভিলার ভেতরে থাকা কারোর পার্সোনাল ডিভাইস থেকে সেই কোডটি হ্যাক বা শেয়ার করা হয়েছে।”

জেনিন এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করল। সে অনুভব করতে পারছে, তার নিজের নিঃশ্বাসের মধ্যেই কেউ বিষ মিশিয়ে দিয়েছে। সে খুব ধীর গলায় বলল, “ইউজি, এই ভিলার প্রতিটি কোণে আমার সিসিটিভি আর লেজার গ্রিড আছে। এসব কি করে সম্ভব?”

নোবারা ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে কাঁপছিল। সে জেনিনের এই রূপটা সহ্য করতে পারছে না। জেনিন যখন কাউকে সন্দেহ করে, তখন সে আর মানুষ থাকে না, সে হয়ে ওঠে এক ক্ষুধার্ত নেকড়ে।

নোবারা এক পা এগিয়ে এসে বলল, “এরা কেন আপনার ক্ষতি করবে? আপনি কি অযথা সন্দেহ করছেন না? আমি তো ওদের সাথে মিশি। ওরা আপনার অনুগত।”

জেনিন মাথা তুলে নোবারার দিকে তাকালো। তার চোখের সেই লালচে আভা নোবারাকে স্তব্ধ করে দিল। জেনিন কোনো উত্তর দিল না, তবে উত্তর দিল ইউজি।

ইউজি এক বিদ্রূপের হাসি হাসল। সে নোবারার দিকে কয়েক পা এগিয়ে এল। “মিস আকারি, এখানে প্রতিটি মানুষের একটা দাম আছে। কেউ যদি এদের দশগুণ টাকা অফার করে, এরা জেনিন নূরশাদের কলিজাও ছিঁড়ে নিতে দ্বিধা করবে না। আর সবচেয়ে বড় কথা…” ইউজি একটু থামল, তার চোখের দৃষ্টি নোবারার ওপর স্থির হলো। “বিশ্বাসঘাতক অনেক সময় ঘরের ভেতরেই থাকে, যাকে আমরা সবচাইতে বেশি বিশ্বাস করি।”

নোবারার বুকটা ধক করে উঠল। “আপনি কী বোঝাতে চাইছেন মিস্টার গালিব? আপনি কি আমাকে সন্দেহ করছেন?”

ইউজি জেনিনের দিকে তাকিয়ে বলল, “বস, আপনি যদি পারমিশন দেন, তবে আমি এই ভিলার প্রতিটি মেম্বারের ব্যাকগ্রাউন্ড আবার চেক করতে চাই। বিশেষ করে যারা গত কয়েক মাসে জয়েন করেছে। আপনার মনে আছে কি না জানি না, এই মূর্তির ডেলিভারি ঠিক তখনই এল যখন মিস আকারি আপনার ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করলেন। ইটস আ পারফেক্ট ডাইভারশন।”

জেনিন এবার সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। সে নোবারার খুব কাছে এসে থামল। নোবারার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। জেনিন তার দীর্ঘ আঙুল দিয়ে নোবারার গলার সেই হীরের দুলটা ছুঁল।

“ইউজি,” জেনিন খুব শান্ত কিন্তু ভারী গলায় ডাকল। “নোবারা আমার পিএ। ওর সব রেকর্ড আমি নিজে চেক করেছি।”

“করেছেন বস,” ইউজি নাছোড়বান্দার মতো বলল। “কিন্তু আপনি কি ওর ফ্যামিলির সাথে দেখা করেছেন? আপনি কি জানেন ও কখন কার সাথে ফোনে কথা বলে? বস, পনেরো বছর পর একটা মেয়ে হুট করে আপনার জীবনে উদয় হলো, তারপর সোজা আপনার বাড়িতেই থাকতে শুরু করলো, এটা কি সহজে মানা যায়?”

জেনিন নোবারার চোখের দিকে তাকালো। নোবারার চোখে এখন কেবল পানি। সে বুঝতে পারছে ইউজি তাকে এক ভয়ংকর জালে ফাঁসাচ্ছে। জেনিনের ইগো আর সন্দেহ এখন তুঙ্গে। সে নোবারার বাহুটা একটু জোরে চেপে ধরল।

“আপনার পরিবার কোথায় মিস আকারি? আপনি বলেছিলেন আপনি একা থাকেন। কিন্তু আপনার ফোন কল লিস্টে গত রাতে একটি আননোন নাম্বারে কল করা হয়েছে। ইউজি সেটা ট্র্যাক করেছে।” জেনিনের কণ্ঠে এখন এক অদ্ভুত কাঠিন্য।

নোবারার পায়ের নিচের মাটি সরে যাচ্ছে। সে তো তার মাকে ফোন করেছিল! কিন্তু সে তো জেনিনকে বলতে পারবে না যে সে তার পরিবারের সাথে যোগাযোগ রাখে, কারণ জেনিন আগেই বলেছে সে একাকীত্ব পছন্দ করে। নোবারা কাঁপা গলায় বলল, “সেটা… সেটা আমার এক ফ্রেন্ড ছিল। বিশ্বাস করুন, আমি কোনো বিশ্বাসঘাতকতা করিনি।”

“ফ্রেন্ড?” ইউজি টিপ্পনী কাটল। “সেই ফ্রেন্ড কি কোনো এজেন্ট?”

“চুপ করুন ইউজি!” নোবারা চিৎকার করে উঠল। সে জেনিনের দিকে তাকিয়ে প্রায় আর্তনাদ করে বলল, “আপনি কি আসলেই এই লোকটার কথা বিশ্বাস করছেন স্যার? আমি কেন আপনার ক্ষতি চাইব?”

জেনিনের পাথুরে মুখে এক মুহূর্তের জন্য ফাটল ধরল। কিন্তু তার ইগো আজ অনেক বড়। সে জেনিন নূরশাদ, সে কাউকে নিজের দুর্বলতা বানাতে পারে না। সে নোবারাকে এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে ইউজিকে নির্দেশ দিল।

“ভিলার প্রতিটি ঘর সার্চ করো। নোবারার ঘরটাও। আমি কোনো খামতি দেখতে চাই না। ইউজি, যদি ওর ফোনে কোনো সন্দেহজনক কিছু পাও, তবে ওকেও ডার্ক সেলে নিয়ে যাও। নূরশাদ ভিলার জন্য যে হুমকি, সে আমার শত্রু।”

জেনিন ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তার প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল বজ্রের মতো ভারী। নোবারা ফ্লোরে বসে পড়ল। ইউজি তার সামনে দাঁড়িয়ে এক পৈশাচিক হাসি দিল।

“আপনার নাটক শেষ মিস আকারি। বস হয়তো আপনাকে আদর করে শাড়ি কিনে দিয়েছেন, কিন্তু তিনি কোনোদিন আপনার জন্য নিজের সাম্রাজ্য বিপদে ফেলবেন না। চলুন, আপনার ঘরটা একটু তল্লাশি করি।”

ইউজি আর দুইজন বডিগার্ড নোবারাকে নিয়ে তার ঘরে গেল। নোবারার প্রতিটি ড্রেস, প্রতিটি কসমেটিকস অবহেলার সাথে ছুঁড়ে ফেলা হলো। ইউজি নোবারার ল্যাপটপ আর ফোনটা সিজ করল। নোবারা দেখছিল জেনিনের দেওয়া প্রতিটি উপহার আজ ধুলোয় লুটোপুটি খাচ্ছে। তার মনে হচ্ছিল, জেনিন কেবল তার ওপর সন্দেহ করছে না, সে নোবারার সম্মানটাকেও পায়ের নিচে পিষছে।

তল্লাশি শেষে ইউজি কিছু পেল না, কিন্তু সে একটা গোপন ট্র্যাকার নোবারার ব্যাগে প্ল্যান্ট করে দিল যা জেনিন জানে না। সে বাইরে এসে জেনিনকে রিপোর্ট করল, “কিছু পাওয়া যায়নি বস, তবে ওর ফোনটা আমি ফরেনসিক ল্যাবে পাঠিয়েছি।”

জেনিন তখন তার স্টাডি রুমে বসে সেই খঞ্জরটা দেখছিল। তার মনে হচ্ছিল, শত্রু যতটা না বাইরে, তার চেয়ে বেশি তার মনের ভেতরে। সে নোবারাকে বিশ্বাস করতে চায়, কিন্তু ইউজির লজিক তাকে বারবার বাধা দিচ্ছে।

<><><><><><><><><>

নূরশাদ ভিলার রাত এখন এক অন্তহীন প্রহর। রেড অ্যালার্টের সেই নিস্তেজ লাল আলোয় ভিলার করিডোরগুলোকে কোনো এক অভিশপ্ত প্রাসাদের মতো মনে হচ্ছে। জেনিন নূরশাদ তার স্টাডি রুমে একা। তার সামনে রাখা সেই খঞ্জরটি এখন টেবিলের ওপর রাখা একটি ধ্রুব সত্যের মতো চিকচিক করছে। জেনিনের মস্তিষ্ক তাকে বলছে সে যা করেছে তা তার সাম্রাজ্যের নিরাপত্তার জন্য সঠিক, কিন্তু তার অবচেতন মন নোবারার সেই আর্তনাদ আর অপমানে কুঁকড়ে যাওয়া মুখটা ভুলতে পারছে না।

বাইরে বৃষ্টির ঝাপটা কাঁচের জানালার ওপর আছড়ে পড়ছে। জেনিন হঠাৎ শুনতে পেল ইউজির পায়ের শব্দ। ইউজি দরজায় নক না করেই ভেতরে ঢুকল। তার হাতে একটি মেমোরি ড্রাইভ।

“বস, ফরেনসিক রিপোর্ট চলে এসেছে। মিস আকারি যে নাম্বারে কল করেছিলেন, সেটা কোনো স্পাই নেটওয়ার্কের নয়। ওটা একটি ল্যান্ডলাইন নাম্বার, যা নূরপুর গ্রামের একটি সাধারণ বাড়ির ঠিকানায় রেজিস্টার্ড। নাম, হালিমা আকারি। আপনার পিএ-র মা।”

ইউজির কণ্ঠে কোনো অনুশোচনা নেই, বরং সে এটি কেবল একটি ডেটা হিসেবে পেশ করল। জেনিন স্তব্ধ হয়ে ইউজির দিকে তাকালো। জেনিনের হাত থেকে কফির গ্লাসটা আলতো করে টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখল। সে অনুভব করল তার পায়ের তলার মাটি এক সেকেন্ডের জন্য দুলে উঠল। নোবারা বিশ্বাসঘাতক নয়। নোবারা কেবল তার একলা মায়ের খোঁজ নিচ্ছিল।

“আর সেই মূর্তির ডেলিভারি বয়?” জেনিনের কণ্ঠস্বর এখন অসম্ভব নিচু।

“আমরা তাকে ধরেছি বস। ও আসলে জেনকিন্স গ্রুপের ভাড়াটে খুনি। ও স্বীকার করেছে যে গেটের কোডটি তারা হ্যাক করেছিল একটি ড্রোন সিগন্যালের মাধ্যমে, ভিলার ভেতর থেকে কেউ এটা লিক করেনি। নোবারা আকারি সম্পূর্ণ নির্দোষ।”

ইউজি কথাগুলো বলে জেনিনের প্রতিক্রিয়ার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। জেনিন হঠাৎ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। তার সারা শরীরে এক প্রচণ্ড কম্পন। সে কী করেছে? সে নোবারার ঘর তছনছ করেছে, তাকে অপমান করেছে, তার ভালোবাসা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এবং সবশেষে তাকে কয়েদীর মতো বন্দী করে রেখেছে। জেনিন নূরশাদের ইগো আজ যেন এক বিশাল পাহাড়ের ওপর থেকে আছড়ে পড়ল ধুলোয়।

সে কোনো কথা না বলে ঝড়ের বেগে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ইউজি পেছন থেকে ডাকল, “বস, আপনি কোথায় যাচ্ছেন? সিকিউরিটি এখনো ক্লিয়ার নয়!”

জেনিন শুনল না। সে সিঁড়ি দিয়ে উঠে নোবারার ঘরের সামনে পৌঁছাল। দুইজন সশস্ত্র গার্ড সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল। জেনিনের রক্তচক্ষু দেখে তারা এক মুহূর্তেই পথ ছেড়ে দিল। জেনিন কাঁপা হাতে পকেট থেকে মাস্টার কি বের করে দরজাটা খুলল।

ঘরের ভেতরটা শ্মশানের মতো নিস্তব্ধ। মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নোবারার কাপড়, ভাঙা পারফিউমের বোতল আর সেই শাড়িগুলো যা জেনিন নিজে পছন্দ করে দিয়েছিল। নোবারা বিছানায় নেই। সে এক কোণে জানালার নিচে মেঝেতে বসে আছে। তার দুহাতের মাঝে মাথা গোঁজা। জেনিনের পায়ের শব্দ পেয়েও সে মাথা তুলল না।

“নোবারা…” জেনিন খুব মৃদু স্বরে ডাকল। তার কণ্ঠে সেই দোর্দণ্ড প্রতাপশালী সিইও নেই, আছে কেবল এক অপরাধী।

নোবারা ধীরে ধীরে মাথা তুলল। তার চোখ দুটো রক্তজবার মতো লাল। কান্নার বেগ হয়তো থেমেছে, কিন্তু সেই জায়গায় এখন বাসা বেঁধেছে এক গভীর শূন্যতা। সে জেনিনের দিকে তাকালো, কিন্তু সেই চাউনিতে আজ কোনো ‘হিংসে’ নেই, কোনো ‘অভিমান’ নেই। সেখানে আছে কেবল এক সমুদ্র পরিমাণ ঘৃণা আর ঘৃণা।

“দরজা খুলে দিলেন কেন স্যার? তল্লাশি কি এখনো শেষ হয়নি? আমার বালিশের ভেতর কোনো বোমা পাননি তো?” নোবারার কণ্ঠস্বর এতটাই শান্ত যে জেনিনের বুকটা ছিঁড়ে যেতে চাইল।

জেনিন এক পা এগিয়ে গেল। সে নোবারার কাছে পৌঁছাতে চাইল, কিন্তু নোবারা হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিল। “এক কদমও আগাবেন না। আপনার এই দম্ভের ছায়া যেন আমাকে আর স্পর্শ না করে।”

“রিপোর্ট এসেছে, আপনি নির্দোষ। ইউজি ভুল তথ্য দিয়েছিল…” জেনিন এর গলায় কথাটুকু আটকে আসছে।

“ইউজি?” নোবারা হঠাৎ শব্দ করে হাসল। এক বিদ্রূপের হাসি। “ইউজি তো কেবল আপনার একটা অস্ত্র। ট্রিগার তো আপনি চেপেছিলেন। ইউজি আমাকে চেনে না, কিন্তু আপনি? আপনি তো আমাকে পনেরো বছর ধরে চেনেন। অথচ ওই লোকটার একটা সন্দেহে আপনি আমার চরিত্র, আমার পরিবার সবকিছুকে অপবিত্র করে দিলেন?”

জেনিন মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। তার ইগো আজ তাকে কোনো বর্ম দিতে পারছে না। সে ফিসফিস করে বলল, “আমি আপনাকে হারানোর ভয়ে পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। ওই হুমকিটা আমাকে দুর্বল করে দিয়েছিল।”

“হারানোর ভয়?” নোবারা এবার উঠে দাঁড়ালো। সে জেনিনের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল, “আপনি আমাকে তখনই হারিয়ে ফেলেছেন, যখন আপনি আমার ঘরের দরজায় তালা ঝুলিয়েছেন। আপনি আমাকে আপনার কর্মচারী বা আপনার প্রপার্টি ভেবেছেন, কোনোদিন মানুষ ভাবেননি। একজন মেয়ের সাথে এভাবে দ্বিমুখী আচরণ করা যায়? রাতে আদরে ভরিয়ে দেবেন আর সকালে অপরাধী সাজিয়ে খাঁচায় পুরবেন? একি কোনো সুস্থ মানুষের ভালোবাসা?”

জেনিন এবার নোবারার হাতটা ধরতে চাইল। “নোবারা, প্লিজ। আমি সবকিছু ঠিক করে দেব। আমি ইউজিকে শাস্তি দেব!”

নোবারা নিজের হাতটা ঝটকা দিয়ে সরিয়ে নিল। সে জেনিনের থেকে তিন হাত দূরে সরে গিয়ে দাঁড়ালো।
“শাস্তি ইউজিকে নয়, শাস্তি নিজেকে দিন। আপনি নিজের ইগোর কাছে হেরে গেছেন। আপনি নূরশাদ ভিলাকে একটা জেলখানা বানিয়েছেন, আর আমি এই জেলের কয়দী হয়ে থাকতে চাই না। নূরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে আমি পদত্যাগ করছি। কাল সকালেই আমি এখান থেকে চলে যাব।”

‘চলে যাব’ শব্দটা জেনিনের মাথায় বজ্রপাতের মতো লাগল। তার পসেসিভনেস আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে চাইল, কিন্তু নোবারার চোখের সেই নিথর দৃষ্টি দেখে সে দমে গেল। জেনিন বুঝতে পারল, এবার আর জোর খাটবে না। সে জোর করে শরীর আটকে রাখতে পারবে, কিন্তু এই মেয়েটার মন আজ হাজার টুকরো হয়ে গেছে।

“আপনি কোথাও যাবেন না। আমি আপনাকে যেতে দেব না,” জেনিন আবার সেই রুক্ষ হওয়ার চেষ্টা করল।

“আটকাবেন? আবার তালা দেবেন? দিন। কিন্তু মনে রাখবেন জেনিন নূরশাদ, আপনি আমার শরীর পাবেন, আমার লাশ পাবেন, কিন্তু আপনার সেই নোবারাকে আর কোনোদিন পাবেন না।”
নোবারার এই কথাগুলো জেনিনকে যেন জ্যান্ত পুড়িয়ে মারল। সে দেখল নোবারা খুব ধীরস্থিরভাবে মেঝে থেকে তার ব্যাগটা তুলে নিল। সে কোনো কাপড় গোছালো না, জেনিনের দেওয়া কোনো গয়না নিল না। সে শুধু তার নিজের আনা সেই পুরনো জীর্ণ ব্যাগটা কাঁধে ঝোলালো।

“আজ রাতটা আমি এখানে থাকছি কারণ বাইরে বৃষ্টি। কাল সূর্য ওঠার আগে আমি চলে যাব। আপনি বাধা দিলে আমি এই জানালার কাঁচ ভেঙে নিচে ঝাঁপ দেব, তবুও আপনার এই বিষাক্ত প্রাসাদে থাকব না।”

জেনিন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে দেখল নোবারা জানালার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। তার পিঠটা কাঁপছে, হয়তো সে ভেতরে ভেতরে কাঁদছে, কিন্তু জেনিনের সামনে সে আজ অটল। জেনিন বুঝতে পারল, একটি মেয়ের আত্মসম্মানে আঘাত করার পর কেবল ‘সরি’ বলে সেটা ফিরে পাওয়া অসম্ভব।

জেনিন ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। করিডোরে ইউজি দাঁড়িয়ে ছিল। জেনিন ইউজির দিকে তাকিয়ে এমন এক চড় মারল যে ইউজি মেঝেতে আছড়ে পড়ল।

“তোমার এই অতি-বুদ্ধিমত্তার জন্য আজ আমি আমার প্রাণ হারিয়েছি ইউজি। যদি কাল ভোরে নোবারা এই ভিলা ছেড়ে যায়, তবে মনে রাখবে, আমি নিজেই এই ভিলা জ্বালিয়ে দেব।”

জেনিন তার নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। সে ড্রয়ার থেকে তার ডায়েরিটা বের করল। কিন্তু আজ সে কিছু লিখতে পারল না। তার হাত কাঁপছে। কলমটা ভেঙে গেল। সে মেঝের ওপর বসে পড়ল।

বাইরে বৃষ্টি থামল না। জেনিন বুঝতে পারল, ক্ষমতা আর টাকা দিয়ে জগত কেনা যায়, কিন্তু বিশ্বাস একবার ভাঙলে তা আর কোনো হীরের দিয়েও জোড়া লাগানো যায় না। নোবারা তাকে ক্ষমা করবে না, এই সত্যটা জেনিনকে এক ভয়ংকর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। জেনিন নূরশাদ আজ হার মেনেছে তার নিজেরই সৃষ্ট দানবের কাছে।

<><><><><><><><><>

নূরশাদ ভিলার বিশাল প্রাঙ্গণে ভোরের কুয়াশা আজ এক চাদরের মতো বিছিয়ে আছে। রাতের সেই প্রলয়ঙ্করী বৃষ্টির পর আকাশটা এখন গুমোট, যেন ঝরতে না পারা কান্নার ভারে সে নুইয়ে পড়েছে। ঘড়ির কাঁটায় তখন ঠিক পাঁচটা। ভিলার প্রতিটি কোণে থমথমে নীরবতা। জেনিন নূরশাদ সারা রাত নিজের ঘরে এক মুহূর্তের জন্যও চোখ বন্ধ করতে পারেনি। সে তার বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছিল নিচের মেইন গেটের দিকে। তার বুকটা দুরুদুরু কাঁপছে, এই বুঝি নোবারা বেরিয়ে এল।

ঠিক পাঁচটা বেজে দশ মিনিটে ভিলার ভারী ওক কাঠের সদর দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে গেল। জেনিন দেখল, একটি ক্ষীণ অবয়ব কাঁধে একটি সাধারণ ব্যাগ ঝুলিয়ে কুয়াশার বুক চিরে বেরিয়ে আসছে। নোবারা আকারি। তার পরনে কোনো জাঁকজমকপূর্ণ শাড়ি নেই, কোনো হীরের দুল নেই। সে ঠিক সেই সাধারণ নোবারা হয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, যে এই ভিলায় প্রথম দিন এসেছিল।

জেনিন আর দেরি করল না। সে দ্রুত সিড়ি দিয়ে নিচে নেমে এল। ড্রয়িংরুমে তখন ভিলার সব স্টাফরা জমায়েত হয়েছে। রাঁধুনি রহমত চাচা, মালিন মাসি, বয়োবৃদ্ধ পরিচারক কাসেম আলী, সবার চোখে জল। তারা জেনিনের ইশারায় নয়, বরং নোবারার প্রতি এক অকৃত্রিম মায়ায় আজ এত ভোরে জেগে উঠেছে।

“মিস আকারি, থামুন!” জেনিনের বজ্রকণ্ঠ ভিলার ড্রয়িংরুমে প্রতিধ্বনিত হলো।

নোবারা থামল না। সে দরজার কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। জেনিন দৌড়ে গিয়ে তার সামনে দাঁড়ালো। নোবারার চোখ দুটো এখনো ফোলা, মুখটা ফ্যাকাসে। জেনিনকে সামনে দেখে সে এক মুহূর্তের জন্য থমকাল, কিন্তু পরক্ষণেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।

“পথ ছাড়ুন স্যার। আমি আগেই বলেছি, এখানে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে,” নোবারার কণ্ঠস্বর আজ বরফের মতো শীতল।

জেনিন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে রইল। তার ইগো তাকে বলছে জোর করে আটকে রাখতে, কিন্তু গতরাতের ভুলটা তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে। সে পেছন ফিরে তাকালো। ইউজি করিডোরের এক কোণে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। জেনিনের চোখের এক ইশারায় ইউজি ধীর পায়ে এগিয়ে এল। ইউজির মুখে এখনো জেনিনের হাতের সেই চড়ের নীল দাগটা স্পষ্ট।

“ইউজি,” জেনিন শান্ত কিন্তু গভীর গলায় বলল। “তুমি যা করেছ, তার জন্য তুমি কার কাছে দায়বদ্ধ?”

ইউজি নোবারার সামনে এসে দাঁড়ালো। তার সেই উদ্ধত অহংকার আজ ধুলোয় মিশে গেছে। জেনিনের নির্দেশে হোক বা পরিস্থিতির চাপে, ইউজি আজ নতজানু। সে নোবারার চোখের দিকে তাকাতে পারছে না।

“মিস আকারি… আমি… আমি আমার ভুল স্বীকার করছি। আমার অতি-সতর্কতা আপনাকে অসম্মান করেছে। বস-এর নির্দেশে নয়, আমি ব্যক্তিগতভাবে আপনার কাছে ক্ষমা চাইছি। আপনার সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল।” ইউজির গলার স্বরে এক অদ্ভুত জড়তা।

নোবারা একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। “মিস্টার গালিব, আপনি তো কেবল আপনার বস-এর হুকুম তামিল করেছেন। আপনার ক্ষমা চাওয়ায় আমার কোনো কিছু আসে যায় না। কারণ ক্ষতটা আপনি দেননি, দিয়েছেন আপনার ওই মহৎ বস।” সে জেনিনের দিকে আঙুল তুলে দেখালো।

জেনিন এক পা এগিয়ে এল। সে এবার নোবারার খুব কাছাকাছি। “নোবারা, ইউজি ক্ষমা চেয়েছে। আমি নিজেও স্বীকার করছি আমি ভুল করেছি। কিন্তু আপনি এভাবে চলে যেতে পারেন না। নূরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজের সাথে আপনার যে কন্টাক্ট, তা এভাবে ভাঙা যায় না।”

“আইন দেখাবেন না জেনিন নূরশাদ! আপনার আইনে মানুষ কেবল পণ্য। আমি পদত্যাগ করেছি,” নোবারা আবার হাঁটতে শুরু করল।

ঠিক তখনই ড্রয়িংরুমের কোণ থেকে হাহাকার করে উঠলেন বৃদ্ধ পরিচারক কাসেম আলী। তিনি কাঁপতে কাঁপতে নোবারার সামনে গিয়ে মেঝেতে বসে পড়লেন। “মা…ও মা! যেও না মা। এই ভিলায় তুমি আসার পর আমরা একটু হাসতে শিখেছিলাম। এই সাহেব তো মানুষ নন, উনি তো পাথর। উনাকে একা ফেলে গেলে উনি আরও ভয়ংকর হয়ে যাবেন। আমাদের কথা ভেবে অন্তত থেকো মা।”

রাঁধুনি রহমত চাচাও এগিয়ে এলেন। “বেটি, তোর হাতের ওই কফি ছাড়া সাহেবের দিন শুরু হয় না। তুই চলে গেলে এই বাড়িতে আবার লাশ পড়বে। আমরা বুড়ো মানুষ, আমাদের তো একটু মায়া কর।”

স্টাফদের এই ইমোশনাল রিঅ্যাকশন দেখে নোবারা খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। সে বুঝতে পারছে না এরা কি জেনিনের শিখিয়ে দেওয়া কথা বলছে নাকি সত্যিই তাকে ভালোবাসে। কিন্তু তাদের চোখের জল তো মিথ্যে নয়। জেনিন এই সুযোগটা হাতছাড়া করল না। সে জানে নোবারার নরম মনটাকে কোথায় আঘাত করতে হবে।

জেনিন নোবারার কানের কাছে মুখ নিয়ে এল। তার কণ্ঠস্বর এখন ফিসফিসে, “আপনি যদি আজ এই গেট পার হন নোবারা, তবে কাল সকালেই নূরপুর গ্রামের সেই ল্যান্ডলাইন কানেকশনটা চিরতরে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। আপনার মা, হালিমা আকারি…হয়তো উধাও হয়ে যাবেন। আমি চাই না আপনার জেদের কারণে ওনার কোনো ক্ষতি হোক।”

নোবারা শিউরে উঠল। সে জেনিনের চোখের দিকে তাকালো। সেখানে আবার সেই পৈশাচিক অধিকারবোধ ফিরে এসেছে। “আপনি… আপনি আমার মায়ের নাম নিয়ে আমাকে হুমকি দিচ্ছেন? আপনি কতটা নিচু হতে পারেন?”

“যতটা নিচু হলে আপনাকে কাছে রাখা যায়, আমি ঠিক ততটাই হতে পারি,” জেনিন খুব শান্তভাবে বলল। “আপনি যদি এখানে থাকেন, তবে নূরপুর গ্রামে আপনার মায়ের চিকিৎসার সব দায়িত্ব নূরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজ নেবে। আর যদি চলে যান… তবে আমি গ্যারান্টি দিতে পারছি না যে কাল সূর্যোদয় পর্যন্ত ওনার ঘরটা আস্ত থাকবে কি না।”

নোবারার চোখের জল আবার বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে এল। সে দেখল একদিকে স্টাফদের কান্না মেশানো অনুরোধ, আর অন্যদিকে জেনিনের এই নৃশংস ব্ল্যাকমেইল। সে একা, এই বিশাল সাম্রাজ্যের সামনে সে বড্ড অসহায়। জেনিন নূরশাদ তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে।

নোবারা তার ব্যাগটা সশব্দে মেঝেতে ফেলে দিল। তার কান্নায় পুরো ড্রয়িংরুম নিস্তব্ধ হয়ে গেল। “আপনি জিতলেন জেনিন নূরশাদ। আপনি আমাকে বন্দী করতে পেরেছেন। কিন্তু মনে রাখবেন, আজ থেকে এই ভিলায় আমার শরীরটা থাকবে ঠিকই, কিন্তু আপনার জন্য যে সম্মানটুকু অবশিষ্ট ছিল, তা আমি আজ নিজের হাতে পুড়িয়ে ফেললাম।”

জেনিন এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করল। সে জিতেছে, কিন্তু এই জয়ের স্বাদ বড্ড তিক্ত। সে ইউজিকে ইশারা করল নোবারার ব্যাগটা উপরে পৌঁছে দিতে। ইউজি ব্যাগটা তুলে নিয়ে নিঃশব্দে উপরে চলে গেল।

স্টাফরা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। তারা নোবারাকে ঘিরে ধরল, কেউ তার হাত ধরল, কেউ তাকে সান্ত্বনা দিতে লাগল। জেনিন দূর থেকে এই দৃশ্যটা দেখল। সে দেখল নোবারা স্টাফদের জড়িয়ে ধরেছে, কিন্তু জেনিনের দিকে সে একবারও ফিরে তাকাচ্ছে না।

নোবারা যখন সিড়ি দিয়ে উপরে উঠছিল, সে জেনিনের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ফিসফিস করে বলল, “আপনার এই পসেসিভনেস একদিন আপনারই কাল হবে জেনিন। আপনি আমাকে আটকে রেখেছেন ঠিকই, কিন্তু আপনার এই প্রাসাদ একদিন আপনার কাছেই জেলখানা মনে হবে।”

জেনিন কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু দেখল নোবারার ছায়াটা ধীরে ধীরে উপরে মিলিয়ে যাচ্ছে। ড্রয়িংরুমের আলো তখন ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হচ্ছে! তাতে কি! জেনিন তো নোবারাকে আটকে দিয়েছে। এবার নিজের করে নেওয়ার পালা। যাতে কোনদিন ছেড়ে যাওয়ার কথা বলতে না পারে।

চলবে ইংশাআল্লাহ……….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here