Soulmate_to_Enemy #পর্ব_১৮

0
2

#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_১৮
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম

নূরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজের সদর দপ্তরে আজ সকাল থেকেই এক অদ্ভুত থমথমে ভাব। অফিসের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হিমশীতল বাতাসের চেয়েও অনেক বেশি শীতল হয়ে আছে জেনিন নূরশাদের পার্সোনাল এক্সিকিউটিভের ডেস্কটি। নোবারা আকারি আজ অফিসে এসেছে ঠিক সময়েই, কিন্তু তার চোখেমুখে সেই চিরচেনা দীপ্তি আজ অনুপস্থিত। তার পরনে একটি সাধারণ ছাই রঙের সুতির শাড়ি, চুলে কোনো আলগা বাহার নেই, এমনকি ঠোঁটে সেই হালকা লিপস্টিকটাও আজ নেই। সে নিজের ডেস্কে পাথরের মূর্তির মতো বসে কম্পিউটারের স্ক্রিনে তাকিয়ে আছে। কিবোর্ডে তার আঙুলগুলো ক্ষিপ্র গতিতে চলছে, কিন্তু তার দৃষ্টিতে এক ধরণের শূন্যতা, যা যে কাউকে ভয় পাইয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

জেনিন নূরশাদ তার কেবিনের কাঁচের দেয়ালের ওপার থেকে নোবারাকে দেখছে। তার হাতে এক কাপ ব্ল্যাক কফি, যা অনেক আগেই ঠান্ডা হয়ে গেছে। জেনিনের পরনে আজ নেভি ব্লু থ্রি-পিস স্যুট, চোখে সেই চিরাচরিত তীক্ষ্ণ চাউনি থাকলেও তার চোয়ালের রেখাগুলো আজ কিছুটা নমনীয়। সে দেখছে নোবারা কীভাবে তার অস্তিত্বকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে নিজের কাজে মগ্ন হয়ে আছে।

সকালে ভিলা থেকে বের হওয়ার সময় নোবারা জেনিনের গাড়িতে ওঠেনি, বরং অফিসের বাসে করে এসেছে, যা জেনিনের ইগোতে এক প্রচণ্ড আঘাত ছিল। তবুও জেনিন আজ নিজেকে সংযত রেখেছে। সে জানে, শিকার যখন আহত হয়, তখন ব্যাধকে অনেক বেশি ধৈর্যশীল হতে হয়।

ইউজি কেবিনে ঢুকল। তার হাতে কিছু এনক্রিপ্টেড ফাইল। ইউজি নোবারার ডেস্কের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একবার থামল, কিছু একটা বলতে চাইল, কিন্তু নোবারার সেই নির্লিপ্ত এবং ঘৃণাপূর্ণ চাউনি দেখে সে কথা না বাড়িয়েই ভেতরে ঢুকে গেল।

“বস, ইউরোপিয়ান শিপমেন্টের আপডেট আছে। আর পুলিশ আবার আমাদের কিছু এজেন্টকে ট্র্যাক করার চেষ্টা করছে,” ইউজি খুব নিচু স্বরে বলল।

জেনিন কোনো উত্তর দিল না। তার নজর এখনো বাইরের ডেস্কে। ইউজি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আবার বলল, “বস, আপনি কি শুনতে পাচ্ছেন?”

জেনিন এবার ইউজির দিকে ফিরল। তার চোখের সেই শীতলতা ইউজিকেও কাঁপিয়ে দিল। “আজকের মিটিংগুলো ক্যানসেল করো। আমি কোনো বাইরের লোকের সাথে কথা বলব না।”

ইউজি অবাক হলো। “কিন্তু বস, জাপানিজ ডেলিগেটরা তো অপেক্ষা করছে। এই ডিলটা আমাদের জন্য…”

“আমি যা বলেছি, তাই করো ইউজি,” জেনিন খুব শান্ত কিন্তু ভারী গলায় বলল। “আর হ্যাঁ, মিস আকারিকে বলো আমার জন্য কফি নিয়ে আসতে।”

ইউজি কেবিন থেকে বেরিয়ে এসে নোবারার ডেস্কের সামনে দাঁড়ালো। সে গলা পরিষ্কার করে বলল, “মিস আকারি, বস কফি চেয়েছেন।”

নোবারা কিবোর্ড থেকে হাত সরাল না। সে স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই বলল, “প্যান্ট্রিতে বলে দিন। আমার কাছে ওনার কফি বানানোর কোনো ইনস্ট্রাকশন নেই।”

ইউজি দাঁতে দাঁত চাপল। “বস আপনাকে ডেকেছেন। আপনি পিএ হিসেবে ওনার অর্ডার রিফিউজ করতে পারেন না।”

নোবারা এবার ইউজির চোখের দিকে তাকালো। সেই চোখে কোনো ভয় নেই, আছে কেবল এক গভীর তাচ্ছিল্য। “আমি আমার কাজের ডেসক্রিপশন জানি। কফি সার্ভ করা আমার কন্ট্যাক্টে নেই। আপনার বসকে গিয়ে বলুন, যদি কাজ থাকে তবে ইন্টারকমে বলতে।”

ইউজি স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। পুরো নূরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজে জেনিন নূরশাদের আদেশের ওপর কথা বলার সাহস কারো নেই, সেখানে এই মেয়েটি সরাসরি অস্বীকার করছে। ইউজি ভেতরে গিয়ে জেনিনকে পরিস্থিতিটা জানালো। জেনিন রেগে যাওয়ার বদলে একটা ম্লান হাসি হাসল। সে নিজেই কেবিন থেকে বেরিয়ে এল।

জেনিন যখন করিডোর দিয়ে হাঁটছে, পুরো ফ্লোরের কর্মীরা মাথা নিচু করে নিজেদের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। জেনিন এসে নোবারার ডেস্কের ঠিক সামনে দাঁড়ালো। তার দীর্ঘ অবয়ব নোবারার ওপর এক ছায়া তৈরি করল। নোবারা কাজ থামালো না। সে জেনিনের উপস্থিতিকে এমনভাবে অগ্রাহ্য করল যেন জেনিন সেখানে নেই।

“কফিটা কি আমি নিজেই বানিয়ে নেব মিস আকারি?” জেনিনের কণ্ঠস্বর আজ খুব নিচু, যেন সে নিজেরই কোনো হারানো সুর খুঁজছে।

নোবারা এবার কিবোর্ড থেকে হাত সরালো। সে ধীরে ধীরে মাথা তুলে জেনিনের দিকে তাকালো। তার চোখে সেই গতরাতের অপমানের আগুন। “আপনার এক ইশারায় তো রক্ত ঝরে, তবে কফি কেন বানাতে পারবেন না? নাকি আমার মতো দাসীর হাতের কফি ছাড়া আপনার সাম্রাজ্য ঠিকমতো চলে না?”

জেনিনের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল, কিন্তু সে নিজেকে সামলাল। সে নোবারার ডেস্কের ওপর দুই হাত রেখে একটু ঝুঁকে এল। “আমি আপনাকে অপমান করতে আসিনি। আমি শুধু চাচ্ছিলাম….”

“যা চাচ্ছিলেন, তা তো আপনি গতরাতেই আদায় করে নিয়েছেন,” নোবারা খুব নিচু স্বরে কিন্তু তীক্ষ্ণভাবে বলল। “আমার মা-কে ব্ল্যাকমেইল করে আমাকে এই নরকে আটকে রেখেছেন। এর চেয়ে বেশি আর কী চান? আমার কলিজাটা ছিঁড়ে ইউজিকে গিফট করবেন?”

জেনিন এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করল। সে অনুভব করতে পারছে, নোবারার এই মৌনতা তাকে তিলে তিলে ধ্বংস করছে। সে একজন মাফিয়া ডন, যার ইশারায় শহর কাঁপে, অথচ এই মুহূর্তে সে এই মেয়েটির অবজ্ঞার সামনে নিজেকে বড্ড অসহায় মনে করছে। সে পকেট থেকে একটি ছোট মখমলের বাক্স বের করে ডেস্কের ওপর রাখল।
“এটা আপনার জন্য। কাল রাতে আপনার একটা গয়না নষ্ট হয়েছিল, ওটার বদলে….”

নোবারা বাক্সটির দিকে তাকালোও না। সে ওটা আঙুল দিয়ে এক পাশে সরিয়ে দিল। ” আপনি যদি মনে করেন এই দামী পাথরগুলো আমার ঘৃণা কমিয়ে দেবে, তবে আপনি ভুল করছেন। এখন আমাকে কাজ করতে দিন। আপনার অফিসে কাজের সময়ের মূল্য অনেক বেশি, তাই না?”

জেনিন আর কিছু বলতে পারল না। সে দেখল অফিসের অন্য কর্মীরা আড়চোখে এই দৃশ্যটা দেখছে। জেনিন নূরশাদ আজ তার নিজেরই তৈরি দুর্গের সামনে দাঁড়িয়ে প্রত্যাখ্যাত হচ্ছে। সে কোনো কথা না বলে নিজের কেবিনে ফিরে গেল।

দুপুরের দিকে জেনিন আবার ইউজিকে ডাকল। জেনিন এখন নিজের ক্ষমতার দম্ভ আর ভালোবাসার নমনীয়তার মাঝে এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বে ভুগছে। সে দেখছে নোবারা দুপুরের খাবার খেতে প্যান্ট্রিতেও যায়নি। সে কেবল পানি খেয়ে কাজ করে যাচ্ছে। জেনিনের বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল। সে জানে নোবারার এই জেদ তাকে অসুস্থ করে দেবে।

জেনিন ইন্টারকম তুলল। “মিস আকারি, আমার কেবিনে আসুন। ইমিডিয়েটলি।”

নোবারা এবার আর না করল না। সে ফাইল হাতে নিয়ে কেবিনে ঢুকল। জেনিনের সামনে ফাইলটা রেখে সে কাঠের মতো দাঁড়িয়ে রইল। জেনিন চেয়ার ছেড়ে উঠে এল। সে নোবারার খুব কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ালো, কিন্তু নোবারা এক কদম পিছিয়ে গেল।

“আমি আপনাকে কামড়াব না নোবানা “জেনিন খুব মৃদু গলায় বলল। “আপনি কেন নিজেকে এভাবে কষ্ট দিচ্ছেন? আপনি দুপুরের খাবার খাননি কেন?”

“আপনার অফিসে কর্মচারীদের লাঞ্চ ব্রেক কতক্ষণের, সেটা কি আপনি মনে করিয়ে দিতে চান?” নোবারার উত্তর ছিল ছোট এবং বিষাক্ত।

“আমি আপনার সাথে কথা বলতে চাইছি মিস আকারি। আমি জানি আমি যা করেছি তা ক্ষমার অযোগ্য। কিন্তু আমাকে একবার সুযোগ দিন!”

নোবারা এবার জেনিনের চোখের দিকে তাকালো। “সুযোগ? সুযোগ তো আপনি গতরাতেই হারাননি জেনিন, আপনি ওটা পনেরো বছর আগেই হারিয়েছিলেন।”

জেনিন নোবারার বাহুটা ধরতে চাইল, কিন্তু নোবারার সেই ঘৃণাপূর্ণ চাউনি তাকে পিছিয়ে আসতে বাধ্য করল। জেনিন নূরশাদ আজ প্রথমবারের মতো বুঝতে পারল যে বন্দুকের গুলিতে মানুষ মরে ঠিকই, কিন্তু অবহেলায় মানুষ পাথর হয়ে যায়।

জেনিন ডেস্কে ফিরে গিয়ে বেল চাপল। ইউজি ঢুকল। “বস?”

“শহরের সেরা রেস্টুরেন্ট থেকে লাঞ্চ অর্ডার করো। আর শোনো, সেটা যেন মিস আকারির ডেস্কে সরাসরি পৌঁছে দেওয়া হয়। ও যদি না খায়, তবে পুরো প্যান্ট্রি স্টাফকে আজই টার্মিনেট করব। কথা যেন পরিষ্কার থাকে।”

জেনিনের এই আদেশ শুনে নোবারা একটু হাসল। এক করুণ হাসি। “আপনার এই শাসন আর পসেসিভনেস দেখতে দেখতে আমি ক্লান্ত জেনিন। আপনি নিজের অপরাধ ঢাকতে গিয়ে অন্যদের ওপর অবিচার করতেও দ্বিধা করেন না। ঠিক আছে, আমি খাব। আপনার স্টাফদের চাকরি বাঁচানোর জন্যই আমি খাব। কিন্তু মনে রাখবেন, প্রতিটি লোকমা আমার কাছে বিষের মতো লাগবে।”

নোবারা কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। জেনিন জানালার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে রইল। সে দেখল নোবারা তার ডেস্কে ফিরে গিয়ে আবার সেই যান্ত্রিক কাজ শুরু করেছে।

ইউজি বাইরে এসে নোবারার ডেস্কের পাশে দাঁড়ালো। সে দেখল নোবারা তার কাজ করছে। ইউজি নিচু স্বরে বলল, “বস আপনার জন্য লাঞ্চ পাঠাচ্ছেন। খেয়ে নেবেন।”

নোবারা ইউজির দিকে না তাকিয়েই বলল, “আপনার বসকে বলবেন, দয়া করে আমার খাবারের মেনু ঠিক করার চেয়ে যেন নিজের ইগোটা একটু ঠিক করেন। আর আপনি? আপনি তো ওনার ছায়া। ছায়াদের নিজস্ব কোনো স্বর থাকে না, তাই দয়া করে ওনার হয়ে ওকালতি করবেন না।”

ইউজি রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে চলে গেল। পুরো অফিস এখন এক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে যেখানে কোনো গোলাবারুদ নেই, আছে কেবল শব্দের তীক্ষ্ণতা আর নীরবতার দহন। জেনিন নূরশাদ আজ সিইও হিসেবে নয়, বরং এক ছটফট করতে থাকা প্রেমিকের মতো নিজের কেবিনে বন্দি। সে দেখছে নোবারা তাকে কীভাবে এক অদৃশ্য জেলের মধ্যে আটকে দিয়েছে।

<><><><><><><><><>

অফিসের বিশাল কাঁচের জানালার ওপাশে দুপুরের সূর্যটা তেজ হারিয়ে অনেকটা ফ্যাকাসে হয়ে এসেছে। নূরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজের করিডোরগুলোতে যে যান্ত্রিক ব্যস্ততা ছিল, লাঞ্চ ব্রেকের কারণে সেখানে এখন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। জেনিন নূরশাদ তার কেবিনের ভেতরে পায়চারি করছে। তার হাতের রোলেক্স ঘড়িটি প্রতি সেকেন্ডে যে টিকটিক শব্দ করছে, সেটি যেন তার হৃদপিণ্ডের ওপর হাতুড়ির ঘা মারছে। সে একটার পর একটা সিগারেট ধরিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু কোনো কিছুতেই তার ভেতরের অস্থিরতা কমছে না। বাইরে তার ডেস্কে নোবারা তখনো বসে আছে। জেনিন লক্ষ্য করল, টেবিলের ওপর রাখা লাঞ্চ বক্সটি নোবারা একবারের জন্যও খোলেনি। সে কেবল নিজের পানির বোতল থেকে দু-এক চুমুক জল খাচ্ছে আর কম্পিউটারের ডেটাবেস চেক করছে।

জেনিনের ভেতরের সেই ভয়ংকর সত্বাটা আজ যেন কোনো গভীর গুহায় লুকিয়ে পড়েছে। তার বদলে জেগে উঠেছে এক রিক্ত প্রেমিক, যে নিজেরই তৈরি করা কাঁটাতারে ক্ষতবিক্ষত। সে দেখল নোবারার মাথাটা ডেস্কে সামান্য নুইয়ে পড়েছে, হয়তো ক্লান্তিতে বা তীব্র অভিমানে। জেনিন আর নিজেকে আটকে রাখতে পারল না। সে ঝড়ের বেগে কেবিন থেকে বেরিয়ে এল। করিডোরে থাকা স্টাফরা জেনিনের এই রণমূর্তি দেখে ভয়ে সিঁটিয়ে গেল, কিন্তু জেনিন কারো দিকে তাকালো না। সে সরাসরি নোবারার ডেস্কের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।

নোবারা মাথা তুলল না। জেনিন দেখল নোবারার চোখের নিচে হালকা কালচে ছায়া। সে খুব ধীরে নোবারার ডেস্কের কোণটা ধরল। তার কণ্ঠস্বর এখন আর সেই গর্জনের মতো নয়, বরং খুব নিচু এবং কাতর।

“মিস আকারি, চলুন।” জেনিন খুব শান্তভাবে বলল।

নোবারা কিবোর্ড থেকে তার আঙুলগুলো সরালো না। সে এক মুহূর্তের জন্য জেনিনের দিকে তাকালো। সেই দৃষ্টিতে আজ কোনো কথা নেই, কেবল এক বিশাল দূরত্ব। “আমার কাজ এখনো বাকি আছে, স্যার। আপনার অফিসের প্রোটোকল অনুযায়ী পেন্ডিং কাজ রেখে ওঠা নিষেধ।”

জেনিন এবার আর কোনো কথা শোনার মেজাজে নেই। সে নোবারার হাতের কব্জিটা ধরল। তবে আগের মতো উগ্রভাবে নয়, বরং খুব সতর্কভাবে, যেন কোনো দামী পালক ধরছে। নোবারা হাতটা সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু জেনিনের শক্তি আর আকুতি, দুটোর কাছেই সে হার মানল।

জেনিন তাকে প্রায় টেনে লিফটের দিকে নিয়ে চলল। অফিসের শত শত চোখ তাদের দিকে নিবদ্ধ, কিন্তু জেনিন নূরশাদের ইশারায় সবাই মাথা নিচু করে নিল। কারো সাহস নেই এই দৃশ্যে নাক গলানোর।

লিফট যখন দ্রুতবেগে নিচে নামছে, নোবারা জেনিনের থেকে মুখ ফিরিয়ে লিফটের কাঁচের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে রইল। জেনিন আয়নায় দেখল নোবারার চোখের কোণটা চিকচিক করছে।

জেনিনের এসইউভি যখন অফিসের পার্কিং লট থেকে বের হলো, ইউজি তার নিজের গাড়িতে করে পেছনে আসতে চাইল। কিন্তু জেনিন ইশারায় তাকে থামিয়ে দিল। আজ জেনিন কোনো বডিগার্ড চায় না, কোনো ডান হাত চায় না। সে চায় কেবল নোবারাকে।

গাড়ি চলতে শুরু করল শহরের ব্যস্ত রাজপথ ছেড়ে এক নিরিবিলি নদীর ধারের দিকে। সেখানে নূরশাদ পরিবারের একটি পুরনো বাংলো আছে, যা এখন কেবল জেনিনের নির্জনবাসের জায়গা। গাড়ির ভেতরে এসি চলছে, কিন্তু পরিবেশটা গুমোট। নোবারা জানালার কাঁচের ওপাশে দ্রুত চলে যাওয়া গাছপালা আর বাড়িঘর দেখছিল। সে ভাবছিল, জেনিন কি তাকে আবার কোনো নতুন শর্তে বাঁধতে নিয়ে যাচ্ছে? নাকি জেনিনের এই ‘নরম হওয়া’ কেবল একটি নতুন কোনো জাল?

জেনিন স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরে আছে। মাঝে মাঝে সে আড়চোখে নোবারার সেই নিথর মুখটা দেখছে। সে মনে মনে হাজারটা কথা সাজাচ্ছে ক্ষমা চাওয়ার জন্য, কিন্তু তার ইগো তাকে বারবার বাধা দিচ্ছে। সে জেনিন নূরশাদ, সে কি কারো পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ে ক্ষমা চাইবে? কিন্তু নোবারার এই মৌনতা যেন তাকে তিলে তিলে মারছে।

বাংলোর গেটে পৌঁছে জেনিন নিজেই নেমে নোবারার পাশের দরজাটা খুলে দিল। জায়গাটা অত্যন্ত শান্ত। কেবল বাতাসের শব্দ আর দূরে নদীর ঢেউয়ের গর্জন শোনা যাচ্ছে। নোবারা গাড়ি থেকে নামল, কিন্তু সে বাংলোর ভেতরে ঢুকতে অস্বীকার করল। সে সোজা গিয়ে নদীর ধারের একটা সিমেন্টের বেঞ্চে বসল। জেনিন তার পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো। দুপুরের রোদ এখন বেশ কড়া, কিন্তু নদীর ধারের হাওয়ায় এক ধরণের স্নিগ্ধতা আছে।

“আপনি কি আমাকে এখানে মেরে ফেলার জন্য এনেছেন স্যার?” নোবারা সামনের দিকে তাকিয়ে খুব শীতল গলায় জিজ্ঞেস করল।

জেনিন শিউরে উঠল। সে নোবারার পাশে বসল না, বরং তার সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল, অন্ধকার জগতের সেই ত্রাস জেনিন নূরশাদ আজ নোবারার পায়ের কাছে নতজানু। “আমি আপনাকে মারার জন্য নয়, আমি নিজেকে মারার জন্য এখানে এসেছি। আপনার এই ঘৃণা আমাকে প্রতিটি মুহূর্তে হত্যা করছে।”

নোবারা এবার সরাসরি জেনিনের চোখের দিকে তাকালো। তার ঠোঁটে এক বিদ্রূপের হাসি। “ভালোবাসার নামে বন্দি করা, মায়ের নাম নিয়ে ব্ল্যাকমেইল করা, এগুলো কি আপনার টান, জেনিন?”

জেনিন নোবারার হাতটা ধরতে চাইল, কিন্তু নোবারা হাতটা সরিয়ে নিজের আঁচলের নিচে লুকিয়ে ফেলল। জেনিনের দুচোখ দিয়ে আজ প্রথমবারের মতো এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। সে জেনিন নূরশাদ, যে কিনা লোহাকে গলিয়ে দেয় নিজের দম্ভে, আজ সে একটি মেয়ের অবহেলার আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। সে খুব নিচু স্বরে বলল, “আমি স্বীকার করছি আমি ভুল করেছি। আমি ইউজিকে সরিয়ে দেব যদি আপনি চান। আমি নূরপুর গ্রামে আপনার মায়ের পাশে থাকব। কিন্তু দয়া করে আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন না।”

নোবারার বুকটা ধক করে উঠল। জেনিন নূরশাদ কাঁদছে? সে কি সত্যি দেখছে নাকি কোনো বিভ্রম? কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে পড়ল গতরাতের সেই অপমান। সে উঠে দাঁড়ালো। নদীর উত্তাল বাতাসের ঝাপটায় তার শাড়ির আঁচল উড়ছে।

“আপনি আমাকে যাই দিন স্যার, টাকা, সোনা বা ক্ষমা, আমার সেই বিশ্বাসটা আর ফিরে আসবে না। আপনি আমার সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছেন। আমি আপনার সাথে আছি কারণ আমি নিরুপায়। কিন্তু আপনার এই নরম রূপটা আমার কাছে কেবল এক ধরণের অভিনয় মনে হচ্ছে।”

নোবারা ধীর পায়ে নদীর পাড়ের দিকে এগিয়ে গেল। জেনিন পেছনে দাঁড়িয়ে রইল। সে দেখল সূর্যের আলোয় নোবারার অবয়বটা কেমন ঝাপসা হয়ে আসছে। জেনিনের মনে হলো সে তার সারা জীবনের সঞ্চিত অন্ধকার দিয়ে একটি নক্ষত্রকে গ্রাস করে ফেলেছে। সে দৌড়ে গিয়ে নোবারার পেছন থেকে তাকে জড়িয়ে ধরতে চাইল, কিন্তু সে থেমে গেল। সে বুঝতে পারল, এই মুহূর্তে স্পর্শ নয়, দূরত্বই হয়তো নোবারাকে শান্তি দেবে।

জেনিন খুব গম্ভীরভাবে বলল, “আমি জানি আপনি আমাকে মাফ করবেন না। কিন্তু আমি আপনাকে হারাব না। আপনি যদি মনে করেন আমার এই ভালোবাসা কেবল অভিনয়, তবে তাই হোক। আমি আজীবন এই অভিনয়টাই করে যাব।”

নোবারা পেছন ফিরল না। তার দুচোখ দিয়ে অঝোরে জল নামছে। সে জেনিনকে ঘৃণা করতে চায়, কিন্তু জেনিনের এই রিক্ত কণ্ঠস্বর তাকে দ্বিধায় ফেলে দিচ্ছে। সে অনুভব করল জেনিন তার খুব কাছে দাঁড়িয়ে আছে। জেনিন তার গায়ে একটা পাতলা শাল জড়িয়ে দিল, যা সে গাড়ি থেকে নিয়ে এসেছিল।

“নদীর পাড়ে হাওয়া বেশি। আপনার ঠান্ডা লেগে যাবে।” জেনিন খুব শান্তভাবে বলল। তার এই অতি-সাধারণ যত্ন আজ নোবারাকে আরও বেশি আহত করল। যে মানুষটা এক হাতে তলোয়ার নিয়ে ঘোরে, সে অন্য হাতে কীভাবে এতটা মায়া নিয়ে আসে?

পুরোটা দুপুর তারা ওভাবেই কাটিয়ে দিল। কোনো অতিরিক্ত কথা নেই, কোনো উচ্চবাচ্য নেই। জেনিন দূরে দাঁড়িয়ে নোবারাকে দেখছিল, আর নোবারা অপলক দৃষ্টিতে নদীর জলের দিকে তাকিয়ে রইল। তাদের মাঝখানে এক বিশাল কাঁচের দেয়াল, যা কেউ ভাঙতে পারছে না। জেনিন নূরশাদ আজ বুঝতে পারল, বন্দুকের গুলি দিয়ে শত্রু মারা যায় ঠিকই, কিন্তু ভালোবাসা পেতে গেলে নিজেকেও তিলে তিলে মরতে হয়।

বিকালে যখন তারা গাড়িতে ফিরছিল, জেনিন খুব মৃদু স্বরে বলল, “অফিসে কাল থেকে আপনাকে আর আমার কেবিনের সামনে বসতে হবে না। আমি আপনার জন্য আলাদা একটা রুমের ব্যবস্থা করে দেব, যেখানে আপনাকে কারো চোখের সামনে পড়তে হবে না। ইউজি আপনার কাছে যাবে না।”

নোবারা জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। সে কিছুই বললো না।

গাড়ি যখন আবার শহরের কংক্রিটের অরণ্যে প্রবেশ করল, জেনিন নিজেকে আবার সেই কঠোর আবরণে ঢেকে নিল। সে জানে তাকে আবার সেই মুখোশটা পরতে হবে। কিন্তু তার ভেতরটা আজ এক মরুভূমি হয়ে রয়ে গেল। নূরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজের গেটে গাড়ি থামার পর নোবারা দ্রুত নেমে গেল।

চলবে ইংশাআল্লাহ।।।।।।।।।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here