কথা_দিলো_রোদ্দুর (৩১) #তুসিকা

0
1

#কথা_দিলো_রোদ্দুর (৩১)
#তুসিকা
অর্থি বিড়াল দেখে ভয় পাচ্ছে,, আর ভয় পেয়ে সাম্যকে কি নিদারুণ আষ্টেপৃষ্টে ধরেছে।
আর বারবার সাম্য কে বলছে বিড়াল টিকে সরিয়ে রাখতে। কিন্ত বিড়ালটি ও নাছোড়বান্দা অর্থির নতুন মুখ দেখে তার পাশেই ঘেঁষে আসার চেষ্টা করছে। সাম্যের অবশ্যই ভালোই লাগছে,, বিড়ালের বাহানায় অর্থি তার এত কাছে এসেছে না হলে এই মেয়ে অন্তত তার কাছে আসার কথা না। তাই অর্থির কান্ড দেখে সাম্য হাসছে।

—” এই আপনি হাসছেন! রুমে বিড়াল ডুকেছে, বের করুন একে!

কিন্তু সাম্য অর্থির কোনো কথা শুনলো না,, উল্টো বিড়ালটিকে কোলে তুলে নিল, এতেই ক্ষান্ত হলো না বিড়ালটির মাথায় হাত বুলিয়ে চুমু ও খেল। অর্থি শুধু চোখ বড় বড় সাম্যের দিকে তাকিয়ে রইল। সাথে সাথে নাক কুঁচকে এলো ওর।

—” আরে এটা আমার বিড়াল,, তুমি এত পাচ্ছো কেন বলো তো! দেখ মিচেন আমার জানেমান আমার কোলে কি সুন্দর বসে আছে, তুমি ধরো দেখবা তোমাকে কিছুই করবে না।

—” না,,, আপনার বিড়াল কাছে বলবেন না,, আর ওকে আপনিই রাখুন,, কাছে আনবেন না, আমার ভয় লাগে প্লিজ।

অর্থি চেঁচিয়ে উঠল কিন্ত সাম্য এবার অর্থির কথা শুনলো না, উল্টো মিচেন কে একে বারে অর্থির সামনে নিয়ে গেল, যা দেখে অর্থি আরো জোরে চিৎকার দিয়ে বিছানার একদম কাছ ঘেঁষে রইল। আর চোখ মুখ খিচে সাম্যের উদ্দেশ্য বলল;
—” আপনি এমন কেন করছেন, প্লিজ ওকে নিয়ে যান এখান থেকে।

সাম্য দুষ্ট হেসে বলল;
—” আগের মতো একটু জড়িয়ে ধরো, তাহলে ভেবে দেখবো।
সাম্যের কথার সাথে বিড়াল টি ও মিউ মিউ করে উঠল তা দেখে সাম্য বলল;
“” দেখলে মিচেন ও চায়, তুমি আমার সাথে সাথে ওকে ও আদর দাও। কাল তো সুযোগ ই ছিল না, কিন্ত… এখন সময় আছে আর সুযোগ ও।

এই বলে সাম্য অর্থির আরো কাছে এগিয়ে যায়,, অর্থি তখন ভয়ে চোখ বন্ধ করে আছে, তা দেখে সাম্য হেসে মিচেন কে কোল থেকে নামিয়ে দেয়। অর্থির বন্ধ চোখ জোড়াতে ফুঁ দেয়,, মুখে ছড়ানো চুল গুলো কানের পাশে গুজে দিল। অর্থি তখন বিস্ময়কর দৃষ্টি নিয়ে সাম্য দিকে তাকালো, সাম্যের সেই শান্ত চোখের নির্লিপ্ত দৃষ্টি দেখে ভয় লজ্জায় মাথা নুইয়ে নিল।
হৃপিন্ডের কম্পন যেন দ্রুত তম হলো,, সাথে মস্তিষ্ক জানান দিল অদ্ভুত কিছুর।

কিন্ত তার আগে হন্তদন্ত হয়ে নিলু এলো অর্থির খোঁজে। কোনোদিক না ভেবে একগাল হাসি নিয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলল;

—” ভাইজান ভাবীকে খালাম্মা ডাকে। পাশের বাড়ির ওই চাচিম্মারা ভাবীকে দেখার জন্য আসছে। তাড়াতাড়ি আসতে বলেন!

নিলু সাম্যদের বাড়িতেই থাকে, সাম্যের মাকে টুকটাক কাজে সাহায্য করে। অনেক বছর ধরেই নিলু এখানে আছে তাই সাম্যদের সাথে ওর টান টা অন্য রকম নিজের। তাই তো নিলুকে দেখে সাম্য তড়িঘড়ি অর্থির সামনে থেকে সরে এলো, চোরামুখো হয়ে এদিক সেদিক তাকালো,, নিজের কপাল গুনে একখান ভাগ্য পেয়েছে, বউয়ের সোহাগ যখন পেতে ইচ্ছে করে তখন বাধা পড়ে যায়,, তাই বিরবির করে বলল;

—” পাঠাচ্ছি যা!

নিলু আসায় অর্থি ও অপ্রস্তুত হয়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেল। দেখলো মিচেন নামক প্রানীটি নেই, তাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো, আর সাম্য আর মিচেন এই দুই আতঙ্ক থেকে বাঁচতে নিলু সাথে চলে গেল। সাম্য পেছনে হাসলো, আর অর্থি রুমে আসার আগেই মুসাবের সাথে বাইরে থেকে ফিরেছিল তাই শরীর টা আবার বিছানায় এলিয়ে দিল।

তবে নিচে গিয়ে আরেকদফা আতঙ্ক সামনের পড়ল অর্থি, নতুন বৌ দেখতে এসেছে কয়েকজন মহিলা। তারা সাম্যদের প্রতিবেশি হয়। অর্থি সালাম জানালো সবাই কে। কিন্ত একটু অস্থির লাগলো, সারা জীবন ওই ঘরকুনে স্বভাব ছিল বলেই এমনটা হচ্ছে। তবে ফাতেমা বেগম থাকায় তিনি সবার সাথে অর্থির পরিচয় করিয়ে দিলেন।

ওখান থেকে একজন বললেন;
—” এটা তোমার ছেলের বৌ! মেয়ে তো সুন্দর আছে ভাবী! ভালোই হলো তোমাকে আর একা থাকতে হবে না,, এখন ছেলে র বৌ পেয়েছো নিজের মতো গড়ে নাও।

ফাতেমা বেগম হাসলেন;
—” হ্যাঁ আপা! আমার সাম্যের বৌ! দোয়া করো ওদের জন্য।

এরপর মহিলা গুলো আরো কিছু কথা বললেন ফাতেমা বেগমের সাথে,, নিলু এসে তাদের চা নাস্তা দিল,,

আর এসব শেষে মহিলারা যখন চলে গেল তখন অর্থি আর সাম্যের রুমে গেল না,, এই রকম আতঙ্কের সামনে কেউ কি ইচ্ছাকৃত পড়তে চায়?, অর্থি চাইলো না,, তাই ফাহা র কাছে গেল।

ফাহা আজ চলে যাবে দেখে অর্থির মনটা একটু খারাপ, অর্থি চেয়েছিল ফাহা যেন আরো দুটোদিন এখানে থাকে পরে সাম্য না হয় ওকে বাড়ি পর্যন্ত দিয়ে আসবে। কিন্ত মুসাব ও আজ চলে যাবে ফেনীতে, তাই ফাহা বলল সে মুসাবের সাথে অর্থিদের বাড়িতে চলে যাবে, আর সেখান থেকে মায়েদের সাথে একেবারে নিজেদের বাড়িতে যাবে। তাই ফাহা এখন রিলাক্সে ব্যাগ গুছিয়ে বিছানায় বসে লটকন খাচ্ছে।

সাম্যদের বাড়িটা অনেক বড়, আর ফল গাছ ও আছে কয়েকটা,, লটকন গুলো ওদের বাগানের যেগুলো নাকি নিলু তাকে এনে দিয়েছিল। অর্থি ফাহা র পাশে বসতে অর্থিকে ও দিল কয়েকটা। আর খেতে খেতে ফাহা বলল;

—” আচ্ছা আপু চলে গেলে তোমার সাথে তো তেমন কথা হবে না, তাই না,,, আমি কিন্তু তোমাকে অনেক মিস করবো,,,

—” আমিও.. তাই বলছি আর দুটো দিনই তো থেকে যাও।

লটকন ছিলে মুখে পুরতে পুরতে ফাহা বলল;
—”পরে আরেকবার আসলে থাকবো,, এখন মুসাব ভাইয়ের সাথে চলে যাই,,,, কিন্ত শোনো না যে কথা বলছিলাম,, এরপর ফাহা অর্থির আরটু কাছে এগিয়ে বসলো,, লজ্জা লজ্জা মুখ করে বলল;
—” আচ্ছা চলে যখন যাবো একটা কথা বলি,, রাগ করবে না কিন্তু, পরে তো জিজ্ঞেস ও করা যাবে না,,, তাই এখন জানতে চাইছি।

অর্থি ফাহা ভাব দেখে কিছু বুঝলো না,, তাই কি জানতে চায় বলতে বলল।

—” উমহু মানে সাম্য ভাই কি কাল তোমাকে আদর দিয়েছে! তোমাদের মাঝে কি রোমান্টিক কিছু হয়েছে। দেখো কিছু মনে করবা না,, ধরো আমি তোমার বান্ধবী হয়ে তোমাকে জিজ্ঞেস করছি।

লাজ শরমের মাথা খেয়ে ফাহা যে প্রশ্ন করলো, তাতে অর্থির গাল গরম হয়ে উঠল,, ফাহা এমনিতেই চঞ্চল, কিন্ত অর্থি কি ভেবেছিল ফাহা এমন একটা প্রশ্ন করবে,, আর কাল সাম্যের সাথে তেমন কোনো গভীর সম্পর্ক ই তৈরি হয়নি, তাছাড়া ফাহা তার বোন তার সাথে এসব কথা কিভাবে বলবে, মানুষ শুনলে কি ভাববে।

কিন্ত ফাহার উৎসুক মন জানার জন্য এমন ভাবে ঝেঁকে ধরলো;
—” আরে আপু লজ্জা পাচ্ছো কেন,, আমি হলে তোমাকে বলতাম না বলো! আর আমরা তো ফ্রেন্ডের মতো বোন! তাহলে বলো!

ফাহা এমন বেলাজ কথা বার্তায়তাতে অর্থি শুধু না বোধক মাথা নাড়ল। আর লাজুক মুখ নিয়ে বলল;

—” কাল উনি আমাকে সুন্দর কয়েকটা গান শোনালেন,, নিজের ব্যাপারে জানালেন, আমার ব্যাপারে জানতে চাইলেন,, আমাকে কিছু উপহার দিলেন ব্যস।

ফাহা এবার অর্থির কাছ থেকে সরে এসে বলল;
–’ ব্যস এটুকুই! সাম্য ভাই তোমাকে পাবার জন্য যা করলো, আমি আরো ভাবলাম কি সুন্দর রোমান্স হবে,, শুনে একটু অভিজ্ঞতা নেব ভালোবাসার মানুষ কে নিজের নিজের মনের কথা বলতে হয়, কিভাবে ভালোবাসতে হয়,,, কিন্তু তোমরা তো দেখছি নিরামিষ!

নিরামিষ কথাটি শুনে কাল রাতের একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে অর্থি। আর সাথেই গাল ফোলালো। সাম্য ও তাকে এই কথা বলেছে,, তাই কথা ঘোরানোর জন্য বলল;

—” এসব কথা তুমি কেন জানতে চাইছো বলো তো। তুমি কাউকে পছন্দ করো ফাহা!

ফাহা একটু লজ্জা পেল,, তবে চটপটে ভাব বজায় রেখে বলল;
—”তোমাকে সব বলব আপু,, কিন্তু এখন কিচ্ছু জিজ্ঞেস করো না এখনও কিছু সিওর নাই।

অর্থি আর ফাহা কে কিছু বলল না,, ফাহা যখন নিজে বলেছে বলবে তাহলে তখন তাকে কথাটা বলবেই, না হলে তার পেটে ভাত হজম হবে না, এটা অর্থির জানা আছে। তাই সে সময় অর্থি ফাহার সাথে কাটালো,, তবে মিচেন নামক অবলা প্রানীটি সারা বাসায় বিচরণ করে বেরিয়েছি আর অর্থি তার থেকে তত দূরত্ব বজায় রেখেছে। কাল নাকি বিড়ালটি ক্যাট হাউজে ছিল তাই অর্থির চোখে পড়েনি,, কিন্ত এখন যত দেখছে তত পালানোর চেষ্টা করছে।

তবে যা বুঝলো সাম্য বিড়ালটি কে অনেক ভালোবাসে,, যখন তখন এসে হাপুস হুপুস করে জড়িয়ে ধরে, কোলে তুলে নেয়,, সাদা পশমের শরীরে আদর করে। আর বিড়াল টি ও সাম্যের ভাষা বোঝে, মিচেন নামে ডাকলে ছুঁটে আসে,, খাবার খেতে বললে খেয়ে নেয়। আর বড় কথা দুপুরে খাবার সময় মিচেন যখন আবারও অর্থির পায়ের কাছে ঘেঁষতে নেয়, তখন সাম্যের এক বলাতে মিচেন তার ক্যাট হাউজে চলে যায় আর অর্থির পাশেই আসেনি।

তবে সবকিছু ভালো গেলেও দুপুরের দিকে খাবার খেয়েই সাম্যের ফুফুরা বাসায় রওনা দিল,, আবার এই বিকেলে দিকে ফাহা আর মুসাব ও রওনা দিকে সাম্যদের বাসা থেকে। তখন একদফা কান্না করলো অর্থি। মন খারাপ হয়েই থাকলো সেই সময়টা অর্থির। তাই বৌয়ের মন ভালো করতে সাম্য বাজারে গেল বৌয়ের জন্য কিছু জিনিস কিনতে।

_____________

সাম্যদের বাড়িতেই থেকে বাসস্ট্যান্ড প্রায় আধা ঘন্টা দূরত্বে,, তাই মুসাব সাম্য কে আসতে বারণ করেছিল তাদের এগিয়ে দিতে। তাই বাসস্ট্যান্ড এ এসে টিকিট কেটে মুসাব আর ফাহা বাসের জন্য অপেক্ষা করলো। ভাপসা গরম ধীরে ধীরে কমে আসছে,, তবুও পড়ন্ত বিকেলের যে শেষ তাপ টুকু বিদ্যমান থাকে তাতেই শরীর অস্থির অস্থির লাগে। তার উপর হাইরোডের চলন্ত গাড়ি গুলো যেন চলন্ত এক অগ্নিপিন্ডের মতো লাভা ছুঁড়ে দেয়। তাই স্বত্বির জন্য মুসাব গেল ঠান্ডা পানি কিনতে। ফাহা তখন যাত্রী ছাউনি তে বসে মুসাবের জন্য অপেক্ষা করছিল।

গাড়ি আসতে এই আধ ঘন্টা মতো সময় লাগবে, তাই এতে মুসাব বিরক্ত হলেও ফাহা মনে মনে বেশ খুশি হলো। আজ সে নিজের মনের কথা মুসাব কে বলবে, মুসাব এটা শুনে কি রিয়েক্ট করবে ফাহার জানা নেই, তবুও আজকে যদি না বলে মুসাবের সাথে বোধ হয় দেখা হওয়া আর সম্ভব হয়ে উঠবে না। তাই নিজের মনে মনে নানা কথা ঝল্পনা কল্পনা করে অনমনা হাসলো ফাহা।

ততক্ষণে মুসাব ও পানির বোতল নিয়ে ফাহার পাশে বসলো,, বোতল থেকে কয়েক ঢোঁক পানি খেয়ে বাকিটা ফাহা কে দিল। ফাহা তখনও যেন পলকহীন ভাবে মুসাবের দিকে তাকিয়ে রইল। মুসাব ফোনে তখন কিছু একটা করছে,,

তবে ফাহা মুসাব কে কিছু বলতে যাবে কিন্ত তখন একটি বৃদ্ধ লোক সাহায্য চাইতে এলো,, লাঠি ভর দিয়ে লোকটার চলতেই কষ্ট হচ্ছে,, তার উপর জীর্ণ শরীর। মুসাব ওনাকে দেখে কিছু টাকা দিয়ে সাহায্য করলো। লোকটার মুখে হাসি ফুটলো যেন,, আর মুসাবের সাথে ফাহা কে দেখে ভাবলো তারা হয়ত স্বামী স্ত্রী তাই লোকটা বলল;

—” এমন ভালা মানুষ আজকাইল নাই গো বাবা! আল্লাহ তোমাগো ভালা করুক! তোমগো জামাই বৌয়ের সংসারে আল্লাহ বরকত দান করুক। সুখে থাকো তোমরা।

মুসাব অপ্রস্তুত হয়ে বলল;
—” না না.. আমার বৌ নয়,,

কিন্ত লোকটা ততক্ষনে যাবার জন্য পা বাড়ালো! মুসাব শেষের কথা বলতে পারলো না,, তবে ফাহা ভেবে দেখলো বৃদ্ধ লোকটার কথা যদি সত্যি হয় তবে মন্দ হয় না। তাই মুসাবের দিকে তাকিয়ে বলল;

–’আচ্ছা ভাইয়া কথা জিজ্ঞেস করি!
মুসাব মাথা নাড়ল!

–”আপনার কি কোনো পছন্দের মানুষ আছে!

মুসাব মাথা নিচু করে হাসলো, কিন্ত কিছু বলল না। এতে ফাহা নিশ্চিত হবার জন্য আবার বলল;
—” আচ্ছা ভাইয়া আপনার কি কোনো প্রেমিকা আছে।

নিরশ গলায় দীর্ঘশ্বাস নিয়ে মুসাব বলল;
—” না,, এসব কিছু আমার জন্য না।

না… মানে নেই,, ফাহা র চোখ যেন ছলছল করে উঠল আনন্দে। এমনিতেই ফাহার একটু ধৈর্য্য শক্তি কম,, তার উপর কথা নিজের মাঝে কখনো সে চেপে রাখতে পারে না,, তাই ভাবলো আর দেরী করবে কিসের জন্য। তাই কোনো দ্বিধাবোধ হীন ভাবে মুসাবের উদ্দেশ্য বলল;

—” মুসাব ভাই,, আপনাকে একটা কথা বলি! কতো দিন বলবো বলবো ভাবছি! কিন্ত সময় সুযোগ কিছু হচ্ছে না,, প্লিজ আপনি আমার কথাটা পুরোটা শুনবেন।

—” হ্যাঁ বলো!

এবার যেন ফাহা একটু থমকালো,, ঢোঁক গিলল,, আর কাঁপা কাঁপা গলায় বলল;
—” আমি আপনাকে পছন্দ করি মুসাব ভাই! এরপর আমি আপনাকে ভালো ও বাসি!

মুসাব বড় বড় চোখ করে ভ্রু কুঁচকে ফাহার দিকে তাকালো। মুসাব কি ঠিক শুনলো, না তার ভুল হলো। তাই সে ফাহা র দিকে তাকিয়ে অনিশ্চিত সুরে বলল;
—” কি বললে!

ফাহা মাথা নিচু করে রেখে আবারও বলল;
—” জানি আপনি বিশ্বাস করবেন না,, কিন্ত আমি আপনাকে ভালোবাসি মুসাব ভাই। সেই কখন থেকে! প্রতিনিয়ত আপনার ফেসবুক একাউন্টে গিয়ে আপনার ছবি দেখি, আপনার খুঁটিনাটি বইয়ের পাতার মতো মুখস্থ করি,, শুধু একটি বার দেখার জন্য চাতক পাখির মতো কিভাবে যে অপেক্ষা করি। আর আপনার ওই হাসি,, মুসাব ভাই আপনার ওই হাসি হয়ত আমাকে ভালো থাকতে দিবে না,, আমার এই মন খারাপের দিনে একটু বিষাদ হলেও আপনার ওই হাসি মাখা মুখটা দেখে একটু খানি ভালো থাকার অনুমতি দিবেন।

ফাহা কথা গুলো বলল কিন্ত অনেকক্ষণ যাবত মুসাব থেকে কোনো উওর আসলো না।

মুসাব এতক্ষণে ফাহা র কথা গুলো শুনে থ হয়ে রইল। তার দৃষ্টিতে ফাহা বোনের ই মতো। আর তারা পরিচিত সে মেহেদী র মাধ্যমে। কিন্ত ফাহা নিজের মনে এত কিছু পোষণ করেছে তার জন্য শুনতেই মুসাবের অবাক লাগছে। তার উপর কি কঠিন কথা বলছে,, তার হাসি নাকি এই পুচকে মেয়ের মন খারাপের ঔষধ। তবে শেষমেশ ওই হাসির কথা ই যেন মুসাবের কাল হলো,, তাই মুসাব এবার ফাহা কে ধমক দিয়ে উঠল।

—” এই তোমার মাথা ঠিক আছে,, বয়স কতো তোমার নাক টিপলে দুধ বের হবে, তুমি প্রেম ভালোবাসার কি বুঝো। আর এসব কি ধরনের কথা বার্তা বলছো তোমার কোনো ধারনা আছে। আমি তোমার কতো বড় হই।

ফাহা প্রথমে মুসাবের কথা গায়ে মাখলো না,, সে ভাবলো মুসাব হয় অবাক হয়ে কথা গুলো বলছে তাই ফাহা আবারও বলল;

—” তো আমি কি ছোট বাচ্চার সাথে প্রেম করবো নাকি,, তাছাড়া আমি কিসের ছোট,, কয়েকদিন পরেই আমার ষোল হবে,, তাই তো বলছি আমি আপনাকে ভালোবাসি মুসাব ভাই।

—” থাপ্রে গাল লাল করে দিব বেয়াদপ! মুখের উপর এখনো কথা বলছো। আমার বয়স জানো সাতাশ চলে,, তোমার থেকে এগারো বছরের বড়ো,, আর এই পার্থক্য নিয়ে বলছো ভালোবাসো।, ভদ্র ভাবে সম্মান দিয়ে কথা বলছি দেখে এটাকে ভালোবাসা ধরো নাও আদতেও জানো ভালোবাসা কি!

মুসাবের ধমক শুনে ফাহা কান্নাই করে দিল,, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলল;
—” আমাকে ধমক দিচ্ছেন কেন,, আমি শুধু…

ফাহার পুরো কথা শেষ হলো না,, তার আগেই মুসাব বলল;
—” এই চুপ! আবার কথা বলছো।

এবার ফাহা সত্যিই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল,, সে সত্যিই ভাবে নি সব সময় শান্ত থাকা মানুষটি এমন আচরণ করছে। তাই জোরেই কান্না করে দিল ফাহা। আর তার কান্না শুনে সেখানে উপস্থিত কিছু লোক আড়চোখে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকাতে মুসাব এবার একটু শান্ত হলো। দম নিয়ে ফাহা কে ভালো ভাবে বলল;

—” দেখ তোমার ভালোর জন্যই ধমক দিয়েছি,, কান্না থামাও ফাহা,, সবাই দেখছে। দেখো আমি বুঝিয়ে বলছি।

ফাহার কান্না একটু কমে আসলো,, কিন্তু হঠাৎই সে মুসাব থেকে দূরত্ব টেনে নিল। মনে ভীষণ কষ্ট পেয়েছে ফাহা। তাকে এভাবে ধমক কেউ দেয় নি, মুসাব তাকে বুঝিয়ে বলতো,, কিন্ত কতো জনের সামনের তাকে ধমক দিয়েছে এতে বেশ অভিমান হলো ফাহার।

—” দেখো ফাহা, তোমার বয়স কম। তাই এসব এখন ভীষণ রঙিন লাগছে,, কিন্ত বাস্তবতা অনেক ভিন্ন ফাহা। এসবের জন্য একটা বয়স থাকা লাগে ফাহা তুমি এখনো ছোট বোঝার চেষ্টা করো। আর কান্না থামাও বাস হয়ত চলে আসবে তখন এমন কান্না করতে থাকলে মানুষ ভাববে আমি তোমাকে অপহরণ করছি।

ফাহা সেভাবেই থেকে আরো দূরত্ব টেনে নিল মুসাব থেকে,, অনেক কষ্ট পেয়েছে ফাহা,, তাই মুসাবের সাথে কোনো কথাই বলল না। সাম্য বা অর্থি কে ফোন করে যদি বলে সে যাবে না তাহলে তারা নানা প্রশ্ন করবে তখন কি উওর দেবে তাই চুপ করে বসে রইল। মুসাব নানা ভাবে বোঝালে ও কোনো উওর করলো না, শেষে বাস আসলে আগেই উঠে পড়ল আর মুসাবের সাথে না বসে অন্য একটা লোকের পাশে বসলো।

মুসাব ও বাসে উঠল। দেখলো ফাহা র কি অভিমান। তার পাশে বসলো না,, তাই অগত্যা ফাহার অপর পাশ বারবার সিটে বসলো মুসাব।
কিন্ত এটাই ফাহার জন্য আরো ভুল হলো,, বাস চলার কিছুক্ষণ পর ফাহার পাশে বসা লোকটা বারবার ফাহার গা ঘেঁষে বসার চেষ্টা করছে,, একটু অস্বস্তি লাগলে ও ফাহা কিছু বলল না,, কিন্ত পরে লোকটা হাত পেছনে নিয়ে ফাহার পিটে হাত রেখে বাজে ভাবে স্পর্শ করার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি থাকায় মুসাব দেখলো সেটা।

দাঁতে দাঁত চেপে হাতের মুঠো শক্ত করলো,, যখন দেখলো এমন অ’শালীন ব্যবহারের পর ফাহা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না তখন আরো বেশি রাগ হলো। উঠে গিয়ে কলার চেপে ধরলো লোকটার। সাথে চেঁচামেচি শুরু করলো ফাহা র সাথে বাস থেমে গেছে ততক্ষনে, সবাই তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। মুসাব তেড়ে গেলে বাকিরা শান্ত করায়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে লোকটাকে বাস থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়।

কিন্ত মুসাবের রাগ তখনও পড়ে নি। ফাহা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে দেখে তাকে গম্ভীর স্বরে জানালার পাশে বসতে বলল। নিজে ও বসলো। ফাহা শান্ত বাচ্চার মতো বসলো কিন্ত কোনো কথা বললো না।

–” টিয়া পাখির মতো চটপট করতে পারো অথচ নিজের সাথে অন্যায় হচ্ছে তার প্রতিবাদ করতে পারলে না।

কিন্তু ফাহা কোনো কথা বললো না,
আর পুরো রাস্তা এভাবেই কাটলো তাদের। ফাহা জানালার বাইরে পড়ন্ত বিকেল দেখতে দেখতে সন্ধ্যার আঁধার কাটালো,, কিন্ত তবুও মুসাব কে কিছু বললো না। আর এই ঘন মেঘ জমা অভিমান নিয়ে ফাহা এক সময় ঘুমিয়ে পড়ল হেলে দুলে মুসাবের কাঁধে।

আর ঘুম ভাঙলো গন্তব্যে পৌঁছানোর পর। কিন্ত মুসাব তাকে বাসায় এগিয়ে দিল, তবে আগের মতো ফাহা উৎসাহ নিয়ে মুসাবের সাথে কথা বলল না। আর হাসি মুখে বিদায় ও জানালো না মুসাব কে।

___________

এভাবেই কারো মনে তীব্র অভিমান, আর কারো মনে তীব্র ভালোবাসায় কেটেছে মাঝের দুটো দিন। সাম্য অর্থির সংসার জীবন মোটামুটি কেটেছে। সাম্য ও ফেনী থেকে চট্টগ্রামের ব্যাংকে ট্রান্সফার হওয়ার জন্য এপ্লাই করেছিল তা এপ্রুভ হয়েছে। তাই নতুন অফিসে জয়েন করার জন্য একটু ব্যস্ত আছে। তার উপর আজ আবার তার খালা রা তাদের দাওয়াত দিয়েছে। সেখানেই যাবে সাম্য রা সবাই। তাই সাম্য প্রথমে নিজের যাবতীয় কাজ শেষ করে এই মাত্রই বাসায় আসলো।

অর্থি তখন রুমে,, সবে মাত্রই গোসল সেরে বেরিয়েছে,, সে ভেবেছিল রুমে কেউ থাকবে না, আর আজ খালা শাশুরিদের বাড়ি যাবে দেখে ফাতেমা বেগম বলেছেন তাকে শাড়ি পড়তে।কিন্তু অর্থি শাড়ি তেমন একটা পড়তে পারে না দেখে ব্লাউজ, পেটিকোট এর সাথে গায়ে ওড়না জড়িয়ে বেরিয়েছে। রুমে কেউ নেই দেখে গায়ের ওড়না খানা খুলে বিছানার উপর রেখে গামছা দিয়ে চুল মুছতে লাগলো। নিলু আসলে তাকে শাড়ি পরিয়ে দেবে বলে।

কিন্ত দরজা সাম্য দরজা ঠেলে রুমে আসলো। কিন্ত হাত এখনো দরজার হাতলেই রইল,, রুমের দিকে পা বাড়ানোর আগেই অর্থিকে এমন অবস্থায় দেখে ঢোঁক গিলল। ততক্ষণে অর্থির ও চোখ গেল দরজায়, ভেবেছিল নিলু এসেছে, কিন্তু সাম্য কে দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তাড়াতাড়ি ওড়না গায়ে জড়িয়ে নিল। সাম্য আর রুমের দিকে পা বাড়ালো না, দরজা বন্ধ করল। বুকে হাত দিয়ে বলল;

–” ইয়া মাবুদ,, ধৈর্য শক্তির সাথে একটু সহ্য শক্তির ক্ষমতা বাড়িয়ে দিন,,, আমিন।

তবে সাম্য আর অর্থির সামনে গেল না,, অর্থি যখন রেডি হয়ে ফাতেমা বেগমের কাছে গেল তখন রুমে গিয়ে সে তৈরি হয়ে নিল। হাতে ঘড়ি পড়ে বাইরে আসবে তার আগেই নিলু হন্তদন্ত হয়ে ছুঁটে আসলো তার কাছে।

আর হাঁপাতে হাঁপাতে বলল;
—” ভাইজান বাসায় পুলিশ আসছে,, আপনার খোঁজ করছে।

সাম্য ভ্রু কুঁচকে নিল,, নিলু মজা করছে বলে মনে হলো না,, তাই সামনে গেল,, দেখলো আসলেই বাড়িতে পুলিশ এসেছে। সাম্য কে দেখে পুলিশ টি এগিয়ে এলো আর বলল;

—” আপনিই সায়েফ আহমেদ। আপনার নামে মান’ হানির অভিযোগ এসেছে।

ফাতেমা বেগম ও আসলেন, অর্থি ও আসলো তার পেছনে,, কিন্ত সাম্য ভয় না পেয়ে ভ্রু জোড়া কুঁচকে বলল;

—” মানে এসব কি বলছেন। কে করেছে এমন অভিযোগ নাম বলুন তার আমি দেখছি।

—” তিথি নামের একটি মেয়ে আপনার নামে অভিযোগ করেছে। আপনি তার সাথে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভঙ্গ করেছেন,, আর উপর তার সাথে অস’ভ্য’তামি করেছেন। তাই চলুন আমাদের সাথে থানায়।

চলবে।

বলেছিলেন না সুন্দর শেষ হচ্ছে, একটু ঝামেলা মন চাচ্ছে। যান ঝামেলা একটা লাগাই দিলাম। এখন কমেন্ট করে বলেন তিথি কে কি করা যায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here