ধূপছায়া #নূপুর_ইসলাম #পর্ব_৫৫

0
1

#ধূপছায়া
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_৫৫

সন্ধ্যার আযানটা পড়তেই পৃথিলা হারিকেন জ্বালালো। আশে পাশে বাড়ি ঘর নেই, মসজিদও যে অনেকটা দূরে আযানের ক্ষণ আওয়াজ খেয়াল করলেই সহজে অনুমান করা যায়। হারিকেনের আলোটা জ্বালিয়ে জুঁইয়ের হাত ধরেই পৃথিলা বারান্দায় এসে বসলো। দরজা এখন খোলা, ক্ষেতের মধ্যে মাটি উঁচু করে বাড়িটা করা । না, নতুন না। উঠানের মাটি শক্ত, মসৃণ প্রলেপ। আশপাশে বড় বড় সারিবদ্ধ অসংখ্য গাছগাছালি। এই সব গাছ গাছালি অল্প কিছু দিনে হওয়ার কথা না। অনেকটা দিন লেগেছে। সেই গাছগাছালি ধরেই পুরো বাড়ি মোটা কাটা তারের বেড়ায় ঘিরে আছে। এক কোণায় আসা যাওয়ার ছোট্ট একটা ঢালু রাস্তা। সেখানে দু’জন জলচৌকিতে বসে আরামছে সিগারেট খাচ্ছে। পৃথিলাকে দেখেই সাথে সাথে সিগারেট ফেলে দিলো। দিয়ে অন্য পাশে মুখ দিয়ে বসলো।

পৃথিলা বুঝতে অসুবিধা হলো না, বাড়িটা কিসের। গ্রামের মানুষ ধীরে ধীরে নিখোঁজ হয়েছে। তাদের ধরেই শেষ করা যায় না। সময়, সঠিক সুযোগ দরকার। সেই পর্যন্ত লুকিয়ে রাখার জায়গা দরকার। এই বাড়িটা সেই জায়গা। যদি ভুল না হয়, আশে পাশের জমি সব সারেং বাড়ির। চকের শেষ মাথার এক সাইড। এমন সাইডের কিছু জমি চাষাবাদ না করলে তাদের কিছু আসবে যাবে না।

পৃথিলা লোক দু’টোর উপর থেকে চোখ ফিরিয়ে আকাশের দিকে তাকালো। আকাশটা মেঘলা। মেঘলা হলেও থালার মতো একটা চাঁদ খিলখিল করে হাসছে । সেই হাসিটাকে মেঘ আড়াল করাতে খুব কসরত করছে। এই ঢাকছে, এই আবার হেসে ঝিলিক দিয়ে হেসে উঠছে। সেই হেসে উঠা চাঁদের দিকে পৃথিলা তাকিয়ে রইল।

জুঁই বাইরে এসেই নিজের মতো নেমে গেছে। পৃথিলার কারণে সে ভয় পাচ্ছে না। বাবা মায়ের জন্য মন খারাপ আছে, তবে চিন্তা নেই। ভেবেছে সময়তো বাড়ি ফিরে যাবে। তাই নেমেই লতা পাতার পাতা এই গাছ, ঐ গাছ থেকে ঘুরে ঘুরে নিয়ে হাতে আপন মনে জমা করতে লাগছে।

এরশাদ গোছলে গিয়েছিল, মাথা মুছতে মুছতে দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো। পৃথিলা ব্যাগের কাপড়-টাপড় ছুঁয়েও দেখেনি। এরশাদ নিজে থেকেই বলল,” গোসল করে নিন, ভালো লাগবে।

সে শান্ত ভাবেই বলেছে, — আমাকে আমার মতো থাকতে দিন।

ব্যস, এরশাদ দ্বিতীয়বার আর কোন শব্দ করেনি। তবে এবার এগিয়ে গেলো। বারান্দা মাটির, তার মধ্যে মানুষজনের বসবাস নেই। পিঁপড়ে বিচ্ছু থাকা স্বাভাবিক ব্যাপার। পৃথিলা সেই বারান্দার মাটির মধ্যেই বসে আছে। তার মধ্যে পা খালি, সকালে বেরোনের সময় তার জুতা রেখে গিয়েছিল। সে জুতাও ছুঁয়ে দেখেনি। পা টা শেষ করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। তবুও ভালো নিজে থেকে দুপুরে ঔষুধ টা খেয়েছে। এখন পেকে না গেলেই হয়।

সে বাড়ির ভেতরে গেলো। মাদুর, আর জুতা নিয়ে এলো। তার জুতা না, পৃথিলার জুতা। সেই যে হসপিটালে প্রথম পৃথিলার জন্য কিনলো। সে তো ফিরে তাকিয়ে দেখেনি। তবে এরশাদ যত্ন করে তুলে রেখেছিল। পৃথিলার নামের একটা সুতাও তার কাছে হিরে রত্নের মতো দামি।

আজ আবার নিয়ে এসেছে। সেটাই এগিয়ে পায়ের কাছে রাখলো। রেখে বলল, — উঠুন, এটা বিছিয়ে দিচ্ছি।

পৃথিলা জুতা জোড়া দেখলো। দেখে চিনতে অসুবিধা হলো না। এই জুতার দিকে দৃষ্টি রেখেই বলল,— প্রয়োজন নেই।

— আছে, উঠুন।

পৃথিলা উঠল না, আগের মতোই বসে রইল। জুঁইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, — ওকে বাসায় দেবেন কখন?

— কাল।

— ওকে এনে কি পাপ করালেন সাবিহাকে দিয়ে?

— ছোট্ট একটা পাপ, এতো আপনার বান্ধবী জাহান্নামে যাবে না।

— কেন করছেন এসব?

— শাস্তি।

— কিসের?

— আমার বাবা-মায়ের খুনির।

— আর আপনার দাদি?

— দাদি?

— খুন তো সেও করেছে, তার শাস্তির কি?

— সেটা আমার দেখার বিষয় না, সে আমার দাদি, আমাদের আগলে মানুষ করেছেন। সে তার জীবনে কি করেছেন, সেটা তার ব্যাপার।

পৃথিলা হেসে ফেললো! হেসে এরশাদের দিকে তাকালো। তাকিয়ে বলল,– যে নিজের চোখ নিজে বেঁধে রাখে, কারো সাধ্য নেই চোখ খোলার। আপনারও সেই অবস্থা। তা না হলে আপনি ঠিক দেখতেন, আপনার দাদি তার জীবনে এই অন্যায়টা করেছে বলেই, আজিজও এই অন্যায় করেছে। আর করেছে বলেই আপনার বাবা, মা নেই।

— সবই বুঝলাম, তো বলুন, এই সব কিছুতে আমার বাবা মায়ের দোষ কি?

— কোন দোষ নেই। আপনার দাদি এক অন্যায় করেছে, আজিজ সেই প্রতিশোধের আগুনে করেছে তার তিনগুণ, সেই তিনগুণের আপনি করেছেন হাজার গুণ। আর কতো? প্রত্যেক মানুষের জীবনের পথে ধূপছায়া দু’টোই থাকে। ব্যস, সঠিক সময়ে সঠিক সিন্ধান্ত নিতে হয়। আপনি ছায়ায় নরম ঘাসের উপর দিয়ে আঁলতো পায়ে এগিয়ে যাবেন, না ধূপের আগুনে ঝলসে। তবে তিক্ত হলেও সত্য আপনারা সবাই ঝলসে যাওয়ার সাইড ধরে এগিয়েছেন। অথচ চাইলেই, একটু থেমে ছায়ার পথে হেঁটে সব ক্লান্তি দূর করতে পারতেন।

এরশাদ মাদুরটা আর পাতল না। খারাপ ভালো যা’ই বলুক, পৃথিলা যখন কথা বলে শুনতে ভালো লাগে। কি শান্ত, কোমল সুরে বলে। এরশাদের ঘোরের মতো লাগে। তাই নিজেও বারান্দার মাটিতে বসলো। তবে কিছুটা দূরে। বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, — আমার জায়গায় সেই দিন আপনি থাকলে কি করতেন?

— আপনি যা করেছেন তাই করতাম। তবে নিজের পরিবারকে বাঁচানোর জন্য তলোয়ার হাতে নিলে সেটা পাপ হয় না। সেইদিন সেই যুবক এরশাদ যা করেছে, সেটা পাপ না। তবে তারপরে যা যা করেছে, সবই পাপ। সেই রাতটুকু দিয়ে পরের পাপটুকু আপনি মুছে ফেলতে পারবেন না। তখন করেছেন সেগুলোও পাপ এখন যা করেছেন এগুলোও পাপ। তাই এই পাপের খেলা বন্ধ করুন। আর কত?

— করলে আপনি আমার হবেন?

পৃথিলা উত্তর দিলো না। জুঁই এক জোনাকি পোকা ধরেছে, খুশিতে এক চিৎকার দিয়ে পৃথিলার কাছে দৌড়ে এলো। পৃথিলাও হাসলো! হেসে হাতে নিলো। নিয়ে আবার ছেড়ে দিলো। দিতে দিতে বলল,— আমাদের দেখাটা বড় ভুল সময়ে হয়েছে। ধরুন, আপনার দাদি পাপ টা করলো না। আপনার ছোট চাচা বড় হলো মায়ের আপন কোলো। তার মা তার ভালাবাসা মেনে নিলো। আমি বড় হতাম এই মিঠাপুকুরের বুকে। তারপর, হয়ত অন্য একটা গল্প হতো। সেই গল্প পাপ থাকতো না, ভয়ংকর এরশাদ থাকতো না। থাকতো…. পৃথিলা থেমে এরশাদের দিকে তাকালো, সব সময়ের মতো চোখে। আধো আলো, আধো অন্ধকারে চোখটা জ্বলজ্বল করছে। তবে আজকের জ্বলজ্বল ভিন্ন। এই ভিন্নতে কোন মুখোশ নেই, নাটক নেই, আছে বেঁধে রাখা শক্ত পুরুষের অবাধ্য অশ্রু।

পৃথিলা সেই অশ্রুর দিকে তাকিয়ে বলল,— আপনি মানেন আর না মানেন। আপনার দাদি শুধু আপনার ছোট চাচির সাথে অন্যায় করেনি, করেছে সারেং বাড়ির প্রতিটা মানুষের সাথে। সেই মানুষের মধ্যে যেমন বাইরের আজিজ আছে, তেমনি ভেতরের আপনিও আছেন। আর অনেক অনেক দূরের পৃথিলা নামক মেয়েটাও আছে।

এরশাদ চোখ ফিরিয়ে নিলো, পৃথিলা মৃদু হাসলো। আয়নায় মুখ দেখা খুবই সহজ, তবে কর্ম দেখা এতো সহজ না। তখনই এক লোক দৌড়ে এলো। এসে বলল,
— পুলিশ আয়না ভাবিকে ধরতে বাড়ি দিকে যাচ্ছে।

এরশাদ ভ্রু কুঁচকে তাকালো। আয়নাকে আজকে ধরতে যাবে কেন? আয়নাকে ধরতে গেলেই শাহবাজ গন্ডগোল করবে। গন্ডগোল লাগলেই সব কথা ছোট চাচার কান পর্যন্ত যাবে। আয়না আছে হাতের কাছেই। তাই আজিজের ব্যবস্থা করে, পরে ওইদিকে যেতে বলেছিল। তো?

সে ভ্রু কুঁচকেই বলল,— অফিসারের মাথা ঠিক আছে?

লোকটা একবার পৃথিলার দিকে তাকালো। তাকিয়ে আবার এরশাদের দিকে তাকালো। এরশাদ বুঝলো, বুঝে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, — জুঁইকে নিয়ে ভেতরে যান।

পৃথিলা উঠে দাঁড়াতে গেলো, এরশাদ নিচু হয়ে আস্তে করে কাটা পায়ে জুতাটা পরিয়ে দিলো। দিতে দিতে বলল,— সময় ভুল হোক, আর যাই হোক। আমার কাছে এখন আপনিই সব। তাই যা বলার বলুন, আমার কাছে এখন শুধু, আপনিই আমি, এবং আপনাতেই আমি।

পৃথিলা উঠল না, এরশাদও আর কিছু বললো না। পাহারার দু’টো লোককে ইশারা দিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে গেলো। বেরিয়ে রাস্তায় উঠতেই লোকটা বলল,– ঢাকা থেকে পুলিশ আইছে। একদল, তাদের মধ্যে একজন নাকি বড় ভাবির আব্বা।

এরশাদ রাগে রাস্তার পাশে পড়ে থাকা, গাছের গুঁড়িতে এক লাথি দিলো। লাথিতে যেমন গাছের গুঁড়ি ভাঙলো, তেমনি তার পা কাটলো।

সাবেত যখন মিঠাপুকুর থানায় পা রেখেছে তখন সন্ধ্যা হবে হবে করছে। আজিজকে থানায় আনতেই থানা গরম। আজিজের লোক, চেয়ারম্যানের লোক সব মিলিয়ে হুলুস্থুল। সেই হুলুস্থুলকে সামলাতে গিয়ে অফিসারের জান যায় যায় অবস্থা। সেই যাওয়ার মাঝেই এক কনস্টেবল এসে তাকে জানালো, মুগদা থানার অফিসার এসেছে, সাথে পুরো এক টিম নিয়ে।

শুনেই তার শরীর দিয়ে চিকন ঘাম দিলো। আর কেউ না জানুক, সে তো জানে সাবেত কে? তাই ঘাম সামলানোর সুযোগও হলো না। তড়িঘড়ি করে এগিয়ে গেলো। সবার সাথে সম্মানের সাথে হাত মেলালো। মিলিয়ে বসিয়ে চা পানির ব্যবস্থা করলো। করে না জানার ভান করে বলল, — কোন কেইসে সমস্যা হয়েছে?

সাবেত শান্ত ভাবেই নড়ে চড়ে আরাম করে বসলো। তাদের থানার ল্যান্ডলাইনে ফোন এসেছে দুপুরের পরে। ফোন করেছিল পৃথিলার শাশুড়ি। কখনো পরিচয় ছিল না। তারেকের কেস ঘাটাঘাটি করতে করতে যেইটুকু জেনেছে। তবে সে সুন্দর মতোই সব ফোনে বললো। তবে সমস্যা হলো চিঠিতে নাকি নাম ঠিকানা ভিন্ন। নাম ঠিকানা নিয়ে সমস্যা নেই। পৃথিলা বুদ্ধিমতি মেয়ে। বিপদে অনেক কিছুই করতে পারে। তাই ঝড়ের গতিতে সব করেছে। যতো ক্ষমতাই থাক, অচেনা জায়গায় প্রস্তুতি ছাড়া যাওয়া বোকামি ছাড়া কিছু না। তাছাড়া চিঠিটা সপ্তাহ খানেক আগের, কি অবস্থায় তার মেয়েটা আছে জানেও না।

তাই নড়ে চড়ে বসে শান্ত ভাবেই পৃথিলার ব্যাপারে সব বললো। বলে বললো, “চিঠিটা এখনো আমার হাতে পৌঁছায়নি। চিঠিটা লিখেছে সে, তার প্রাক্তন শাশুড়ির কাছে। আজকে দুপুরেই তারা হাতে পেয়েছে। পেয়ে ল্যান্ডলাইনে ফোন করে ব্যাপারটা আমাকে জানিয়েছে। আমি তো চিঠির জন্য বসে থাকতে পারি না। মেয়ে আমার, চিন্তাও আমার। তাই সেখানে লোক পাঠানো হয়েছে, চিঠি আসছে। আপাতত আপনি বলুন, কিছু শুনি।”

অফিসার ঢোক গিললো। কোন অফিসার কেমন, কণ্ঠ শুনেই ধারণা করা যায়। আর এই মেয়েও ভাই, চোরের উপরে সামসের। এরশাদের মতো চতুর লোকের চোখে কি সুন্দর ধুলো ছিটিয়েছে। এরশাদ ধরতেও পারেনি। সে ঢোক গিলে একটু হেসে বলল, — আপনার মেয়ের কেসে আমরাও কাজ করছি। এমনকি আজকে আসামিকেও ধরেছি। তবে সমস্যা, সে গ্রামের গণ্যমান্য একজন। এই যে থানা ভর্তি লোক, সব তার। আর সে মুখ খুলছে না।

সাবেত আগের মতোই শান্ত চোখে অফিসারের কথা শুনলো। বয়স অল্প, নতুন অফিসার। তাই শান্তভাবেই শুনে বলল, — এই কেসের ফাইলটা আমাকে দিন।

— জ্বি?

সাবেত শান্তভাবেই আরেকটা কাগজ এগিয়ে দিলো। দিতে দিতে বলল, —- মানুষের মাংস মানুষ খায় না। হাজার তেল ঝোল দিয়ে রান্না করে দিলেও খাবে না। তবে কুকুরের এই সমস্যা নেই, তার চোখের সামনে একটা কুকুর মারবেন। মেরে তেল ঝোল দিয়ে রান্না করে দিলেই টুপ করে খেয়ে ফেলবে। পুলিশ আর কুকুরের মাঝে খুব একটা তফাৎ নেই। সেটা আমি যেমন জানি, আপনিও জানেন। তবে জানার অভিজ্ঞতা আপনার চেয়ে আমার একটু বেশি।

কোন উদ্দেশ্য কি বললো অফিসারের বুঝতে অসুবিধা হলো না। তাই থমথমে মুখে কাগজটা টেনে নিলো, নিয়ে দেখলো। উপরমহল থেকে সব অর্ডার আছে। সে মনে মনে একটা গালি দিলো। দিয়ে এক লোকের দিকে তাকালো। এতো ভিড়ে এখানে এরশাদের লোকও দুনিয়ায়। সে তাকাতেই আস্তে করে লোকটা বেরিয়ে গেলো। যেতেই সে ড্রয়ার থেকে ফাইল এগিয়ে দিলো।

সাবেত ফাইলের সব দেখলো। দেখতে দেখতে বলল, — কেইস হয়েছে দুজনের নামে। অথচ ধরেছেন একজনকে। ব্যাপার কি?

— বললামই তো গণ্যমান্য লোক। ধরতেই দুনিয়ার ঝামেলা হয়েছে। তাই ওইদিকে আর আজকে এগোনো যায়নি। তবে কাল ব্যবস্থা করতাম।

সাবেত শুনলো। শুনেই উঠে দাঁড়ালো। দাঁড়িয়ে বলল,
— চলুন, যাওয়া যাক।

অফিসার অবাক হয়ে বলল, — কোথায়?

— আসামি ধরতে।

— আসল আসামি তো ধরেছিই।

— চিঠিতে আমার মেয়ে স্পষ্টভাবে বলেছে এরশাদ নামক এক লোক তাকে আটকে রেখেছে। আর আপনি ধরেছেন মহাজনকে।

— এই চিঠির সত্যতা আমি জানি না। তবে আপনার মেয়েকে মহাজন সরিয়েছে। প্রমান সাক্ষী ফাইলে তো দেখার কথা।

— জ্বি দেখেছি। এবার আসুন। আর একটা কথা জানার ছিল। আসলে এটা তো ফাইলে নেই তাই।

অফিসার ভদ্রতার হাসি কোন রকম হেসে বলল, — জ্বি বলুন?

—- দ্বিতীয় আসামি, মানে আয়নামতী এরশাদ নামের লোকের পরিচিত?

আফিসার মনে মনে আরেকটা গালি দিলো। দিয়ে বলল,– তার ছোট ভাইয়ের বউ।

সাবেত শীতল চোখে অফিসারের দিকে তাকালো। তাকিয়ে বের হতে হতে বলল,— সারেং বাড়ি রাইট?

অফিসারও আগের মতোই বললো,– জ্বি স্যার।

সাবেত এবার হাসলো! হেসে বলল,— চলুন! যাওয়া যাক। এই সারেং বাড়ি আমার এমনিতেও দেখার খুব শখ।

এশার আযানটা পড়তে না পড়তেই কারেন্ট টুপ করে চলে গেলো। যেতেই নিস্তব্ধ সারেং বাড়ি পুরো অন্ধকারে ডুবে গেলো। এই আর কি? নিত্য দিনের ঘটনা। তবুও আয়না চমকে উঠল। সে রুম থেকে আর বের হয়নি। এরশাদ ভাই বাড়িতেই আছে কি না জানে না। শাহবাজও আর এদিকে আসেনি। তাই ভয়ে আর বেরই হয়নি।

হারিকেন রাখা দরজার সাইডে। আয়না অন্ধকারে হাতড়ে হারিকেনের সামনে গেলো। হারিকেন জ্বালিয়ে ছোট ছোট কদমে সিঁড়ির কাছে গেলো।

আম্বিয়া বু নিচে হারিকেন তেল দিচ্ছে। তাকে দেখে বললো, — আজকে ছাদের কাপড় তুলেছিলে আয়না?

আয়না তো তোলেনি। এতো ঝামেলায় মাথায়’ই ছিল না। সে তড়িঘড়ি করে রুমে গেলো, হারিকেন টা নিয়ে ছাদের দিকে এগিয়ে গেলো। গিয়েই থমকালো। অন্ধকারে হাত পা ছড়িয়ে শাহবাজ শুয়ে আছে। চোখ বন্ধ। দেখতো কান্ড! এই লোকের আজিব এক অভ্যাস। এখানে, ওখানে, যেখানে ভালো লাগে সেখাই হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ে।

আয়না ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো। হারিকেনটা এক সাইডে রেখে আস্তে করে বলল,– জেগে আছেন না, ঘুমিয়ে?

শাহবাজ সাথে সাথেই বলল,— কোন অবস্থায় থাকলে তোমার উপকার হয়?

— কোনটাই না। ঘরে গিয়ে ঘুমান।

— কেন?

— এখানে শোয় কে?

— আমি শুই।

আয়না বড় একটা শ্বাস ফেললো। তার কেন জানি মনে হচ্ছে, কোনো কারণে শাহবাজের মন খারাপ। বীণারও একই অবস্থা। ফরহাদ ভাই যাওয়ার পর থেকেই থম মেরে আছে। সে সেটাই জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলো। মাঝে এরশাদ ভাই পরে গেছে। সে শ্বাস ফেলেই বলল,– আপনার কি মন খারাপ?

— যদি বলি হ্যাঁ, কি করবে?

শাহবাজ সব সময় সোজা কথাই বলে। তবুও আয়না সব সময় থমকে যায়। এই যে এখনো গেলো। সে ভেবেছিলো সবার মতো মন খারাপ থাকলেও শাহবাজ বলবে, না। তবে এই বান্দা বলেনি। আবার বলে কি করবে? সে করবে টা কি?

সে কাপড় তুলতে তুলতে বলল,– আমি কি করবো?

শাহবাজ চোখ খুললো! ঘাড় কাত করে তাকালো। পেঁয়াজ রঙের কাপড়ে হারিকের মৃদু আলোয় তার বধুকে দেখলো। দেখতেই বুকটা টিপটিপ করতে লাগলো। উঠে গিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করলো। প্রেম ট্রেম সে জানে না। ভালোবাসা আবার কি? তবে সে জানে, এই বোকা সোজা মেয়েটা তার বউ। গায়ে আগুন দিয়ে তাকে কবুল বলিয়ে বিয়ে করেছে। সাথে ঘৃণা করে, আবার মায়াও করে। সে নিজেও ঘৃণা করে, চোখের বিষ । আর এই ঘৃণা, বিষ, মায়া সব কিছু মিলিয়ে কিছু একটা হয়ে গেছে। এই হওয়া শাহবাজের ভালো লাগে। তাই তাকিয়ে তার মতোই বলল,– এসে তো একটা চুমুও খেতে পারো। খেলে তো আর ঠোঁট কতোটুকু কমে যাবে না। জায়গায় জিনিস জায়গায়’ই থাকবে।

আয়না থমকে দাঁড়ালো। দাঁড়িয়ে মুখ গোঁজ করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। শাহবাজ তার মতোই বলল,
— গোঁজ টোঁজ করে লাভ নেই। না পারলে আসো, আমি নিজেই দেই।

আয়নার রাগ হলো। বাড়ি ভরা দুনিয়ার ঝামেলা। এতো ঢং আসে কোথা থেকে! সে হাতের কাপড় নিয়েই হনহন করে চলে গেলো। শাহবাজ হাসলো। হেসে উঠে দাঁড়ালো। দাঁড়াতেই দেখলো আয়না আবার দৌড়ে আসছে। হাতে এইমাত্র তোলা কোনো কাপড়ই নেই। চোখ মুখে ভয় স্পষ্ট। আর সেই ভয় নিয়েই তার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল।

শাহবাজ তাল সামলাতে পারল না। দু’কদম পেছালো। পেছিয়ে কিছু বলবে তার আগেই আয়না ভয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে বলল, — মান্না ভাই আইছে। পুলিশ নাকি আসছে। আমাকে ধরে নিবো।

শাহবাজের তেমন পরিবর্তন হলো না। থানা থেকে ফিরেই ইমরান তাকে সব বলেছে। জুঁই ভাইয়ের কাছে। ভাইয়ের কথা না শুনলে, জুঁইকে ভুলে যেতে বলেছে। তা’ই সে সারাদিন আর বাড়ি থেকে বের’ই হয়নি। সে জানতো, এমন কিছুই হবে।

শাহবাজ আয়নার ছোট্ট শরীরটা দু’হাতে আগলে জড়িয়ে শূন্যে তুলে ফেললো। প্রথমবার বউ নিজে থেকে বুকে এসেছে। সদ্ব্যবহার না করলে শাহবাজের বদনাম হয়ে যাবে। তাই আরো শক্ত করে জড়িয়ে নিতে নিতে বলল,— এভাবে ঝড় তুফান তুলে বুকে আছড়ে পড়বে, বাকি সব আমার।

চলবে…..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here