#নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক
লেখনীতে : মিথিলা মাশরেকা
৬৫.
এখনো অবদি চারগ্লাস পানি শেষ করেছে মোহিনী। এই তীব্র গরমেও কাপছে ও। ওর শরীরের কম্পন এতোটাই বেশি যে, দুজন মহিলা কনস্টেবল মিলে হাতপা ধরে রেখেছে ওর। হবেই না কেনো? চোখের সামনে এক ভ’য়াবহ মৃ’ত্যুখেলা দেখতে হয়েছে ওকে গতরাতে। মোহিনীর চোখে ভাসছে গতরাতের দৃশ্য। গতরাতে চঞ্চল অনুর কাছে যাবার আগেই জ্ঞান হারিয়েছিলো অনু। ঠিক তখনই দরজায় নক পরে ওদের। এমনিতেও অনুকে জ্ঞান হারাতে দেখে বিরক্ত ছিলো চঞ্চল, তারওপর দরজায় নক। রীতিমতো খিচে উঠলো ও। মোহিনীকে বললো,
– একটা কাজ ঠিকমতো পারিসনা। এটা বেহুশ, আরেকটা নক করে জ্বালাচ্ছে। বাকিদের এদিক আসতে বারণ করিসনি?
– বলেছিলাম তো। তারপরও এতোবড় সাহস কে দেখাবে?
কপালে ভাজ রেখে কিছুটা চিন্তিতস্বরে বললো মোহিনী। চঞ্চল রাগে সামনে থাকা চেয়ারে লাথি মারলো। পরিস্থিতি সামাল দিতে মোহিনী শ’য়তানি হাসলো এবারে। বললো,
– রাগ কেনো করছেন চঞ্চল ভাই। বেহুশটা ছেড়ে যেটা হুশে আপনার কাছে এসে ধরা দিচ্ছে, সেটাকে ধরুন না!
হাসি ফোটে চঞ্চলের মুখে। অনুর ওড়নাটা খুলে গলায় ঝোলায় ও। এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দেয়। মোহিনী মোবাইলে ছিলো। হঠাৎ কুকড়ে ওঠার আওয়াজ পেয়ে চোখ তুলে তাকায় ও। আর তাতে যা দেখলো, চোখজোড়া বেরিয়ে আসতে চায় ওর। দরজায় দাড়ানো কালো জিন্স,জ্যাকেট পরিহিত এক মুখোশধারী। হাতে গ্লাভস পরা। চঞ্চলের গলার ওড়নাটা দিয়ে ফা’সের মতোকরে পেছন থেকে ধরে রেখেছে সে। আর চঞ্চলের বুক থেকে পেট অবদি ছু’ড়ি দিয়ে চেড়া। বুকের ভেতরে লাফাতে থাকা র’ক্তাক্ত হৃদপিণ্ডটা চোখে পরতেই মোহিনী চিৎকার দিয়ে উঠলো। চঞ্চলের মুখ থেকে ঘলঘলিয়ে র’ক্ত আসে। মুখোশধারী একহাতে গলার ওড়নার ফাঁস ধরে, আরেকহাতে পাউডারের মতো কিছু একটা ওর নাকে-মুখে পুরে দিলো। সেকেন্ড দশের মধ্যে মেঝেতে লুটিয়ে পরে চঞ্চল। র’ক্তের স্রোত বয় মেঝেতে। দপদপ করে সংকোচিত প্রসারিত হতে থাকা চঞ্চলের হৃদপিন্ডটা তখনো দৃশ্যমান। মোহিনী চিৎকার করে ওঠে আবারো। কিন্তু লাভ হয়না। ওই সবাইকে বলে এসেছে, যাইকিছু হোক, আজরাতে এদিকটায় না আসতে। ওর কথামতোই এদিকে আজ এগোবেনা কেউই।
সামনের ব্যক্তিটি একটা ভেতরে ঢুকে দরজা লক করে। তালা ঝুলিয়ে চাবিটা নিজের পকেটে পোরে। মোহিনী পেছোতে পেছোতে বেডের এককোনে চলে যায়। দুদেয়ালের কোনে পিঠ ঠেকিয়ে, হাটু মুড়িয়ে কাদতে থাকে। অবয়ব পাত্তা দেয়না ওকে। কাধের ব্যাগ নামিয়ে সেখান থেকে একের পর এক ধারালো অ’স্ত্র, হাঁতুড়ি, সূঁচ বের করে চঞ্চলের দেহের ওপর খাটাতে থাকে। চঞ্চল একচুল নড়তে পারছে না। তবে যন্ত্রনায় শরীর মোচড়াচ্ছে। মোহিনী আর সহ্য করতে পারলো না সে দৃশ্য। দুহাতে চোখমুখ ঢেকে ফেললো নিজের। আঙুলের ফাঁকে সামনে তাকালেই আঁতকে উঠছিলো বারবার। চঞ্চলের হৃদপিণ্ড তখনো দেখা যায়। আস্তেধীরে চলছে ওটা। মোহিনী একেবারে দুহাতে চোখ বন্ধ করে নিলো নিজের।
প্রায় ঘন্টাদেড় পর সাড়াশব্দ না পেয়ে ভয়েভয়ে চোখ খোলে মোহিনী। দরজা খোলা। আর ঘরে তখন একবিছানায় ও আর অজ্ঞান হয়ে নিজের বিছানায় পরে থাকা অনু। মেঝেতে র’ক্তের বন্যা। ছু’ড়িসহ বাকিসব অস্ত্রও রাখা। র’ক্তের দাগ দরজা দিয়ে বাইরে চলে গেছে। মোহিনী কাপতে কাপতে বিছানা থেকে নিচে নামে। র’ক্তের দাগ বলছে, চঞ্চলের দেহটাকে টানতে টানতে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। মুখ চেপে ধরে আবারো কেদে দিলো ও। চোখে পরে বিছানায় থাকা কাগজটা। সেখানে লেখা, ‘যদি খু’নী হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে পারো, তো খু’ন হবেনা। নইলে পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকো না কেনো, যতো দেরিতেই হোক না কেনো, চঞ্চলের মতো নিজের কুকর্মের শাস্তি ঠিক তোমার কাছে পৌছে যাবে।’
কাগজটা হাতে নিয়ে কাপতে থাকলো মোহিনী। র’ক্তের দাগ অনুসরন করে বাইরে বেরোলো কোনোমতে। পুরো করিডোর ফাকা। রক্তের দাগ করিডরের শেষ প্রান্ত অবদি গেছে। মোহিনীর চোখে স্পষ্ট ভাসলো, মা’রার পর চঞ্চলকে এখান দিয়েই টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ভয়েভয়ে এগিয়ে গিয়ে কিনারায় গিয়ে নিচে তাকালো ও। আর নিচের বেতের ঝোড়ে পরে থাকা চঞ্চলের বি’দঘুটে দেহটা দেখে, মুখ চেপে ধরে কয়েককদম পিছিয়ে গেলো ও। স্তব্ধ পায়ে আবারো অনুর রুমে চলে আসে মোহিনী। ধপ করে মেঝেতে বসে যায়। খু’নির রেখে যাওয়া কাগজটা চিবিয়ে খেয়ে ফেলে। মন্ত্রপুতের মতো সবগুলো অস্ত্র ছুয়েছুয়ে দেয় ফিঙ্গারপ্রিন্ট হিসেবে। ওকে এতোক্ষণ চুপ থাকতে দেখে সাইফ অধৈর্য হয়ে পরলো যেনো। আবারো বললো,
– সত্যিটা বলুন মিস মোহিনী। আ’ম ওয়েটিং!
মোহিনীর কানে গেলেও মাথায় গেলোনা কথাটা। ওর মাথায় এটাই আছে, যে চঞ্চলকে এমন ভ’য়ংকরভাবে খু’ন করতে পারে, সে সব পারে। আর মা’রা যাওয়ার চেয়ে জেলে থাকা ভালো। তাছাড়া চঞ্চলকে খু’নের একটা ভালো কারন দর্শিয়েছে ও। অনুকে জোর করতে আসা। তাই ওকে মারার দায়ে জেল হলেও খুববেশি দিনের হাজত হবে না ওর। মোহিনী সাইফের চোখে চেয়ে স্পষ্টভাবে বললো,
– আমি সত্যিই বলছি। খু’নটা আমিই করেছি।
সাইফ হার মানলো। বুঝলো ভালোমতোন ভয় পেয়ে আছে মোহিনী। কথা বেরোবে না ওর মুখ দিয়ে। পেছন ফিরে তাকালো সাইফ। হাত পাঁচেক দুরুত্বে শারাফ দাড়ানো। কালো প্যান্টে ইন করা আকাশীরঙা শার্ট পরনে ওর। সাইফের মনে হয়েছিলো হয়তো মোহিনীর বিষয়ে শারাফ কিছুটা সহায়ক হতে পারে। তাই শারাফকে চলে আসতে বলেছিলো ও। বোনের বিয়ের দিনটাতেই বোনের হবু বরকে এভাবে ক্রাইমসিনে আনার কোনো ইচ্ছা ছিলো না ওর। কিন্তু উপায়ও তো নেই! শারাফ পুরোটা সময় বুকে হাত গুজে চুপচাপ দেখেছে মোহিনীকে। হতাশ হয়ে সাইফ উঠে আসলো মোহিনীর সামনে থেকে। শারাফকে বললো,
– কি বুঝলে?
শারাফ বুক থেকে হাত নামালো। বললো,
– ওর সামনে পুরো ঘটনাটা ঘটেছে। একজনকে মা’রাত্মক কষ্ট দিয়ে খু’ন করা দেখেছে ও। আর সেটা এতোই ভ’য়ানক যে, ও ধরেই নিয়েছে এখন মুখ খুললে একইভাবে ওউ মারা পরবে। মৃ’ত্যুভয়ের ওপরে কিছু হয়না মিস্টার এহমাদ। হাজার চেষ্টা করলেও আপনি ওর মুখ খোলাতে পারবেন না এমুহূর্তে।
– করনীয়?
– স্বাভাবিক হওয়ার জন্য সময় দিন। মিনিমাম একটা দিন। নিরাপত্তা পেলে তারপর ক্রসকোশ্শেন করলে, ঠিকই বলবে কি ঘটেছিলো।
সাইফ চুপ রইলো। শারাফের বলা মতো একটাদিন সময় নেই ওর হাতে। তার আগেই অন্যপথ দেখতে হবে ওকে। শারাফের কাধে হাত রেখে বললো,
– ওকে। দেখা যাক। আর তোমাকে এভাবে ডেকে আনার জন্য…
– ইটস টোটালি ওকে মিস্টার এহমাদ। বরযাত্রী ঘন্টাদুই পরে বেরোবে। সবাই রেডি হতে ব্যস্ত। তবে আমার স্বপ্নীলে ফেরা উচিত এখন। আপনার বোন আমার জন্য অপেক্ষা করছে। অনুমতি দিন।
মাথা নেড়ে হ্যাঁ বুঝালো সাইফ। বললো,
– আমিও বরযাত্রী পৌছানোর আগেই বাসায় ফিরবো শারাফ! আমার বোনের জীবনে আমি নিজে ওয়েলকাম করবো তোমাকে।
সাইফের সাথে হ্যান্ডশেইক করে, ওকে জড়িয়ে ধরলো শারাফ। হাসিটা মিলিয়ে শক্ত চোয়াল নিয়ে বেরিয়ে গেলো ওখান থেকে। সাইফ এগোলে পাশের রুমটায়। হলের গেইটম্যানকে সেখানে বসানো হয়েছে। বেশকিছুক্ষণ তাকে প্রশ্ন করেও তেমন কিছু পাওয়া গেলোনা। যারা আগেররাতে হলে ঢুকেছিলো, তারা নাকি সবাই আইডি দেখিয়েই ঢুকেছে। হলের প্রবেশমুখের সিসিটিভির ফুটেজ ও নেওয়া হয়েছে। সেখানেও সবাইকে আইডি দেখিয়ে ভেতরে আসতে দেখা গেছে। কিন্তু সাইফের কাছে এটাও স্পষ্ট, হলে থাকা সবাই আইডিধারী হতে পারেনা। তা কোনোভাবেই সম্ভব না। আর কেউ হোক না হোক, চঞ্চল আর খু’নী, এরা দুজনই হলআইডি না দেখিয়ে হলে ঢুকেছে। কিন্তু গেইটম্যান মিথ্যে বললেও সিসিক্যামের ফুটেজ তো মিথ্যে দেখাবে না। আরকোনো উপায় অবশিষ্ট দেখলো না সাইফ। চঞ্চলের হ’ত্যাকান্ডে এখনকার মতো অবশিষ্ট নেই কিছুই। সব অ’স্ত্রে মোহিনীর ফিঙ্গারপ্রিন্ট। তারেকের মৃ’ত্যুর বিষয়টা এখনো লোক জানাজানি হতে দেয়নি ও। সবমিলিয়ে এখন সবুজের গার্লফ্রেন্ডই ওর শেষ আশ্বাস। নইলে আজকে এই কেইস থেকে অবহ্যতি নিতে হবে ওকে। তৈরী রাখা কেইস এবোর্ট লেটার জমা দিতে হবে ইন্সপেক্টর আফজালকে। জীবনে প্রথমবারের মতো। সাইফ দ্রুতপদে পা বাড়ায় হল থেকে বেরোবে বলে। কিন্তু গেইটের কাছে যেতেই দুটো মেয়ে ছুটে আসে ওর দিকে। একজন হাপাতে হাপাতে বললো,
– স্ স্যার, মোহিনী আপু চঞ্চল ভাইকে খু’ন করেনি স্যার। প্ প্রমাণ আছে আমাদের কাছে!
চকচকে চোখে তাকালো সাইফ। মেয়েটা একটা শুকনো ঢোক গিলে ফোন বের করলো নিজের। কিছু একটা বের করে সাইফের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো,
– স্যার আমি অনুর করিডোরের অপোজিট করিডোরে থাকি। চারতলাতে। গ্ গতকাল অনেকরাতে বয়ফ্রেন্ড ভিডিও কল করেছিলো। রুমমেটদের ঘুমে ব্যাঘাত হবে বলে আমি বাইরে চলে আসি। কথা বলতে বলতে একসময় আমার বয়ফ্রেন্ড বললো তোমার পেছনে নিচতলার করিডোরে ভূত ঘুরছে দেখো। ও প্রায়ই এমন মজা করে। আমি ভেবেছিলাম তখনো হয়তো মজাই করছে৷ বললাম মজা করোনা তো! ও আবারো একইকথা বললো। আমি নিজের ক্যামেরার দিকে ভালোভাবে তাকালাম। আর যা দেখলাম…
এটুকো বলে থামলো মেয়েটা। ফোনে থাকা ছবিটা জুম করে সাইফকে দেখিয়ে বললো,
– এ্ এটা তখনকার স্ক্রিনশট নেওয়া স্যার। এই ড্রেস তো মোহিনী আপুর না। আ্ আরোকিছু ছবি আমি তখন লুকিয়েচুরিয়ে তুলেছিলাম দেখুন। আছে ওখানে।
সাইফ ছবিতে দেখলো কালো জ্যাকেট, জিন্স, মুখোশধারী। নাজমুলকে মা’রতে যাওয়া সেই একইবেশী। একপা ধরে চঞ্চলের দেহটাকে করিডোরের মেঝেতে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে সে। তারপর ওর নিথর দেহটাকে রেলিংয়ের ওপর তুলে নিচে ফেলে দিলো। শেষ ছবিটা দেখে সাইফের চোখ বেরিয়ে আসার উপক্রম। অবিশ্বাসী অশ্রুতে ভরে ওঠে তারা। কপালের পাশ বেয়ে ঘাম গরায় সাইফের। আর মুখ দিয়ে অস্ফুটস্বরে বের হয়,
– শারাফ…
•
সাদা রঙের শেরওয়ানিটা পরে নিয়ে আয়নায় নিজেকে দেখলো শারাফ। স্বপ্নীলের সবার পরনে হালকা ধুসর রঙের পরিধান। মেয়েরা বিছানায় বসে কানাঘুষা আর হাসাহাসি করছে। শারাফ সেন্ট নিয়ে হাতের কবজি আর গলায় স্প্রে করলো। বা বুকের কাছে শেরওয়ানির কারুকাজটা ঠিকঠাক করে নিলো। আয়নায় মেহেরুনের দিকে তাকিয়ে বললো,
– ভাইয়া কই ভাবী?
– এইতো।
দরজায় তাকালো সবাই। সেখানে পাগড়ির কাপড়টা হাতে শাওন দাড়িয়ে। এগিয়ে এসে শারাফের সামনে দাড়ালো শাওন। শারাফ মাথা নিচু করলো। শাওন ওর মাথায় পাগড়ি বাধতে বাধতে নিচুস্বরে বললো,
– বেরিয়েছিলি?
– হু। বিয়ের দিনটাতেও ক্রাইমসিনে যেতে হয়েছিলো।
শাওন একপলক তাকালো ওর দিকে। শারাফের ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক হাসি আর গহীন দৃষ্টি। সেটা শাওনের সুবিধের ঠেকলো না। এ পরিবারের সবার চোখকে ফাকি দেওয়া গেলেও সবচেয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিজোড়ার আড়াল থাকার প্রচেষ্টা অনেক আগেথেকেই চালিয়েছে ও। শুধুমাত্র শারাফের কারনে ও দেশে ফেরার পরপরই হলের নি’ষিদ্ধ কার্যক্রম থামিয়ে দিয়েছিলো ও। ভেবেছিলো শারাফ বিয়েতে ব্যস্ত থাকবে, এরমাঝে ও দেশে এসে নিজেহাতে গুছিয়ে নেবে। কিন্তু তার বিপরীতটাই ঘটছে কেবল। প্রথমে তারেক নি’খোঁজ, এখন চঞ্চলের খু’ন। মাথাটা ঝারা মারলো শাওন। শারাফের পাগড়ি বাধা শেষ হলে চাদরটাও ঠিকঠাকমতো ভাজ করে ওর হাতে ধরিয়ে দিলো। শারাফ সৌজন্য হেসে ফোন হাতে নিলো নিজের। তারপর কল লাগালো স্নিগ্ধতার নম্বরে।
কল শুনে ফোনের দিক তাকালো স্নিগ্ধতা। শারাফের নম্বরটা দেখে ঠোঁটে লাজুক হাসি ফুটলো ওর। টের পেলো, শুধু ও না, ওকে সাজাতে বসা একঘর মেয়েও সে ফোনটার দিকে তাকিয়ে আছে। হাত বাড়াতে যাবে, একজন ছো মে’রে নিয়ে নেয় ওর ফোনটা। বাইরের দিকে ছুট লাগাচ্ছিলো সে। কিন্তু দরজায় অনুর সাথে ধাক্কা পেয়ে থেমে যায়। স্নিগ্ধতা খুশিতে দাড়িয়ে গেলো। এগিয়ে গিয়ে অনুকে জড়িয়ে ধরে উচ্ছ্বাসে বললো,
– এসেছিস তুই?
মাথা ওপরনিচ করে জোরালো হাসলো অনু। স্বাভাবিক থাকতে ফোনটা নিয়ে লাউডস্পিকারে দিলো ও। ওপাশ থেকে শারাফ বললো,
– রেডি হয়েছো?
স্নিগ্ধতা মিনমিনে গলায় বললো,
– হচ্ছিলাম।
– এখন যদি লাউডস্পিকারেই বলে ফেলি আমার তোমাকে কনেবেশে দেখার জন্য তর সইছে না, রুমের সবাই নির্লজ্জ বলবে?
খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে রুমের সবাই। অগ্নিলা এসে ফোনটা হাতে নেয় এবারে। স্পিকার অফ করে শারাফকে বললো,
– ফোন লাউডে আছে সে প্রেডিকশন বাদ দিয়ে জলদি আসো।
কল কেটে অনু-অগ্নিলা সবাই মিলে সাজাতে শুরু করে স্নিগ্ধতাকে। সাজানো শেষে আয়নায় নিজেকে দেখতে লাগলো স্নিগ্ধতা। সবাই বসেবসে বলাবলি করছিলো ওদের নিয়ে। সেসময়ই দরজায় নক পরে। স্নিগ্ধতা আয়নায় তাকিয়ে দেখলো সাইফ এসেছে। একহাতে ঘোমটা আর আরেকহাতে জামা ধরে হাসিমুখে উঠে দাড়ালো ও। চকচকে চোখে চেয়ে রইলো ভাইয়ের দিকে। আর সাইফ স্তব্ধ। বিমুঢ়তা নিয়ে একপা দুপা করে এগোচ্ছে সে। পাশ থেকে অগ্নিলা রুমের সবচেয়ে বয়স্কাকে উদ্দেশ্য করে বললো,
– ওরা ভাইবোন কিছুক্ষণ একান্তে কথা বলুক দাম্মা?
ওর সাথে ছোটবড় সকলেই সায় দিলো। কলরব করতে করতে স্নিগ্ধতার ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো নারীসমাজ। ফাঁকা ঘরটায় তখন শুধু সাইফ, অগ্নিলা, স্নিগ্ধতা। দুভাইবোনের মুখচোখ দেখে নিয়ে, দরজাটা ভিড়িয়ে বেরিয়ে গেলো অগ্নিলা। স্নিগ্ধতা আগ্রহ নিয়ে বললো,
– কেইস সলভ হয়েছে তোমার?
– হুম।
ছোট্ট করে জবাব দেয় সাইফ। খুশি হয়ে যায় স্নিগ্ধতা। নিজেকে আবারো পুরোপুরিভাবে দেখে নিলো ও। একটু ঘুরে উঠে জামাটা ভাইকে দেখালো। আরোবেশি উৎসুক কন্ঠে শুধালো,
– আমাকে কেমন দেখাচ্ছে ভাইয়া?
সাইফের চোখ আবারো ভরে উঠলো৷ মেহেদীরাঙা হাত, কারুকাজকরা হালকা ধুসর রঙের বড়হাতা আনারকলি, মাথায় তুলে দেওয়া সাদা জরজেটের ঘোমটা, টায়রা, নাকে নথ, কানে বড় দুল, হাতভরা চুড়ি। শুভ্রতায় মোড়ানো এই স্নিগ্ধতা ওর পৃথিবী। কিন্তু কেইসের সত্যতা আজ সেই পৃথিবীতে তান্ডব আনতে উদ্যত। এই সত্যের ঝড়ে আজ ধ্বংস হয়ে যাবে সবকিছু। সাইফ শক্ত করলো নিজেকে। হাত মুঠো করে, কান্নাদের দমালো। হাতে থাকা ফোনটায় কিছু একটা বের করে সামনে তুলে ধরলো স্নিগ্ধতার। জলভরা চোখে দাতে দাত চেপে বললো,
– দ্যা কিলার!
#চলবে…

