নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক লেখনীতে : মিথিলা মাশরেকা ৭১.

0
1

#নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক
লেখনীতে : মিথিলা মাশরেকা

৭১.

সাইফ চেয়ারে বাধা অবস্থায় শক্ত হয়ে বসে আছে। আর ওর পায়ের ওপর মাথা রেখে মেঝেতে বসে আছে অগ্নিলা। বেশকিছুক্ষন আগে আবারো ফিরেছে ও। সামনে পরে থাকা অগ্নিলার মোবাইলে ম্যাসেজ নোটিফিকেশন আসলো একটা। ম্যাসেজে গুরুত্ব না দিয়ে শুধু সময়টা দেখে নিলো অগ্নিলা। ভোর পাঁচটা। অগ্নিলা মিনমিনে গলায় বললো,

– গত কয়েকমাসে এমন প্রতিটা ভোর আমি তোমার বুকে কাটিয়েছি সাইফ। আর আজ দেখো, তোমাকে আটকে রেখে তোমার পায়ে জায়গা করতে হয়েছে আমাকে।

সাইফ জবাব দিলোনা। অগ্নিলার চোখের কোনা বেয়ে আবারো জল গরায়। একহাত বাড়িয়ে মোবাইলটা হাতে নেয় ও। সোজা হয়ে বসে। কিন্তু ম্যাসেজটা দেখেই দৃষ্টি প্রসারিত হয় ওর। আবারো চোখ বেয়ে জল গরায় টুপটাপ। মাটিতে ঠেস দিয়ে উঠে দাড়ালো অগ্নিলা। সাইফ দুবার পলক ফেলে ওকে পরখ করলো। কাঠের তাকের একটায় সাইফের ফোন রাখা। সেটা হাতে নিলো অগ্নিলা। তারপর সাইফের সামনে এসে বললো,

– তোমায় যেতে হবে।

সাইফ ভ্রু কুচকে চাইলো। অগ্নিলার কথা বুঝে আসলো না ওর। অগ্নিলা ওর সে চাওনি উপেক্ষা করে ওর হাতের বাধন খুলতে লাগলো। বললো,

– একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?

– তোমার কি মনে হয় সাইফ? আমার পরিণতি কি?

– জেল।

অগ্নিলার হাত থেমে যায়। চোখ তুলে তাকায় ও সাইফের দিকে। সাইফ তেমনি দৃঢ়তার সাথে বললো,

– তুমি সত্যি লুকিয়েছো। য়্যুমুর অন্যায়ে তুমিও জড়িত।

অগ্নিলা দৃষ্টি সরালো। আবারো ওর হাতের বাধন খুলতে ব্যস্ত হয়ে পরলো। বললো,

– আর ওরা মেয়েগুলোর সাথে যে অন্যায় করেছে? সেটা? নিস্পাপ ছেলেগুলোর হাতে মাদক নামের বিষ তুলে দিয়ে এতোগুলো পরিবার ধ্বংস করে দিয়েছে, সেটা? সেসবের কি হবে?

– আইন ওদেরকেও…

সাইফের হাতের শেষ বাধনটা সর্বোচ্চশক্তিতে টান মেরে খুলে ফেললো অগ্নিলা। তীব্র ক্ষোভ নিয়ে চেচিয়ে বললো,

– আইন, আইন, আইন! আইন কবে কাদের শাস্তি দিয়েছিলো সাইফ? কবে? আইন পেরেছিলো য়্যুমুর এক্সিডেন্ট কেইসের ভেতরের রেইপ কেইসকে খুজতে? আইন পেরেছিলো ইন্সপেক্টর বাকেরের মেয়ের মতো হাজারো মেয়ের সম্মান বাচাতে? আইন পেরেছিলো ওর মতো শ খানেক মেয়ের সুইসাইড আটকাতে? আইন পেরেছিলো ওই জানোয়ারদের শাস্তি দিতে?

সাইফ জবাবহীন। হাত পুরোপুরিভাবে ছাড় পেয়েছে ওর। অগ্নিলাকে গুরুত্ব না দিয়ে ও নিজের পায়ের বাধন খুলতে উবু হয়। দমে যায় অগ্নিলা। তাচ্ছিল্য করে বলে,

– ঠিক এমনটাই গা ছাড়া ছিলো তোমার আইন সাইফ! কিছুই করতে পারতো না তোমার আইন! কিছুই করতে পারতো না!

অগ্নিলার আওয়াজ বেড়েছে। নিজেকে মুক্ত করে সোজা হয়ে দাড়ালো সাইফ। অগ্নিলা এগিয়ে এসে ওর বুকপকেটে ফোন গুজে দিলো। তারপর সাইফের কলার ধরে, দাঁতে দাঁত চেপে বললো,

– তোমার আইন প্রমাণ চায়, তাইনা সাইফ? ওরা প্রমাণ চায়তো? তবে এই নাও প্রমাণ! য়্যুমুর করা সাত খু’নের কে কি কি পাপ করেছে, তার প্রমাণ! হতে চলা বারোতম খু’ন যে হবে, তার কি পাপ, তার প্রমাণ! তুমি মুক্ত সাইফ! দেখিয়ে দাও তোমার আইন কি করতে পারে। আমিও দেখতে চাই, তোমার আইন কাকে সাজা দেয়। পাপীকে? নাকি পাপের বিনাশীনিকে? আমিও দেখতে চাই! গো আহেড!

সাইফের বুকে দুহাতে ধাক্কা মেরে নিজেই দু পা পিছিয়ে যায় অগ্নিলা। সাইফ হাত মুঠো করে নিলো। দেখলো সামনের কাঠের তাকে হ্যান্ডকাফ রাখা আছে একটা। সাতপাঁচ না ভেবে ওটা অগ্নিলার হাতে পরিয়ে দিলো ও। তারপর টেনে নিয়ে একটা লোহার খামে আটকে দিলো অগ্নিলাকে। অগ্নিলা কিছুক্ষণ হাতের বাধনের দিকে চেয়ে থেকে হেসে ফেললো। বললো,

– যেই আমি তোমাকে মুক্ত করলাম, সেই আমাকেই আটকে দিচ্ছো? আমি পালাতাম না সাইফ। পালানোর হলে তোমাকে মুক্ত করতাম না।

অগ্নিলার কথায় ভুল ছিলোনা। সাইফ জবাব না দিয়ে বেরিয়ে আসছিলো। পেছন থেকে অগ্নিলা উচ্চস্বরে বললো,

– তবে তুমি আমার পরিণতি জানোনা সাইফ। আমি জানি। আর তুমিও তা জানার অধিকার রাখো। তাই বলছি। আমার পরিনতি লকাপ না। আমার পরিনতি, আমি তোমার হতেচলা সন্তানের মা। এন্ড ট্রাস্ট মি, আই’ল বি দ্যা বেস্ট সিঙ্গেল মম এভার!

সাইফের পা আটকে যায়। আস্তেকরে পেছন ফেরে ও। জলভরা চোখে তাকায় অগ্নিলার দিকে। এতোক্ষণে ওর চোখে পরে, বিয়ে উপলক্ষে লাল শাড়ি পরেছিলো অগ্নিলা। ওর হাতে চুড়ি, গলায় গয়না, উশকো খুশকো চুলের খোপায় নকল ফুলের গাজরা। কপালের বা কোনে একটুখানি কাটা, রক্ত জমে আছে সেখানে। ওকে পেছন ফিরতে দেখে দম নেয় অগ্নিলা৷ ঔদার্যের সাথে বলে,

– পিছু ফিরো না সাইফ। পিছুটান রেখো না। যে অন্যায়কারীকে শাস্তি না দিয়ে অন্যায় নিধনকারীনিকে বাধা দেয়, আমি তার দয়া-ভালোবাসা কোনোটাই গ্রাহ্য করবো না। তুমি চাইলেও অগ্নিলা আর নীলা হবেনা। ডু হোয়াটএভার ইউ ওয়ান্ট!

পানির চ্ছটায় জ্ঞান ফেরে ডক্টর জেনেলার। পিটপিটিয়ে চোখ মেললো সে। নিজেকে আবিষ্কার করে এক আবদ্ধ অন্ধকার ঘরের মেঝেয় পরে থাকা অবস্থায়। তার বরাবর সামনে দাড়ানো এক পুরুষ অবয়ব। তার হাতে থাকা গ্লাসটা থেকে তখনও দুফোটা পানি পরছে। জেনেলা ক্লান্ত চোখ নেয় তার হাতঘড়িটার দিকে। বড় আকারের ঘড়িটায় তখন সাড়ে পাঁচটা বাজছে। ভোর। ক্লান্তিতে চোখ বন্ধ করে, পেছনের দেয়ালে মাথা ঠেকায় জেনেলা। ওকে শ্রান্ত দেখে সামনেরজনের মাথায় আবারো রাগ চেপে বসে। গ্লাসটা ছুড়ে মারে সে। মেঝেতে পরে সশব্দে ভেঙে যায় ওটা। জেনেলা গুরুত্ব দিলোনা। লোকটা কিঞ্চিৎ উবু হলো। বড়শ্বাসে বললো,

– তোমার মেয়ে কোথায়?

জেনেলা চোখ তুলে চাইলো। কোনো এক চিড় ভেদ করে আলো ঢুকেছে ঘরে। আর সে আলো পরেছে সামনেরজনের মুখে। শক্তপোক্ত চোয়ালের মানুষটার স্বাভাবিক গোলগাল মুখটা অস্বাভাবিকভাবে ভয়ানক দেখাচ্ছে। জেনেলা বিচলিত হলো না। ইংরেজীতে বললো,

– য়্যুমু মারা গেছে।

– এটা তুমিও জানো, আমিও জানি, ও মারা যায়নি।

– য়্যুমু আমার মেয়ে। ও বেচে থাকলে, আমার চেয়ে খুশী আর কেউ হতো না। কিন্তু ও বেচে নেই। তোমরা মেরে ফেলেছো ওকে।

জেনেলা আবারো দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে নিতে যাচ্ছিলো। ওকে ওমন শান্তভাবে দেখে শাওনের রাগ তড়তড়িয়ে বাড়লো। শারাফের বিয়েতে যায়নি ও। হিসেব মেলানোর বাকি ছিলো বলে। একের পর এক সৌরভ, সবুজ, তারেক, চঞ্চল কেনো খু’ন হলো; কিভাবে হলো, কে মেরেছে ওদের সব প্রশ্নের উত্তরের প্রয়োজন ছিলো ওর। তারেক মারা যাবার আগেই ওকে বলেছিলো, ওকে গ্রেফতার হবার পর সাইফ ওকে নাজমুলের খু’নির যে ছবি দেখিয়েছিলো, তাতে য়্যুমুর লকেট ছিলো। শাওন চিন্তায় পরে যায়। য়্যুমুকে রেপ করে, ড্রাগ নিয়ে ওরা টেন্টেই পরে ছিলো। পরে অবশ্য খবর পায়, এক্সিডেন্ট করে য়্যুমুর মৃত্যু হয়েছে। যেহেতু এক্সিডেন্ট কেইস, এ নিয়ে বাড়তি কোনো কথা হয়নি। ওরা চারজনও আর গুরুত্ব দেয়নি। য়্যুমুকে ওরা মৃত বলেই জানতো। সেখানে খু’নগুলো ওই করেছে, তা মানতে সময় লাগছিলো শাওনের।

হণ্যি হয়ে য়্যুমুর বাকিসব খবরাখবর খোঁজ করেছে ও। আর সেখান থেকে জানতে পারে, য়্যুমু শারাফের পুর্বপরিচত। শাওনের ভয় বাড়ে। শারাফ যদি কোনোভাবে এসবে জড়িয়ে থাকে, তারমানে ও ওদের ড্রাগ আর হলকাহিনীর সবটাই জেনে গেছে। কিন্তু সেখানেও শাওনের ঠিকঠাক জবাব মেলেনা। কারন শারাফ দেশে ফেরার পর ওর আড়াল রাখতে হলে অনাচার থামিয়ে দিয়েছিলো শাওন। মোহিনী, চঞ্চল সবাইকে সাবধান করেছিলো, ড্রাগের লেনদেনও কমিয়ে দিয়েছিলো ও। সবটা জেনে চুপ থাকার মানুষ শারাফ না। ছোটচাচার রেফারেন্সে ইন্সপেক্টর আফজালের সাথেও ওঠবস করেছে শাওন। সিরিয়াল কিলিং কেইসে সাইফ যতোদুর এগিয়েছিলো, তার কাছ থেকে বেশকিছু জেনেছে। যেখানে স্পষ্টতর, প্রতিশোধস্পৃহা থেকেই এই খু’নগুলো করছে কেউ। শারাফের ভয়ে মাদক লেনদেন আটকে রাখার লস, তারওপর তিন সঙ্গীর নৃশংস মৃত্যু। এরপর ওর নিজের মৃত্যুঝুকি থাকা অস্বাভাবিক কিছু না। সবদিক মিলিয়ে শাওনের মাথার ভেতরটা রো রো করে ওঠে। ডক্টর জেনেলাকে পাকড়াও করাটাই শেষ আর উৎকৃষ্ট উপায় মনে হয়েছে ওর। কিন্তু সে-ও বারবার বলছে য়্যুমু মারা গেছে। খিচে উঠে জেনেলার চুলের মুঠি ধরলো শাওন। জেনেলা কুকড়ে উঠে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলো। তবে পারলো না। শাওন বাজখাই গলায় বললো,

– নাটক করছো ডক্টর? শাওন এতোবছর হলো ওই ফিল্ডে অনেককে ঘোল খাইয়ে এসেছে। সো শাওনের কাছে কোনো নাটক না!

– মিথ্যে বলছি না আমি।

– বলছো! আমি বেশ ভালোমতোই জানি ডক্টর, তোমার মেয়ে সেদিন এক্সিডেন্ট মারা যায়নি। দেশে এসে ওকে লুকিয়ে ফেলেছো তুমি। তারপর একটু একটু করে এই কয়বছরে ওকে দিয়েই এতোগুলো খু’ন করিয়েছো। নিজের রেপিষ্ট সৌরভ, চঞ্চল, তারেককে ওই খু’ন করেছে!

– তোমার কাছে মিথ্যে বলে আমার কোনো লাভ নেই শাওন।

– তাহলে মুহাম্মদ ইয়ামিনের মিথ্যে পরিচয়ে তুমি আমার ড্রাগব্যবসায় ইনভল্ব হয়েছিলে কেনো?

ডক্টর জেনেলা টলোমলো চোখে চায়। নামটা তার চোখের সামনে একেরপর এক ভেসে ওঠে তার পুরো জীবদ্দশা। বছর পচিশেক আগে তুরস্কের এই সুদর্শন ব্যক্তির প্রেমে পাগল হয়েছিলো সে। ওদের প্রনয়ের পরিনতি হিসেবেই জন্ম নেয় য়্যুমু। বাবার নামহীনে বড় হওয়া য়্যুমুকে সর্বোচ্চ আদরে স্বাধীনতায় মানুষ করেছিলো জেনেলা। আর সেই য়্যুমুই যখন বাংলাদেশে এসে রেপ হয়, এক্সিডেন্ট করে, জেনেলার মাতৃত্বের সবটুকো আর্তচিৎকার সেদিন স্নিগ্ধতা দেখেছিলো। ও যখন বলেছিলো য়্যুমুর পাপীদের শাস্তি দেবে, স্বার্থপর হয়ে গিয়েছিলো জেনেলা৷ পুরো পৃথিবীর কাছে নিজের মেয়ের মৃত্যুর কারন দর্শিয়েছিলো সেই এক্সিডেন্টকে। ধামাচাপা দিয়েছিলো শাওন আর ওর সঙ্গীদের কুৎসাকে। স্নিগ্ধতা ওকে যখন যেভাবে যা করতে বলেছে, তাই করেছে সে। তবে প্রথম খু’ন সম্পর্কে জানার পরপরই জেনেলার আত্মগ্লানি শুরু হয়। য়্যুমুর শোধ নিতে গিয়ে একটা নিস্পাপ, স্নিগ্ধ মেয়ের জীবন নষ্ট হচ্ছে ভেবে পিছু হটতে চায় ও। চেষ্টা করে স্নিগ্ধতাকে ফেরানোর। কিন্তু লাভ হয়নি৷ শাওনের সবরকম অপকর্মের কথা বলে ওকে থামিয়ে দিয়েছে স্নিগ্ধতা। অগ্নিলার মতো জেনেলাও তখন আর পিছুটান রাখতে পারেনি। এতোগুলো মানুষের ন্যায় হিসেবে অন্যায়ে নামাটা দোষের মনে হয়নি তারও। শাওনের ড্রাগব্যবসার খোজ নিতে, সেখানে ঢোকা জরুরি ছিলো। আর শাওন সেসময় তুরস্কের ডিলার খুজছিলো। বাধ্য হয়ে য়্যুমুর বাবার পরিচয় ব্যবহার করেছে জেনেলা। যেহেতু সে য়্যুমুকে সন্তানের পরিচয় দেয়নি, কখনো ডিলার আইডি দেখে ওদের সন্দেহ করবে না শাওন। এতোদিনে ও সত্যিটা জেনে গেছে শুনে জেনেলা অবাকই হলো। শাওন বললো,

– তোমার ল্যাপটপে ডিলার আইডির লগিন করা৷ মানে তোমরা দুই মা-মেয়ে মিলে, আমারই কাছ থেকে ড্রাগ কিনে, সেই ড্রাগস দিয়ে আমারই ছেলেদের খু’ন করেছো! এতোবড় খেল খেলেছো শাওনের সাথে!

জেনেলা চুপ। শাওন একটা ফোন এগিয়ে দিলো ওর দিকে। বললো,

– সব হিসেব মেলাবো আমি। আগে তুমি তোমার মেয়েকে ডাকো।

– আর কতোবার বলবো, য়্যুমু জীবিত নেই।

– ও রিয়েলী? যদি ও মারাই গেছে, তবে ওর রেপিস্টদের খু’ন করছে কে? ওই খু’নীর কাছে য়্যুমুর লকেট কিভাবে গেলো? য়্যুমু না হলে, ওর লকেটসমেত আমার তিন পার্টনারকে খু’ন করলো কে?

– খু’নগুলো আমি করেছি।

মেয়েলী আওয়াজে শাওনের ভ্রু কুচকে আসে। জেনেলার চুল মুঠো করে রাখা হাত নমনীয় হয়ে আসে। শহরের বাইরের এই একতল টিনশেড বড় ঘরটা বাইরে থেকে দেখতে একটা লবনের স্টোরেজ। কিন্তু মুলত এটা শাওনের মাদক আস্তানা। বাইরের লবণের স্টোরেজ সাইনবোর্ডটার জন্য খুববেশি পাহাড়ার প্রয়োজন হয়নি এখানে। থাকার মধ্যে আছে জেনেলা, ও আর তিনচারটে ছেলেপেলে। এখানে অন্য কোনো মেয়ের আনাগোনার প্রশ্নই ওঠেনা। শাওন পেছন ফেরে। কালো সালোয়ার-কামিজ পরিহিতা শুভ্ররমনীকে দেখে আপাদমস্তক ধাধিয়ে যায় ওর। মুখ দিয়ে অবিশ্বাসী আওয়াজ বেরোয়,

– স্নিগ্ধতা?

স্নিগ্ধতা স্থির। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ও শাওনের দিকে। গলায় জর্জেটের ওড়না। একহাতে সিনথেটিক মাস্কের মতো কিছু একটা। চুলগুলো ছাড়া৷ ফর্সা নিস্প্রভ মুখশ্রীর সে অদ্ভুত শীতল চাওনি যেনো শাওনকে ভয় দেখাতে চায়। কিন্তু শাওন কেবল অবাক হয়। জেনেলাকে একপলক দেখে স্নিগ্ধতার দিকে এগোতে যাচ্ছিলো ও। কিন্তু অকস্মাৎ ওর ঘাড়ে সূচ ফোটে। ‘আহ!’ বলে ঘাড় চেপে ধরে শাওন। স্নিগ্ধতা শান্তস্বরে বললো,

– ইন্সপেক্টর সাইফ এহমাদকে প্রথমবার দেখে তোর চোখে ধরা পরে যাবার যে ভয় দেখেছিলাম, তারচেয়েও বেশি ভয় তোর আমাকে ভয় করা উচিত ছিলো শাওন।

শাওন মুখ থুবড়ে মাটিতে পরে যায়। ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে দেখার সুযোগ পেলোনা ও। স্নিগ্ধতা দু পা এগিয়ে, আস্তেধীরে হাটু ভাজ করে ওর সামনে বসলো। বললো,

– ভালো করে দেখে নে। যাকে খুজতে জেনিমমকে এখানে এনেছিস, তোর সে ভয় আমি। য়্যুমু, হলের মেয়েদের নরকযন্ত্রণার নিধনকারিণী আমি। এতোগুলো বছর হলো ক্যাম্পাসে, হলে যে রাজনীতি আর ড্রাগসের নোংরা খেলা সাজিয়েছিস তুই, তার ইতি আমি। তোর সর্বপাপের বিনাশক আমি শাওন। আমি। স্নিগ্ধতা এহমাদ।

– হলের ছেলেদের হাতে বিষ তুলে ওদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করা জানোয়ার, মাদকসম্রাট বলে না তোকে সব? বল! তোর শরীরে এখন কোন ড্রাগ বইছে?

শাওন জবাব দিতে পারেনা। তবে ওর চাওনি বদলায়। বিস্ফোরিত চোখে চায় ও স্নিগ্ধতার পেছনে। ওর ঠোঁট কাপছে। অথচ মুখ দিয়ে কথা বেরোচ্ছে না। চোখের কোন রক্তাক্ত হয়ে আসছে ওর। স্নিগ্ধতার পেছন দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া ব্যক্তি যেনো ওর জবান বন্ধ করে দিয়েছে। স্নিগ্ধতা বললো,

– সে রাতে য়্যুমু যতোটা জোরে চিৎকার করেছিলো, ইন্সপেক্টর বাকেরের মেয়েসহ হলের মেয়েগুলো তোর পোষা জানোারদের কাছ থেকে ছাড় পাবার জন্য যেভাবে আকুতি করেছিলো, তারচেয়েও জোরে চিৎকার কর শাওন। আমি তোর চিৎকার শুনতে চাই! তোর আগে যারা মারা পরেছে, তাদের কারো চিৎকার শোনা হয়নি আমার। কিন্তু তোর চিৎকার শুনতে চাই আমি শাওন! চিৎকার কর! চিৎকার কর!

শাওনের মুখ তখনো বন্ধ। কোনোমতে স্নিগ্ধতার পেছনে মানুষটার দিকে আঙুল উচায় ও। স্নিগ্ধতা কিঞ্চিৎ মাথা ঘুরায়। তারপর মেঝেতে থাকা গ্লাসের টুকরো হাতে নেয় ও। ওটার ধারালো প্রান্ত আঙুল ছুইয়ে বললো,

– সামনের ঘরটায় মাত্র পাঁচজনের পাহাড়া?

– অবশ্য অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস থাকা তোর ভুল না। এতোগুলো দিনে কেউ যখন সন্দেহ করেনি এই লবনের গুদামে মাদকের কারবার হয়, ভবিষ্যতেও করতো না।

– তবে এখানকার পাহাড়ায় তোর শ খানেক পোষ্য থাকলেও আমি আসতাম শাওন। শুধু ভেন্টিলেটরের আউটার সাইডে একটু বেশি পরিমানে কার্বন মনোক্সাইড ব্যবহার করতে হতো, এই যা!

শাওন মাটিতে হাত দিয়ে থাপড়াচ্ছে। স্নিগ্ধতা দাতে দাত চেপে বললো,

– হ্যাঁ! কথা বল শাওন। তুই নিজে এই হিসেব একাকী মেলাতে পারবি না! কথা বল! প্রশ্ন কর আমাকে!

শাওন তখনো চুপ। চেষ্টা করেও মুখ দিয়ে কথা বের করতে পারছে না ও। স্নিগ্ধতা হুট করেই কাচটা শাওনের গলা বরাবর ধরলো৷ বললো,

– তোকে জবাব দিতে বিন্দুমাত্র ইচ্ছে করছে না আমার। ইচ্ছে করছে বাকিসবের চেয়েও তোকে জঘন্য মৃত্যু দিতে। এই নারীলোভী শরীরের একটা একটা শিরা ধমনি ছিড়ে দিতে। মাথায় ফুটন্ত পানি ঢেলে এই জঘণ্য কাজ চালনা করে যাওয়া মস্তিষ্ককে গলিয়ে দিতে। দুকানে গরম লোহা ঢুকিয়ে দিতে। প্রতিটা আঙুলের সন্ধি থেতলে দিতে। নখ উপড়ে নিতে। দৃষ্টি তুলে নিতে। মেয়েদের ভোগ্যবস্তু মনে করা শরীরের একটা একটা অংশ, টুকরো টুকরো করে কেটে রাস্তার কুকুরদের খাইয়ে দিতে! ইচ্ছে তো করছে…

স্নিগ্ধতা উত্তেজিত হতে হতেই থেমে যায়। একবার শাওনের পেছনে বসা ক্লান্ত জেনেলার দিকে তাকালো ও। তারপর হাত নামিয়ে নিলো আস্তেকরে। বললো,

– কিন্তু তোর চেহারায় আজ য়্যুমুর যন্ত্রণার পরিবর্তে, স্বপ্নীলের হাসিমুখগুলো ভেসে উঠছে শাওন। মেহুভাবীর নিস্পাপ মুখটা, শায়েরীর চঞ্চল মুখটা, মায়ের দরদভরা মুখটা, ছোটমার হাসিমুখটা, মুসকানের আদরআদর কথাগুলো সব মনে পরছে। আমার শরীরে লেগে থাকা শারাফের পবিত্র ছোয়া আমায় বাধা দিচ্ছে, এ শরীরে আর কোনো কলঙ্কে না লাগাতে। তোর মতো পশুর রক্ত না ছোয়াতে। আমি দুর্বল হয়ে পরছি শাওন! দুর্বল হয়ে পরছি আমি!

কাচ ছুড়ে মারে স্নিগ্ধতা। শরীরের ভর ছেড়ে দিয়ে, পা বিছিয়ে মেঝে বসে পরে ও। উদ্ভ্রান্তের মতো কাদতে থাকে হাউমাউ করে। টের পায়, ওর রোগ, ওর দ্বিতীয় সত্ত্বা শারাফের ভালোবাসায় হার মেনেছে। প্রেমে বাচতে চাওয়া স্নিগ্ধতা, প্রতিশোধস্পৃহায় বেচে থাকা য়্যুমুর ইতি চাইছে। আফসোস না করার শপথ করে বসা মনটা কেবল আফসোস গাইছে, এমনটা না হলেও পারতো, এমনটা না হলেও পারতো! শাওন তড়পাচ্ছে মেঝেতে। শরীর মোচড়াচ্ছে। মুখ দিয়ে সাদা ফেনা চলে এসেছে ওর। ওকে ওভাবে কাদতে দেখে জেনেলা উঠে দাড়ালো। এগিয়ে এসে স্নিগ্ধতার মাথায় হাত রাখলো। চোখ তুলে চাইলো স্নিগ্ধতা। কি হলো ওর, নিরব হয়ে গেলো নিমিষেই। উঠে দাড়ালো ও। জেনেলার হাতের ট্র্যাকার লাগানো ঘড়িটা খুলে নিজের হাতে পরলো। ওর বিধ্বস্ত মুখচেহারা দেখে চারবছর পর আবারো কলিজা কেপে উঠলো জেনেলার। মনে পরে গেলো মেয়ে হারানোর যন্ত্রণা। অপরাধীর মতো করে বললো,

– আমি তোমার দোষী স্নিগ্ধতা। ইমারজেন্সিতে থাকা অবস্থায় তোমাকে য়্যুমুর বিষয়ে না বললে আজ…

– না বললে এই নরপিশাচরা শাস্তি পেতো না জেনিমম। আইন কোনোদিনও ওদের উপযুক্ত শাস্তি দিতে পারতোনা। য়্যুমুর মতো মেয়েদের জীবনের এই বিষাক্ততা নির্মূল হতোনা।

জেনেলা কথা বাড়ালো না। গর্বের চোখে চাইলো স্নিগ্ধতার দিকে। স্নিগ্ধতা পাশে তাকালো। ওর দৃষ্টি অনুসরন করে সেদিক তাকালো জেনেলাও। স্নিগ্ধতা বললো,

– পারবে তুমি?

জেনেলা মাথা ওপরনিচ করলো। স্নিগ্ধতা বললো,

– এতোদিনে তোমার একমাত্র চাওয়া ছিলো শাওনকে নিজে হাতে শাস্তি দেওয়া। সে চাওয়ায় আমি বাধা দিলাম না জেনিমম। ওকে তোমার ওপরেই ছাড়লাম। কাজ শেষে বাসায় ফিরে যেও। আর হ্যাঁ, বিপরীত চিন্তা করোনা৷ বাকের স্যার এই কেইস সামলে নেবেন নিজের মতো করে। সবটা সেভাবেই হবে, যেভাবে আমি চাই।

দুফোটা চোখের জল ফেলে, তৎক্ষনাৎ তা মুছে ফেলে স্নিগ্ধতা। ওর অশ্রু দেখে জেনেলার মন আবারো যেনো কু গেয়ে ওঠে। সবটা এতো দ্রুত হবার কথা ছিলো না। নয়তো অনেক আগেই শেষ হবার কথা ছিলো। কোনোটাই হয়ে ওঠেনি। কেনো হয়ে ওঠেনি, সেটা স্নিগ্ধতার চোখের তারায় স্পষ্ট। প্রতিশোধ ওকে এ অবদি আনলেও, প্রেম ওকে থামিয়ে দিয়েছে। শাস্তি ওকে পরিকল্পনা শেখালেও, ভালোবাসা ওর সব পরিকল্পনায় দাড়ি টেনেছে। স্নিগ্ধতার হাত চেপে ধরলো জেনেলা। ব্যস্তভাবে বললো,

– আ্ আর তুমি? তুমি কোথায় যাবে?

স্নিগ্ধতা তাচ্ছিল্যে হাসলো। নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে চুপ রইলো কিছুক্ষণ। একদৃষ্টিতে মেঝের দিকে তাকিয়ে, একটু সময় নিয়ে বললো,

– ওই! যাকে সবাই আমার চির-অপেক্ষক হিসেবে জানে, তার কাছে ফিরবো!

জেনেলার হাত আলগা হয়ে আসে। জেনেলাকে হাত ছাড়তে দেখে স্নিগ্ধতা মৃদ্যু হাসলো। বললো,

– ঠিক বুঝেছো তুমি। তার কাছেই যাচ্ছি। তাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবে তো। হিসেবমতে, সেই তো আমার চুড়ান্ত গন্তব্য। মিস্টার আরাফাত।

#চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here