প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন #পর্বসংখ্যা_৬৫

0
2

#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_৬৫
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা

ড্রয়িংরুমে মানুষের হিড়িক পড়েছে যেন। এত এত মানুষের মধ্যমণি জমকালো লাল বেনারসি জড়ানো রমণী। সে আপাতত স্থির হয়ে সোফায় বসে আছে। মাথায় থাকা দোপাট্টা ললাট ছাড়িয়ে মুখশ্রী অবধি টানা। বর্ণা আলগোছে দোপাট্টা টেনে উপরে তুলে দিল। নজরে ধরা দিল কনের সজ্জিত মুখশ্রী! কেউ কেউ লাবণ্যময় রূপে মুগ্ধ হলেও অধিকাংশই নাক মুখ কুঁচকে চাইছে। সুরভীর ননাস তো ভরা মজলিসে বলেই বসল,
– তোদের ছেলের কী আক্কেল গুড়ুম হয়েছে সুরভী? এমন এতিম মাইয়ারে কেন বিয়া করল? দুনিয়ায় তো আর মাইয়া মানুষের অভাব পড়ে নাই। তোদেরও বলিহারি ছেলে জিদ ধরল আর তোদেরও রাজি হইতে হইব।

সুরভী যেন বেজায় বিরক্ত। জানত এই মেয়েকে ঘরে তুললে উঠতে বসতে এসবই শুনতে হবে তাকে। কিন্তু তাই বলে মেয়েটার সামনেই। কিছুটা বিব্রত বোধ করে সুরভী। আড়চোখে একবার চাইল লাবণ্যর পানে। পরক্ষণেই বলে উঠল,
– আপা ছাড়েন ওসব কথা। ছেলে কেমন জেদি জানেনই তো। বিয়ে যখন হয়েই গিয়েছে এখন আর এসব বলে লাভ নেই। এই মেয়ে এখন এই বাড়ির বউ। তাকে নিয়ে এসব বলাটা ভালো দেখায় না।

বর্ণাকে ডেকে বলল,
– লাবণ্যকে ঘরে নিয়ে যাও।

বলেই উঠে চলে গেলেন। বর্ণাও শাশুড়ি মায়ের কথামতো লাবণ্যকে নিয়ে গেল মাহাদের রুমে। এই রুমে লাবণ্যর বহুবার আসা হয়েছে। কিন্তু তখন জানা ছিল না এই ঘরেই তার আজীবনের জন্য ঠাঁই মিলবে। লাবণ্য আস্তে ধীরে বালিশে মাথা হেলিয়ে দিল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই চোখ বুজে এলো তার।

খট করে খুলে গেল বন্ধ ঘরের দোর। বাহির থেকে লাগানো ছিল। দরজা লাগিয়ে সবাই পথ রোধ করে দাঁড়িয়ে ছিল মাহাদের। তাদের হিসেব বুঝিয়ে দিতেই পথ ছাড়ে। সকলে যেতেই মাহাদ দরজা খুলে রুমে এলো। ক্লান্ত চোখের চাহনি বদলে মুহূর্তে ধরা দিল অপরূপা সুন্দরীর মুখশ্রী। পা দুটো সামান্য গুটিয়ে দু হাত ভাঁজ করে তন্দ্রায় মগ্ন রমণী। মাহাদ মৃদু হেসে ধীর কদমে এগিয়ে গেল। তার দৃষ্টি স্থির, চোখে অদ্ভুত মাদকতা! সামান্য ঝুঁকে রমণীর মুখে দৃষ্টি জ্ঞাপন করে। পুরো মুখশ্রীতে নজর বুলিয়ে যায়। ঘুমন্ত লাবণ্যর দিকে চেয়ে বলল,
– বিষণ্ণ এক বিকেলে দেখেছিলাম আতঙ্কে ছেয়ে থাকা দু লোচন। সে চোখে চেয়ে কাবু হয়েছিলাম পুরোদমে, স্থবির হয়েছিল মন মস্তিষ্ক।‌ নিজের সত্তা খুইয়ে হারিয়ে ছিলাম ঐ গভীর চোখের মায়ায়!

খানিকটা ঝুঁকে লাবণ্যর কপালে অধর ছোঁয়াল মাহাদ। ঠোঁট নাড়িয়ে মৃদু স্বরে বলে উঠে,
– মেয়ে তুমি কি জানো তুমি এই পুরুষের জন্য কী!

মাহাদ সরে গেল। মেয়েটা বেনারসি পরেই ঘুমে বিভোর। এমনকি গায়ের গয়নাগাটি অবধি খুলেনি। দোপাট্টাও মাথায়। যেকোনো সময় গলায় প্যাঁচ লাগতে পারে। মাহাদ সেফটিপিন খুলে দোপাট্টা খোলার চেষ্টা করল। কিন্তু কোনোভাবে সম্ভবপর হলো না। মেয়েটার দখলদারিতে সম্পূর্ণ দোপাট্টা, গায়ের নিচে চাপা পড়েছে। মাহাদ তবুও চেষ্টা চালাল। লাবণ্য একটু নড়েচড়ে উঠতে দোপাট্টা ছাড়িয়ে নিতে সক্ষম হলো সে। দোপাট্টা এক পাশে রেখে মাহাদ লাবণ্যর গলার সীতা হার খুলে রাখল, সাথে হাতে থাকা বালাগুলো। তবে কানের ঝুমকা জোড়া খুলতে গিয়ে বিপাকে পড়ে গেল। মেয়েটা এক পাশ হয়ে শুয়ে আছে। যার দরুন মাহাদ এক কানের ঝুমকা খুলতে পারলেও অন্য কানের ঝুমকা খুলতে পারছে না। মাহাদ কতক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। মেয়েটা উল্টো ফিরলে না হয় সে খুলে রাখবে। মাহাদ মিনিট পাঁচেকের মতো ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইল। লাবণ্য অন্যদিকে ফিরতে মাহাদ দ্রুত ঝুমকা খুলে সব একসাথে নিয়ে ড্রেসিং টেবিলের উপরে রেখে দিল। তারপর হুট করে লাবণ্যর সম্মুখে হাঁটু গেড়ে বসল। হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিল মেয়েটার কোমল গাল, তারপর অধর চেপে ধরল মেয়েটার ললাটে। মেয়েটা খানিকটা নড়েচড়ে উঠতে মাহাদ হুড়মুড় করে উঠে ওয়াশরুমে চলে গেল। চুরি করে চোর ধরা পড়ার ভয়ে যেমন করে পালায় মাহাদও তেমন করে পালাল। ছেলেটা ফ্রেশ হয়ে এসে তোয়ালে হাতে নিল। ভেজা মুখাবয়ব মুছে নিল তোয়ালে দ্বারা। টি-শার্ট গায়ে গলিয়ে লাবণ্যর পাশে জায়গা দখল করল। খুব সাবধানে এক হাত রাখল মেয়েটার উদরে। এই মেয়ের ঘুম খুব গাঢ় তা অজানা নয় মাহাদের। সেজন্য সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে ছাড়ছে না মাহাদ। মেয়েটা ঘুমিয়ে থাকায় তার জন্য ভালোই হলো। নয়তো এই মেয়ের ধারের কাছে যাওয়া যেত না, ছোঁয়া তো বহু দূর।

সূর্য রশ্মি চোখে বিঁধতে লাবণ্য চোখ মেলে চাইল। নিজেকে অন্য এক কামরায় দেখে প্রথমে হকচকালেও পরমুহূর্তে বুঝে উঠল সে মাহাদের রুমে আছে। লাবণ্য বিছানা ছাড়তে ছাড়তে এক পলকের জন্য মাহাদের দিকে তাকাতে ভুলল না। মাহাদ উল্টো ফিরে শুয়ে আছে। লাবণ্য গিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়াল। কাল রাতের কথা মনে হতেই সে বিব্রত বোধ করে। তার জেগে থাকা উচিত ছিল। আর সে কিনা পুরো রাত ঘুমিয়ে কাটিয়েছে। আর মাহাদও তাকে ডাকল না। লাবণ্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে আয়নায় দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। দোপাট্টা, গয়নাগাটি কিছুই নেই তার গায়ে। লাবণ্য কিছুটা অবাক হলেও বুঝতে অসুবিধা হলো না এই কাজ মাহাদের। মেয়েটা লাগেজ থেকে শাড়ি নিয়ে ওয়াশরুমে গেল। শাড়ি গায়ে জড়িয়ে বেরিয়ে এলো। ভেজা চুল শুকিয়ে মাথায় ঘোমটা টেনে বেরিয়ে গেল রুম থেকে। একবারের জন্যও মাহাদের দিকে তাকায়নি। লাবণ্য বাহিরে যেতেই দেখল বর্ণা এদিকেই আসছে। হয়তো তাকে ডাকার জন্যই এসেছে। লাবণ্যকে দেখেই বর্ণা একগাল হাসল। বিনিময়ে লাবণ্যও মৃদু হাসে।

– তোমাকে ডাকতেই এসেছিলাম। চলো নিচে যাই।

– সবাই উঠে গিয়েছে?

– হ্যাঁ। বাড়ির বাচ্চাগুলো বাদে বাদবাকি সবাই উঠে গিয়েছে।

– ওহ্।

– মাহাদ ওঠেনি?

– না, ঘুমাচ্ছে।

লাবণ্য আর বর্ণা দুজন একসাথেই নামল। সকলে তাকিয়ে দেখছে দুই জা কি সুন্দর হেসে হেসে কথা বলে হেঁটে আসছে। লাবণ্য নিচে গিয়ে সকলকে সালাম দিল। সুরভী আড়চোখে লাবণ্যর দিকে তাকিয়ে সালামের জবাব দেয়। বর্ণা লাবণ্যকে বলল,
– তুমি বসো। আমি নাস্তা বানাতে গেলাম।

– তোমাকে যেতে হবে না। আজকে নাস্তা লাবণ্য বানাবে।

শাশুড়ির কথায় বর্ণা পিছন ফিরে চাইল। লাবণ্য বানাবে মানে। মেয়েটা প্রথম দিনই নাস্তা বানাবে। তার শাশুড়ি বলছে এই কথা।

– ও বানাবে কেন? আমি বানিয়ে আনছি।

– আমি বলেছি সেজন্য। তুমি যাও, সৌভিককে ডেকে তোলো। আজ বাড়ির সবার জন্য লাবণ্য নাস্তা বানাবে।

– কিন্তু ও কি করে…

– কেন ও বানালে কী সমস্যা?

পরক্ষণে লাবণ্যর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
– কী লাবণ্য, পারবে না?

– জি পারব।

– তাহলে যাও।

লাবণ্য রান্নাঘরে চলে গেল। সবার জন্য কী বানাবে বুঝে উঠতে পারল না মেয়েটা। ড্রয়িংরুমে এক নজর তাকিয়ে দেখল দশ, পনেরোজনের মতো লোক বসে আছে। এত মানুষের জন্য তাকে একা নাস্তা বানাতে হবে। লাবণ্য কিছুটা বিপাকে পড়ল বৈ কি। মানুষ বেশি এতে তার সমস্যা নেই। সে একা হাতে পনেরো বিশজনের নাস্তা বানাতে পারবে। কিন্তু সমস্যা হলো সময় কম।‌ আসার আগে দেখেছিল ঘড়ির কাঁটা সাতটা পেরিয়েছে। এত অল্প সময়ে সবার জন্য নাস্তা বানাতে গেলে ঘণ্টাখানেক সময় লাগবে। লাবণ্য আর ভেবে সময় নষ্ট করল না। রান্নাঘরে খুঁজে আটার বয়াম বের করল। আটা গুলে রুটি বেলতে লাগল।‌ রুমালি রুটি বানাবে সে। এই রুটি একসাথে অনেকগুলো বেলা সম্ভব। এতে সময় কম লাগবে, ঝটপট নাস্তা বানানোও হয়ে যাবে। মেয়েটা রুটি ভাজতে ভাজতে দেখল মাঝারি সাইজের দুটো পাতিল রাখা নিচে। লাবণ্য ঢাকনা উঠিয়ে দেখল, একটাতে গোরুর গোশ আর অন্যটায় সবজি। গরম দিলেই হয়ে যাবে। কালকের বিয়ের অনুষ্ঠানের রান্নায় হয়তো রয়ে গিয়েছে। লাবণ্য স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। যাক তাকে রুটির সাথে অন্য কিছু বানাতে হবে না তাহলে। মেয়েটা একা হাতে পাতিল উপরে উঠানোর চেষ্টা করল। তবে পারল না। বেশ ভার পাতিল দুটো।

মাহাদ নিচে নেমে লাবণ্যকে কোথাও দেখল না, রুমেও নেই মেয়েটা। বর্ণা মেয়েকে কোলে নিয়ে তার শাশুড়ি মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। মাহাদকে দেখে সে মাহাদের কাছে এগিয়ে এলো। চাচ্চুকে দেখেই কোলের বাচ্চাটা চাচ্চুর কোলে যাওয়ার জন্য ছটফট করতে লাগল। মাহাদ এখনও বর্ণাকে দেখেনি। তার চোখ দুটো লাবণ্যকে খুঁজে চলেছে। মেয়েটা মুখ দিয়ে অস্ফুটে আ আ বু বু করছে। হাত বাড়িয়ে মাহাদের টি-শার্ট খামচে ধরল। এতেই মাহাদের ধ্যান ভাঙে। চট করে পিছন ফিরে চাইল। মাহাদকে তাকাতে দেখে মেয়েটা দু হাত বাড়িয়ে বলে উঠল,
– চাচ্চু তোলে।

– আমার বাচ্চাটা কোলে আসবে আমার?

মেয়েটা ঝটপট মাথা নাড়াতে লাগল। মাহাদ কোলে তুলে নেয়। গালে দুটো চুমু খেল, মেয়েটাও তার চাচ্চুকে আদর দিল। মাহাদ পিছনে ফিরে বর্ণাকে জিজ্ঞেস করল,
– লাবণ্য কোথায়?

– রান্নাঘরে।

– কী!

মাহাদ কিছুটা উচ্চস্বরে বলে উঠল। মাহাদকে এমন রিয়েক্ট করতে দেখে বর্ণা কিছুটা চাপা স্বরে বলল,
– আস্তে, বাড়ি ভর্তি মানুষ।

– ও রান্নাঘরে কী করছে?

– নাস্তা বানাচ্ছে।

– ওকে কেন বানাতে বললি?

– মা বলেছেন।

মাহাদ চুপ করে গেল। সে এখন মাকে গিয়ে এই নিয়ে প্রশ্ন করতে পারত, কেন লাবণ্যকে নাস্তা বানাতে বলল। কিন্তু মাহাদ এমনটা করবে না। সে জানে তার মা লাবণ্যকে মেনে নেয়নি। ইচ্ছে করেই মেয়েটাকে নাস্তা বানাতে বলেছে। এখন সে এই নিয়ে তার মাকে প্রশ্নবিদ্ধ করলে তার মা অযথা উল্টা পাল্টা ভেবে বসবে। ভাববে বিয়ে হতে না হতেই বউয়ের পক্ষ নিচ্ছে সে। এমন কিছু হোক মাহাদ তা চাইছে না। মাহাদ ড্রয়িংরুম পেরিয়ে রান্নাঘরে গেল। দেখল মেয়েটা কোমরে শাড়ির আঁচল গুঁজে রুটি ভাজতে ব্যস্ত। কপালে তার বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। আগুনের তাপে এমনটা হয়েছে। সামনের কিছু চুল কপালে লেপ্টে রয়েছে। মাহাদের ইচ্ছে করল মেয়েটাকে একটু ছুঁয়ে দিতে। মাহাদ যেন ঘোরে চলে গেল। কদম বাড়িয়ে এগিয়ে গেল লাবণ্যর দিকে।

লাবণ্য শাড়ির আঁচল দিয়ে কপালের ঘাম মুছে পিছন ফিরে মাহাদকে দেখে হকচকিয়ে গেল। নিজেকে সামলিয়ে বলল,
– কখন এসেছ?

লাবণ্যর কথা কর্ণগোচর হতে মাহাদের যেন হুঁশ ফিরে। কিছুটা গম্ভীর স্বরে বলল,
– মাত্রই।

– কিছু লাগবে তোমার?

– হ্যাঁ, ঐ পানি খাব।

বলেই হাসার চেষ্টা করল।

– আচ্ছা দাঁড়াও। পানি দিচ্ছি।

লাবণ্য পানি দিতে মাহাদ এক ঢোক গিলে গ্লাস রেখে দিল। তারপর লাবণ্যর পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বলল,
– কতক্ষণ লাগবে?

– এই তো শেষ। তুমি একটু হ্যাল্প করো তো মাহাদ ভাই।

ভাই, এই মেয়ে এখনও তাকে ভাই বলছে। মাহাদের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। কিছুটা হিসহিসিয়ে বলল,
– বলো কী করতে হবে?

লাবণ্য ফ্লোরে রাখা পাতিল দুটো দেখিয়ে বলল,
– একটু উপরে তুলে দিবে।

– ওকে নাও।

লাবণ্য হাত বাড়িয়ে কোলে নিতে চাইলে মেয়েটা আসলো না। টি-শার্ট খামচে ধরল মাহাদের। সে এখন চাচ্চুর কোল থেকে কিছুতেই নামবে না। লাবণ্য এগিয়ে এসে জোর করে নিতে চাইলে মেয়েটা হাত পা ছোড়াছুড়ি করতে লাগল।

– আমার মা, এমন করে না। কাকিয়ার কাছে যাও।

– দাব না।

– চাচ্চু আবার কোলে নিব। দেখো কাকিয়া বউ সেজেছে। তুমি না কালকে বউয়ের কোলে উঠার জন্য কাঁদছিলে, আজ যাবে না?

– না।

বলেই মেয়েটা মাহাদের ঘাড়ে মুখ গুঁজল। মাহাদ মৃদু হাসে। লাবণ্যকে ইশারা করল মেয়েটাকে নেওয়ার জন্য। জোর করে কোলে নিতে গিয়ে লাবণ্য অনেকটা সন্নিকটে চলে গেল মাহাদের। লাবণ্য আর মাহাদের শরীর ছুঁই ছুঁই। লাবণ্য ব্যালেন্স না রাখতে পেরে মাহাদের গায়ের উপর পড়ল। হঠাৎ এমন হওয়াতে দুজনেই হকচকিয়ে ওঠে। মাহাদ এক হাতে মেয়েটাকে আঁকড়ে ধরে। লাবণ্য দ্রুত সামলে নিল নিজেকে। বুক ঢিপঢিপ করছে তার। লাবণ্য মেয়েটাকে কোলে নিয়ে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে রইল। মাহাদের দিকে আর তাকাল না সে। মাহাদ পাতিল দুটো উঠিয়ে মেয়েটাকে নেয় লাবণ্যর কাছ থেকে। ড্রয়িংরুমে যেতে যেতে বলল,
– কাজ শেষ করে দ্রুত আসো।

লাবণ্য মাথা নাড়িয়ে সায় জানায়। গরম গরম রুটি, গোরুর গোশ আর সবজি নিয়ে টেবিলে রাখল। সকলে নতুন বউয়ের হাতে বানানো নাস্তা খেল। মেহমানদের মধ্যে অনেকেরই রুমালি রুটি এই প্রথম খাওয়া হয়েছে। লাবণ্যকে অনেকেই জিজ্ঞেস করছে এই রুটি সে কীভাবে বানিয়েছে, তাদের যেন শিখিয়ে দেয়।

দুপুরের রান্নাও লাবণ্য করেছে। যদিও এইবার একা হাতে তাকে কিছু করতে হয়নি। বর্ণাও হাত লাগিয়েছে। দুই জা মিলে রান্না শেষ করল। লাবণ্য দেখল মাহিরা কেমন মুখ ভার করে রেখেছে। সুরভী আর মাহিরা বাদে সকলেই স্বাভাবিকভাবে কথা বলছে তার সাথে। শাশুড়ির আচরণের কারণ জানলেও মাহিরার এমন তাকে এড়িয়ে চলার কারণ বুঝল না লাবণ্য। সুরভী আগে থেকেই তার সাথে অত কথা বলত না। তাকে যে খুব একটা পছন্দ করে না সুরভী তা লাবণ্যর অজানা নয়। কিন্তু মাহিরা এমন করছে কেন? তার আর মাহাদের বিয়ে ঠিক হওয়ার পর থেকেই দেখছে মাহিরা কেমন যেন তাকে এড়িয়ে চলে। প্রথমে আমলে না নিলেও এখন বেশ ভাবাচ্ছে লাবণ্যকে। মাহাদের সাথে তার বিয়ে হওয়াতে মাহিরা কী কোনোভাবে তার শাশুড়ির মতো অসন্তুষ্ট? না কি অন্য কোন কারণ আছে?

লাবণ্য বারান্দায় বসে আছে। মাহাদ গিয়েছে আড়াইল্লার বাজার করতে। নতুন জামাই প্রথমবার শ্বশুর বাড়িতে গেলে বাজার করে নিতে হয়। সেজন্য বাবা, ভাইয়ের সাথে বাজারে গিয়েছে সে। যদিও সকলে বলেছিল মাহাদের যাওয়ার দরকার নেই। সৌভিক আর তার বাবা এনে দিবে সব, তবুও মাহাদ একপ্রকার জোর করেই গেল। লাবণ্য বিষণ্ণ মনে বসে আছে। মাহাদ যে এত কিছু করছে ও বাড়ি থেকে কি আদৌ কেউ আসবে তাদের নিতে? এমন প্রশ্ন সারা সকাল থেকে তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। লাবণ্য নিশ্চিত ও বাড়ির কেউ আসবে না। কেউ না এলে মানুষের কানাঘুষার শেষ হবে না। এমনিতেই হুট করে তাদের বিয়ে হওয়াতে লোকে হাজার কথা বলে বেড়াচ্ছে। তার মধ্যে কাল বিয়েতে নাওয়াজ লাপাত্তা ছিল। সবকিছু মিলিয়ে এলাকার আলোচনায় নাওয়াজ আর মাহাদের পরিবার। এর মধ্যে কেউ নিতে না এলে লোকে কথা শোনাতে ছাড়বে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here