#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_৬৬
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা
বউ শাশুড়ি মিলে মাছ কাটছে। সকাল সকাল নাওয়াজ বাজার থেকে ছোটো মাছ নিয়ে এসেছে। পাঁচ মিশালি মাছ সব। পুঁটি, টেংরা, শিং, গুতুম, কই, বাইমসহ প্রায় সব মাছই আছে। এসব ছোটো মাছ খেতে স্বাদ লাগলেও কাটাকাটি বেশ ঝামেলার। বিশেষ করে মলা, ঢেলা মাছ। আভিরা হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে কপালে পড়ে থাকা চুল সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে বারংবারই অসফল হচ্ছে সে। মেজাজ খারাপ হলো মেয়েটার। এই চুলগুলো বেশ জ্বালাতন করছে। আভিরা ভেবেই নিল মুখের উপর হুটহাট পড়া এই চুলগুলো কেটে ফেলবে সে। মাছ কেটে উঠে দাঁড়াল আভিরা। কোমর ধরে গিয়েছে তার। ঠোঁট ফুলিয়ে নিঃশ্বাস ফেলে মেয়েটা। বাইরে লাগানো ট্যাপ ছেড়ে মাছগুলো ভালোভাবে ধুয়ে নিল। বাড়ির আঙিনায় মাছ কাটতে বসেছিল। নয়তো বাড়ির ভিতরে মাছ কাটলে পরে গন্ধ যাবে না। আভিরা মাছগুলো ফ্রিজে রেখে রুমে গেল। আলমারি থেকে জামা নিয়ে গোসল সেরে বের হলো সে। ফ্যানের বাতাসে চুল শুকিয়ে আঁচড়িয়ে নিল। মাথায় ওড়না দিয়ে মেয়েটা রুম থেকে বের হলো। তার মা আর শাশুড়ি বসে কী যেন বলছে। আভিরাকে দেখে দুজন নিজেদের মধ্যে চলতে থাকা কথার ইতি টানে। আভিরা দরজায় দাঁড়িয়ে ভিতরে থাকা রমণীদের উদ্দেশ্য করে বলল,
– মা তোমরাও চলো।
– জিদান আর জ্যোতি কোথায়?
– ভাইয়া তো বাড়িতে নেই। জ্যোতি আমার রুমে।
– ওদের দুজনকে সঙ্গে নিয়ে যাও।
শাশুড়ির এমন থমথমে স্বরের বিপরীতে আভিরা সামান্য মাথা নেড়ে সায় জানায়। শাশুড়ির সাথে কথা বলতে ভয় লাগে আভিরার, না জানি কখন তার কোন কথায় রেগে যায়। আভিরা জ্যোতিকে নিয়ে মাহাদদের বাড়িতে গেল।এভাবে যেতে তার মোটেও ভালো লাগছে না। আভিরা বিমর্ষ মুখে মাহাদদের হলরুমে বসে আছে। তার সামনে সুরভী বসে আছে। হাতে তার পানের কৌটা। চুন, জর্দা, সুপারি যা যা লাগে সব নিয়ে বসেছে। সুরভীর বিয়ের পরপরই এমন পান খাওয়ার অভ্যাস হয়। সে অভ্যাস আজও ছাড়তে পারেনি সুরভী। পান খেয়ে ঠোঁট দুটো লাল করে রাখবে।
– মাহাদ ওর বাবার সাথে বাজারে গিয়েছে। তোমরা লাবণ্যর রুমে গিয়ে বসো।
– আচ্ছা।
বলে আভিরা উঠে গেল। জ্যোতির সাথে আভিরা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠল। সে ভেবেছিল সুরভী হয়তো তাকে দেখেই প্রশ্ন করবে, তুমি একা এলে যে? ইয়াজমীন আসেনি? তখন কী জবাব দিবে এই ভেবেই মেয়েটার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে আসে। কিন্তু সুরভী এমন কিছু জানতে চাইল না।
দরজায় কড়া নাড়ে আভিরা। ভিতর থেকে লাগানো না, হালকা ভিড়ানো। তবুও মেয়েটা কড়া নাড়ল। ভিতর থেকে লাবণ্যর কণ্ঠস্বর ভেসে আসে।
– কে?
– আপু আমি।
– ওহ্ আভিরা, ভিতরে এসো।
আভিরা চপল পায়ে রুমে গেল। ভিতরে গিয়ে দেখল লাবণ্য রুমে নেই। এদিক ওদিক চোখ ঘুরিয়ে লাবণ্যকে খুঁজল আভিরা। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো লাবণ্য। তার মুখশ্রী আগের মতোই, মুখের দিকে তাকিয়ে তার অবস্থা ঠাহর করা সম্ভব নয়। লাবণ্য এক পলক আভিরাকে দেখেই নজর ফিরিয়ে নেয়। তোয়ালে দিয়ে ভেজা হাত, মুখ মুছতে ব্যস্ত সে। আভিরা অনেকটা সময় ধরে লাবণ্যকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। লাবণ্যর মুখের ভাবভঙ্গি খুব স্বাভাবিক। তাদের দিকে তার খেয়াল নেই। সে হাত, মুখ মুছে চুলে চিরুনি চালায়। কোমর ছাড়িয়ে পড়া চুলগুলো মুঠোবন্দি করে হাত খোঁপা করে নিল। লাবণ্যর এই ঘন দীঘল কেশ আভিরা চেয়ে দেখে। জ্যোতিও হা করে চেয়ে আছে। তার চুল অত বড়ো না, কোনোরকম কাঁধ এর নিচে। অবশ্য আভিরার চুল কোমর অবধি পড়ে। কিন্তু এত মোটা খোঁপা আভিরার চুলে হয় না। তার চুল হালকা কোঁকড়ানো, ঘনও বেশ। কিন্তু লাবণ্যর চুলের মতো না লম্বা আর না এমন মোটা খোঁপা হয় আভিরার চুল। জ্যোতির বড়ো চুল পছন্দ না। কাঁধ অবধি যেতেই কেচি চালিয়ে ঘ্যাচঘ্যাচ করে কেটে দেয়। আবার কখনো চুল বড়ো হতে দেয়। সব তার ইচ্ছের উপর নির্ভর করে। অদ্ভুত সব ইচ্ছে জ্যোতির। মুখ ফুটে যখন নিজের ইচ্ছে অনিচ্ছের জানান দিতে পারে না তখন সব রাগ নিরীহ চুলের উপর দেখায়। মুঠোয় নিয়ে ঘ্যাচঘ্যাচ করে কেটে ফেলে। এই তো তার চুল কাঁধ পেরিয়েছে। ভেবেছিল ঢাকা ফিরিয়েই চুল কেটে কাঁধ সমান করে ফেলবে। কিন্তু লাবণ্যর এমন দীঘল কেশ দেখে নিজের মনোভাব পাল্টে নেয় মুহূর্তে।
জ্যোতির চোখ জোড়া জ্যোতির ন্যায় জ্বলজ্বল করছে। কারো চুল এত সুন্দর হয়? এমন প্রশ্ন মনে খেলে গেল। সে উচ্ছ্বসিত হয়ে লাবণ্যর কাছে গেল। হলবলিয়ে বলল,
– আপু আমি একটু তোমার চুল ছুঁয়ে দেখব? তুমি কি রাগ করবে?
জ্যোতির কণ্ঠে কেমন অস্থিরতা। যেন তার তর সইছে না ছুঁয়ে দেখার জন্য। কেমন উত্তেজনা বিরাজ করছে তার মাঝে, হাত কাঁপছে খানিকটা। লাবণ্য আয়নায় সবটাই দেখল। জ্যোতিকে হঠাৎ তার পাগল মনে হচ্ছে। নয়তো এই মেয়ে এমন অস্বাভাবিক আচরণ করছে কেন? লাবণ্য আয়না থেকে দৃষ্টি সরিয়ে খানিকটা ধীর স্বরে বলল,
– না।
লাবণ্যর না বলতে দেরি তো জ্যোতির হাত বাড়াতে দেরি হলো না। মুহূর্তেই হাত গলিয়ে দিল ঘন কালো কেশে। তবে এভাবে ছুঁয়ে সে যেন বিরক্ত বোধ করছে। চোখে মুখে ফুটে উঠল তা। নাক মুখ কুঁচকে চুল ছুঁয়ে দিতে লাগল। তারপর হুট করে খোঁপা খুলে দিল। ঝলমলে সিল্কি চুল পিঠ ছাড়িয়ে ফ্লোরে গিয়ে ঠেকল। বিস্ময়ে পুনর্বার ঠোঁট দুটো কিঞ্চিত ফাঁকা হয়ে এলো জ্যোতির। ইশ্ এত সুন্দর কেন লাবণ্য আপুর চুল। এইটাই ভেবে পাচ্ছে না জ্যোতি। চুলগুলো ছুঁয়ে মনে হচ্ছে সে কোনো তুলো ছুঁয়ে দিচ্ছে, কেমন ঘ্রাণ ছড়িয়ে ঘরময়। লাবণ্য আজ শ্যাম্পু করেছে বোধহয়। কেমন সুঘ্রাণ নাকে ঠেকছে জ্যোতির। লাবণ্য কোন শ্যাম্পু চুলে দেয় সে জিজ্ঞেস করবে কি? জিজ্ঞেস করলে কি লাবণ্য আপু রাগ করবে? সে লাবণ্য আপুকে কখনো কথা বলতে দেখে না। কেমন যেন গম্ভীর হয়ে থাকে সর্বক্ষণ। সেজন্য প্রশ্ন করতে দোটানায় পড়ছে।
জ্যোতি চুলে হাত রেখেই বলল,
– আপু তোমার চুল এত সুন্দর কেন? উফ্ আমি তো পাগল হয়ে যাব!
জ্যোতির চোখে মুগ্ধতার ছাপ! চোখ দুটো এখনও চিকচিক করছে। সামান্য চুল দেখে কেউ এত উৎফুল্ল কি করে হয়। এমন মুগ্ধ হয়ে দেখার কী আছে? মেয়েটা মুগ্ধ হয়ে দেখছেই না শুধু, পাগলামিও করছে। লাবণ্য জ্যোতির চুল দেখল। ব্রাউন কালারের চুলগুলো কাঁধের খানিকটা নিচে পড়ে আছে। ঘন, সিল্কি চুল। তার চুলের থেকেও এই মেয়ের চুল বেশি সুন্দর। অথচ এই মেয়ে তার চুল নিয়ে মেতে আছে। এমন করছে যেন লম্বা চুল আগে কখনো দেখা হয়নি। এই প্রথম দেখল, আর তাতেই মুগ্ধতার রেশ কাটছে না।
– আমি আঁচড়িয়ে দেই।
বলতে বলতে মেয়েটা চিরুনি হাতে নেয়। কাঠের চিরুনি দেখে আরও আশ্চর্য হলো। জ্যোতি খুব ধীরে আঁচড়ে দিতে লাগল লাবণ্যর চুল। অথচ খানিক আগেই লাবণ্য চুল আঁচড়িয়েছে, খোঁপাও বেঁধে ছিল। আর এই মেয়ে তার খোঁপা বাঁধা সেই চুল খুলে আঁচড়াতে ব্যস্ত। লাবণ্যর মনে হলো জ্যোতির মাথায় সত্যি সত্যি সমস্যা আছে। এমন চঞ্চলতা তার পছন্দ না, তার চুলে কারো হাত দেওয়াটাও অপছন্দ। তবে অদ্ভুত হলেও আজ তার রাগ লাগছে না, বরং জ্যোতির কাণ্ড দেখে হাসতে ইচ্ছে করছে। এত বড়ো মেয়ে অথচ বাচ্চাদের মতো করছে। এমন বাচ্চামো কেউ করে।
– দাঁড়ান আমি খোঁপা বেঁধে দেই।
কয়েকবার চেষ্টা করেও মেয়েটা অসফল হলো। ঠোঁট উল্টে অসহায় চোখে তাকিয়ে থাকল হাতের মুঠোয় থাকা চুলের দিকে। লাবণ্য আপু নিশ্চয় রেগে যাবে এখন। ইশ্ সে এমন পাগলামি করতে গেল কেন? এখন যে খোঁপা বাঁধতে পারছে না। জ্যোতি চশমা ঠেলে কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল,
– আমি তো খোঁপা বাঁধতে পারছি না।
লাবণ্য হঠাৎ উচ্চস্বরে হেসে উঠল। ঠোঁট দুটো প্রসারিত হওয়ায় তার গজ দাঁত দৃশ্যমান। জ্যোতির মুগ্ধতার রেশ এবার আভিরার চোখে পরিলক্ষিত। মেয়েটা অবাক হয়ে লাবণ্যর হাসি দেখছে। তার শাশুড়িও এমন অমায়িকভাবে হাসে। লাবণ্য যেন অবিকল ইয়াজমীনের মতোই হাসছে। লাবণ্য ইয়াজমীনের সব গুণ পেয়েছে। এই হাসিই তার প্রমাণ। আভিরার চোখে মুখে মুগ্ধতার ছড়াছড়ি। অবিশ্বাস্য হলেও আভিরা এই প্রথম লাবণ্যকে এভাবে হাসতে দেখল। লাবণ্য তো সর্বদা তাকে এড়িয়ে চলত। লাবণ্যর হাসি সেজন্য দেখা হয়ে ওঠেনি। আভিরার কাছে হঠাৎ লাবণ্যকে অদ্ভুত সুন্দর লাগল। বেগুনি রঙের সুতির শাড়ি লাবণ্যর গায়ে। বেগুনি রঙটা যেন লাবণ্যর গায়ে চমৎকার মানায়। সৌন্দর্যও ফুটে উঠে পরিস্ফুট ফুলের ন্যায়। সাদা বেগুনি রঙের ব্লাউজের সাথে এক রঙা বেগুনি শাড়ি, জারুল ফুলের ন্যায় লাগছে লাবণ্যকে!
– কী নিয়ে এত হাসাহাসি চলছে?
পুরুষালি কণ্ঠ কানে আসতে লাবণ্যর মুখের হাসি বিলীন হয়ে গেল। চোয়াল শক্ত করে সামনে দৃষ্টিপাত করে। দেখল দরজায় হেলান দিয়ে মাহাদ দাঁড়িয়ে। তার মুখে অমায়িক হাসি। চোখ ছোটো ছোটো করে ঠোঁট এলিয়ে হাসছে সে। মাহাদকে দেখে আভিরা মাথায় ওড়না টেনে সালাম দিল। জ্যোতিও ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করল।
– ভাবি না বসে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?
আভিরা লজ্জা পেল। মাহাদ সচরাচর সম্বোধন ছাড়াই কথা বলে তার সাথে। এমন সরাসরি ভাবি বলাতে দৃষ্টি নত হলো তার। মৃদু স্বরে বলল,
– সমস্যা নেই।
– সমস্যা নেই বললে তো চলবে না। এই প্রথম আমার রুমে এলেন, এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে আমার খারাপ লাগবে।
আভিরা খাটের এক কোণায় জড়োসড়ো হয়ে বসল। জ্যোতির দিকে তাকিয়ে মাহাদ ঠোঁট কামড়ে বলল,
– কী ব্যাপার, তোমাকে কী আলাদাভাবে বসার কথা বলতে হবে?
জ্যোতি সামান্য হকচকিয়ে দ্রুত বসে বলল,
– না না।
মাহাদ বেশ শব্দ করে হেসে উঠল। তিন রমণী কেমন অস্বস্তিতে পড়ে তার এমন হাসিতে। লাবণ্যর গায়ে কাঁটা দেয়। দাঁতে দাঁত বসে রইল সে। মাহাদ ওয়াশরুমে যেতে যেতে বলল,
– আমাদের নিতে এসেছেন বুঝি? পাঁচ মিনিট সময় দিন, ফ্রেশ হয়ে আসছি।
পাঁচ মিনিটের জায়গায় পনেরো মিনিট অপেক্ষায় রাখল রমণীদের। আভিরা এই প্রথম মাহাদের রুমে এসেছে। এ বাড়িতে আসা হলেও মাহাদের রুমে কখনো আসা হয়নি তার। হালকা কমলা রঙের প্রলেপ চার দেয়ালে। হলুদ, কমলা এই রঙগুলো আভিরার বেশ অপছন্দের। অনেকে আবার গাঢ় সবুজ রঙের প্রলেপ দিয়ে থাকে দেয়ালে। আভিরার বেশ বিরক্ত লাগে। তবে এই ঘরের দেয়ালে কমলা রঙ দেখে আভিরার অসহ্য রকমের রাগ লাগল না। হালকা কমলা রঙের সাথে স্বচ্ছ পর্দা ঝুলানো। দেখতে বেশ লাগছে। বিছানার চাদরও কমলা রঙের। আভিরা এতক্ষণ খেয়াল করেনি। তার মনে প্রশ্ন জাগল, মাহাদ ভাইয়ার কি কমলা রঙ পছন্দ? অথচ কমলা রঙ মাহাদের ভারি অপছন্দের। তবুও তার ঘর জুড়ে কমলা রঙের ছড়াছড়ি। দেয়াল থেকে শুরু করে মেঝেতে থাকা পাপশ অবধি কমলা রঙের। দেয়ালে টাঙানো ওয়ালম্যাটেও কমলা রঙ ছড়িয়ে। আভিরা বিস্মিত হলো বেশ। তবে অপছন্দের রঙটা দেখতে খারাপ লাগছে না।
ঘরের কোণায় কোণায় অপছন্দের রঙে কেউ রাঙিয়ে রাখে? তবে প্রিয় নারীর পছন্দের হলে সে ভিন্ন কথা। সবার অপছন্দের এ রঙটাই অদ্ভুতভাবে লাবণ্যর বেশ পছন্দের। নিজ রমণীর পছন্দের রঙ যদি তার গৃহে শোভা মণ্ডিত না থাকে তাহলে রমণীর সাথে অন্যায় হয়ে যাবে। মাহাদ এমন অন্যায় কেমন করে করবে? সেজন্য বছর কয়েক আগে সাদা দেয়াল জুড়ে কমলা রঙের আস্তরণ ফলায়। সুরভী এই রঙ দেখে ক্ষেপে ছিল বেশ। পুরো এক সপ্তাহ কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করেছিল। মায়ের রাগের কথা মনে হতেই মাহাদ ভাবল মায়ের সাথে দেখা করা উচিত। লাবণ্যকে বিয়ে করার জন্য বাড়িতে বেশ হাঙ্গামা করেছে সে। সবাই রাজি থাকার পরও মায়ের আপত্তিতে নিজেকে ঠিক রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল তার পক্ষে। নিজের এমন রগচটা আচরণে মাহাদ বেশ বিরক্ত। মা তার ভালোবাসার বিশাল জায়গা জুড়ে। মাকে দুঃখ দিয়ে এভাবে বিয়ে করতে চায়নি সে। সে ভেবেছিল তার মা হাসিমুখে মত দিয়ে দিবে। কারণ লাবণ্যকে বেশ স্নেহ করে সুরভী। কিন্তু মা যে লাবণ্যকে বিয়ে করা নিয়ে এমন অসম্মতি জানান দিবে তা সে ভাবেনি। লাবণ্যর এতিম হওয়াতে তাকে বাড়ির বউ করতে আপত্তি জানাচ্ছে শুনে মাহাদ ভয়ঙ্কর রেগে গিয়েছিল। কাঁচের টি টেবিলটা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল সে। রেগে গেলে সে নিজের মধ্যে থাকে না। সেজন্য রাগ সামলাতে না পেরে টি টেবিল ভেঙে দিয়েছিল। এই টি টেবিল তার মায়ের অনেক পছন্দের ছিল। ভাবতেই মাহাদের মুখ গম্ভীর হয়ে আসে। ভাবল ও বাড়ি থেকে ফিরেই সে মায়ের জন্য একটা টি টেবিল এনে দিবে। সেইম তো সেইম, ঠিক আগেরটার মতো। মা নিশ্চয় রেগে থাকবে না তখন। তার মা উপরে উপরে যতটা কঠোরতা দেখায় ভিতরে ভিতরে ঠিক ততটাই নরম। তবে মা যে লাবণ্যকে এত সহজে মেনে নিবে না এও জানা আছে মাহাদের।
_
লাবণ্যর চোখ দুটো যেন ব্যাকুল হয়ে কাউকে খুঁজে চলেছে। কাতর চোখে সে সিঁড়ির বরাবর থাকা বন্ধ রুমের দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখে জল ছলছল করছে না, দৃষ্টিও স্বাভাবিক। তবুও যেন কেমন কাতরতার ছাপ। আভিরা লাবণ্যর চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে জায়গা ত্যাগ করে সে। তেমন অভিব্যক্তি দেখায় না। যেন দেখেও না দেখার ভাব স্পষ্টতই। ট্রে হাতে ফিরে এলো মেয়েটা। ওড়না দিয়ে মাথা প্যাঁচানো তার। শুধু মুখশ্রী দৃশ্যমান। লম্বা হাতার জামা পরেছে সে। বেশ ঢিলেঢালা। আভিরার স্বাস্থ্য বেড়েছে অনেকটা, সৌন্দর্যও চোখে পড়ার মতো। গায়ের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি পেয়েছে আগের তুলনায়। গৌর গায়ের আবরণে লাল রঙটা ফুটে উঠেছে। সৌন্দর্যে যেন মেয়েটা অনন্য।
আভিরা ভারী ট্রে রাখল টি টেবিলে। লাবণ্য মাহাদের কেউই হাত ছোঁয়ায় না তাতে। লাবণ্যর দৃষ্টি নিচে নিবদ্ধ হলেও মাহাদ এদিক সেদিক তাকিয়ে উপরে উঠে গেল। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে দরাজ গলায় জিজ্ঞেস করল,
– নাওয়াজ কোথায়?
আভিরা বুঝল এই প্রশ্ন তার উদ্দেশ্যেই করা। ধীর স্বরে বলল,
– উনি একটু বাহিরে গিয়েছেন।
– দ্রুত ফোন করে আসতে বলুন। কোনোরকম অজুহাত দেখালে ঐ শালার একদিন কি আমার একদিন।
প্রথম কথাটা গম্ভীর শোনালেও পরের কথায় না চাইতেও হেসে উঠল আভিরা। লাবণ্য দেখল হাসির দরুন আভিরার ফুলো ফুলো গাল দুটো আরও ফুলে গিয়েছে। আভিরা হাসলে বাম পাশের গালে গর্তের দেখা মিলে। অদ্ভুত লাস্যময়ী এই কন্যা। উচ্চতায় এই মেয়ে টেনেটুনে পাঁচ ফুট হবে হয়তো। তবে সৌন্দর্যের কাছে মেয়েটার এই কমতি কেমন চাপা পড়ে যায়। বরং এই মেয়ের সৌন্দর্যে সকলের চোখ ঝলসে যাওয়ার জো। খোদা তায়ালার নিখুঁত সৃষ্টি যেন আভিরা।
দরজায় কড়া নাড়তে ভিতর থেকে ইয়াজমীনের গলার স্বর ভেসে আসে।
– ওরা এসে গিয়েছে?
অপর পাশ থেকে জবাব না পেয়ে ইয়াজমীনের কপালে ভাঁজ পড়ে। বিছানা ছেড়ে বন্ধ ঘরের দোর খুলে দিলেন তিনি। মাহাদকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠে বললেন,
– তুই? আমি ভেবেছিলাম আভিরা হয়তো।
মাহাদ ইয়াজমীনের খাটে বেশ আয়েশ করে শুয়ে পড়ল। দু হাত মাথার নিচে রেখে পা দুটো হেলিয়ে দিয়েছে। গমগমে স্বরে বলে উঠল,
– বাড়িতে জামাই এসেছে, আর তুমি ঘরের দরজা আটকে বসে আছো।
ইয়াজমীন কিছু বলল না। চাপা ক্ষোভে ওনার মুখশ্রী কঠিন হয়ে আসে, শ্বাস প্রশ্বাসের বেগতিক দশা।
মাহাদ হঠাৎ চোখ বুজে থেকে বলে উঠল,
– মায়েদের মন হয় নরম। তাদের এমন কঠিন হতে নেই। হলেও প্রকাশ্যে আনতে নেই তা। যেখানে কাঠিন্যতা প্রকাশ করতে হয় না সেখানে ঘৃণা করাটা ঠিক খাটে না। ঠিক বলেছি তো খালা শাশুড়ি?
বলেই ছেলেটা চট করে দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এলো। গলা ছেড়ে বলে উঠল,
– আরেকবার দরজা বন্ধ করে রাখলে তোমাকে আর তোমার ছেলেকে আমি দেখে নিব খালা শাশুড়ি। অসভ্যটা উধাও হয়ে গিয়েছে। কী ভেবেছে, মাঝ রাতে বাড়ি ফিরলে কেউ বুঝতে পারবে না। দিনের মতো রাতেও উধাও থাকে না কেন? ওহ হো রাতে উধাও থাকবে কী করে? ঘরে বউ আছে না, রাতের বেলা তো আসতেই হবে।
শেষের কথাগুলো বিড়বিড় করে বলল মাহাদ। চাপা স্বরে হিসহিসিয়ে নাওয়াজকে বিশ্রী গালি দিল কয়েকটা। সে নিচে যেতেই দেখল ইয়াজমীনও তার পিছন পিছন নেমে এসেছে। মাহাদ ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসল। লাবণ্য ইয়াজমীনকে দেখেই মাথা নামিয়ে ফেলেছে। অসম্ভব ভাবে শরীর কেঁপে উঠল তার। চোখে জল জমতে লাগল। লাবণ্য বার কয়েক শ্বাস টানে। মনে হচ্ছে, শ্বাস ফেলা দুষ্কর হয়ে পড়েছে। দরদর করে শরীর ঘামতে লাগে তার। কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ল। লাবণ্যর শরীর জমে যায়। শাড়ির আঁচল দিয়ে গলার ধারে ঘাম মুছে নেওয়ার প্রয়াস চালায়। ব্যর্থ হলো সে। হাত দুটো কম্পনরত। কাঁপা হাতে মাহাদের হাত চেপে ধরল। নিভু নিভু চোখে অস্পষ্টভাবে ধরা দিল মাহাদের আতঙ্কিত চেহারা!

