#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_৬৭
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা
অন্ধকারে আচ্ছন্ন কামরা। সিলিং এ ঝুলন্ত বৈদ্যুতিক পাখা ঘুরে চলেছে অনবরত। কক্ষ জুড়ে শীতল ভাব। রাস্তায় লাগোয়া বাল্বের আলো অন্ধকারে মুদে থাকা রুমটিতে আলো ছড়াতে ব্যর্থকাম। ফোঁটায় ফোঁটায় বৃষ্টি নিজ ছন্দে আসমান থেকে জমিনে পতিত হচ্ছে। শ্রাবণের শেষ বৃষ্টি। তোড়জোড় ছাড়াই বর্ষিত হচ্ছে। গগণ চুঁইয়ে গড়িয়ে পড়া বৃষ্টির পানি ভিজিয়ে দিচ্ছে জমিনে থাকা সবুজ ঘাসের পাতা। শুকনো মাটি বৃষ্টির পানিতে একটু একটু করে ভিজে চলেছে। মাটির কালচে সাদাটে ভাব পাল্টে ছেয়ে যাচ্ছে কালো রঙে। শক্ত শুকনো মাটির দলা ভিজে রূপায়িত হচ্ছে নরম ভেজা মাটির দলাতে। আকাশে থাকা চাঁদটাও দেখা যাচ্ছে আবছা আবছা। যেন ক্ষণিকের মধ্যে তলিয়ে যাবে নিকষ কালো আঁধারে। প্রকৃতি যেন আজ বেজায় বেজার। তাই তো শান্ত রূপ বদলিয়ে ধ্বংসলীলায় মত্ত। প্রবলতর হলো বাহিরে বহমান বাতাসের বেগ। শুকনো পাতা উড়ে চলেছে বাতাসের সহিত। ধুলোবালি কুণ্ডলি পাকিয়ে ঝড়ো হাওয়া প্রবাহিত।
বিছানায় শায়িত রমণী নড়েচড়ে উঠে এবার। হালকা পবন এসে গা ছুঁয়ে দেয়। শীত শীত লাগছে। কুঁকড়ে উঠে কাথা টেনে গা ঢাকার প্রয়াস চালায়। হাতড়েও কাথার নাগাল পেল না। বোধহয় ধারের কাছে কোথাও কাথা নেই। শরীর গুটিয়ে ওড়না মেলে ঘুমে তলিয়ে যায় ফের। দেখা হলো না কেউ সযত্নে তার গায়ে কাথা টেনে দিতে ব্যস্ত। মাহাদ লাবণ্যর গায়ে কাথা টেনে বিছানা ছাড়ে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে ঝড়ো হাওয়া অবলোকন করল মিনিট দুয়েক। পকেট থেকে ফোন বের করে ডায়াল করল নাওয়াজের নাম্বারে। সাথে সাথে কল রিসিভ হয়। দুপ্রান্তের দুজনই মৌন। যেন তারা নীরব থাকার প্রতিজ্ঞা বদ্ধ। নীরবতা ভাঙে নাওয়াজের কণ্ঠে।
– ড্রাইভিং করছি। কিছু বলার থাকলে বল। নয়তো ফোন রাখ।
মাহাদ আজ রেগে গেল না। শান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
– কতক্ষণ লাগবে?
– এই তো বাড়ির কাছাকাছি, দশ মিনিট লাগবে।
– আচ্ছা। জলদি আয়। অপেক্ষায় আছি।
বলেই মাহাদ কল কেটে দেয়। নজর দিল তমসায় তলিয়ে থাকা ঘুটঘুটে কালচে আকাশে। ভারী বর্ষণের ফলে আকাশ দেখার জো নেই। তবুও মাহাদের তীক্ষ্ণ চোখ দুটো ঝড় বৃষ্টি ভেদ করে আকাশ দেখার অভিলাষে প্রয়াসরত। বৃষ্টির মাঝে অস্পষ্টত দেখা মিলে কাকভেজা এক মানব দেহ। যে আঙিনা পেরিয়ে একছুটে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করেছে। নাওয়াজ ভিতরে আসতে মাহাদ নিচে গেল। মাহাদকে দেখে নাওয়াজের কদম থামে। ভেজা শার্ট, প্যান্ট গায়ে থাকা অবস্থায় সোফায় দখলদারি করে। গায়ে থাকা পানি সোফা ভেজাতে শুরু করল। নাওয়াজ গা এলিয়ে দিল। কপাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে বর্ষণের জল। ভেজা হাত দিয়ে ঝেড়ে মাথার পানি ফেলে নাওয়াজ। মাথা উঠিয়ে এক নজর চাইল মাহাদের দিকে। মাহাদকে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলল,
– কী হয়েছে? দাঁড়িয়ে আছিস কেন?
মাহাদ কিছু না বলে নাওয়াজের পাশে বসল। ছেলেটা তখনও নিশ্চুপ। মাহাদের তো এমন নীরব থাকার কথা না। এই যে দুদিন ধরে উধাও ছিল, তাকে পেয়েই তো রাগ দেখানোর কথা। তবে এমন নিশ্চুপ কেন?
– কী হয়েছে তোর?
– তোর বোন আমাকে শান্তি দিচ্ছে না।
লাবণ্যর কথা উঠতে নাওয়াজের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। থমথমে মুখ করে চোখ বুজে সোফায় মাথা হেলায়। মেয়েটা কী করেছে জানার আগ্রহ দেখা গেল না তার মাঝে। ইট সিমেন্টের আস্তরণ দেওয়া দালান হওয়ায় বর্ষণের প্রকোপ অলক্ষণীয়। তবে শো শো বাতাসের শব্দ জানান দিচ্ছে কী তীব্র পরিমাণে বর্ষিত হচ্ছে মেঘমালার বারিদ। বাতাসের সাথে মটমট করে ডালপালা ভাঙার জোরালো আওয়াজ! ঝড়ের প্রকোপে গাছের ডাল ভেঙে চলেছে। বিকট শব্দে ধারে কাছে কোথাও বাজ পড়ল বোধহয়। মুহূর্তেই অন্ধকারে তলিয়ে গেল সর্বত্র। মাহাদ দ্রুত ফোনের ফ্ল্যাশ দেয়।
নাওয়াজ হঠাৎ জানতে চাইল,
– কী করেছে?
– প্যানিক অ্যাটাক!
নাওয়াজ ভ্রু কুঁচকে নেয়। থমথমে গলায় বলল,
– মানে?
– জানি না। বিকেলে হঠাৎ করে জ্ঞান হারাল। অবস্থা যা দেখলাম; প্যানিক অ্যাটাক করেছে সম্ভবত।
– ওহ্।
নাওয়াজের কণ্ঠে কেমন দায়সারা ভাব। এমন একটা কথা শুনে স্বাভাবিক থাকার কথা নয়। লাবণ্যর ব্যাপারে নাওয়াজের এমন নিরুত্তর মনোভাব দেখে খুব একটা অবাক হলো না মাহাদ। যেন এমনটা হওয়ারই ছিল। মেয়েটা নিজ দোষে স্নেহের জায়গা হারিয়েছে। নাওয়াজ উপরে উঠতে উঠতে বলল,
– লাবণ্য রুমে একা আছে, ওর কাছে যা।
মাহাদ নিঃশব্দে ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসল। নাওয়াজ উপরে উপরে যতই কাঠিন্যতা দেখাক না কেন, বোনের ব্যাপারে ছেলেটা কতটা উদ্বিগ্ন তা অজানা নয় মাহাদের। মাহাদ আর দাঁড়িয়ে রইল না। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল।
নাওয়াজের বিচলিত চোখের দৃষ্টি রুমের এদিক সেদিক। আভিরার দেখা নেই কোথাও। মেয়েটা গেল কোথায়? নাওয়াজ ভ্রুকুটি করে। এই মেয়েটা এমন হুটহাট কোথায় চলে যায় বুঝে আসে না নাওয়াজের। ভেজা শার্ট, প্যান্ট ছেড়ে টি-শার্ট, টাউজার গায়ে গলিয়ে নেয় নাওয়াজ। মাথাটা ধরেছে। এক কাপ কফি প্রয়োজন তার। নাওয়াজ দু হাতে মাথা চেপে ধরল। অস্পষ্ট স্বরে আভিরার নাম ধরে ডাকল কয়েকবার। মেয়েটার খুঁজে তৎপর উঠে দাঁড়াল নাওয়াজ। একে একে দেখে নিল খোলা অলিন্দ, ওয়াশরুম, মায়ের বন্ধ ঘর। আভিরা কোথায় গেল নাওয়াজের বুঝে এলো না। মায়ের ঘরের বন্ধ দরজায় কড়া নাড়তে গিয়েও ছেলেটা থেমে গেল। রাতের এগারোটা বাজে, মা নিশ্চয় ঘুমিয়ে পড়েছে। এত রাতে দরজায় কড়া নাড়াটা ঠিক হবে না। অস্থির নাওয়াজ মাথার চুল টেনে ধরে এবার। মাথা যন্ত্রণা যেন বেড়েছে তার। এর মধ্যে মেয়েটাকে না দেখে মস্তিষ্ক যেন নিশ্চল। উপর নিচ সব জায়গায় খুঁজেও মেয়েটাকে না পেয়ে নাওয়াজ যেন পাগলপ্রায়।
ছাদে পা দিতেই নাওয়াজের দৃষ্টি স্থির হয়। উদ্দীপ্ত চোখ জোড়ায় কেমন অদ্ভুত মাদকতা। অস্থিরতা, রাগ দমে রমণীকে দেখার অভিলাষে মত্ত। নাওয়াজ ঘোলাটে চোখে বৃষ্টিস্নাত রমণীকে আবদ্ধ করে। নজর দেয় শরীরের প্রতিটা ভাঁজে ভাঁজে। হঠাৎ এমন হওয়াতে রমণী আঁতকে ওঠে। ঝাপসা চোখে অস্পষ্টত দেখে নাওয়াজের অবয়ব। অনুভব করল শীতল দু হাত ছুঁয়ে দিচ্ছে কায়া। স্নানরত রমণীর কায়া জুড়ে অদ্ভুত শিহরণ। থরথর করে কেঁপে উঠে চিত্ত। তিরতির করে কাঁপতে থাকা ওষ্ঠাধর যেন নাওয়াজকে দিশেহারা করার জন্য যথেষ্ট। ভেজা চুল মুঠোয় নিয়ে ওষ্ঠ আঁকড়ে ধরে, চুম্বনে লিপ্ত হলো মুহূর্তে। আভিরা ব্যথায় কঁকিয়ে ওঠে। অস্পষ্ট স্বরের গোঙানি যেন নাওয়াজকে অস্থির করে তুলে ক্রমশ। প্রগাঢ় হয় ওষ্ঠের মিলন, সাথে এলোমেলো ছোঁয়া।
নাওয়াজকে দু হাতে ঠেলে আভিরা খানিকটা দূরে সরে দাঁড়ায়। হাঁসফাঁস অবস্থা তার, লজ্জায় নতজানু হয় তনু। কেঁপে উঠে সর্বাঙ্গ। আলিঙ্গনে মত্ত হয় উভয় সত্তা। দুর্বার চাহনি নাওয়াজের, তাতেই রমণীর চিত্ত দিশেহারা। উষ্ণতা যেন শিরায় শিরায় বহমান। অথচ শীতল বৃষ্টি ভিজিয়ে দিচ্ছে তাকে। তবুও অঙ্গ জুড়ে উত্তাপ অনুভূত। অনুভূতির উত্তাল ঢেউয়ে ভাসমান আভিরা টের পেল না লোকটা কখন তাকে দু হাতে তুলে নিয়েছে। সিঁড়ি বেয়ে তটস্থ পায়ে রুমের দিকে এগিয়ে গেল। এক হাতে দরজা আটকে বিছানায় ফেলে মেয়েটাকে।
আভিরা শ্বাস আটকে পড়ে আছে। হৃৎস্পন্দনের বেগ জোরালো। এলোমেলো চোখের দৃষ্টি। মেয়েটা কুণ্ঠিত হয় কেমন! ভীতিকর চাহনি তার। এই বুঝি দম বন্ধ হয়ে যাবে। নাওয়াজ যত এগিয়ে আসছে আভিরার তত হাঁসফাঁস অবস্থা। দু হাতে ভেজা শাড়ি আঁকড়ে ধরে। তার এলোমেলো শাড়ির ভাঁজে পেট, কোমর দৃষ্টিগোচর হলো সহজে।
নাওয়াজ মেয়েটার চিবুক ছুঁয়ে চুম্বন আঁকে। আভিরার কাঁপুনি যেন থামছে না। শরীর কম্পমান, বেপরোয়া শ্বাস প্রশ্বাসে নাওয়াজের নিজেকে দমিয়ে রাখা দায়। নাওয়াজ ঢোক গিলে। চিড়বিড়িয়ে উঠা মস্তিষ্কে কেবল মেয়েটাকে ছুঁয়ে দেওয়ার প্রয়াস! অঙ্গে ভেজা শাড়ি, এলোমেলো ভেজা চুল লেপ্টে আছে গলদেশে। নাওয়াজ হাত দিয়ে গলার ধারে লেগে থাকা চুল সরিয়ে মুখ গুঁজে। বিড়বিড় করে বলে উঠল,
– আমাকে ঠিক থাকতে দিচ্ছেন না আপনি। যেই দহনে আমি অঙ্গার প্রায়, তা আপনাকে ছুঁয়ে না দিক।
নাওয়াজ দূরে সরে গেল। আলমারি থেকে কাপড় নিয়ে গোসলে গেল সে। দুইবার বৃষ্টির পানি গায়ে লেগেছে, গোসল না দিলে জ্বর আসবে নিশ্চিত। আভিরা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। নাওয়াজের এমন হুট করে দূরে সরে যাওয়া ভালো লাগল না আভিরার। তবে কি তার অবচেতন মন নাওয়াজকে কাছে চাচ্ছে। আভিরা সলজ্জায় গুটিয়ে যায়। জড়োসড়ো হয়ে খাটের এক কোণায় বসে রইল। মেয়েটার ভেজা শাড়িতে চাদর গলিয়ে তোষক ভিজে চলেছে সে খেয়াল নেই।
– এভাবেই বসে থাকবেন?
– হু।
আভিরা কিছুটা আনমনে জবাব দেয়। নাওয়াজ ভ্রু কুঁচকে নেয়। মেয়েটা কোন খেয়ালে ডুবে আছে। হাতের তোয়ালে সোফায় ছুঁড়ে মেরে রাশভারী গলায় বলল,
– ভেজা শাড়ি গায়ে জড়িয়ে সারা রাত পার করার ইচ্ছে আছে না কি?
– হ্যাঁ আব্ না।
আভিরা হকচকিয়ে ওঠে। হুঁশ ফিরে তার। দ্রুত বিছানা ছেড়ে দেখল খাটের এক পাশ ভিজে পুরো জবজবে। আভিরা কাঁদো কাঁদো চাহনি দেয়। নাওয়াজ তা দেখে মৃদু হাসে। টেবিল ল্যাম্পের হলদেটে আলোতে আভিরার মুখশ্রী স্পষ্ট। সাদা শাড়ি, টকটকে লাল ব্লাউজ ভিজে শরীরের সাথে লেপ্টে। নিষিদ্ধ স্থানে নজর যেতে নাওয়াজের মাথা ফাঁকা হয়ে এলো। তড়িৎ বেগে নজর ফেরায় সে। বক্ষঃস্থলে তার ধড়ফড় অবস্থা। অসহ্য যন্ত্রণায় মস্তিষ্ক বিহ্বল।
আভিরা জামা নিয়ে ধীর কদমে এগিয়ে আসে। মাথায় সূক্ষ্ম যন্ত্রণা হচ্ছে তার। চোখের মণি ঘোটালে, ঝাপসা দেখছে দু চোখে। অক্ষি কোটরে টলটল করতে থাকা জল বোধ হয় এই গড়িয়ে পড়ল। মেজাজ খারাপ হয় মেয়েটার। বৃষ্টিতে কেন ভিজতে গেল। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে সম্মুখে কদম ফেলে। কদম ফেলাও যেন দুষ্কর। বৃষ্টির পানি সহ্য হয় না তার। জ্বর আসে। সেজন্য ছোটো থেকে বৃষ্টি অপছন্দ আভিরার। বৃষ্টি থেকে কীভাবে পালিয়ে বাঁচা যায় সেই সুযোগ খুঁজে বেড়ায়। বৃষ্টির দিনে ঘরের দোর আটকে বসে থাকে আভিরা। সারাদিন ঘর থেকে বাইরে বের হয় না আর। সেজন্য বৃষ্টির দিনে স্কুল কলেজে তার অনুপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। হালকা ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হলেও স্কুলে দেখা পাওয়া যেত না এই মেয়ের।
আজ হঠাৎ বৃষ্টিতে ভেজার সাধ জাগে। আভিরা ছুটে ছাদে চলে যায়। ভিজেছে ঘণ্টা দুয়েক। লাফালাফি ঝাঁপাঝাঁপির অভ্যাস নেই আভিরার। শুধু ঠায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টির পানিতে গা ভিজিয়েছে। নাওয়াজ না গেলে হয়তো আরও ঘণ্টাখানেক ভেজা হতো। বেশি আবেগপ্রবণ হতে গিয়ে মনে হচ্ছে এখন তাকেই ভুগতে হবে। অসুস্থ না হয়ে পড়ে আবার।
আভিরা দু মগ পানি ঢেলে গোসল সেরে বেরিয়ে এলো। গায়ে তার সুতির সেলোয়ার কামিজ। ভেজা চুল থেকে পড়া পানিতে কামিজ ভিজে চলেছে। আভিরা নাক মুখ কুঁচকে নেয় এবার। চোখে মুখে বিরক্তিভাব। তোয়ালে দিয়ে ভেজা চুল পেঁচিয়ে বাঁধল আভিরা। আভিরার কার্যক্রম সবটাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল নাওয়াজ। এই মেয়ে গোসল সেরে গায়ের পানি কেন মুছে না তাই বুঝে এলো না নাওয়াজের। প্যাঁচানো তোয়ালে খুলে আভিরার চুল মুছতে লাগল। আভিরা শুধু হতভম্ব হয়ে দেখে গেল।
– আপনার দেখছি বদ অভ্যাসের শেষ নেই আঞ্জুম। ভেজা শরীর মুছেন না কেন? আবার চুল না মুছেই তোয়ালে পেঁচিয়ে রেখেছেন। এসবের জন্যই তো ঠান্ডা লাগে। নিজের বেলায় বড্ড বেখেয়ালে আপনি।
আভিরা নিশ্চুপ থেকে শুনে গেল। কিছু বলতে ইচ্ছে করছে না তার। আভিরার এমন নিশ্চুপতা যেন নাওয়াজের রাগ বাড়িয়ে দেয়। ঘাড়ে হাত পেঁচিয়ে দাঁত বসিয়ে দিল গলায়। ব্যথায় আভিরা ছটফট করতে লাগল। নাওয়াজ ছাড়ে না মেয়েটাকে। শক্ত হাতে কোমর জড়িয়ে গাঢ় নিশানা বসায়। ক্ষততে ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,
– আজকের কাজের শাস্তি। পরেরবার এই কামড়ের কথা মাথায় রাখবেন। আর ভুলে গেলেও সমস্যা নেই। আমি মনে করিয়ে দিব।
বলেই ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসল। রাগে আভিরার শরীর জ্বলে যাচ্ছে, চোখের পানিতে গাল ভিজে তার। এই লোকটা এত খারাপ। অসভ্য, ফালতু লোক। বিড়বিড় করে আভিরা গিয়ে খাটে শুয়ে পড়ে। ভেজা অনুভব হতেই কান্নার শব্দ বাড়ে। অসহ্য লাগছে আভিরার। খাটের এই পাশ যে ভিজে গিয়েছে তার তো খেয়ালই নেই। এখন সে কোথায় ঘুমাবে। আভিরা উঠে খাটে হেলান দিয়ে বসে। সে আজ বসে বসেই ঘুমাবে। ঐ অসভ্য লোক ঘুমাক আরামে। তার কষ্ট হলে ঐ লোকের কী। এই যে সে উঠে বসেছে ঐ লোক দেখেও কেমন অদেখা করছে। চোখ বুজে পড়ে আছে। পাষাণ লোক একটা, আভিরা আর কথা বলবে না। মেয়েটা বিড়বিড় করতে করতে ঘুমে তলিয়ে গেল। শরীরে যেন ক্লান্তি ভর করেছে। মাথা হেলিয়ে পড়তে নিলে নাওয়াজ বুকের উপর ফেলে আভিরাকে। মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
– গালি দেওয়া হচ্ছিল বুঝি?
আভিরা লজ্জা পেল। লোকটা শুনেছে তবে! হাঁসফাঁস করে উঠতে চাইল বক্ষঃস্থল হতে। নাওয়াজের ফিসফিস করা কণ্ঠস্বরে নড়চড় থেমে জমে যায় মেয়েটার।
– ভেজা সত্তায় আপনাকে দেখে আমার নিজেকে ঠিক রাখা দুষ্কর হয়ে পড়ে। রাতের ঘুম নষ্ট করতে না চাইলে চুপচাপ শুয়ে থাকুন।
_
অস্পষ্ট গোঙানির শব্দে নাওয়াজের ঘুম হালকা হয়ে আসে। দৃষ্টিগোচর হলো ঘুমন্ত রমণীর ছটফটে কায়া। গায়ে হাত দিতে সহসাই হাত সরিয়ে আনে নাওয়াজ। আভিরার গা গরম, জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। বৃষ্টিতে ভেজার ফলেই জ্বর এসেছে। নাওয়াজের মেজাজ খারাপ হয়। বিক্ষিপ্ত মেজাজে উঠে রুমের লাইট দেয় সে। দেখল বুজে থাকা চোখ গলিয়ে পানি পড়ছে। নাওয়াজের বুক মোচড় দিয়ে ওঠে। মেয়েটার নিশ্চয় কষ্ট হচ্ছে। নাওয়াজ আভিরার ঘুমন্ত মুখশ্রী দু হাতের আঁজলায় নিয়ে চুমু খেল। শুষে নিতে চাইল সমস্ত উত্তাপ। গরমে যেন তার ঠোঁট জোড়া উত্তপ্ত হয়ে আসে। এতটা জ্বর কখন এসেছে, মেয়েটার শরীর এমন জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে আর সে টের পেল না। নাওয়াজের নিজের উপর রাগ হলো। সে কেন আগে টের পেল না। নাওয়াজ জ্বরে কাঁপতে থাকা আভিরাকে উঠিয়ে প্যারাসিটামল খাইয়ে দিল। ঔষধের তিক্ত স্বাদে আভিরা বমি করে ভাসায়। নাওয়াজ অসহায় চোখে তাকাল আভিরার দিকে। ঔষধ না খেলে তো এই জ্বর কমবে না। নাওয়াজ মেয়েটার মাথায় হাত রাখে। ভেজা চুল খোঁপা বেঁধে চুমু খেল ঠোঁটের কিনারায়। আভিরার চোখ থেকে এখনও পানি গড়িয়ে পড়ছে। মেয়েটা মাথা রাখে নাওয়াজের কাঁধে। আভিরার শরীরের উত্তাপে নাওয়াজের কাঁধও গরম হতে লাগল। নাওয়াজ দেরি করে না মেয়েটাকে শুয়ে দিয়ে ওয়াশরুমে গেল। রুম পরিষ্কার করে জামা পাল্টে বালতি ভর্তি পানি নিয়ে এলো। ভেজা শার্ট, প্যান্টের সাথে এই টি-শার্টও বিনে রাখে। এতগুলো ভেজা কাপড় জমে গিয়েছে। সকাল পর্যন্ত এভাবে রেখে দিলে ভ্যাপসা গন্ধ ছড়াবে। নাওয়াজ নিজের শার্ট, প্যান্টের সাথে আভিরার ভেজা শাড়িও ধুয়ে দিল।
আভিরার মাথায় পানি ঢালতে লাগল নাওয়াজ। খেয়াল রাখছে কানে যেন পানি না যায়। ভেজা চুল মুছিয়ে দিয়ে জলপট্টি দিল। সারা রাত নাওয়াজের জলপট্টি দিয়ে পার হলো। ভোরের আলো ফুটতে আড়মোড়া ভেঙে উঠে দাঁড়ায় নাওয়াজ। শরীর ব্যথায় ম্যাজম্যাজ করছে। নাওয়াজ আভিরার পাশ ঘেঁষে শুয়ে পড়ল। সারাটা রাত নির্ঘুম কেটেছে তার। এক সেকেন্ডের জন্যও দু চোখের পাতা এক করেনি। অসহ্য যন্ত্রণায় রাত পার করেছে নাওয়াজ। যেন জ্বরাক্রান্ত আভিরা না সে নিজে ছিল। নাওয়াজ হাত বাড়িয়ে আভিরাকে কাছে টেনে নেয়। মেয়েটা বুকে মাথা রাখতে ছটফট করতে থাকা হৃৎপিণ্ড শান্ত হয়ে আসে। নাওয়াজ চুমুতে ভরিয়ে দিল আভিরার সারা মুখ। এতক্ষণ নিজেকে স্বাভাবিক রাখলেও আভিরাকে কাছে পেতেই তার অস্থিরতা তীব্রতর হয়। নিজেকে কীভাবে সামলেছে কেবল নাওয়াজ জানে। নাওয়াজ মনে মনে আভিরার সুস্থতা কামনা করল। খোদা তায়ালা যেন তার আঞ্জুমকে সবসময় সুস্থ রাখে, অসুস্থতা যেন এই মেয়েটাকে না ছুঁতে পারে। বড্ড নাজুক তার আঞ্জুম। একটু কিছু হলেই সহ্য করতে পারে না। সামান্য জ্বরেই কেমন কাবু হয়ে গিয়েছিল মেয়েটা।
পুঞ্জীভূত মেঘের দল ভেসে বেড়াচ্ছে আসমান জুড়ে। আকাশ এখন পরিষ্কার। রাতের বৃষ্টি থেমেছে ভোরবেলায়। স্বচ্ছ আকাশে পাখির মেলা। ডানা মেলে উড়ে চলেছে নাম না জানা পাখির দল। ঘুমন্ত আভিরার ঘুম ভেঙে গেল হুট করে। নড়তে নিলেই বুঝল সে কারো শক্তপোক্ত হাতের বাঁধনে আবদ্ধ। আভিরা ভার হয়ে থাকা মাথা তুলে তাকায় নাওয়াজের মুখপানে। হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দেয় নাওয়াজের ঘুমন্ত মুখ। লোকটার চোখ মুখে কেমন ক্লান্তির রেশ। সারা রাত কি ঘুমায়নি? এমন গভীর ঘুমে মগ্ন কেন এই লোক? আভিরা উঠে বসার চেষ্টা করল। মেঝেতে নজর যেতে মেয়েটার হুঁশ ফিরে। বালতি ভর্তি পানি দেখে যা বুঝার বুঝে গেল। আভিরা নির্নিমেষ চেয়ে রইল নাওয়াজের দিকে। চোখে তার অনুতাপ, দহনে উত্তপ্ত কায়া। উদাসী নজরে কয়েক পল চেয়ে থেকে বিছানা ছাড়ে। বালতি ভর্তি পানি নিয়ে ফেলল স্বচ্ছ টাইলসে। বারান্দায় যেতে আরেক দফা হতবাক হলো আভিরা। তার আর নাওয়াজের কাপড় প্রায় শুকিয়ে এসেছে। এই লোক কাপড়ও ধুয়ে দিয়েছে। আভিরা বিষণ্ণ নজরে দেখল সবটা। অথচ তার জানা হলো না নাওয়াজ তার বমি করে ভাসিয়ে রাখা ফ্লোরও পরিষ্কার করেছে। জানলে নিশ্চয় রমণী কেঁদেকেটে বেহাল দশা করত নিজের।
কোমরে কারো হাতের ছোঁয়া পেয়েও আভিরার মধ্যে ভাবাবেগ হলো না তেমন। সে নিজ খেয়ালে মত্ত। গন্ধরাজ হাসনাহেনা ফুলের সুবাসে মাতোয়ারা মানব মানবী। মিষ্টি ফুলের সুবাসে সুরভিত চারপাশ। নাওয়াজের কাছে যেন ফুলের সুবাসের থেকেও রমণীর গায়ের ঘ্রাণ অত্যধিক নেশালো। নাওয়াজ নাক টেনে শ্বাস নেয়। নিজেকে কেমন মাতাল লাগছে। মেয়েটাকে নিজের দিকে ফেরায় নাওয়াজ। আভিরাকে নত মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভ্রু কুঁচকে আসে তার। কপালে গলায় হাত রেখে দেখে নিল জ্বর কমেছে কিনা। জ্বর নেই একেবারেই। যা ভোগানোর রাতের বেলায় মেয়েটাকে ভুগিয়েছে। নাওয়াজ গালে হাত রাখতেই আভিরা নাওয়াজের হাত চেপে ধরে। নাওয়াজ অবাক হলো কিছুটা। এই মেয়েটা এমন অদ্ভুত আচরণ করছে কেন? আভিরা নাওয়াজের হাতে ঠোঁট ছোঁয়ায়। মেয়েটা প্রায় কেঁদেই ফেলল। কান্নারত কণ্ঠে ভাঙা গলায় বলে উঠল,
– আমি দুঃখিত।
নাওয়াজের দৃষ্টি আভিরার ক্রন্দনরত মুখে লেপ্টে। মেয়েটা এমন কান্না করে কেন? নাওয়াজ এগিয়ে নিজের শুষ্ক ঠোঁট ছোঁয়ায় আভিরার থুতনিতে। শান্ত স্বরে বলে উঠল,
– আমার রাণী আপনি, আপনার সেবায় এই অধম সদা প্রস্তুত। চোখের পানি না ফেলে হুকুম করুন।
নাওয়াজের এহেন বলা কথায় আভিরা না চাইতেও হেসে উঠল। দন্তপাটি বের করে হাসছে মেয়েটা। নাওয়াজ ঘোর লাগা চোখে তাকায়। এই রমণীর হাসি তার কাছে প্রশান্তির কারণ।

