#প্রফেসরের_জেদিলতা
#পর্ব_১২
#আরিবা_নাওশীন
খান বাড়ির উঠোনে কৃষ্ণচূড়া গাছটায় এখন লাল ফুলের মেলা। সময় তার নিজস্ব নিয়মে বয়ে গেছে একটা পুরো বছর। এই এক বছরে আরশাদ খান আয়াজ আর ঈনশুর জীবনের সমীকরণটা আরও অনেক বেশি পরিপক্ক, আরও অনেক বেশি মধুর হয়েছে। ঈনশু এখন কলেজের ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রী, আর আয়াজ যথারীতি সেই চেনা গম্ভীর, রাশভারী প্রফেসর যার ক্লাসে এখনো পুরো ডিপার্টমেন্ট কাঁপে। কিন্তু ক্লাসরুমের ওই চার দেয়াল পার হয়ে ঘরের চেনা চৌকাঠে পা রাখলেই ড. আরশাদ খান আয়াজ যেন সম্পূর্ণ অন্য এক মানুষ।
আজ ছুটির দিনের বিকেল। ঈনশু ঘরের বারান্দায় একটা আরামচেয়ারে বসে আছে। তার পরনে একটা সুতি জামদানি শাড়ি, চুলে আলতো করে একটা খোঁপা করা। তার শান্ত চেহারায় এখন এক অদ্ভুত, মায়াবী স্নিগ্ধতা।
আয়াজ ধীর পায়ে বারান্দায় ঢুকলেন। গায়ের ফরমাল শার্টের হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গুটানো, চোখে চশমা নেই। তাঁর হাতে এক বাটি গরম গরম ঝাল ফুচকা আর তেঁতুলের টক। তিনি ঈনশুর পাশে এসে বসলেন এবং ফুচকার বাটিটা তার সামনে ধরলেন।
ঈনশু ফুচকা দেখেও আজ ওমন চঞ্চল হয়ে উঠল না, বরং মুচকি হেসে বলল, “আজ হুট করে ফুচকা? প্রফেসরের মনটা আজ এত উদার কেন শুনি?”
আয়াজ একটা ফুচকা চামচে নিয়ে ঈনশুর মুখের সামনে ধরে খুব নিচু ও মায়াবী স্বরে বললেন, “সব প্রশ্নের সাইকোলজিক্যাল ব্যাখ্যা খোঁজা বন্ধ করো তো, জেদিলতা। ডাক্তার বাবু কী বলেছেন মনে নেই? এখন তোমার যা খেতে ইচ্ছে করবে, তাই হাজির করা এই প্রফেসরের প্রধান ডিউটি। নাও, মুখ খোলো।”
ঈনশু আলতো করে ফুচকাটা মুখে পুরে দিল। তার চোখ দুটো আনন্দে চকচক করে উঠল। হ্যাঁ, খান বাড়িতে এখন এক নতুন অতিথির আগমনবার্তা গুঞ্জরিত হচ্ছে। ঈনশু আর আয়াজের ভালোবাসার বাগানে ফুটতে চলেছে এক নতুন কুঁড়ি। এই সুখবরটা পাওয়ার পর থেকে আয়াজ যেন ঈনশুকে চোখের আড়াল করতেই চান না। সারাক্ষণ এক অদৃশ্য সুরক্ষার চাদরে তাকে মুড়িয়ে রাখেন।
ঈনশু আয়াজের হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল, “আচ্ছা আয়াজ, আমাদের সন্তান যদি আমার মতো জেদি আর চতুর হয়, তবে আপনি সামলাবেন কী করে?”
আয়াজ একটু হাসলেন। চশমা ছাড়া তাঁর সেই গভীর চোখ দুটোতে এখন এক চরম তৃপ্তির আলো। তিনি ঈনশুর কপালে নিজের ঠোঁট দুটো আলতো করে ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বললেন, “মা যদি এক নাম্বারের জেদিলতা হয়, তবে সন্তান একটু জেদি হওয়াই তো স্বাভাবিক। আর সামলানোর কথা বলছ? দুনিয়ার সবচেয়ে চতুর আর জেদি মেয়েটা যখন আমার এই বুকের খাঁচায় স্বেচ্ছায় বন্দি হয়ে গেছে, তখন ওই ছোট্ট জানটাকে সামলানো আমার জন্য কোনো ব্যাপারই না।”
সন্ধ্যায় নিচে নামতেই দেখা গেল ড্রয়িংরুমে সায়েব একটা বাচ্চার খেলনা গাড়ি নিয়ে সোফায় বসে একা একাই খেলছে। ঈনশু আর আয়াজকে সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখেই সে সোফা থেকে লাফিয়ে উঠল।
“এই যে আমাদের হবু আব্বু-আম্মু এসে গেছেন!” সায়েব খেলনা গাড়িটা টেবিলের ওপর রেখে বলল, “ঈনশু, তোকে একটা কথা বলে রাখলাম। আমার ভাগ্নে বা ভাগ্নি যাই আসুক না কেন, ও কিন্তু একদম আমার মতো স্মার্ট আর চঞ্চল হবে। ওই গম্ভীর প্রফেসরের মতো চশমা পরে দিনরাত থিসিস পেপার ঘাঁটবে না, বলে দিলাম!”
আয়াজ সোফায় বসে চশমাটা চোখে পরলেন এবং গম্ভীর মুখে বললেন, “সায়েব, মামা হওয়ার আনন্দটা একটু বেশিই দেখা যাচ্ছে। কিন্তু মনে রেখো, সামনের সপ্তাহে তোমার ফাইনাল ইয়ারের প্রজেক্ট ডিফেন্স। সেখানে যদি কোনো গড়মিল পাই, তবে ভাগ্নের মুখ দেখার আগে তোমাকে ডিপার্টমেন্টের ল্যাবে আটকে রাখব।”
সায়েব ওমনি জিব কেটে ঈনশুর পেছনে গিয়ে লুকিয়ে বলল, “আরে এই পড়াশুনা শেষ হচ্ছে না কেন? আর না তো এই স্যারের ধমকি। দেখেছিস ঈনশু? লোকটা এখনো আমাকে থ্রেট দিচ্ছে! তুই একটু ওনাকে বল না ঘরের মধ্যে ওমন কসাইগিরি বন্ধ করতে!”
ঈনশু নিজের সেই পুরোনো চতুর আর ভন্ড হাসিটা ফুটিয়ে বলল, “সায়েব, এবার কিন্তু আমি স্যারের পক্ষেই ওকালতি করব। তুই মামা হবি বলে কি পড়াশোনা ছেড়ে দিবি? যা, এক্ষুণি পড়তে বস!”
সায়েব কপালে হাত দিয়ে বলল, “হায় রে কপাল! এই বাড়িতে আমার কোনো দামই নেই। তোরা স্বামী-স্ত্রী মিলে আমার ক্যারিয়ারের বারোটা বাজিয়ে ছাড়লি!”
সুমি বেগম আর শাপলা বেগম রান্নাঘর থেকে মিষ্টির বাটি নিয়ে এলেন। পুরো ঘরের বাতাস তখন হাসির রোলে মুখরিত হয়ে উঠল। শওকত আর জেবাও আজ এসেছে।
রাত ১১টা ৩০ মিনিট।
আয়াজ আর ঈনশুর ঘরের জানালা দিয়ে পূর্ণিমার আলো এসে পড়েছে বিছানার ওপর। পুরো ঘরটা যেন এক রুপালি মায়ায় ডুবে আছে।
ঈনশু জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরের শান্ত প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে ছিল। আয়াজ ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন এবং পেছন থেকে ঈনশুকে নিজের শক্ত ও উষ্ণ বাহুবন্ধনে জড়িয়ে নিলেন। তাঁর হাত দুটো ঈনশুর পেটের ওপর খুব আলতো করে রাখা যেখানে স্পন্দিত হচ্ছে তাদের ভালোবাসার এক নতুন জীবন।
ঈনশু পিছন ফিরে আয়াজের বুকে নিজের মাথাটা রাখল। সে এক দীর্ঘ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলল, “আজ আমার নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মেয়ে মনে হচ্ছে, আয়াজ।”
আয়াজ ঈনশুর চুলে নিজের মুখটা ডুবিয়ে দিয়ে নিচু, গম্ভীর অথচ চূড়ান্ত এক ভালোবাসাময় স্বরে বললেন, “আর আমার মনে হচ্ছে, চার বছর আগে ডায়েরির পাতায় যে ‘ইনশিরাহ’ নামটা লিখেছিলাম, আজ সেই নামটা আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর বাস্তব হয়ে আমার বুকে মিশে আছে। তোমার এই জেদ, তোমার এই চতুরতা সবকিছুই আমার জীবনের নিখুঁততম থিওরি, জেদিলতা।”
ঈনশু হেসে ফেলল।
চলবে,,,

