প্রসেফরের_জেদিলতা #আরিবা_নাওশীন #পর্ব_১৪,১৫

0
1

#প্রসেফরের_জেদিলতা
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_১৪,১৫

আয়াজ স্টাডি রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর আরও বেশ কিছুক্ষণ ওই অন্ধকার ঘরে কাঠের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল ঈনশু। বাইরে বৃষ্টির বেগ এখন আরও বেড়েছে, সাথে দমকা হাওয়া। জানালার কাঁচগুলো এমনভাবে কাঁপছে যেন যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে গুঁড়িয়ে যাবে। কিন্তু ঈনশুর বুকের ভেতরের ঝড়টা বাইরের এই প্রকৃতির চেয়েও অনেক গুণ বেশি মারাত্মক।

সে ধীর পায়ে নিজের শোবার ঘরে ফিরে এলো। খাটের একপাশে ছোট্ট আয়াত এক হাত ছড়িয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। তার সেই নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে ঈনশুর চোখ দুটো আবার ভিজে উঠল। এই মেয়েটার বাবা… ড. আরশাদ খান আয়াজ… মানুষটা আসলে কী?

ঠিক তখনই দরজায় মৃদু আওয়াজ হলো। ঈনশু চমকে তাকিয়ে দেখল আয়াজ ঘরে ঢুকেছে। এতক্ষণের সেই রেনকোট বা পকেটের রিভলভার সব গায়েব। পরনে তাঁর একদম সাধারণ একটা ধূসর রঙের টি-শার্ট আর ট্রাউজার। চোখে সেই কড়া ফ্রেমের চশমাটা আবার স্বস্থানে ফিরে এসেছে। তাঁকে দেখে বোঝার উপায় নেই।

আয়াজ বিছানার পাশে এসে আয়াতের কপালে আলতো করে হাত রাখল, কম্বলটা একটু টেনে দিল। তারপর ঈনশুর দিকে তাকিয়ে একদম স্বাভাবিক, শান্ত গলায় বললেন, “মাথাটা জ্যাম হয়ে আছে। এক কাপ কড়া করে আদা-চা বানিয়ে দেবে, ঈনশু?”

ঈনশু চোখ দুটো সরু করে বলল, “আপনার তো মাথা জ্যাম হওয়ারই কথা, প্রফেসর সাহেব। পকেটে ওমন ভারী জিনিস নিয়ে ঘুরলে গ্র্যাভিটির কারণে মাথা তো নিচের দিকে টানবেই!”

আয়াজ চশমার আড়াল থেকে ঈনশুকে দেখল। তাঁর ঠোঁটের কোণায় সেই চেনা, বাঁকা হাসির রেখাটা ফুটে উঠল। তিনি বলল, “সাইকোলজি বলে, অতিরিক্ত কৌতূহল মানুষের ক্ষুধা আর ঘুম দুটোই কেড়ে নেয়। আমি কিন্তু চায়ের কথা বলেছি।”

“বানাচ্ছি!” ঈনশু গটগট করে পা ফেলে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। কিন্তু তার মগজ তখন অন্য হিসাব কষছে। রহস্য যখন সামনে এসেছে, তখন সেটা চট করে সমাধান করার বোকামি সে করবে না।

পরদিন সকাল। রাতের সেই ঝোড়ো হাওয়া কেটে গিয়ে ক্যাম্পাসে এখন ঝলমলে রোদ। কিন্তু খান বাড়ির ডাইনিং টেবিলের আবহাওয়াটা একটু অন্যরকম।
সায়েব টেবিলে বসে পরোটা মুখে পুরতে পুরতে গভীর মনোযোগ দিয়ে খবরের কাগজ পড়ছিল। সাধারণত সে স্পোর্টস পেজ ছাড়া কিছু উল্টায় না, কিন্তু আজ তাকে ক্রাইম পেজের দিকে ঝুঁকে থাকতে দেখে ঈনশু একটু অবাক হলো।

ঈনশু চায়ের ফ্লাস্কটা টেবিলে রাখতে রাখতে বলল, “কী রে সায়েব? সূর্য আজ কোন দিকে উঠেছে? তুই সকাল সকাল দেশের অপরাধ জগতের খবর পড়ছিস কেন?”

সায়েব চারপাশটা একটু দেখে নিয়ে গলাটা নিচু করল। তারপর চোর চোর চোখে সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আরে ঈনশু, বুঝিস না কেন! কাল রাতে যখন ঝড় হচ্ছিল, আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। দেখলাম আয়াজ ভাই একটা কুচকুচে কালো রেনকোট পরে গাড়ি থেকে নামলেন। ওনার হাঁটার স্টাইলটা কেমন ছিল জানিস? একদম ওই হলিউড সিনেমার জেমস বন্ডের মতো! আমার কেন যেন সন্দেহ হচ্ছে, আমাদের এই গম্ভীর প্রফেসর আড়ালে কোনো সিক্রেট মিশন চালাচ্ছে!”

ঈনশুর বুকের ভেতরটা ছ্যাৎ করে উঠল। সায়েবের মতো একটা ফাঁকিবাজ ছেলেও যখন ধরে ফেলছে, তখন ব্যাপারটা হালকা নয়। কিন্তু ঈনশু নিজেকে সামলে নিয়ে সায়েবের মাথায় একটা হালকা চাঁটি মে-রে বলল, “বেশি গোয়েন্দা গল্প পড়া বন্ধ কর তো! জেমস বন্ড নাকি! ওনার কেরিয়ারটাই তো সাইকোলজি নিয়ে, মানুষের মন পড়া ওনার কাজ। তুই নিজের পড়ার দিকে মন দে, আজ ওনার ডিপার্টমেন্টে তোর অ্যাসাইনমেন্ট সাবমিট করার লাস্ট ডেট।”

“বাপ রে! ভাইবোনের টিমটা একদম খতরনাক!” সায়েব ওমনি ডিমের পোচটা মুখে চালান করে দিয়ে বলল, “আমি চললাম। প্রফেসরের ডেরায় যাওয়ার আগে নিজের পিঠটা বাঁচানো দরকার।”

সায়েব ব্যাগ কাঁধে নিয়ে টেবিল থেকে উঠতেই সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল ড. আরশাদ খান আয়াজ। আজ তাঁর পরনে হালকা নীল রঙের শার্ট, হাতে কালো রঙের লেকচার ফাইল।

আয়াজ সায়েবকে দেখেই কড়া গলায় বললেন, “সায়েব, তোমার আজকের প্রজেক্ট ফাইলের থার্ড চ্যাপ্টারটা যেন গতদিনের মতো কাঁচা না হয়। মনে রেখো, এবার কিন্তু এক্সটার্নালরা খুব কড়া।”

সায়েব ওমনি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে একটা স্যালুট ঠুকে বলল, “ইয়েস স্যার! একদম বুলেট স্পিডে কাজ জমা দেব!” বলেই সে এক ছুটে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।

আয়াজ এসে চেয়ারে বসলেন। ঈনশু তাঁর সামনে চায়ের কাপটা এগিয়ে দিল। আজ দুুজনের চোখাচোখি হতেই এক অদ্ভুত নীরবতা খেলা করে গেল। ঈনশুর চোখে ছিল হাজারটা প্রশ্ন, আর আয়াজের চোখে ছিল এক গভীর, রহস্যময় কুয়াশা।

আয়াজ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন, “আজ বিকেলে কলেজে একটা স্পেশাল সেমিনার আছে, ঈনশু। আমি চাই তুমিও সেখানে থাকো। তোমার সেই অনলাইন রিসার্চ ফার্মের কিছু ডেটা আমার লেকচারে কাজে লাগবে।”

ঈনশু চায়ের বাটিটা হাতে নিয়ে একটু বাঁকা হেসে বলল, “সেমিনারে শুধু ডেটারই কাজ হবে তো স্যার? নাকি অন্য কোনো সারপ্রাইজ এর ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বাজানো হবে?”

আয়াজ চশমাটা নাকের ডগায় একটু নামিয়ে সরাসরি ঈনশুর চোখের দিকে তাকাল। তাঁর সেই চাউনিতে আজ কোনো হিংস্রতা ছিল না, ছিল এক প্রচ্ছন্ন চ্যালেঞ্জ। তিনি বললেন, “সারপ্রাইজ তো পরশুদিনের কনফারেন্সে, মিস জেদিলতা। আজকেরটা হলো স্রেফ ট্রেলার। তৈরি থেকো।”

বিকেল ৪টে। কলেজের মেইন অডিটোরিয়াম রুমে বেশ ভালোই ভিড়। ড. আরশাদ খান আয়াজের সেমিনার মানেই সেখানে স্টুডেন্টদের পাশাপাশি অন্য ডিপার্টমেন্টের প্রফেসরদেরও উপস্থিতি আছে।

ঈনশু একদম পেছনের সারির একটা চেয়ারে বসে ছিল। তার কোলে ছোট্ট আয়াত ঘুমাচ্ছে। স্টেজ থেকে আয়াজের গম্ভীর, রাজকীয় কণ্ঠস্বর পুরো হলে গমগম করছে। তিনি আজ ‘ক্রিমিনাল সাইকোলজি’ নিয়ে লেকচার দিচ্ছেন। কীভাবে একটা অপরাধীর মন কাজ করে, কীভাবে সে নিজের অপরাধ ঢাকার জন্য সমাজের বুকে একটা ভদ্র মুখোশ পরে ঘোরে আয়াজের প্রতিটা বাক্য যেন ঈনশুর বুকের ভেতর তীরের মতো বিঁধছিল। ঈনশু মনে মনে ভাবছিল, এই মানুষটা কি নিজের ভেতরের গল্পটাই স্টেজে দাঁড়িয়ে ডিক্টেট করছেন না তো?

ঠিক তখনই অডিটোরিয়ামের পেছনের দরজাটা খুলে গেল। এক ভদ্রলোক ভেতরে ঢুকলেন। বয়স আনুমানিক পঁচানব্বই বা তার কাছাকাছি, পরনে দামী স্যুট, কাঁচা-পাকা চুলগুলো খুব নিখুঁতভাবে আঁচড়ানো। তাঁর চোখে একটা চতুর, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।

ভদ্রলোক ভেতরে ঢুকতেই সামনের সারিতে বসেন প্রিন্সিপাল সাহেব নিজে দাঁড়িয়ে ওনাকে সিট ছেড়ে দিলেন। ঈনশু একটু অবাক হয়ে পাশের এক জুনিয়র লেকচারারকে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা ম্যাম, ওই ভদ্রলোক কে বলুন তো?”

লেকচারার মেয়েটি ফিসফিস করে বলল, “আরে, তুমি ওনাকে চেনো না? উনিই তো আমাদের কলেজের ট্রাস্টি বোর্ডের মেইন ডিরেক্টর মিস্টার জামান! এই কলেজের আসল ক্ষমতা ওনার হাতেই। বড্ড প্রভাবশালী মানুষ।”

‘মিস্টার জামান’ নামটা শুনতেই ঈনশুর পুরো শরীর শক্ত হয়ে গেল। কাল রাতের সেই ডায়েরির পাতা, সেই খবরের কাগজের কাটিং চোখের সামনে ভেসে উঠল। আরিয়ান খানের মৃ-ত্যুর পেছনে এই মানুষটার হাত আছে?

ঈনশু মিস্টার জামানের দিকে তাকাল, আর ঠিক তখনই স্টেজ থেকে আয়াজের কণ্ঠস্বর একটু থমকে গেল। ঈনশু চট করে স্টেজের দিকে তাকাল।

আয়াজ মিস্টার জামানের দিকে তাকিয়ে আছেন। তাঁর মুখের সেই চেনা প্রফেসরের শান্ত খোলসটা এক সেকেন্ডের জন্য যেন চড়চড় করে ফেটে গেল। চশমার আড়ালে তাঁর চোখ দুটোতে এক পলকের জন্য সেই কাল রাতের হিংস্র, আদিম প্রতিশোধের আগুনটা জ্বলে উঠেই আবার মিলিয়ে গেল। আয়াজ নিজেকে সামলে নিয়ে আবার লেকচার শুরু করলেন।

কিন্তু ঈনশু সেটা ধরে ফেলেছে। তার চতুর মন এবার বুঝতে পারল রহস্যের জালটা আসলে কতটা গভীরে ছড়ানো। এই মিস্টার জামান আর আয়াজের মধ্যকার এই নীরব যুদ্ধটা কেবল শুরু হয়েছে, আর এর শেষ কোথায়, তা এখনো কুয়াশায় ঢাকা।

কনফারেন্সের আর মাত্র একটা দিন বাকি। ঈনশু মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, সে স্রেফ চালের ঘুঁটি হয়ে থাকবে না। এই উপন্যাসের আসল মোড় সে নিজের বুদ্ধিতেই ঘোরাবে।

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here