‘মেঘের মুলুকে চল’
আয়রা তাবাস্সুম
পর্ব০৬
[ গল্পের থিম প্লট যেকোনো সংলাপ কপি নিষিদ্ধ ]
নাজিয়া বিড়ালের মতন নিঃশব্দে পা টিপে টিপে ওয়াশরুম থেকে বের হলো। উদ্দেশ্য বদ টা দেখার আগেই চুপিচুপি রুম থেকে বেরিয়ে যাবে। ওয়াশরুমে ঢুকার আগে ফুরফুরে মেজাজে যে কেলেংকারী সে বাঁধিয়েছে বের হয়ে সেই ফুরফুরে মেজাজের রফাদফা হয়ে গলা অব্দি ভয় ভর করলো তার৷ মুখে যত বড় কথা বলুক মন জানে ত মেয়েটার, গোঁয়ার টা কে সে কতটা ভয় পায়। এটাও বুঝল তখন আবেগের বশে বিবেক খুইয়েঁ অত সাহস দেখানো উচিত হয়নি।
বের হয়ে দেখল রুমে নেই বদ টা। নিশ্চয়ই ব্যালকনিতে তাহলে। নাজিয়া সুযোগের পূর্ণ সৎ ব্যবহার করে একছুটে দরজার কাছে পৌঁছে নব ঘুরাতে ই নিজের পেছনে শব্দ পেলো বড় বড় পা ফেলে কারো ছুটে আসার। মিনিটের ব্যবধানে নিজেকে আবিষ্কার করল শক্তপোক্ত বাহুবন্ধনী তে৷ আযান মেয়েটার হাত দুটো পিছনে মুড়িয়ে নিজের মুখোমুখি এনে দাঁড় করানোয় নাজিয়ার পিঠ গিয়ে ঠেকল দরজায়৷ পিঠের চাপ পড়তেই দরজা টা আপনাআপনি বন্ধ হলো।
আযানের মেজাজ এমনিও চড়ে ছিলো৷ ব্যালকনির ঠান্ডা বাতাস গায়ে মেখে চেষ্টা করছিল মাথা ঠান্ডা করার৷ কিন্তু এর ই মধ্যে মেয়েটাকে ওভাবে চুপিচুপি চোরের মতো বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে দেখে পাগলা রাগ টা আবার ফিরে এলো। তরতরিয়ে বাড়ল রাগের মাত্রা। আযান বাঘ না ভাল্লুক! বেকুব টাকে খেয়ে ফেলবে সে? বেয়াক্কল মেয়ে একটা!
এদিকে নাজিয়ার অবস্থা তখন নাজেহাল। ভয়ংকর জোরালো শব্দে দ্রিমদ্রিম আওয়াজ হচ্ছে বুকের ভেতর৷ সে কি নিব্বি! এরকম ত ছোটবেলায় সিরিয়ালে দেখতো সে৷ নায়ক কাছে আসলে নায়িকার বুকে ধুকপুক ধুকপুক শব্দ হয়। সে এতদিন ভেবে আসত ওসব শুধু নাটক সিনেমা তে ই হয়। কিন্তু গতকাল রাতে যখন বদ টা চোখ রেখেছিল তার চোখে তখনও যে নাজিয়ার এমন মনে হচ্ছিল। দু জোড়া চোখের আবারো মিলন ঘটতেই নাজিয়া চটজলদি মুখ নামিয়ে নিলো। রাগ হলো তার। এমন সারাক্ষণ চোটপাট করা লোক এত সুন্দর দেখতে হবে কেনো! এত সুন্দর চোখের পাপড়ি ত মেয়ে হয়ে নাজিয়ার ও নেই!
নাজিয়া কি এক রাতের ব্যবধানে একদম ধরাশায়ী হয়ে গেলো বজ্জাত টা র প্রেমে ইশ! নাজিয়া কে বদ টা যখন হঠাৎ নাম ধরে ডাকে তখন নাজিয়ার কি যে ভালো লাগে! এই যে এখন হাত মুড়িয়ে এত কাছাকাছি আছে নাজিয়ার। চোখমুখ শক্ত করে দুনিয়ার রাগ নিয়ে দেখছে নাজিয়াকে। সেটাও ত নাজিয়ার ভালো লাগছে! হায় হায়! পরে কি বজ্জাত টার চোটপাট ও নাজিয়ার ভালো লাগবে! এই ভয়ংকর চিন্তা মাথায় আসতেই ভাবনার রেলগাড়ির লাগাম টেনে ধরলো সে৷ নাজিয়া কক্ষণো প্রেমে পড়বে না বদ টার! এর চেয়ে ভালো নাজিয়া ড্রেনে পড়ে ময়লা ঘাঁটাঘাঁটি করবে! বলে সে নিজেকে নিজেকে যেন কঠিন মোটিভেশন দিলো আযানের প্রেমে না পড়ার।
এদিকে আযান তখন থেকে একদৃষ্টে মেয়েটাকে দেখে চলছে। তার পিটপিট করে চোখ ঝাপটানো, কুঁচকে থাকা ভ্রু সব খেয়াল করলো। যদিও মেয়েটার মুখের কোথায় কি আছে সব মুখস্থ তার। পুরো রাত মেয়েটার চেহারা খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে শেষ রাতে ঘুমিয়েছে সে।
মেয়েটাকে ভাবনায় মগ্ন দেখে আযানের বড় বিরক্ত লাগল এবার। কই তাকে একটু ভয়টয় পাবে তা না এমন চিন্তায় ব্যস্ত হয়ে চোখ নামিয়ে থম মেরে আছে যেন কিছুক্ষণ পর লাখ টাকার বিজনেস ডিল সাইন করবে বেকুব টা। একটা পুরো কোম্পানির ভার তার হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। রাগ আর সামলাতে না পেরে আযান গর্জে উঠে মেয়েটাকে ডাকল৷ বের করে আনল তার লাখ টাকার ভাবনার জগত থেকে। ‘অ্যাই বেয়াদপ। গোসলে যাবার আগে এত তালবাহানা করেছ কেনো৷ রোজ রোজ এমন করবে তুমি?’
নাজিয়া সেকেন্ডের মধ্যে মাথা এপাশওপাশ নেড়ে বুঝিয়ে দিলো সে এমন করবে না৷ পাগলা ষাঁড় কে খ্যাপিয়ে গুঁতা খাওয়ার মতন বেকুব সে মোটেও নই! তার এমন ভালোমানুষি আযানের সন্দেহ লাগল। নাগিন টা যেকোন সময় রুপ বদলাবে। সেই ভাবনা থেকে মেয়েটাকে ভয় দেখাতে মোক্ষম অস্ত্র কাজে লাগাল সে।
মুড়িয়ে রাখা হাত দুটো আরেকটু চেপে ধরে মেয়েটাকে নিয়ে আসল তার বুকের একেবারে কাছাকাছি। এতটা কাছে আযানের গরম নিঃশ্বাস পড়ছে নাজিয়ার ঘাড়ে। পাঁচ ফুট তিনের মেয়েটার কানের নাগাল পেতে আযান খানিকটা উবু হয়ে ঝুঁকে তার মুখের সামনে এলো। একদম বরফ ঠান্ডা গলায় বলল, ‘যদি রোজ রোজ সকালে গোসল নিয়ে আজকের মত ড্রামা দেখি তাহলে রাতে এমন কাজ করে ফেলব সকালে গোসল ফরজ হবে তোমার উপর। চাও সেটা?’
কথাগুলো কানে আসতেই নাজিয়ার মাথা যেনো খালি হয়ে এলো। একে ত ছ ফুটের অ্যানাকন্ডা টা তার এত কাছে তার উপর কথাবার্তা ও বলছে কিরকম সব। সে চোখমুখ কুঁচকে মুহুর্তের মধ্যে বলে ফেলল, অ্যাই অ্যাই আপনি অ্যাডাল্ট কথাবার্তা কেনো বলছেন। ‘ছি! কি অসভ্য আপনি! দুদিনের পরিচিত একটা মেয়েকে এসব কথা কেউ বলে?’
আযানের মনে হলো তার রাগ হুট করে নেমে গেছে৷ বেকুব টা জোকারের চাইতে কম না। গতকাল থেকে আযান যেভাবে মেয়েটার একেকটা কথা শুনে হাসির দমকে পাগলপারা হয়ে আছে এত হাসি লাস্ট কবে হেসেছে বেখবর সে৷ তবুও মুখটা জোর করে গম্ভীর বানিয়ে মেয়েটার মুড়িয়ে রাখা হাত দুটো ছেড়ে দিয়ে কপালে একটা ছোটখাটো গাট্টা মেরে বলল, ‘দুদিনের পরিচিত মেয়েটা আমার বউ স্টুপিড! বউদের অ্যাডাল্ট কথাবার্তা বলা স্বামীদের জন্য ফরজ!’
অসভ্য টা টাওয়াল হাতে ওয়াশরুমে ঢুকতে ই নাজিয়া কপালে হাত ঘষতেঁ ঘষতেঁ চোখেমুখে বিরক্তি এনে খাটে গিয়ে বসল৷ সিদ্ধান্ত নিলো, না! বদ টার প্রেমে পড়বে না সে! অসভ্যটার অ্যাডাল্ট কথাবার্তা শুনে আজ কেমন গা শিরশির করছে নাজিয়ার। প্রেমে পড়লে দেখা যাবে নাজিয়া তার ওরকম কথাবার্তায় গাল লাল করে লজ্জা পাবে, দাঁত বের করে হাসবে।
ইশ! নিজের অত অধঃপতন নাজিয়া কিছুতে ই হতে দেবে না!
____________________
বেলা দশটা৷ ইশিতার মনে হচ্ছে এখন বিয়েটিয়ে করে বউ হয়ে যাওয়া ই তার মহা সমস্যার একমাত্র সমাধান ৷ ডিপার্টমেন্টের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে সেকেন্ড সেমিস্টারের রেজাল্টের পিডিএফ দেয়া হয়েছে।
পিডিএফ টা ওপেন করেই তার মুখ বিতৃষ্ণায় তেতো হয়ে এলো৷ দুটো কোর্সে ফেইল! তাও আবার স্ট্যাটিস্টিকস আর বায়োকেমিস্ট্রি র মতন হাড়বজ্জাত কোর্স দুটো। রিটেক দিয়ে পাশ করতে জান বের হয়ে যাবে তার। হতাশায় মাথা খালি হয়ে এলো যেন৷ শুধু ভাবলো বিয়ে করে নিলে এই পড়াশোনা থেকে রেহাই পাবে সে।
বিয়েশাদী করলে সংসারের চাপে পড়াশোনা করার সুযোগ হয় না অনেকের৷ এই মোক্ষম সুযোগ কাজে লাগাতে হবে তার। বিয়ে করে ভালো লক্ষী বউটি হয়ে সংসার করবে সে। পড়াশোনা গোল্লায় যাক! এখন পড়াশোনা এমনিও যেনো তার খুউউব হচ্ছে! সে চটজলদি কল দিলো একজনের নাম্বারে।
ওপাশের মানুষটাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ই একনাগাড়ে বলে যেতে লাগল। ‘হ্যালো! তুষার ভাই! রাখো তোমার সালাম। আগে কথা শুনো আমার। জরুরি কথা! খালামনি কে নিয়ে আজ বাড়ি আসবে তুমি। আমাদের বিয়ের কথা তুলবে আম্মুর কানে৷ দুটো কোর্সে ফেইল আসছে আমার। ছোটভাইয়া জানলে চড় মেরে মুখের নকশা পাল্টে ফেলবে! কিন্তু বিয়ে করে অন্যের বাড়ির বউ হয়ে গেলে অন্তত চড়টড় দেয়ার আগে দু বার ভাববে সে।’
‘দুটো কোর্সে ফেইল এ আর এমন কি! তুই যে লেভেলের গাধী জুনিয়রদের সাথে সব কোর্সে ফেইল মেরে পুরো সেমিস্টার যে কন্টিনিউ করতে হচ্ছে না সেটার শুকরিয়া কর। একশবার আযান ভাই কে বলেছিলাম তোকে সায়েন্স পড়তে না দিতে৷ আর্টস ঠিক হতো তোর জন্য। শুনল না কথা। তোরা ভাইবোন দুটোই ঘাড়ত্যাড়া !’
ফোনের ওপাশের মেয়েটার জবাব নাই দেখে তুষার আবারো বলতে লাগল, ‘আল্লাহ গুনাহ দিবে আমাকে। তোর মত জনমের গাধীকে বিয়ে করে আমার ফিউচার বাচ্চাকাচ্চাদের একটা ট্যালেন্টেড ব্রিলিয়ান্ট মা পাবার হক নষ্ট করছি। বলে না হাতি কাদায় পড়লে চামচিকাও লাথি মারে। আমার হয়েছে সে অবস্থা। ভালোবাসি দেখে ছোটবেলার মত স্কেল দিয়ে বাইরাতে পারি না৷ কতবার বলেছি ভার্সিটি তে উঠে ফেইল করলে মানসম্মান থাকে না। ভালো করে পড়! কথা তো শুনবি না একটাও।’
‘তোমার জ্ঞানগর্ভ আলাপ শুনতে কল দেইনি আমি। যা বলছি সেটা করবে। এটা বাদে আমি আর উপায় দেখছি না।’ ইশিতা বিরক্ত গলায় বলে উঠল। এত কথা ভালো লাগছে না তার।
‘হ্যা আমি মাথামোটা ত তোর মতন। বাড়ির অবস্থা দেখেছিস? তোর বাড়ির অবস্থা তোর জানা নেই? একে ত ইমান ভাইকে খালু বাড়ি আসতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সে নিয়ে খালামনির মাথা খারাপ। আবার আযান ভাই ভাবির সাথে ই সংসার করবে সাফ সাফ জানিয়েছে এটা নিয়েও খালামনি রেগে আছে। এই অবস্থায় আমি নাচতে নাচতে তাদের যেয়ে বলি তাদের মেয়েকে আমার হাতে তুলে দিতে! মানে একদম উৎকৃষ্ট মানের গোবর ঠাসা না তোর মাথায়! এর চেয়ে বলছি জানপ্রাণ লাগিয়ে পড় যাতে কোনোভাবে পাশ……’
ইশিতা খট করে কলটা কেটে ফোন সুইচড অফ করে রাখল। এমন জটিল মুহুর্তে এত জ্ঞানের কথা শুনার মনমানসিকতা নেই তার। এখন যে এত জ্ঞানের কথা বলা হচ্ছে প্রেম করার সময় এসব মনে ছিল না ভন্ড টার! প্রেম করে দিনরাত চব্বিশ ঘন্টা ভন্ড টার চিন্তায় মশগুল হয়ে না থাকলে ঠিক পাশ এসে যেত তার। এত গাধা স্টুডেন্ট সে নিশ্চয় নয়।
[ অ্যারেঞ্জ ম্যারেজে দুদিনে ভালোবাসা হয় না। যত্ন ভালোলাগা বোঝাপড়া এগুলো তৈরি হতেও সময় লাগে। তাই যারা বলছেন এত ঝগড়া এদের প্রেম কেনো নেই ইত্যাদি তাদের বলব গল্প শুরুর আগে আমি যে প্লটে গল্প টা সেট করেছি আমাকে সেটা অনুযায়ী আগাতে দিন। আশা করি পাঠকেরা আমাকে নিজের মনমতন লেখার পুর্ণ স্বাধীনতা দিবেন৷ পাশাপাশি শুধু নেক্সট, বড় পর্ব চাই এসব বাদেও আরো গঠনমুলক কমেন্ট করা যায়৷ সেটা এক লাইনের হলেও আমার ভালো লাগবে ]

