মেঘের মুলুকে চল’ আয়রা তাবাস্সুম পর্ব০৭

0
2

‘মেঘের মুলুকে চল’
আয়রা তাবাস্সুম
পর্ব০৭

[ বিভিন্ন পেইজে গল্পটা কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। গল্পের প্লট থিম যেকোনো সংলাপ কপি করা নিষিদ্ধ ]

‘ভাবি আসব? ব্যস্ত তুমি?’ ননদের গলার আওয়াজ কানে আসতেই নাজিয়া বেশ খুশি হলো। ব্রেকফাস্টের পর থেকে একা একা বিরক্ত লাগছিল তার। নাশতার টেবিলে সে ভেবেছিল টিভি সিরিয়ালের মতন টানটান উত্তেজনাপুর্ণ জমজমাট কোনো কাহিনি হবে৷ তেমন কিছু অবশ্য হয়নি সম্ভবত এজন্য যে তার বদরাগী বর টাও তার সাথে বসে নাশতা সেরেছে৷ বদ টা কে খুউউব ভয় পায় বোধহয় তার বাড়ির লোকজন।

তবু সে খেয়াল করেছে কিছু না বললেও তার শাশুড়ী রিনা খান মার্কা লুক দিয়ে চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তাকে দেখছিল একনাগাড়ে৷ নাজিয়া অবশ্য বিচলিত হয়নি তাতে। শাশুড়ী রিনা খানের মতন কুটনি হলে সে ও শাবনুরের মতন ন্যাকা নয়। উনিশ বিশ করলে নাজিয়াও একেবারে দেখে নিবে মহিলাকে।

পাশে আরেকটা কুচুটেঁ মহিলা ও নাজিয়া দেখেছে যে নাজিয়াকে আগাগোড়া পরখ করে কিছুক্ষণ পরপর তার শাশুড়ীর কানে ফিসফিস করে কথা বলেছে৷ নাজিয়া চেহারা দেখেই বুঝেছে এই মহিলাও সুবিধের নয়। তার স্পষ্ট মনে আছে বিয়ের দিন বদ টাকে গোঁয়ার অমুকতমুক বলে এই মহিলা ই লোকজনের কানে বিষ ঢালছিল।

‘ভাবি তোমায় বিরক্ত করতে আসলাম৷ আসলে আমার মন ভালো নেই বুঝলে। দেখি তোমার সাথে কথাটথা বলে মন ভালো করতে পারি কিনা।’ নাজিয়ার তার ননদকে বেশ মনে ধরেছে। কি মিশুক মেয়েটা। যেচে এসে কথা বলে নাহলে বদ টা কাজে বেরুলে নাজিয়ার পুরো একা লাগে এই বাড়িতে৷ সে চটজলদি ইশিতার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল, ‘একটুও বিরক্ত হচ্ছি না৷ তোমার মন ভালো নেই কেনো এটা বল দেখি৷’

ইশিতা এবার বড়সড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। দুঃখে কাতর হয়ে দুটো কথা বলবে সেটারও জো নেই৷ একটা ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া মেয়ে দুটো কোর্সে ফেইল মেরেছে এটা খুব সম্মানের কথা না৷ তাই সে কথা লুকিয়ে বরং বলল ‘ওই অ্যাকাডেমিক নিয়ে স্ট্রেসে আছি এই আরকি।’ পরক্ষণেই কিছু একটা মনে পড়তেই চটজলদি জানতে চাইল, ‘আচ্ছা ভাবি কাল রাতে ভাইয়া কি তোমায় বকাটকা দিয়েছে? বকা দিলে আমাকে জানাও। আব্বু আমাকে তোমার কাছ থেকে জানতে বলেছে। এরকম হলে আব্বু ভাইয়াকে ওয়ার্ন করবে। ভাইয়া আবার আব্বুর কথা মান্য করে খুব৷’

বকা মানে! বেকুব বেয়াক্কল বেয়াদপ বাঁদর কোনোটা কি ডাকতে বাদ রেখেছে বজ্জাত টা নাজিয়াকে! মনে মনে এসব ভাবলেও মুখে মিথ্যে বলল, ‘না এমন কিছু হয়নি। খুব ক্লান্ত ছিলাম ত দুজনেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।’ বদ টা যে তার উপর মনের সুখে খুউউব চোটপাট দেখায় এ কথা ননদকে জানালে নিজের মানসম্মান ই তার থাকবে না। তাই কথাগুলো চেপে গেলো।

‘যাক বাবা৷ তাহলে ঠিকাছে। আমিও চিন্তায় ছিলাম মাঝরাতে ভাইয়া আবার কোনো সিন ক্রিয়েট করবে কিনা। সারাদিন যেভাবে ফুঁসছিল ও।’ ইশিতা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলে। নাজিয়ার এবার মনে পড়ল বজ্জাত টার প্রফেশনের ব্যাপারে জানতে চাওয়ার বিষয়টা। সে কন্ঠে রাজ্যের কৌতুহল নিয়ে বলল, তোমার ছোটভাইয়া সিআইডি!

ইশিতা তার কথার টোন ধরতে পারল না। বুঝল না নাজিয়া তাকে প্রশ্ন করছে নাকি জানাচ্ছে কিছু। সে কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে একনাগাড়ে বলে চলল, ‘কি বলছ ভাবি! ভাইয়া সিআইডি? আমার এজন্যই সন্দেহ হতো বুঝলে। নাহলে ভাইয়া এমন চালাকচতুর কিভাবে! মুখ দেখেই চট করে মানুষের মন পড়ে ফেলতে পারে৷ তার মানে এটা দাঁড়ায় ভাইয়া যে আর্কিটেক্ট ও এটা শুধু নিজের আসল প্রফেশনকে গুপ্ত রাখতে চালিয়ে যাচ্ছে। আমার ত এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না তবে যেরকম চড়টড় দেয়।ওরকম লোহার মতন হাত। আসলেই হয়তো ক্রিমিনাল দের পিটায় এজন্য৷ বাই দ্যা ওয়ে তুমি কিভাবে এটা জানলে ভাবি, ও তোমায় বলেছে?’

নাজিয়া হতভম্ব হবার শক্তিও হারিয়ে ফেলল। এই মেয়েকে সে প্রশ্ন করেছে অথচ এই মেয়ে প্রশ্ন টাকেই উত্তর বানিয়ে নিজের মতো কথা বলেই যাচ্ছে। বজ্জাত টা তাকে বেকুব ডাকে অথচ তার বোন ত মহা বেকুব! এবার নাজিয়া কিছুটা ক্লান্ত হয়ে বলল, ‘আমি তোমার কাছ থেকে জানতে চাচ্ছিলাম উনি সিআইডি কিনা৷ সবসময় এমন সিরিয়াস ভাব নিয়ে থাকে ত তাই। ওনি যে সিআইডি এমন কিছু আমার জানা নেই৷ উনি তাহলে আর্কিটেক্ট?’

ইশিতা এবার কিছুটা লজ্জা পেলো যেনো৷ ভাবি ও হয়তো তুষার ভন্ড টার মতন তাকে মাথামোটা ভাববে। তাই তাড়াতাড়ি প্রসংগ পাল্টাতে বলল, ‘হ্যা। বুয়েট থেকে পাশ করেছে ও৷ এক বছর হলো একটা আর্কিটেকচারাল ফার্মে জয়েন করেছে৷ জানো ভাবি বুয়েটে ভাইয়ার কত অনুরাগী ছিলো। মেয়েরা মরত ওর উপর।’

নাজিয়ার ব্রহ্মতালু অব্দি জ্বলে উঠল যেনো৷ চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, ‘সেসব আবার তোমার ভাইয়া খুব গর্ব করে বলেছে তোমাদের? মেয়েরা হেদিয়েঁ মরেছে তার উপর সেটা নিয়ে সে এত খুশি?’

‘তোমার মাথা পাগল ভাবি? জীবনে বলবে ও এসব কথা! আমি শুনেছি একটা ঘটনার জোরে৷ ভাইয়া তখন বুয়েটে ই পড়ে। ডিবেটিং নাকি সায়েন্টিফিক সোসাইটি এরকম কোনো একটা অর্গানাইজেশনের জিএস ছিল ও৷ সেটা সোশ্যাল সাইটে পোস্ট করায় আমি ট্রিট খুঁজে কমেন্ট করেছিলাম।’

‘ওমাহ পরে দেখি আমার ইনবক্সে দুজন আপু নক দিলো। ইনিয়েবিনিয়ে যেটা বলল সেটার অর্থ দাঁড়ায় ভাইয়া কারো সাথে কমিটেড নাকি লং টার্ম কোনো রিলেশনশিপে আছে যে ক্যাম্পাসে এভাবে কাউকে পাত্তা দেয় না ও৷ ভাইয়ার জুনিয়র ব্যাচের ও অনেক মেয়ে নাকি ভাইয়াকে আকারে ইঙ্গিতে পছন্দের ব্যাপারটা জানাতো। অ্যাপ্রোচ করতে যদিও সাহস পেতো না ভাইয়ার গম্ভীর ভাববেশের জন্য।’

‘এত পছন্দ করার কি আছে তোমার ভাইয়াকে৷ কোথাকার সুপারস্টার সে!’ রাগে বিরক্তিতে নাজিয়ার গা জ্বলে যাচ্ছে যেন। বদ টা নাহয় দেখতে হ্যান্ডসাম আছে কিন্তু দিনশেষে সে তো নাজিয়ার বর। আগে হোক পরে হোক মেয়েরা তার উপর নজর দেবে কেনো!

‘আহা ভাবি বুঝোনি তুমি! মেয়েদের একটা টাইপ আছে না৷ ননচ্যালান্ট কম কথাবার্তা বলে। গম্ভীর থাকে। মেয়েদের পাত্তা দেয় না। আনবদার্ড। এমন ছেলে পছন্দ আরকি৷’

‘আমার ত মনে হচ্ছে রুচিতে সমস্যা ছিল ওদের নাহয় তোমার ভাইয়ের মত লোকের প্রেমে পড়ে ! নিব্বি হবে আরকি ওরা একেকটা!’ নাজিয়া চোখমুখ কুঁচকে বলল। এসব কথা শুনতে একটুও ভালো লাগছে না তার।

‘তাহলে ভাইয়ার প্রেমে পড়লে তোমাকেও আমি নিব্বি ডাকবো এটা মনে রেখো।’ ইশিতা হাসতে হাসতে বলে ফেলল। ‘এরকম যেদিন হবে সেদিন আমার চারটে হাত চারটে পা গজাবে। যতসব ফাও কথা। নেহাৎ বিয়ে হয়েছে তাই। নাহলে তোমার ওই বজ্জাত ভাই কে কবে ঠ্যাং দেখিয়ে এই বাড়ি ছাড়তাম আমি। তাকে তার অকাদ দেখাতাম!’ নাজিয়া খুউউব ভাব নিয়ে বলল কথাগুলো ননদকে যেনো আজ সকালে বদ টার ভয়ে সে একছুটে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে চায়নি।

‘তাই নাকি? আমিও আমার অকাদ দেখতে চাচ্ছি৷ কিভাবে দেখাবে?’ পেট ফেটে হাসি আসলেও মুখটা খুব সিরিয়াস রেখে কন্ঠ একদম খাদে নামিয়ে কথাগুলো বলল আযান। নর্মালি তার ওয়ার্কিং আওয়ার বিকেল চারটে পর্যন্ত। জরুরি একটা ডকুমেন্ট ফেলে যাওয়ায় অফিস আওয়ারের মাঝেই এসেছিল সেটা নিতে৷ রুমে ঢু্কবে এমন সময়ই কানে আসে বেকুব টার শেষের কথাবার্তা গুলো। দরজার দিকে পিঠ করে বসায় মেয়েটা দেখতে পায়নি তাকে। আযান বাইরে দাঁড়িয়েই মিটমিট করে হাসল দু মিনিট। বেকুব টা তাকে যমের মত ভয় পায় অথচ ননদের সামনে বিরাট বড় হিরো সাজা হচ্ছে। বের করবে আযান তার হিরোগিরি!

গম্ভীর গলার আওয়াজ টা কানে আসতেই নাজিয়ার মনে হলো সে ঘুমের ঘোরে কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছে৷ বাস্তব নিশ্চয়ই এত ভয়ংকর হবে না! সে দুদিনে যেটুকু বুঝেছে বজ্জাত টা বেয়াদবি নিতে পারে না৷ অথচ আজ সে মহা বেয়াদবি করে ফেলেছে। শুধু কি তাই! বজ্জাত টা কে ঠ্যাং দেখাবে বলেছে৷ যদি বদ টা রেগে গিয়ে চড়টড় মেরে দেয় তাকে! ননদের সামনে এই মুখ নাজিয়া আর দেখাতে পারবে না৷ আফসোস রাগ দুটোই হলো। রাগ টা হল নিজের উপর৷ এই মুখ একাই নাজিয়াকে বিপদে ফেলতে যথেষ্ট। ব্রেইন খাটিয়ে কোনো আকাম করা লাগে না তার বিপদে পড়তে৷ নাজিয়ার মনে হলো প্রাণ টা গলায় আটকে বসে আছে৷ নিশ্বাস নিলেই পেছন থেকে গুলি ছুটে আসবে!

ইশিতার চোখমুখ ও তখন দেখার মতন। কথায় এমন মশগুল ছিল সে ভাইয়াকে দরজার সামনে খেয়ালই করেনি । ভাবির জন্য বড় মায়া লাগল তার। হিসেবে গড়মিল ও হলো যেন৷ ফুপিদের মুখে সে বহুবার শুনেছে তাদের দাদাজান নাকি ভীষণ ভালোবাসত দাদিকে। রীতিমতন মাথায় তুলে রাখত৷ সে হিসেবে ছোটভাইয়ার ও বউয়ের প্রতি নরম হবার কথা অথচ যা দেখছে তাতে এমন কিছু মোটেও মনে হচ্ছে না তার। তুষার ভন্ড টা আরো বলেছিল ‘ভাবির আসায় আযান ভাইয়া এবার বাঘ থেকে বিড়াল হবে দেখিস।’ সে ত এখন দেখছে ভাবি ই ভাইয়ার সামনে একেবারে ভিজে বেড়াল৷ ভাইয়ার গলা কানে আসতেই মুখে রা নেই তার।

‘ইশি বের হ। তোর ভাবি আমাকে এখন আমার অকাদ দেখাবে৷’ খুব সরল গলায় কথাগুলো বলতে বলতে আযান রুমে ঢুকে একনজর বেকুব টাকে দেখল। এখনো পিঠ ফিরে বসে আছে৷ মুখ ফিরিয়ে আযান কে দেখার সাহস অব্দি নেই তার অথচ খুব বড় গলায় বলেছে আযান কে নিজের অকাদ দেখাবে।

ইশিতার মাথায় চট করে কোনো বুদ্ধি এলো না পরিস্থিতি সামাল দেয়ার। ভাবির হয়ে যে দুটো কথা বলবে সেই সাহস ও হলো না৷ ভাইয়ার রাগ নিয়ে ভালো ই আইডিয়া আছে তার। বউকে ছাড় দিলেও দিতে পারে কিন্তু কথার অমান্য করলে তাকে ছাড় দেবে না এটা সে জানে। তাই বিনাবাক্য ব্যয়ে সে গুটিগুটি পায়ে দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলো। যাওয়ার আগে একবার অবশ্য ভাবির মুখটা দেখেছিল সে৷ ভয়ে এইটুকু হয়ে ছিল। যেতে যেতে ই ভাবল ভাবি ঠিক ই বলেছিল। আর যা ই হোক এমন চোটপাট করা লোকের প্রেমে ত পড়া ই যায় না। পড়া উচিত ও না!

[ পেইজে রিচ নাই৷ গল্পটা পড়লে রিয়েক্ট কমেন্ট করার অনুরোধ রইল। গল্প ভালো লাগলে পেইজের রিভিউ অপশনে গিয়ে দু লাইন কিছু লিখবেন ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here