মেঘের মুলুকে চল’ আয়রা তাবাস্সুম পর্ব০৮

0
1

‘মেঘের মুলুকে চল’
আয়রা তাবাস্সুম
পর্ব০৮

[ কপি নিষিদ্ধ বলার পরও দেদারসে গল্প টা কপি করা হচ্ছে। আবার সেগুলোর লিংক বানিয়ে বিভিন্ন গ্রুপে শেয়ার ও করছে অথচ রাইটারের অরিজিনাল পেইজ থেকেই পর্বের লিংক শেয়ার করতে কি সমস্যা এদের আমি বুঝি না। চোর কপিবাজ একেকটা ]

নাজিয়ার মনে হচ্ছে ফিল্মের নায়িকাদের মতন যদি তারও ঠুসঠাস বেহুশ হয়ে যাবার ট্যালেন্ট থাকত তাহলে কত ফাঁড়া তার এমনিই কাটত। স্কুলে থাকতে কত দেখেছে সকালে এসেম্বলিতে দাড়ালেইঁ কয়েকজন ধুমধাম বেহুশ হয়ে পড়ে হুলস্থুল কান্ড বাধিয়েঁ ফেলত৷ চেয়েও এই টেকনিক রপ্ত করতে পারেনি সে। মিথ্যেমিথ্যে আজ ভান করে বেহুঁশ হলে দেখবে ঠিকই চোখের পাতা পিটপিট করছে তার। বদ টা এক লহমায় ধরে ফেলবে ব্যাপারটা। তখন কেলেংকারী আরো বড়সড় হবে৷ তাই সেই প্ল্যান বাদ দিলো সে৷

আযানের ঠান্ডা গলায় বলা কথাগুলো শুনে তার এতই ভয় লেগেছে মাথায় তালগোল পাকিয়ে গেলো সব৷ দোয়া ইউনুস পড়তে গিয়ে পড়ে ফেলেছে বাপ মায়ের জন্য মোনাজাতে পড়া দোয়া। ইতিউতি করে মুখ ফিরাতে ই দেখল বদ টা ডোর লক করে ড্রেসিং টেবিলের পাশে হেলান দিয়ে দাড়িয়েঁ আছে। নাজিয়াকে দুনিয়ার রাগ নিয়ে দেখছে। এত সুন্দর চোখের কি বিশ্রী অপব্যবহার! খালি চোখ রাঙায়! এমন বিপদের মুহুর্তে নাজিয়ার মাথায় এই খেয়াল এলো৷

‘অ্যাই বাদরঁ! অকাদ দেখাবে না আমার?’ আযান এবার খুব রাগ দেখিয়ে কথাগুলো বলল যদিও ভিতরে ভিতরে মেয়েটার চোখমুখের অবস্থা দেখে হাসিতে ফেটে পড়ছে সে। বেকুবটাকে একটু চোটপাট না করলে যেন পেটের ভাত হজম হয় না তার।

‘মজা করছিলাম। মজা বুঝেন না? অটিস্টিক আপনি?’
কি বলতে কি বলল নাজিয়া নিজেও জানেনা। নিজের বলা কথাগুলো কর্ণকুহরে প্রবেশ করতেই সে নিজে হতবাক! বিস্ফোরিত নজরে দেখল সামনের আযরাইল টা ভ্রু দুটো তুলে কনুই ভাজঁ করে চোখ পাকিয়ে তাকে দেখছে। ভয়ডরের মধ্যেই নাজিয়ার মাথায় অন্য খেয়াল আসল। নাজিয়া বোবা হলে বেশ হতো! মুখ খুললেই সকাল থেকে খালি নিজের বিপদ বাড়াচ্ছে সে! ন্যাড়া বেলতলায় একবার গিয়ে আর যায় না এদিকে নাজিয়া যেন চুল গজাতেই মাথা ন্যাড়া করে ফেলে আবার সেখানে যেয়ে মাথায় বেলের বারি খাওয়ার জন্য!

‘অটিস্টিক যে ডেকেছ এটা ও কি মজা করেছ? প্রতিবন্ধী ত আমার তোমাকে মনে হয়। বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী!’
আবার থেমে থেমে আযান যোগ করলো কথা, ‘সকাল থেকে দেখছি বাঁদরামি শুরু হয়েছে তোমার। কাল রাতে মুখ ত এমন বানিয়ে রেখেছিলে যেনো বাড়া ভাতও গিলতে জানো না। আজ এমন ভোল পাল্টানোর মানে কি হ্যা?’

নাজিয়া মুখ নামিয়ে রইল। বজ্জাত টাকে উচিত জবাব দেয়ার মতন একশটা কথা পেটে কিলবিল করলেও টু শব্দ টি করল না। দু বার মুখ খুলে যা অনর্থ ঘটার ঘটেছে। আজকের জন্য যথেষ্ট সেটা!

‘অ্যাই বাদরঁ! এই বাঁদরামি র জন্য কি শাস্তি দেয়া যায় তোমায় বলো।’ আযান মেয়েটাকে আরেকটু ভয় দেখিয়ে মজা নেবার লোভ সামলাতে পারল না।

কথাটা কানে আসতেই নাজিয়া চটজলদি দুহাতে কানের পাশ সহ দুগাল ঢেকে ফেলল৷ চড়টড় খেলে পাপার কাছে বিচার দেবে সে পরে৷ নিজের গাল বাঁচাতে হবে আগে। প্রটেকশন ফার্স্ট! যেরকম দানবের মতন বিশাল হাত দুটো বজ্জাত টার! চড় খেলে মাড়ির দাঁত সহ নড়বে এটা শিওর!

‘কান ধরে ওঠবস করবে নাকি কানে হাত দিলে যে।’
কৃত্রিম হামি তুলে আযান ঠোটঁ চেপে হেসে বলে। পুরো ব্যাপারটা তার কাছে কোনো কমেডি নাটকের চেয়ে কম লাগছে না। ভীষণ মজা পাচ্ছে সে।

কিন্তু এরকম নিম্নমানের রসিকতায় নাজিয়া রেগে গেলো। কথাটা খুব মানসম্মানে লেগেছে তার। মুহুর্তের মধ্যে ভয়ডর ভুলে মুখ খুলল সে। ‘কানধরে উঠবস আমি ল্যাদাকালে ও করিনি যে এখন করবো! আপনার স্বপ্নে ও সেটা হবে না! চড়টড় দিবেন এজন্য সেইফটি হিসেবে গালে হাত দিয়ে আছি।’
শেষের কথাটা খুব কাঁচুমাচু হয়ে বলল মেয়েটা যেন আযানকে বুঝতে দিতে নারাজ তার চড় সে ভয় পায়।

‘বউ কে আমি চড় মারব কেনো?’
ভুতের মুখে রামনাম এই প্রবাদ বাক্য নাজিয়া জীবনে বহুবার শুনেছে। আজ যেন নিজের চোখে দেখল৷ কাল থেকে বজ্জাত টার কত মৌখিক চড় খেয়েছে সে! আজ কেমন নাগরাজের মত রুপ পাল্টে একেবারে ভালোমানুষের মতন জানতে চাচ্ছে বউ কে চড় মারবে কেনো। ন্যাকার ঘরের ন্যাকা! ভেংচি ও কাটল একদম সামনাসামনি।

আযান দেখল সেটা৷
‘আর বউ চড় খাওয়ার মত কাজ করবে ই বা কেনো।’
এবার আরো ঠান্ডা গলায় বলল সে।

নাজিয়ার বড় রাগ লাগল এবার। নাজিয়া ভয় পায় দেখেই ত বদ টা তাকে এমন ভয় দেখায় সর্বক্ষণ৷ মনে মনে ভেবে ফেলল এখুনি খোলাখুলি সবটা বলবে সে। বদ বজ্জাত বর্বর বদমায়েশ যেটাই হোক দিনশেষে নাজিয়ার বর ই ত৷ নিশ্চয় নাজিয়ার কথা বুঝবে৷ অন্তত একটা চেষ্টা ত নাজিয়া করতেই পারে!

মুখ তুলে দেখল বজ্জাত টা এবার তার সামনে এসে বসেছে৷ এতক্ষণ দেখছিল বোধহয় তার ধ্যানমগ্ন চেহারাটাকে। বজ্জাত টা এভাবে নাজিয়াকে দেখলে নাজিয়ার মার্কামারা চালু জবানও অটোমেটিক বন্ধ হয়ে যায়। তবুও ঢোক গিলে গলা ভিজিয়ে বলল, ‘বউ চড় খাওয়ার মত কাজ করলে ও তাকে চড় মারা যাবে না। বউ কে রাখতে হবে আদর যত্নে ভালবাসায়।’
দুনিয়ার অস্বস্তি জড়তা নিয়ে নিভুনিভু স্বরে শেষের কথাটা বলল সে।

‘মনে ত হচ্ছে আমি তোমার বউ। আর তুমি আমার জামাই। যেভাবে বলছ বর দের এটাওটা করতে হয়। আমার চাইতে ত বেশি তুমি জানো!’
মাথাটা বালিশে এলিয়ে দিতে দিতে আযান বড্ড তাচ্ছিল্য করে বলল কথাগুলো। সকাল থেকে ভীষণ আলসেমি লাগছে তার৷ কাল রাতে বেকুবটাকে আরাম করে ঘুমোনোর সুযোগ দিতে গিয়ে ভালো ঘুম হয়নি তার নিজের! অথচ বেকুব এখন তাকে শেখাচ্ছে বউ কে আদর যত্নে রাখতে হবে। কাল রাতে কি আযান কম যত্ন করেছে বউয়ের! অকৃতজ্ঞ মেয়েমানুষ একটা! আজ সে এতকিছুর ধার ধরবে না। একদম হাতপা ছড়িয়ে ঘুমোবে নিজের বিছানায়। বেকুবের ঘুম হলে হবে না হলে নাই৷

নাজিয়ার গা জ্বলে উঠল এবার। সে কত সিরিয়াস কথা বলেছে অথচ বজ্জাতটার ভাবভঙ্গি দেখো। আবারও আরেকটা নিম্নমানের রসিকতা করে আয়েশি ভঙ্গিতে শরীরটা বিছানায় এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজে শুয়ে আছে৷ বিন্দুমাত্র গুরুত্ব দেয়নি তার কথাবার্তা কে৷ এমন লোকের সাথে নাজিয়া সারাজীবন কিভাবে কাটাবে! বড় অভিমান হলো তার।

পাঁচ দশ মিনিট এভাবে নীরবতায় কাটার পর আযান হুড়মুড়িয়ে উঠে পড়ল৷ অফিসে যথেষ্ট কাজ পড়ে আছে৷ ঘুম পেলেও যেতে হবে তার। যাবার আগে মনস্থির করল বাঁদর টাকে আরেক ডোজ দিয়ে যাবে। যেই ভাবনা সেই কাজ৷ ডকুমেন্ট টা প্যান্টের পকেটে পুরে মুখ ফুলিয়ে খাটে বসে থাকা মেয়েটাকে আরেকবার দেখল।
খুব সহজ গলায় বলল, ‘মানলাম বউ কে আদর যত্ন ভালোবাসায় রাখতে হয়। কিন্তু আদর করতে গেলে বউ যদি বলে প্লিজ এখন না আমার সময় লাগবে তখন কি করা উচিত?’

কোনো জবাব এলো না৷ শুধু দেখল মেয়েটার কানের লতি খানিকটা লাল হয়ে আছে। আযানের বড় হাসি পেলো। বেকুবটা তাহলে লজ্জা ও পায়৷
আবারও বলল, ‘অ্যাই বাঁদর! কিছু জানতে চাইলাম আমি৷ তখন কি করবো বলো!’

‘আমি আদর বলতে নরমসরম আদরের কথা বলেছি৷ আপনার মতো অ্যাডাল্ট কিছু মিন করি নি৷’
মেয়েটা মুখ ফুলিয়ে বলল এবার।

‘নরমসরম আদর কিরকম সেটাও বলে দাও তাহলে! আমিও একটু শুনি সেটা কিরকম৷’
আযান মেয়েটাকে বিরক্ত করতে কোনো চেষ্টা বাকি রাখল না।

নাজিয়ার এবার এত রাগ লাগল৷ বজ্জাত টা ইচ্ছে করেই যে তাকে অস্বস্তিতে ফেলছে সেটা ভালো করেই বুঝল৷ মনস্থির করল একটুও লজ্জা পাবে না সে৷ নাজিয়াকে অস্বস্তিতে ফেলতেই বজ্জাত টা এত কাহিনি করছে ত। ঠিকাছে তবে নাজিয়া কোনো রাখঢাক ছাড়াই কথাগুলো বলে ফেলবে।

সে কাটকাট গলায় জবাব দিল, ‘এই যেমন বউ কে অহেতুক চোটপাট না দেখানো, বউ য়ের সাথে নরম গলায় কথা বলা, কাজে যাওয়ার সময় বউয়ের কপালে আদর করা এসব আর কি। নরম আদর বলতে আমি এসব মিন করেছি। আপনার মতন ডার্টি মাইন্ড না আমার!’

কথাগুলো বলার সময় আযান একদৃষ্টে দেখেছে মেয়েটাকে৷ কেমন জোর করে মুখে রাগ এনে কথা শুনাচ্ছে আযান কে। বেকুব টা কি জানে আযান মুখ দেখেই তার মনের খবর পড়ে ফেলতে পারে! আযানের বড় হাসি পেলো এমন মিছিমিছি রাগ দেখে। সে রুম থেকে বেরুতে গিয়েও কি একটা ভেবে থেমে গেলো।

বড় বড় পা ফেলে আবার ফিরে এসে মেয়েটাকে সরে পড়ার ফুরসত না দিয়েই আলতো হাতে তার নামিয়ে রাখা মুখটা তুলে ধরল। নরম একটা চুমো দিলো তার কপালে, পরপর ঠোঁট ছোঁয়ালো বুজে রাখা দু চোখের পাতায়। মেয়েটার শরীর যে কাপছেঁ সেটাও টের পেলো৷ তারপর একনজর মেয়েটার আগাগোড়া লাল হয়ে থাকা চেহারাটা দেখে সরে এলো তার কাছ থেকে।

আযান মেয়েটাকে প্রতিউত্তরে কিছু বলার অবসর না দিয়েই রুম থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে তরল গলায় বলল, ‘বউ কে আদরে রাখতে গিয়ে প্রথম দুটো কথা শুনলে তোমার মত বাঁদরের বাঁদরামি দিনদিন বাড়বে। বিরক্ত করবে আমাকে। ওতে আমার ক্ষতি! তবে শেষের টায় আমার লাভ। ওটা তে সমস্যা নেই!’

দরজার বাইরে আযানের পায়ের শব্দ মিলিয়ে যেতেই নাজিয়া গলায় আটকে রাখা শ্বাসটা ছাড়ে। বজ্জাত টা আর কিছুক্ষণ রুমে থাকলে সে নিশ্চয় দমবন্ধ হয়ে মরে পড়ে থাকত! হাত বাড়িয়ে কপালে ছুঁতে ই মেয়েটার পুরো শরীর শিরশির করে উঠল। ‘বজ্জাত টা শুধু বর্বর বদরাগী বদমাশ নয় বেহায়া বেলাজ বেশরম ও৷’ মেয়েটা চোখ বুজে বিড়বিড় করল।

_____________________

রাদ তার সামনে হাসিহাসি মুখ করে বসে থাকা মেয়েটাকে আরেকবার দেখল৷ কিছু শক্ত কথা বলা দরকার মেয়েটাকে৷ কিন্তু সে এনার্জি তার নেই আজ। মিটিংয়ের পর মিটিং অ্যাটেন্ড করতে হয়েছে। তার উপর রোজ রোজ একই কেচ্ছাকাহিনি এই মেয়ের৷ এতদিনে মেয়েটার ও মুখস্থ হয়ে যাবার কথা রাদ তাকে কি কি বলতে পারে।

সে এবার বড়সড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘মিস ওয়াজিফা মেহনাজ অথৈ! একটা এক পেইজের স্প্রেডশিট রেডি করে সেটায় দশটা ভুল করা টা কি আপনার হিডেন ট্যালেন্ট? সিভি তে মেনশন করেননি কেনো এটা? তাহলে আমরা আপনাকে আরো হাইয়ার পোস্টে নিয়োগ দিতে পারতাম। এখন যে পোস্টে আছেন সেটা আপনার এই ট্যালেন্টের তুলনায় খুবই নগন্য!’

সামনের হাসিহাসি মুখের মেয়েটা এবার গালের হাসি আরো বড়সড় করল যেন পুরো ব্যাপারটায় সে খুব একটা বদার্ড না। নিজস্ব একটা থিওরি আছে তার। কর্পোরেট অফিসে টিকে থাকতে হলে হাসিমুখে সব সয়ে যেতে হবে৷ অত মান অপমান বোধ থাকলে হবে না। আর তার মতন কাজকর্মে আনাড়ি হলে ত মানঅপমান বোধ থাকার প্রশ্ন ই উঠে না!

আর এমনিও এত আরাম আরাম অপমান সে গায়ে মাখে না৷ অফিসের বাকিরা ঠিক ই বলে রাদ তেহযীব চৌধুরী নিখাদ জেন্টলম্যান। লোকটার সহ্যক্ষমতা দারুণ! অন্য কেউ হলে রোজকার তার এসব ভুলচুকে অতিষ্ঠ হয়ে কবেই তার চাকরি নট করত। তবুও ভালো এই লোক কেবল হালকাপাতলা অপমান করে ক্ষান্ত হয়। ব্যাপারটাকে বাড়াবাড়ির পর্যায়ে নিয়ে যায় না।

[ লাস্টের দিকের রোজা গুলোয় যে কতটা টায়ার্ড লাগে সবাই নিশ্চয় জানেন৷ তবুও শরীরের সবটুকু এনার্জি দিয়ে ভেবেচিন্তে গল্প টা লিখি৷ কিন্তু আজ থেকে মনস্থির করলাম গল্প টা নিয়ে এত প্রেশার আমি নিব না। যেরকমটা আপনারা অনেকেই সামান্য রেসপন্স করার, পেইজ ফলো দেয়ার এবং পেইজের রিভিউ অপশনে গিয়ে দু লাইন রিভিউ লেখার প্রেশার নেন না। ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here