মেঘের মুলুকে চল’ আয়রা তাবাস্সুম পর্ব০৯

0
1

‘মেঘের মুলুকে চল’
আয়রা তাবাস্সুম
পর্ব০৯

সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে আযান দেখল বেকুব টা রুমে নেই। সে গা করল না তেমন৷ যেনো জানত এমন কিছু একটাই হবে৷ এমনে খুব মুখ চালালেও সকালের ঘটনায় মেয়েটা যে লজ্জা পেয়েছে সেটা সে জানে৷
কানের লতি মুখের একপাশ সব কেমন লাল হয়ে ছিল মেয়েটার৷ আযান একপেশে হেসে বিড়বিড় করল ‘বেকুব মেয়ে একটা! নিজে আদর চাবে আবার আদর করলে মুখ ঢাকবে।’
সে আর মাথা ঘামাল না৷ বাঁদর টার নতুন কোনো বাঁদরামি করার খেয়াল আসলে এমনিই চোখের সামনে এসে ঘুরঘুর করবে।

চটজলদি ফ্রেশ হয়ে এসে মাথা মুছতে মুছতে সে ল্যাপটপ নিয়ে বেডে হেলান দিয়ে বসল। সামনে তাকাতেই চোখ গেলো টি টেবিলে ঢাকা দিয়ে রাখা বাটি টায়। কোতুহলী মনে ঢাকনা খুলে ই দেখল বাটিতে ক্ষীর রাখা। ক্ষীর তার বেশ পছন্দের।

প্রথম খেয়াল এলো বেকুব টা ঠিক কবে থেকে এমন পতিভক্ত হলো যে বিয়ের দুদিনের মাথায় বরকে পছন্দের খাবার বানিয়ে খাওয়াচ্ছে। আযানকে দেখলেই ত খালি কিন্ডারগার্টেন পড়ুয়া বাচ্চাদের মতন ভেংচি কাটবে নাহয় বিড়বিড় করে গালি দেবে। এই দুটো কাজ বাদে যে বেকুব টা আরো কাজ জানে কিংবা রান্নাবান্না জানে। আযানের বিশ্বাস হলো না ব্যাপারটা।
তাই ঘটনা জানতে মুহুর্তের মধ্যে তারস্বরে ডাকল তাকে, ‘আরমিইইইইন! অ্যাই আরমিইইন! কোথায় ঢুকে বসে আছো? রুমে আসো এক্ষুনি। দু মিনিটের মধ্যে আসো।’

নাজিয়া দু রুম পরে ই ছিল। আযানের ফুপি আজ বিকেলে বউ দেখতে এসেছে৷ ভদ্রমহিলার নাজিয়াকে বেশ মনে ধরেছে। নাজিয়ার ও তাকে পছন্দ হয়েছে। কি ভালো ভালো প্রশংসা করেছে মহিলা নাজিয়ার! এটাসেটা গল্প করছিল দুজনে একসাথে।

এমন সময়েই বজ্জাত টার এমন মরিয়া গলার আওয়াজ পেয়ে নাজিয়ার বড় লজ্জা লাগল। দেখল ফুপি মিটমিট করে হাসছে তার দিকে তাকিয়ে৷ এমনকি বলেও ফেলল বজ্জাত টা নাকি বউ কে চোখে হারায়। নাজিয়ার বড় ইচ্ছে হলো বলতে চোখে হারায় না খালি চোটপাট দেখায় ! কিন্তু মুখটা মিছিমিছি হাসি হাসি বানিয়ে সে বেরিয়ে এলো। বড্ড মেজাজ খারাপ হলো তার। বজ্জাত টা নিজে ত তাকে মানসম্মান দেয় না। আবার লোকজনের সামনে তার মানসম্মান ও রাখে না!

‘সমস্যা কি আপনার! এভাবে গরিলার মতন চিল্লাচ্ছেন কেনো!’
আযান ভ্রু দুটো তুলে চোখমুখ শক্ত করে তাকাতে ই মেয়েটা মিইয়ে গেলো। মিনমিন করে বলল, ‘ইয়ে মানে কনসার্ন থেকে বলেছি! বুঝেন নি আপনি? এমন তারস্বরে চিল্লালে পরে গলা ব্যথা হবে আপনার।’

‘খুউব বিশ্বাস করলাম তোমার কথা। স্টুপিড একটা!’ এটুকু বলেই সে আঙুল তাক করে ক্ষীরের বাটি টা দেখাল। ‘এটা কি?’
‘ক্ষীর। জীবনে দেখেন নি?’ নাজিয়ার বড় বিরক্ত লাগত৷ এমন ল্যাবাছ্যাবা প্রশ্ন করতে তাকে এমন করে ডাকছিল! কত সুন্দর গল্প করছিল সে।
‘ক্ষীর যে সেটা আমিও দেখছি৷তোমার মত বেকুব না আমি! এখানে কেনো? তুমি বানিয়েছ এটা?’

এবারের প্রশ্নে মুখ টা কাঁচুমাচু করে মেয়েটা বলল, ‘আমি পারি না ত এসব৷’
তারপর থেমে থেমে যোগ করল, ‘আপনার ফুপি বানিয়ে এনেছে। খেতে খুউব টেস্টি! ভাবলাম আপনারও মজা লাগবে। তাই আপনার ভাগের টুকু আলাদা বাটিতে ভরে নিয়ে এলাম৷ যদি আপনি আসতে আসতে মেইডরা ভাগাভাগি করে খেয়ে নিতো! আপনি ত আর ভাগে পেতেন না ডেজার্ট টা৷’

‘তুমি আমার জন্য আলাদা করে রেখে দিয়েছ?’
মেয়েটা উপর নিচ মাথা নাড়ল৷ বদ টার মতিগতি ঠাহর করতে পারছে না সে৷ কেমন চুপ হয়ে আছে৷ নিষ্পলক চোখে নাজিয়াকে দেখছে। অদ্ভুত! জ্বিনটিন ভর করল নাকি!

ছোটবেলায় যেকোন ডেজার্ট আযানের খুবই পছন্দের ছিল। বাড়িতে কোনো ডেজার্ট বানানো হলে অধিকাংশ সময় সে মাকে বলত তার ভাগের টা আলাদা করে রেখে দেয়ার৷ মাঝরাত অব্দি পড়তে পড়তে ফ্রিজ থেকে বের করে ঠান্ডা ঠান্ডা খাবে সে। প্রায়ই খেয়াল করত তার ভাগের টা তোলা থাকত না কিংবা তার মা রাখতে ভুলে যেতো। তেমন আমলে নিতো না ছেলের আবদার। হয়তো আবদার রাখার এত গরজ ও ছিল না তার।

রেহনুমা ভুঁইয়া মা হিসেবে নিরপেক্ষ ছিলেন না। বড় সন্তানের প্রতি তার যতটা স্পষ্ট পক্ষপাত ছিল ততটা অবহেলা উদাসীনতা ছিল মেজো সন্তান হিসেবে আযানের প্রতি। আযান তাই অভ্যস্ত নয় কেউ তার ব্যাপারে ভাববে তার যত্ন নেবে৷ অথচ আজ বহুবছর পর একজন তার জীবনে আসলো দুদিন হয়নি। তারপরও কি অবলীলায় বলে ফেলল তার জন্য আলাদা করে নিয়ে এসেছে এটা ভেবে যদি তার ভাগে না পড়ে!

আযান ভাবল মেয়েটা এমন করেছে শুধু কি আযান তার বর বলে নাকি মনের টান তৈরি হয়েছে তার আযানের প্রতি। মায়া টান ভালবাসা এই ব্যাপারগুলো আযানের ওভাররেটেড লাগে! শুনতে চমৎকার অথচ কষ্ট বাদে আর কিচ্ছু দেয় না! সে ত কখনো তার মাকে কম ভালোবাসেনি অথচ সেই ভালবাসা সবসময় শুন্য হয়ে তার কাছে ফিরে এসেছে। উপরি হিসেবে পেয়েছে অবহেলা অনাদর উদাসীনতা।

তাই পারতপক্ষে আযান এসবে জড়াতে চায় না আর। বিয়ে যেহেতু হয়েছে বউয়ের যতটা যত্ন দায়িত্ব করতে হবে সবটা সে করবে। তবে ভালবাসা ব্যাপারটা হয়ত কখনো হবে না। জীবন ত আর ফিল্ম না৷ এতবছর যে অনুভুতি টাকে সে নিজের মধ্যে অকেজো করে রেখেছিল সেটা নিশ্চয়ই একদম হঠাৎ করে প্রাণ পেয়ে উঠবে না! বড়জোর মায়া টান এসব তৈরি হতে পারে৷ অনুভুতির বাড়াবাড়ি এটুকুতেই থেমে থাকলে ভালো!
ভালবেসে আবারও অ ভালোবাসা ফেরত পাবার মতন ভুল করার ইচ্ছে কিংবা সাহস কোনোটাই আযানের আর নেই!’

ভাবনার অতলে হারানোর আগে ই সে বাস্তবে ফিরে এলো ফোনে ভিডিওর শব্দে। বেকুব টা ছোট বাচ্চাদের মতন পা দুলিয়ে দুলিয়ে বেডে বসে খুউব মনোযোগ দিয়ে রিলস দেখছে। আযান তাকে একনজর দেখল। তারপর ক্ষীরে চামচ চালিয়ে খেতে খেতেই বলল, ‘আরমিন! পড়াশোনা নাই তোমার? এত মনোযোগ দিয়ে ফোন চালাচ্ছ?’

‘এখন মাত্র ক্লাস শুরু হলো থার্ড ইয়ারের। প্রেশার নেই এত।’ সে মনোযোগ ফোনে রেখেই জবাব দিল৷ দুনিয়া গোল্লায় গেলেও রিলস বা যেকোনো ভিডিও নাজিয়ার পুরো মনোযোগ দিয়ে দেখার অভ্যেস!

‘কোন ভার্সিটিতে পড়ছ তুমি। আর ফোন থেকে মাথা তুলে প্রশ্নের জবাব দাও। আমি দু বার বলব না এক কথা!’
‘ধুর ব্যাডা! তুই কোথাকার মন্ত্রী মিনিস্টার রে যে দু বার এক কথা বলবি না!’ মনে মনে বললেও এই কথা মুখ ফুটে বলার সাহস নাজিয়ার নেই৷
তাই খুব ত্যক্ত বিরক্ত গলায় একবাক্যে জবাব দিলো।
‘ঢাবি তে পড়ছি। অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রি।’

‘ভালো।
তা খুব ত বিরক্ত হচ্ছ জবাব দিতে। ব্যাপার না! এখন যত পারো ফোন দেখে নাও। শুধু রেজাল্ট দেখব আমি৷ একটু উনিশ বিশ হোক রিলস দেখা একেবারে জন্মের মত ছুটিয়ে দেবো।’
টিস্যুতে মুখ মুছতে মুছতে আযান কন্ঠ খাদে নামিয়ে কথাগুলো বলল।

পড়াশোনা নিয়ে উদাসীনতা খুব অপছন্দ আযানের। টিউশন যখন করাতো কত স্টুডেন্টদের মেরে পিঠের ছাল তুলেছে শুধু এরকম অবহেলার কারণে। বউ বলে মেয়েটা কতকিছু থেকে বেঁচে যাচ্ছে অথচ তবুও অভিযোগ করে আযান তাকে নাকি কেবল চোটপাট দেখায়।

এতক্ষণ তবুও মেজাজ সামলে কথা বললেও নাজিয়া এবার আর ধার ধরল না সেসব সৌজন্যতার। সবসময় চোটপাট দেখায় এখন কি পড়াশোনা নিয়েও দেখাবে! এটা কেমন কথা! বিয়ের পর নাজিয়া ভালো বউ হলে তবুও লাভের লাভ। ভালো রেজাল্ট নিয়ে এমন কোন এভারেস্ট জয় করবে সে! বজ্জাত টার এমন খবরদারিতে আর রয়েসয়ে জবাব দেয়ার ধৈর্য্য থাকল না তার।
ফট করে বলে বসল, ‘শুধু রেজাল্ট দেখব মানে? আপনি আমার বাপ?’

‘তোমার বাপের চাইতে খারাপ! রেজাল্ট দিলে দেখবে সেটা!’
বরফ ঠান্ডা গলার কথাগুলো শুনে নাজিয়া বুঝল বজ্জাত টার মেজাজ এখন ভয়ংকর চড়ে আছে। কথা না বাড়ানোই বুদ্ধিমানের কাজ এই ভাবনায় সে ফোন রেখে লাগেজ থেকে চুপচাপ কোর্সের বই নোট শিটস সব বের করতে লাগল।

আযান বাজপাখির নজরে মেয়েটাকে দেখল খানিকক্ষণ। তারপর সে না দেখার মতন মিটমিট করে হেসে বিড়বিড় করল ‘বেকুব একটা!’ তার মনে হলো না এমন ভয় দেখিয়ে কোনো অন্যায় করেছে সে। বাঁদর টার এই ডোজের দরকার ছিল। নাহলে দেখা যাবে পড়াশোনা বাদ দিয়ে বাদরঁ টা সারাক্ষণ বাঁদরামি করে বেড়াবে। ইশি র সাথে বসে সুযোগ পেলেই দুই বেয়াদব মিলে তার বদনাম করবে!,

এসব ভাবতে ভাবতেই বিছানায় গা এলিয়ে চোখ বুজল সে। সারাদিনের ক্লান্তিতে শরীর চলছে না আর।

ডিনার শেষে রাতে ঘুমোতে গিয়ে বাঁধল আরেক বিপত্তি। কিছুক্ষণ পর পর মেয়েটার বিছানার এপাশ-ওপাশ করায় আযানের ঘুম আসি আসি অবস্থার রফাদফা হলো। এমনিতে সকাল থেকে রাজ্যের ঘুম তার চোখে। তার উপর পাশের বাঁদরটার বাঁদরামি রাতের বেলাও কমছে না৷ সে বড় বিরক্ত হয়ে গর্জে উঠল মেয়েটার উপর।
‘অ্যাই বাঁদর! এমন উথালপাতাল চালাচ্ছ কেনো বিছানা জুড়ে! ঘুমোতে পারছ না? গতকাল ত এমন মরার ঘুম দিয়েছ জ্যান্ত কবর দিয়ে আসলেও খবর হতো না তোমার। আজ এমন কি হলো!’

এমনিতে নাজিয়ার মনমেজাজ ভালো নেই। সন্ধ্যায় বজ্জাতটার চোটপাটে বিয়ের দুদিনের মাথায় পড়তে বসতে হয়েছে তার। এখন ঘুমোতে এসেও আযাবের বাচ্চা তাকে শান্তি দিচ্ছে না। তবুও ধৈর্য্য ধরে চিবিয়ে চিবিয়ে জবাব দিলো, ‘আমি ত আপনার বিছানায় শুয়ে অভ্যস্ত নয়। তাই ঘুম আসছে না৷ এপাশ-ওপাশ করছি কেনোভাবে ঘুম আসার আশায়। গতকাল ক্লান্ত ছিলাম দেখে হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছিলাম’

আযান এবার আর কোনোকিছুর ধার ধরল না। ডোজ ছাড়া বাঁদর টা যে ঘুমোবে না সে ভালোই বুঝতে পেরেছে। তাই মুহুর্তের মধ্যে বাম কাত হয়ে হ্যাচকাঁ টানে বাদরঁটাকে নিয়ে এলো নিজের বলিষ্ঠ বাহুবন্ধনীতে। এতে নাজিয়ার মুখ গিয়ে পড়ল তার শক্তপোক্ত বুকে।
মেয়েটাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে চোখ বুজে তরল গলায় বলল, ‘ঘুম এবার আসবে৷ এতক্ষণ বেশি জায়গা পেয়েছিলে তাই বেশি ছটপট করেছ৷ এখন এভাবে ঘুম হলে হবে না হলে নাই৷ চুপ করে ঘুমোও।’

পুরো ব্যাপারটা বুঝে উঠতে নাজিয়া সময় পেয়েছে দু মিনিট। অমন অতর্কিত হামলায় এখনোও বেসামাল তার শরীর মন। তবুও কোনোমতে ঝটকা টা সামলে উঠেই তার মোচড়ামুচড়ি শুরু হলো! অথচ এক ইঞ্চি ও সরাতে পারল না অমন শক্ত ভারী শরীরের দানবটাকে।
অগত্যা ত্যক্ত বিরক্ত গলায় বলল, ‘এভাবে জীবনেও ঘুম আসবে না আমার!’

‘ঘুমের বাপ সহ আসবে!’সেকেন্ডের মাঝে ফিরতি জবাব এলো।
মেয়েটার জবান বন্ধ হলো তক্ষুনি। এমন খারাপ গোয়ারঁ বেহায়া বেশরম বর নাজিয়ার! খুব দুঃখ হলো তার। আবারও কিছু বলতে যাবে তার আগেই কানে আসল বজ্জাতটার ঠান্ডা গলার ওয়ার্নিং।

‘চুপচাপ ঘুমাও৷ চোখ বন্ধ করে থাকলে ঘুম অটোমেটিক আসবে। আর একটা কথা বললে শুধু আজ নয় রোজ এভাবে ঘুমোতে হবে। চাও সেটা! তুমি চাইলে আমার তরফ থেকে কিন্তু কোনো সমস্যা নেই!’
‘বজ্জাত বেহায়া ব্যাডা একটা!’ এবার নাজিয়া রাখঢাক রাখল না আর। বজ্জাত টা শুনতে পাবার মত করে বিড়বিড় করল।

আযান শুনল সেটা। তবুও কোনো প্রতিউত্তর ছাড়া নিঃশব্দে হেসে পুনরায় চোখ বুজল। রক্তমাংসের কোলবালিশ টা কে আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আরামে চোখে ঘুম নামল তার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here