‘মেঘের মুলুকে চল’
আয়রা তাবাস্সুম
পর্ব০৫
সন্ধ্যা থেকে মিসেস নাওয়ার চৌধুরী র ব্লাড প্রেশার আপ ডাউন করছে। নাজিয়ার বাবা একপ্রকার দোটানায় পড়লেন৷ একে ত মেয়ে ও বাড়িতে কিভাবে আছে তার চিন্তা৷ সেই সাথে আবার এই বাড়িতে মেয়ের মায়ের চিন্তা৷ তিনি ভীষণ অসহায় বোধ করে ছেলেকে কল দিয়ে তাকে চটজলদি বাড়িতে আসতে বললেন।
ছেলে ফিরল একেবারে ডাক্তার সাথে নিয়ে৷ প্রেশার মেপে আরো কিছু টুকটাক মেডিসিন পাল্টে দিয়ে ডাক্তার বিদায় নিলো৷ আপাতত ঘরণী ঘুমিয়ে আছে দেখে নাজিয়ার বাবা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ছেলের সাথে আলোচনায় বসলেন৷ জানালেন নিজের উৎকন্ঠা উদ্বেগের কথা।
‘আব্বু তোমরা দুজনে ই শুধু শুধু টেনশন করছ৷ বাবুনি ওখানে ভালো থাকবে। তোমার কি মনে হয় ও খারাপ থাকার মতন অবস্থায় থাকলে আমি এখানে এতটা নির্ভার হয়ে বসে থাকতাম! ওর শ্বশুরবাড়ির লোকজনের ব্যাপারে শিওরলি বলতে পারছি না কিন্তু হাজব্যান্ড ও পেয়েছে ভালো ই৷’
‘আযানের ব্যাপারে লোকটোক লাগিয়ে আজ সারাদিন খবর জোগাড় করেছি আমি যদিও আফসোস হচ্ছিল এরকম পাগলপারা হয়ে যদি ইমান বাস্টার্ড টার ব্যাপারেও খবর নিতাম! তাহলে বাবুনি র আজকের ট্রমা টা ফেইস করতে হতো না। ভাই হিসেবে আমি এরকম অযোগ্য কিভাবে হতে পারলাম আব্বু! বলে বুঝাতে পারব না আমার নিজেকে কতটা অপরাধী মনে হচ্ছে।’
রেজওয়ান চৌধুরী ছেলেকে স্বান্তনা দিতে পিঠে হাত বুলিয়ে দিলেন৷ ‘শুধু কি তুই রাদ ! বাপ হিসেবে ত আমি আরো বেশি অপরাধী। অযোগ্য! বিজনেস পার্টনারের এক কথায় কোনো খোঁজখবর ছাড়াই তার কুলাঙ্গার ছেলের সাথে মেয়েটার বিয়ে ঠিক করে ফেললাম। মেয়েটা এত ভালো এত বাধ্য আমার! তার পাপা র কথায় টুঁ শব্দটি না করে রাজি হয়ে গেলো। অথচ আমি নিজের হাতে তার জীবন শেষ করলাম৷ কেমন খারাপ বাপ আমি তুই দ্যাখ!’
বাবাকে এমন অপরাধবোধে পিষ্ট হতে দেখে রাদ তাকে নিশ্চিন্ত করতে চাইলো নাহলে আবার অসুস্থ হয়ে পড়বেন উনি। ‘আব্বু বুনির জীবন শেষ হয়নি৷ আযান ছেলেটা ভালো। পাশাপাশি পরিশ্রমী ট্যালেন্টেড। বুয়েট থেকে আর্কিটেকচারে গ্র্যাজুয়েট সে। পাশ করে বের হবার একবছরের মাথায় ই দেশের টপ আর্কিটেকচারাল ফার্মে জয়েন করেছে৷ ফিউচারে আরো ভালো পজিশনে প্রমোশন ও হবে হয়তো।’
‘ও ত চাইলে ই আংকেলের বিজনেসে জড়িয়ে পায়ের উপর পা তুলে বসে থাকতে পারত। কিন্তু এখন যা করছে পুরোটা নিজের পটেনশিয়াল ট্যালেন্ট কাজে লাগিয়ে করেছে। হ্যা রাগটা বেশি ওর কিন্তু সেটা ত আর অহেতুক দেখায় না। পরিস্থিতি বুঝে ও। কাল পুরো বিয়ের অনুষ্ঠানে সবচেয়ে বেশি রাগ কিন্তু ওর দেখানোর কথা ছিলো। বুনি র সাথে ত ওর বিয়ে হবার কথা ছিলো ই না তবুও বুনিকে বিয়ে টা করতে হয়েছে ওর। পুরোটা সময় ভদ্রতা দেখিয়ে চুপ ছিল ছেলেটা।’
একটু থেমে আবারো যোগ করল, ‘কলেজ ভার্সিটি দুটো তে ই ওর হিস্ট্রি জানতে চেয়েছি। একদম ক্লিন ক্যারেক্টার ওর। মেয়েঘটিত কোনো কিছুতে জড়িত ছিল না। খুব ফোকাসড ছিল নাকি একাডেমিক লাইফে। তাহলে এবার আব্বু এসবের মানে এটাই দাড়াঁয় আল্লাহ বুনি র জন্য বেস্ট টা ই রেখেছে। হ্যা একটা অঘটন ঘটেছে ঠিক ই তবে আমার মনে হয় বুনি র জীবনে আযানের আসার জন্য এই অঘটন ঘটা টা জরুরি ছিল’।
রেজওয়ান সাহেব কে এবার খানিকটা নির্ভার হতে দেখে ছেলে নিশ্চিন্ত হলো। তবুও বলল, ‘আর এমনিও ওরা দুজন কয়েকদিন পর ত আসবেই। তখন নাহয় বুনি র থেকে জেনে নিবে আযানের সাথে থাকতে ওর অসুবিধা হচ্ছে কিনা’।
শেষে বাবাকে চোখ রাঙাল। ‘আব্বু কোনো টেনশন নয় আর। এখন সোজা ঘুমোতে যাবে তুমি।’
রেজওয়ান সাহেব স্মিত হাসলেন এবার। তার ছেলে মেয়ে দুটো ই খুব ভালোবাসে তাকে। একদম নিখাঁদ ভালোবাসা।
_________________
সকালে ঘুম ভেঙে চোখ খুলতেই আযান বেকুব টা কে দেখল৷ ঘুমে ঠাসা চোখ মুখ ফোলা, চুলের আলুথালু বেশ নিয়ে বেকুবটা তাকে একধ্যানে দেখছে৷ আযান নিজের বুকে হাত দিয়ে বোঝার চেষ্টা করল, ভেতরে কিছু একটা ঘটেছে এইমাত্র! সে গা করল না৷ বরং খ্যাকিঁয়ে উঠে বলল, ‘এমন কল্লা র উপর বসে তাকিয়ে আছ কেনো। বেশি সুন্দর আমি?’
নাজিয়ার ইচ্ছে হলো দুয়েকদিন পর মাঝরাতে না, বজ্জাত টার চোয়াল সে আজ ই এক্ষুনি ঘুষি মেরে ভেঙে ফেলবে৷ সারাদিন চোটপাট করতে ই হবে বদ টার! ঘুম ভেঙে সুযোগ পেয়ে নাজিয়া নাহয় একটু দেখছিল তাকে। বর হয় ত সে নাজিয়ার! কিন্তু এরকম মুখের উপর লজ্জা কেনো দিবে অসভ্য টা! বদ টা কে সে এখন থেকে হাড় জ্বালিয়ে মারবে। নাজিয়া তক্ষুনি সিদ্ধান্ত টা নিলো।
মেয়েটাকে এমন হঠাৎ চুপ হতে দেখে আযান ভাবলো ঘুমে ঢুলছে বোধহয়! সে হাতের তুবড়ি বাজিয়ে ডাকল তাকে। ‘অ্যাই আরমিন! ওয়াশরুমে এখন যাবে তুমি ? নাকি আমি সেরে আসব?’
‘আমি আমি।’ এক সেকেন্ড ও না ভেবে নাজিয়া তড়িঘড়ি উত্তর দিলো। সবকিছু তে বজ্জাত টা কে আগে থাকতে দেবে না সে! এদিকে তাকে জামাকাপড় না নিয়েই ওয়াশরুমে যেতে দেখে বিরক্তিতে আযানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল৷ ‘অ্যাই বেকুব! জামাকাপড় ছাড়া গোসলে যাবে তুমি?’
‘গোসল আজ করবো না ত। গোসল আমি একদিন পরপর করি।’ নাজিয়া স্বাভাবিক গলায় কথাগুলো বলতে বলতে চুলের খোঁপা বাঁধে।
‘একদিন পর পর? মানে? তুমি এত খবিশ!’ আযান যেনো হতভম্ব হতেও ভুলে গেলো।
‘আমি খবিশ হই যা হই আপনার কি! আমি কি আপনার সাথে গা ঘেঁষাঘেষি করছি? যে আমি গোসল না করলে আপনার খুউব সমস্যা হবে।’ নাজিয়া চোখমুখ কুচকেঁ তেতো গলায় জবাব দিলো৷ রাতে একটা ফুরফুরে ঘুম দিয়ে সকাল হতে ই মেয়েটার মুখে যেন খই ফুটছে। অবলীলায় ভুলে বসল তার সামনে দাড়ানোঁ গোঁয়ার টার রাগ জেদ।
‘সময় যখন হবে তখন শুধু গা ঘেঁষাঘেষি না আরো অনেক কিছু তুমি করবে। কিন্তু এখন! তুমি সোজা গোসল করবে! না হলে আমি কান ধরে ওয়াশরুমে রেখে আসবো। চাও সেটা?’ আযান দাঁতে দাঁত চেপে রাগ সামলে একটা ঠান্ডা চাহনি দিয়ে বলল কথাগুলো ৷ অপরিষ্কার অগোছালো কোনোকিছু ই তার পছন্দ না। সে নিজেও ভীষণ পরিপাটি মানুষ।
‘খবিশ একটা। ছি! মেয়েমানুষ ও এরকম খবিশ হতে পারে আমার জানা ছিলো না৷’ থেমে থেমে সে আবারো কথাগুলো যোগ করল যেন সে এখনো বিশ্বাস করতে পারছেনা একটা গোটা দিন গোসল না করে থাকা ও সম্ভব!
তার নাকমুখ কুচঁকে বলা শেষ কথাগুলো শুনে নাজিয়ার চাপা রাগ যেনো এবার মাথায় চড়ে বসলো। এতক্ষণ তবুও গোসল করতে রাজি হলেও বজ্জাত টা এভাবে অপমান করছে দেখে জেদ দেখিয়ে সে উঠা থেকে আবারও বিছানায় বসে পড়ল। করবে না সে গোসল! যা হবার হবে!
‘আরমিইইইন!অ্যাই খবিশ! রাগ উঠাবে না আমার একদম৷ গোসল না করলে রাতে আমার বিছানায় জায়গা নেই তোমার। মেঝেতে শুবে আজকে! সাথে আরো শাস্তি ত আছেই। ঘাড়ত্যাড়ামি একদম ছুটিয়ে দিব বেয়াদপ!’
বর্বরটার গর্জে উঠা কন্ঠস্বর শুনে এবার মেয়েটার গতকালকের পুরো দিন টা যেনো চোখের সামনে ভাসল। গোঁয়ার টার রেগে যাওয়ার একটা প্যাটার্ন আছে। নাজিয়া খেয়াল করেছে সেটা।
প্রথমে বদ টা খুব শান্ত গলায় কথা বলে। এরপর ঠান্ডা দৃষ্টিতে দেখে। তিন নাম্বার ধাপে গলার স্বরে যেনো দানব ভর করে। এরপরে হয় বিস্ফোরণ! হিসেব অনুযায়ী তাহলে এখন পরিস্থিতি তিন নাম্বার ধাপে আছে। এরপরে ফাটবে বম্ব! মেয়েটাকে আযান বেকুব ডাকলেও এবার সে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিলো। ফট করে দাঁড়িয়ে লাগেজের দিকে হাত বাড়িয়ে জামাকাপড় নিলো। কেলেঙ্কারি হবার আগে ই যেনো সতর্ক হয়ে নিজেকে বাঁচিয়ে নিলো।
তবুও তার মন মানলো না এভাবে কাপুরুষের মতন পিঠ দেখিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালাবার। যুদ্ধক্ষেত্র ই ত! বজ্জাত টা র সাথে যবে থেকে নাজিয়ার জীবন জুড়েছে তখন থেকে ই সে যেনো ঢাল তলোয়ার হাতে সদা প্রস্তুত। সকালে ই সিদ্ধান্ত নিয়েছে গোঁয়ার টা র অন্যায় চোটপাট আর মানবে না। চোখে চোখ রেখে মোকাবেলা করবে। লক্ষী ন্যাকা বউ টি হয়ে থাকবে না! মাঝখানে গোসলের কাহিনি এসে সবটা ভন্ডুল করে দিলো৷
এভাবে কোনো প্রতিবাদ ছাড়া গোসলে যেতে তার মন মানলো না৷ বজ্জাত টা ভাববে নাজিয়া ভীষণ ভয় পায় তাকে৷ তাই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আর রাখঢাক না রেখে নাজিয়া ওয়াশরুমে দ্রুতপায়ে যেতে যেতে বর্বর টা শুনার মতন করেই বলল, ‘হতচ্ছাড়া বজ্জাত একটা! সবকিছুতে বাড়াবাড়ি!’
আযানের চোখ দুটো যেনো কপালে উঠল। এই মেয়ে র এত সাহস! গতকাল রাতে তবুও বিড়বিড় করছিল অথচ এখন সামনাসামনি ই তাকে অমান্য করছে! কাল রাতে কি তাহলে সে একটু বেশি ই মানবতা দেখিয়ে ফেলেছে! বকা টকা কম দিয়েছে!
নাহলে বাঁদর টা এমন নাগিনের মতো খোলস ছাড়ল কেনো! কাল রাতে ত খুব চোখ নামিয়ে মিনমিন করে কথা বলছিল। আর এখন মুখের উপর রীতিমতো বজ্জাত ডাকছে তাকে! রাতারাতি এত পরিবর্তন! আযান সিদ্ধান্ত নিলো একটা চরম শিক্ষা দেবে বাদরঁ টাকে৷ আযান গতকাল রাতে একটু নরম হয়েছে কি খুউউব বাড় বেড়েছে বাঁদর টার।
আযান দাঁতে দাঁত চেপে অপেক্ষা করতে লাগল মেয়ে টার ওয়াশরুম থেকে বের হবার। রাগে বিড়বিড় করলো, ‘বেকুব বেয়াক্কল ত ছিলোই৷ এখন হয়েছে বেয়াদপ।’
অপেক্ষা করতে করতেই কঠিন সিদ্ধান্ত নিলো একটু শাসন সে আজ করবে ই বেয়াদব টাকে! বাঁদর টা র বাঁদরামি নামাবে!
[ প্রতি পর্বে ভিউয়ারস হয় পাঁচ ছ হাজার মানুষ অথচ ফলো দেয় চারশ জন। রিয়েক্ট দেয় দুশো জন। কমেন্ট করে দশ জন সেখানে র পাঁচ টা কমেন্টে আবার থাকে নেক্সট। চমৎকার ! ]

