#মেঘের_মুলুকে_চল
#আয়রা_তাবাস্সুম
#পর্ব০৪
‘অ্যাই রাজিয়া না মর্জিয়া কি বিড়বিড় করলে! গালি দিয়েছ স্বামীকে?এত বেয়াদব বউ তুমি!’ আযান ভুরু কুঁচকে মহা রেগে কাটকাট গলায় বলল৷
নাজিয়ার মনে হলো একমাত্র বেহুশঁ হয়ে গেলে ই সে বেচেঁ যাবে এখন৷ বজ্জাত টার শকুনের চোখ! ঠিকই লিপ রিড করে ধরে ফেলেছে নাজিয়া তাকে গালি দিয়েছে। এখন কি বর্বরটা তার গালে চড় বসাবে একটা! এসির নিচেও নাজিয়ার মনে হলো হঠাৎ করে চারপাশে খুব গরম৷ বুকের মধ্যে কেমন ধড়পড় করছে!
পরক্ষণে নাজিয়ার অভিমান ও হলো। বর্বরটা যেভাবে বলছে যেনো গালি কেবল বর্বর টার একার সম্পত্তি! নাজিয়া কি দেখেনি কবুলের পাচঁ দশ মিনিট আগেও বর্বরটা কাকে জানি কল দিয়ে বিশ্রী থেকে বিশ্রী সব গালি দিচ্ছিলো যেগুলো কানের আশেপাশে আসলেও আস্তাগফিরুল্লাহ জপতে হয়।
আর এখন যে ই না নাজিয়া নিরীহ কয়েকটা গালি বিড়বিড় করলো তখনি রেগে গেছে। স্বৈরাচার একটা! সে নিজেকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা টা করলো। গলা একেবারে নরম করে কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, ‘গালি দিই নি ত। আর আমার নাম নাজিয়া। রাজিয়া মর্জিয়া এসবের একটা ও না’
তার কাদোঁ কাদোঁ স্বরের অভিনয় কাজে দিলো হয়তো। আযান চোখমুখ শক্ত করে খানিক্ষণ তাকিয়ে থেকে কিছু বলল না আর। কিন্তু পরমুহুর্তেই আবার ভারী বিরক্ত হয়ে বলে উঠলো, ‘নাজিয়া কোনো নাম হলো! ছ্যাহ। আমার দাদীর নাম ছিল রাজিয়া বানু। তোমাকে ডাকতে গেলে দাদি র কথা আগে মাথায় আসবে। বৌ কে ডাকলে দাদির কথা মাথায় আসার ব্যাপারটা বিশ্রী৷ আর কোনো ভালো নাম নেই তোমার? পুরো নাম কি’?
নাজিয়া হাফ ছেড়ে বাচলঁ ৷ যাক এ যাত্রায় বর্বর টা কে ভুলিয়ে ভালিয়ে বাগে আনা গেছে। সে মিনমিন করে জবাব দিলো, ‘নাজিয়া আরমিন চৌধুরী’
‘কেমন নাম এটা! দুইটা আলাদা আলাদা মানুষের নাম যেন জোড়া দিয়ে রেখেছে। নামের অভাব ছিলো? নাকি ন মাস পেটে থাকতেই বাপ মা কে এমন জ্বালিয়ে মেরেছ পেট থেকে বের হতেই ওরা কোনোরকমে একটা নাম দিয়ে দায় সারলো’, বলেই আযান ফিচেল হাসি দিলো একটা।
গা জ্বালানো হাসিটা দেখে নাজিয়ার ইচ্ছে হলো তক্ষুনি একটা ঘুষি মেরে বজ্জাত টার চোয়াল ভেঙে দিক। তখন সে ও বজ্জাত টাকে একটা নতুন নামে ডাকবে৷ আযান চোয়ালভাঙা ইয়াসীর ভুইয়াঁ!
কিন্তু পরক্ষণেই ভাবলো এই কাজ করতে হবে সাবধানে, আরো দুয়েকদিন পর৷ মাঝরাতে ঘুমের ভান ধরে বেয়াদব টার চোয়াল বরাবর জোরসে একটা ঘুষি মারবে! তারপর জেগে গিয়ে এমন ভান ধরবে যেনো ঘুমের ঘোরে হাতের ধাক্কায় ভুলে এসব করেছে। তখন নাজিয়া দেখবে ভাঙা চোয়াল নিয়ে এই বজ্জাতের এত হাসি কোনদিকে বের হয়! নিজের শয়তানি বুদ্ধিতে নাজিয়ার নিজেকে পিঠ চাপড়ে বাহবা দিতে মন চাইল৷ এদিকে তাকে অন্য ভাবনায় ব্যস্ত দেখে আযান হাতের তুবড়ি বাজিয়ে ডাকল।
অ্যাই আরমিন! অ্যাই মেয়ে!
প্রথমবার আযানের মুখে নিজের নামটা শুনে নাজিয়া ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে লাগলো। বর্বর একটা লোক যার মুখে গালি চোটপাট ছাড়া আর কিছু মানায় না তার মুখে নাজিয়ার নাম টা শুনতে এত ভালো লাগবে কেনো! লক্ষণ ত সুবিধের নয়!
এরকম চোটপাট করা লোকের প্রেমে পড়বে নাজিয়া? সে কি নিব্বি? ভালোবাসা দিয়ে ঠিক করে ফেলবো টাইপ ! ইয়াক! নিজেকে খানিকটা ভর্ৎসনা করলো যেনো। নিজের মনের অবস্থা ঠাহর করতে আরেকটু ভাবতে গেলেই তার ধ্যান ভাঙল আযানের গম্ভীর গলার ওয়াজ নসীহত শুনে।
‘স্বামী একবার ডাকলে একবারে ই জবাব দিবে৷ বিয়ে যেহেতু হয়েছে বাধ্যগত বউ হবার চেষ্টা করো৷ আল্লাহ সওয়াব দিবে বুঝছ?’ আযান গম্ভীরমুখে উপদেশ টা দিয়ে বউয়ের মতিগতি বুঝার চেষ্টা করল।
‘তাই বলে সওয়াব কামানোর জন্য তোর মত আযাব কে সহ্য করবো আমি?’ সেকেন্ডের মাথায় নাজিয়া নিজের মনে জবাব টা তৈরি করে ফেললে ও মুখ ফুটে বলার সাহস পেলো না।
‘আর স্বামী কে গালি দিবে না৷ মনে থাকবে? আল্লাহ বেজার হবে কিন্তু। ছোটখাটো গালি ও দিবে না। এই যেমন কিছুক্ষণ আগে হারামজাদা ডেকে বিড়বিড় করেছ’ আযান কৃত্রিম হাই তোলার ভান করে কথাটা বলেই খাটের দিকে এগিয়ে গেল । এদিকে বিস্ময়ে চোখ দুটো রসগোল্লা সাইজের বানিয়ে নাজিয়ার মুর্ছা যাওয়ার উপক্রম৷
তার ইচ্ছে হলো কোনো জাদুবলে হয় সে গায়েব হয়ে যাক নাহয় বর্বর টা! মিথ্যে বলে ধরা খাওয়ার ব্যাপারটা তার মন মানতে পারলো না। লজ্জায় অস্বস্তি তে মুখ নামিয়ে বসে রইলো। অস্বীকার ও করল না এবার। কেনো ই বা করবে! গালি দিয়ে ভয় তার একটু ও লাগছে না। বজ্জাত টা গালি র ই যোগ্য! গালি সে পারলে আরো কয়েকশবার দিবে! প্রয়োজনে গুগল থেকে বিশ্রী থেকে বিশ্রী গালি শিখে তারপর দিবে!
কিন্তু এই যে লোকটার কাছে ধরা খেয়ে তার নিজেকে চোর চোর লাগছে এই তিতকুটে অনুভুতি রমণীর মন বিষিয়ে দিলো। ‘গালিটা বরাবর কিভাবে ধরতে পারলো! সাংঘাতিক লোক ত! কাল সকালে ই খবর নিতে হবে বজ্জাত টার প্রফেশন কি। গোয়েন্দা টোয়েন্দা নাকি? চেহারা ত এমনিও চব্বিশ ঘন্টা আসামি পিটানোর মতন সিরিয়াস বানিয়ে রাখে’ এসব ভংচং চিন্তাভাবনায় মশগুল রমণী টের ও পেলো না কখন একজন বিশাল শরীর টা নিয়ে তার পাশের বালিশে মাথা চেপে সোজা হয়ে শুয়ে পড়েছে। যার চোখ এখন নাজিয়ার চিন্তামগ্ন চেহারা টায়।
‘বেকুব আর বেকুবের লাখ টাকার চিন্তাভাবনা!’ বিছানায় স্থির হয়ে বসে থাকা নাজিয়ার ধ্যান ভাংলো কথাটা শুনে। খেয়াল করলো অসভ্য টা কেমন করে তার পাশে শুয়ে পড়ে তাকিয়ে দেখছে। আবার বড় গলায় বেকুব ও ডাকছে তাকে৷ ‘অ্যাই বেকুব! ঘুমাবে না তুমি?’ আযানের এবার বড় বিরক্ত লাগল।
বেকুব টা সারাদিন কেঁদেছে, তারপর পুরা মাঝরাত তার সাথে ঝগড়া করেছে এখন বাকি রাত টা আউলফাউল চিন্তা করে কাটাবে কিংবা আরো কিছু উল্টাপাল্টা কথা বলে আযানের ঘুমটাও নষ্ট করবে। সে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো একটা৷ মেয়েমানুষ মানেই মহাঝামেলা! এসব ভেবে বিরক্তি তে তার মুখ তেতো হয়ে আসলো।
‘প্লিজ এখন না! আমার সময় লাগবে’ ভাবনার জগৎ থেকে হঠাৎ বাস্তবে ফেরায় অন্যমনস্ক হয়ে আযানের শেষ কথাটা না শুনেই হতবিহ্বল মস্তিষ্ক ভেবে ফেলল অন্যকিছু। মুখের আগায় থাকা সারাদিনে কতশত বার প্র্যাকটিস করা কথাটা বলে ফেলল নিজের অজান্তেই! আবারো একরাশ অস্বস্তি জাঁকিয়ে বসলো মেয়েটাকে৷
বজ্জাত টা তাকে বলেছে একটা আর সে শুনেছে আরেকটা! আর উত্তর যেটা দিয়েছে সেটার ত তুলনা ই নেই! চেহারা এবারে একদম চিবুকের কাছে নিয়ে এসে তীব্র লজ্জা আর অস্বস্তি নিয়ে হাতের নখ খুঁটতে লাগল। চেহারাটা তুললেই দেখতে পারত তার এমন বেয়াক্কলপনায় কিভাবে নাকের ডগা ঢলার ছুতোয়ঁ ঠোঁট হাতে ঢেকে প্রাণপণে হাসি আটকানোর চেষ্টা করছে তার পাষাণ বর্বর সহজে না হাসা মানুষটা!
আযান মনে মনে চাইল আরো কিছুক্ষণ সামনের বেকুব টা ওভাবে মুখ নামিয়ে ই রাখুক! নাহলে এই মুখ চেপে রাখা হাসিটা বেরিয়ে পড়বে। তারপর মেয়েটা আযান কে নরম মাটির দলা ভেবে ইচ্ছেমতে নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরাবে। বউ দের এত লাই দিতে নেই, এত সহজ হতে নেই তাদের সাথে! এসব ভেবে সে যথাসম্ভব নিজেকে স্বাভাবিক করে একদম ভালো মানুষের মতন বলল, ‘ঘুমাতে সময় লাগবে তোমার? ইনসমনিয়া আছে?’ অথচ তার চতুর মস্তিষ্ক তখনি ধরে ফেলেছে মেয়েটার কথার মর্মার্থ৷ বুঝতে একটু ও অসুবিধে হয়নি মেয়েটা কি বলতে চেয়েছে।
নাজিয়ার অস্বস্তি যেনো এবার আরো একধাপ বাড়লো৷ বেয়াদপ টা যে ইচ্ছে করেই এমন ভালোমানুষি র ভোল ধরেছে সেটা সে ঠিক ই টের পেলো। সাহস করে ভাবলো ক্লিয়ার কাট বলেই ফেলবে চেপে রাখা কথাটা।
‘আসলে আমি বলতে চেয়েছি আমি প্রিপেয়ার্ড না ওসবের জন্য মানে বিয়ের রাতে যেসব হয়। প্লিজ আমাকে সময় দিবেন, প্লিজ’! শেষের কথাটা বলতে গিয়ে তার গলা কেঁপে উঠলো৷ বর্বর টা যদি না মানে। যদি বলে বউয়ের উপর তার পুরো হক আছে এত অনুমতি র ধার ধারবে কেনো সে?
তাহলে… নাজিয়া পরের টা আর ভাবতে পারলো না। লোকটা জোরজবরদস্তি করলে নাজিয়া একদম পাথর হয়ে যাবে। হয়তো ভেতর থেকে একেবারে মরে যাবে। এসমস্ত ভাবনার অবসান ঘটলো আযান মুখ খুলতেই৷
‘বিয়ে হয়েছে আমাদের। যেভাবে ই হোক৷ তুমি আমার স্ত্রী। তোমার সুবিধা অসুবিধা দেখা আমার জন্য ফরজ। এর মানে আবার এটা না তোমার সুবিধা অসুবিধা দেখে তোমায় বকবো, ধমকাবো। সেটা আমি সবসময় ই করব বেয়াক্কলের মতন কাজকারবার করতে দেখলে’
‘কিন্তু কাছাকাছি আসবার ব্যাপারটা দুজনে র ইচ্ছে য় হবে। তুমি চাইলে হবে! আমি শরীর লোভী কামুক পুরুষ না৷ বিয়েটা আমি শুধু শরীর ছুঁতে করিনি। তাই না ঘুমিয়ে কানের কাছে সময় লাগবে বলে প্যানপ্যান করলে একটা চড় সত্যিই লাগাবো। খেতে চাও চড়’?
বর্বর টা র এতক্ষণ বলা কথাগুলো শুনে নাজিয়ার মনে যেটুকু ভালোলাগা আস্তেধীরে তৈরি হচ্ছিল শেষের কথা কানে আসতেই সেটুকু যেনো উবে গেলো। ‘সবসময় চোটপাট দেখাতে হবে! কি ভালো করে কথা বলছিল কিন্তু শেষে আবার আগের ফর্মে ফিরে এলো বজ্জাত টা’ সে চোখমুখ কুঁচকে নিজের মনে মনে বলল। সব দুশ্চিন্তা ঝেড়ে ফেলে মাঝখানে কিছুটা দুরত্ব রেখে খাটের একপাশ ঘেঁষে শুয়ে পড়লো। ‘বজ্জাত টা এতটা ও বজ্জাত না’, মনে মনে ভাবলো।
‘ডিস্টেন্স রাখছ ভালো কথা কিন্তু যেভাবে খাটের কাছ ঘেঁষে শুয়েছ ঘুমের মধ্যে এপাশ ওপাশ ফিরতেই ত পড়ে হাতপা কোমর দুটোই ভাঙবে নিজের। তখন তোমার সেবাযত্ন কে করবে! মাজা ভাঙা বউয়ের সাথে সংসার করার এত গরজ নাই আমার! সোজা বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেবো’ মেয়েটা র পাশ থেকে মুখ ফিরিয়ে অন্য পাশে কাত হয়ে শুয়ে আযান খুব বিরক্ত গলায় কথা গুলো বলল তাকে।
‘বজ্জাত টা মহা বজ্জাত’! দু মিনিট আগের ধারণা মুহুর্তের মধ্যে পাল্টে নাজিয়া খাটের কিছুটা মাঝখানে সরে এলো। ভাবল যেরকম খারাপ লোক কোমর ভেঙে শয্যাশায়ী হলে আসলেই সেবাযত্ন করবে না তার! বেয়াদপ টা ওপাশ ঘুরে শুয়েছে সেটার পুরোপুরি সুযোগ নিয়ে ইচ্ছেমতো ভেংচি কাটল তাকে। আরো কিছুক্ষণ পর সারাদিনের ক্লান্ত শরীর টা ঘুমে তলিয়ে গেলো।
মেয়েটার ঘুমে ঠাসা অবস্থা টের পেতেই আযান নিঃশব্দে পাশ ফিরল। নজর ফেলল তার সামনের বালিশে শোয়া ফোলা গালের মেয়েটার উপর।
এভাবে একপাশ হয়ে তার ভালো ঘুম হয় না৷ তবুও মেয়েটার অস্বস্তি কাটাতে এতক্ষণ মুখ ফিরিয়ে ঘুমের ভান ধরেছিল। তা নাহলে বেকুবটা বোধহয় আজ রাতে আর ঘুমোতো না!
আযান আদুরে গোলগাল চেহারা টার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। মনে পড়লো কিছুক্ষণ আগের ঘটনা টা। একপেশে হাসি হেসে মেয়েটাকে দেখতে দেখতে ই বিড়বিড় করলো, একদম বেকুব বেয়াক্কল মেয়ে একটা!

