#মেঘের_মুলুকে_চল
#আয়রা_তাবাস্সুম
#পর্ব০৩
ডিম লাইটের হালকা আলোয় চাদর জড়িয়ে জবুথবু হয়ে বিছানায় বসে থাকা মেয়েটাকে আগাগোড়া একবার দেখে নিয়ে আযান আবারো গম্ভীর গলায় ডাক দিলো, ‘জবাব নাই কেনো? একটা প্রশ্ন করলাম ত! প্রেম ভালবাসা ছিলো বুঝি অই রাস্কেল টার সাথে। তাই ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়ে সবার সামনে অমন মরা কান্না কাদঁছিলে তার শোকে!’ শেষের কথাটা আযান কিছুটা বিদ্রুপাত্নক শ্লেষে বলে ফেলল৷
নাজিয়ার মনে হলো হঠাৎ কেউ জোরে তার দুগালে জুতার বারি মেরেছে। এত বিশ্রী, এত নিচ এই লোকটার চিন্তাভাবনা, ছি! ননদের কথাবার্তা শুনে খানিকক্ষণ আগে তার মনে যেটুকু শান্তি ছিলো তা যেনো নিমিষেই উধাও হলো। সারাদিন তার সাথে যা কিছু ঘটেছে সেসবের দুঃখ রাগ ক্ষোভ থেকে কান্না করাটাকেও এই লোক এত বিশ্রী ভাবে নিবে সেটা নাজিয়ার ধারণার বাইরে ছিলো।
কেনো জানি ভীষণ অভিমান হলো তার! সিদ্ধান্ত নিলো একটা কথাও বলবে না । এই বর্বরের কোনো প্রশ্নের জবাব দিবে না। যা হবার হবে। এই লোক যখন ভেবেই ফেলেছে তার লম্পট ভাইয়ের সাথে নাজিয়ার প্রেমের সম্পর্ক ছিলো তখন ভাবুক! ফলশ্রুতিতে নাজিয়া জেদ করে মুখে তালা ঝুলিয়ে বসল, হ্যা না কোনো জবাব ও দিলো না ৷ গোঁয়ারের সাথে গোয়ার্তুমি দেখানোর বিরাট ভুল টা করে ফেলল একদম নিজের অজান্তেই।
তবুও মিনিট দুয়েক পরে চুপিচুপি অই বর্বরের চেহারা টা দেখতে চাওয়ার অদ্ভুত ইচ্ছে জাগল নারীমনে৷ গোয়ারঁ টা রেগেটেগে আছে কিনা চোখমুখ দেখে বুঝতে চাইল। এদিকে আযান ঠিকই হাতের ঘড়ি খুলতে খুলতে মেয়েটার চাহনি টের পেলো৷ সে ও ইচ্ছে করে মুহুর্তের মধ্যে মুখ উঠিয়ে ড্যাবড্যাব চোখে মেয়েটাকে দেখল। দু জোড়া চোখের মিলন ঘটতে মিনিট না গড়াতেই নাজিয়া হাসফাঁস করে চেহারা নামিয়ে ফেলল। বুক ধুকপুক করছে তার৷ অস্থির লাগছে। কি আশ্চর্য!
সেই কয়েক সেকেন্ডের দৃষ্টির মিলনে কতবার যে নাজিয়ার বুক ধুকপুক করল সে হিসেব নাজিয়া রাখে নি৷ চোখ নামিয়ে রাখলেও সে বুঝলো অসভ্য টা এখনো তাকে ই তাড়িয়ে তাড়িয়ে দেখছে যেনো জীবনে মেয়ে দেখেনি কখনো।
পুরো ঘটনায় আযানের চোখমুখ একদম নির্লিপ্ত। ভুরু কুঁচকে খানিকটা সময় তার সামনে নতমুখে বসে থাকা মেয়েটাকে দেখলো সে । তবুও কোনো নড়চড় না পেয়ে এবার তারস্বরে চেঁচাল, ‘বোবা তুমি ? অলরেডি দু বার একই কথা জানতে চেয়েছি। এরপর আর মুখে নয় হাতে কথা বলব। আমার প্রশ্নের উত্তর যে মুখ থেকে বেরোয় না সেই মুখ আমি থাপড়ে লাল করে ফেলব ইডিয়েট! লাস্টবার জানতে চাচ্ছি অই বাস্টার্ড কে পছন্দ করতে তুমি? দুজনে কোনো সম্পর্কে ছিলে?’
এতক্ষণ ধরে জমিয়ে রাখা যত জেদ সাহস সব যেনো ফুস করে উবে গেল নাজিয়ার। তার মনে হলো রাগ জেদ সব চুলোয় উঠুক৷ অমন বড় বড় ফোলা দানবের মতন হাতের দুটো চড় গালে পরলে, পাপা কে ফোন করে এই দোযখ থেকে নিয়ে যেতে বলার মতন কথা বলার অবস্থা ও থাকবে না তার। তাই চটজলদি মুখ তুলে উল্কার গতিতে মিনমিন করে বলল, ‘পছন্দ করতাম না৷ পাপা ছবি দেখিয়েছিল শুধু আর বলেছিল তার বহুদিনের বিজনেস পার্টনারের ছেলে। আপনার অই লম্পট ভাইয়ের সাথে প্রেম ত বাদ দিলাম বিয়ের আগে সামনাসামনি দেখা অব্দি করিনি আমি’
তখন রাত দুটোর কাছাকাছি। ব্যালকনির স্লাইডিং ডোর খোলা থাকায় রাতের বাতাস হু হু করে ঢুকছে। সেই সাথে ভেসে আসছে টবের কামিনী চন্দ্র মল্লিকা ফুলের ঘ্রাণ৷ আযান আজ প্রথমবারের মতন ঠাহর করতে পারল না কোনটা কোন ফুলের ঘ্রাণ। কারণ তার ধ্যান চিন্তাভাবনা সব সম্পুর্ণ অন্য জায়গা জুড়ে। আজ সারাদিন তার মস্তিষ্ক উত্তপ্ত হয়ে সে যেনো বারুদের মতন বিধ্বংসী হয়ে ছিল৷ কেউ কিছু বললেই খ্যাকিঁয়ে উঠছিলো, রাগে ফুসঁছিলো ক্রমাগত।
বড় ভাইয়ের গাফিলতি, বাপের আবদার, লোকজনের কথাবার্তা, পরিবারের মানসম্মান সবকিছুর চিন্তা যেনো সমানে তার খারাপ মেজাজ ভয়াবহ খারাপ করার চেষ্টায় মশগুল ছিলো। অথচ এখন তার সামনে বসে থাকা ভীতু চেহারার মেয়েটার শেষের কথাগুলো যেন মুহুর্তেই খরা রৌদ্রদাহে এক পশলা বৃষ্টির মতন তার শরীর মন জুড়ে প্রশান্তি এনে দিলো, ঠান্ডা হলো তার টগবগিয়ে ফুটতে থাকা সারাদিনের গরম মেজাজ।
কবুল বলার সময় ও তার মধ্যে একপ্রকার দ্বিধা কাজ করছিল। ইমান আযহার ভুইঁয়া তার কেবল দু বছরের বড়৷ একপ্রকার পিঠাপিঠি ভাইয়ের মতন বড় হওয়া নর্মাল হলেও বহু কারণে সেই স্বাভাবিক সম্পর্কটুকু গড়ে উঠেনি দু ভাইয়ের মধ্যে। মেয়েটা যখন কবুল বলতে সময় নিচ্ছিল, বিয়ে ভাঙার কষ্টে দিশাহারা ছিলো তখন সে ভেবে বসেছিল ইমান ইতরটা কে বর হিসেবে পাবে না দেখে মেয়েটার এত কষ্ট। কবুল বলতে এত জড়তা সংকোচ। হয়তো প্রেমের সম্পর্ক ছিলো তাদের মধ্যে। অথচ এখন মেয়েটার বলা কথার সুবাদে ভুল ভাঙলো তার। মনে হলো মাথার উপর থেকে মণ কয়েক ভারী কোনো বোঝা নেমে গেলো।
আযান নিজেও বুঝলো না তার হঠাৎ এত নিশ্চিন্ত হবার কারণ৷ আফসোস গোয়ারঁ টা জানল ই না তার অবচেতন মন কবুল বলা মাত্রই মেয়েটাকে নিজের বলে ধরে নিয়েছে। কিছুতেই মানতে পারছিলো না তার তিন কবুল বলে ধর্মমতে বিয়ে করা বউয়ের মন মস্তিষ্ক জুড়ে সে ব্যতীত অন্য কোনো পুরুষ থাকবে৷
মনে মনে খুশি হলেও চোখমুখ একই রকম বেজার রেখে আযান গম্ভীরমুখে বলল, ‘না বলায় বেঁচে গেছ৷ হ্যা বললে সাথে সাথে ঘাড় ধরে রুম থেকে বের করে দিতাম’ নাজিয়ার আতংকভরা দৃষ্টি আযানের চোখ এড়ালো না। মেয়েটা খুব ভয় পেয়েছে তাকে৷ পাওয়া দরকার! সে ভয় টা বাড়িয়ে দিতে দুয়েকটা মিথ্যে আরো বললো, ‘এমন ড্যাবড্যাব করে কি দেখছো? একটা কথাও মিথ্যে বলিনি আমি৷ হ্যা বললেই তোমাকে নিজের রাস্তা মাপতে বলতাম। এমন বউয়ের আমার দরকার নেই’
এদিকে নাজিয়ার এমন রাগ লাগলো। লোকটা আজ তাকে যত ভেলকি দেখিয়েছে তাতে এই বাড়ি ছেড়ে যেতে পারলে সে পারতপক্ষে বাচেঁ। রাগের মধ্যে রাগ আরো বাড়লো সন্ধ্যার ঘটনাটা মনে পড়তেই। সে চাপাস্বরে ঠান্ডা গলায় আযানের বলা শেষের কথাটার জের ধরে প্রশ্ন করলো, ‘বউ মানেন নাকি আপনি আমাকে? কই তখন ত সবার সামনে জোর গলায় বলেছিলেন আপনার ঘাড়ে এসে পড়েছি আমি!’
বোবার ত ভালোই বুলি ফুটেছে, আযান মনে মনে ভাবলো। কিন্তুু চোখমুখ কুঁচকে বলে, ‘কি আশ্চর্য! মানুষ ত বউ লুলা কানা প্রতিবন্ধী হলেও সংসার করে। বউ মানে, ফেলে ত আর দেয় না! সেখানে তোমার দুটো হাত দুটো পা সব ঠিকাছে৷ তাহলে আমি তোমাকে বউ মানবো না কেনো আজব।’
‘আর যদি আমি আপনাকে না মানি? আপনার সাথে সংসার করতে না চাই তবে?’ নাজিয়া আর রাখ ঢাক রাখলো না৷ বলে ই ফেলল এতক্ষণ তার মনে চেপে রাখা কথাটা। ‘তাহলে একটা থাপ্পড় এবার তুমি সত্যি ই খাবে। মামাবাড়ির আবদার যেনো। আমি পায়ে ধরেছিলাম কবুল বলতে? স্বামী মানবো না সংসার করবো না এরপর কি আলাদা শোবে? এসব ফিল্মি জিনিসপাতি করার প্ল্যান থাকলে মাথা থেকে এক্ষুণি ডিলিট করো। সংসার তুমি না করলে তোমার বাপ এসে করবে!’
‘আমার বাপ তোকে গুলি করবে হারামজাদা’ নাজিয়া কথাটা বলতে গিয়েও বললো না৷ বহু কষ্টে নিজের রাগ সংবরণ করলো।
(ঘন্টার পর ঘন্টা সময় লাগিয়ে ভেবেচিন্তে চার পাঁচ হাজার ওয়ার্ড লিখি অথচ বদ মানুষজন তোমাদের রিয়েক্ট কমেন্ট করতে এত আলসেমি! ভালো হয়ে যাও তোমরা বুঝছ!)

