#মেঘের_মুলুকে_চল
#আয়রা_তাবাস্সুম
#পর্ব০২
‘তাই বলে তোর বাবার কথায় মেয়েটাকে তোর বিয়ে করে আনতে হবে! আমাদের উপর ত খুব রাগটাগ দেখাস তখন দেখাতে পারলি না কেনো’ আরমান ভুঁইয়া আরেকটা দীর্ঘশ্বাস আড়াল করে মাথার বালিশে গাল চেপে পাশ ফিরলেন৷ বাসায় এসেই শুয়ে পড়েছেন তিনি৷ অন্ধকার রুমে এখন কেমন হাসফাসঁ লাগছে৷ নিচ থেকে এখনো তার গৃহিণীর চিল্লাপাল্লা চলমান৷ ছেলেকে একনাগাড়ে কথা শুনাচ্ছে। সেসবের কিছু তার কানেও আসছে। তিনি গা করলেন না এসব কথাবার্তা। বরং জীবনের হিসাবনিকাশ মেলালেন নীরবে। সারাজীবন টা যেনো তার চোখের সামনে একেবারে জীবন্ত হয়ে ভেসে উঠল।
আরমান ভুঁইয়ার বাপ এই তল্লাটের বড় ব্যবসায়ী ছিলেন। রাগী প্রতাপশালী মানুষ। একে ত খানদানী পরিবার পাশাপাশি বংশপরম্পরায় বাপের সেই ব্যবসা ফুলেফেঁপে এমন বাড়ল আরমান ভুঁইয়া পারলে রাজার হালেই জীবন কাটালেন। কোনো অভাব ছেলেদের ছুতেঁ দিলেন না বিশেষ করে বড় ছেলেটা মুখ ফুটে চাদঁ চাইলে চাঁদ এনে দেয়ার মতন বাপ ছিলেন তিনি। চোখ বন্ধ করেই বহুবছরের পুরোনো স্মৃতি ভেসে উঠল মনের পর্দায়। ছোট দুটো ছেলেকে দু হাতে ধরে স্কুলের গেইট থেকে গুটিগুটি পায়ে বাসায় ফিরছেন। আজ জানলেন সেই ছোট দুটো ছেলের একটা এমন অজাত ইতর যে ছ বছর এক মেয়ের সাথে সম্পর্কে থেকে তাকে পোয়াতি বানিয়ে আবার আরেক মেয়ের জীবন শেষ করতে বরবেশে একদম বাবুর মতন বিয়ে বাড়িতে হাজির হয়েছিল। ছি! তার আবার অস্থির লাগা শুরু হলো। মনে হলো বুকের ভেতর কে জানি জোরে জোরে বারি মারছে। তিনি প্রাণপণে চেষ্টা করলেন ঘুমিয়ে পড়তে।
‘ছোটভাইয়ার ধমকে মনখারাপ করে থেকো না ভাবি৷ ও সবাইকে ই এমন চোটপাট দেখায়। ও রাগ একদম সামলাতে পারে না’ নাজিয়া তার ননদের কথা শুনে এবার কান্না কিছুটা থামালো৷ ইশিতা তাকে কিছুক্ষণ আগে আযানের বেডরুমে নিয়ে এসেছে। একটা ছিমছাম রুম৷ একপাশের ব্যালকনিতে বিভিন্ন রকমের অর্কিড। ফার্নিচারের বাড়াবাড়ি নেই। সিম্পল খাট ড্রেসিং টেবিল ওয়ারড্রব আর বুক শেলফ এসব ই। জিনিসপত্র কম হলেও রুমটা খুব পরিপাটি করে গোছানো। নাজিয়া চোখমুখ মুছে কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে আশেপাশে নজর বুলালো।
‘ভাবি নিশ্চয় ভাবছ ভাইয়া খুব গোছালো মানুষ তাই রুমটা এমন। সে ভাবনা ভুল না তবে আরেকটা কারণ ও আছে। ভাইয়া নিজের রুমে টোটালি কাউকে এলাউ করে না। নিজে পরিষ্কার গোছগাছ সব করবে টুঁ শব্দ ছাড়া তবে কেউ তার রুমে এসেছে জানলে বাড়ি চিল্লিয়ে মাথায় করে। আমি ত কয়েকদিন আগেও এমন থাপ্পড় খেয়েছি চুরি করে ভাইয়ার টি শার্ট নিতে আসছিলাম তাই৷ ওর জিনিসে কেউ হাত দিবে সেটা ওর খুব অপছন্দ। জানো আমার বড়ফুফি ত সবসময় বলে বংশে নাকি একমাত্র ছোটভাইয়া ই পুরোটা আমার দাদাজানের মেজাজ পেয়েছে। হাবভাব রাগ অভ্যেস বেশিরভাগ নাকি কেবল দাদাজানের সাথে মিলে’
নাজিয়ার এবার ইচ্ছে হলো আর রাখঢাক না রেখে একদম ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে প্রাণ খুলে বিলাপ করে কাঁদতে। সে আসছে থেকে কেবল দেখে আর শুনে আসছে ওই আযান না আযাবের বাচ্চার রাগের ফিরিস্তি। নাজিয়া সামনাসামনি মানুষের সাথে এত কথাবার্তা বলতে পারে না৷ নিজের মনে মনেই নিজের সাথে দুনিয়ার কথাবার্তা বলে সে৷ তাই ননদকে না বললেও মনে মনে ভাবলো এক ক্যারেক্টারলেস প্রতারকের কবজা থেকে বাঁচিয়ে খোদা তাকে আরেক বদমেজাজি বেয়াদবের গলায় ঝুলিয়ে দিলো যে কথাবার্তা র কোনো সৌন্দর্য নমনীয়তা জানে না। খালি ধমক দেয়। তখন কেমন বিশ্রী করে নাজিয়াকে চিল্লিয়ে বলল বিয়ে করেছি না! যেনো নাজিয়া এই গোঁয়ার বর্বরটাকে বিয়ে করতে হেদিয়েঁ মরছিল। ফালতু লোক একটা!
ইশিতা নিজের এতগুলো কথার বিপরীতে নাজিয়াকে চুপ দেখে যা বুঝার বুঝে নিলো৷ ‘তুমি বোধ হয় ইন্ট্রোভার্ট, ভাবি৷ তাহলে বলবো ভাইয়ার সাথে ভালো ই মিলবে তোমার। ভাইয়াও কম কথা বলে৷ যখন বলে তখন অবশ্য গাইল্লায় নাহলে ধমকায়। এই প্রসংগ বাদ তবুও শেষে একটাই কথা বলব ভাবি যা ই হয়েছে আল্লাহপাকের কাছে শুকরিয়া করো৷ ইমান ভাইয়া আমার নিজের বড়ভাই তবুও কোনোদিন বুঝিনি ও এমন ইতর৷ একেবার ভিজে বিড়াল সবার আদর্শ ছেলে সেজে ছিল এতদিন। আম্মুর ত ফেবারিট বাচ্চা ও। এজন্য এতকিছুর পরও বড়ভাইয়ার দোষ ঢাকতে তোমাকে বিয়ে করেছে কেনো বারবার এটা বলে বলে ছোটভাইয়াকে জুলুম করছে রীতিমতন। তুমি অন্তত ছোটভাইয়ার সাথে রাগ করে থেকো না৷ ও আর যা ই হোক ইমান ভাইয়ার মতন ভন্ড নয়। বলতে গেলে একদম নির্ভেজাল মনে মুখে একই এরকম মানুষ ও’
নাজিয়া এবার আর মনে মনে কথা বলার ধার না ধরে মুখের উপরেই বলল, ‘ভন্ড না হলে এই রাগ চোটপাট কবুল বলার আগে বিয়ে বাড়িতে দেখালেই ত পারত। তখন অন্তত আমি পাপাকে বলতাম এমন বদরাগী আমাকে চায় না এমন কারো সাথে তোমরা জোর করে আমার বিয়ে দিও না৷ তখন ত বলেনি কিছু। এমনকি ড্রাইভিংয়ের পুরোটা সময়ও অভিযোগ রাগ কিছু দেখায়নি আমায়। চুপচাপ ছিলো। তাহলে এখানে এই দোযখে নিয়ে এসে আমার ফিরে যাবার সব পথ বন্ধ করে আমাকে এভাবে ধমকে অপমান করলো কেনো। এই প্রশ্নের উত্তর দিবে আমায়? এটা কেমন আচরণ। আজকের দিনের পুরো ঘটনায় আমার দোষ টা কি যে আমি এরকম অপমান সহ্য করব’
ইশিতা এবারে কোনো জবাব দিলো না। সে নতমুখে বলল, ‘ফ্রেশ হয়ে নিও ভাবী৷ তোমার লাগেজ খাটের পাশে রাখা আছে৷ বাড়ির যা সিচুয়েশন তোমাদের বাসর টাসরের রিচুয়াল হবে বলে মনে হয় না৷ আর ছোটভাইয়ার মেজাজের পারদ যেহেতু মিনিটে মিনিটে বাড়ছে তুমি বরং তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়৷ ভাইয়া কি না কি বলবে তারপর তুমিও একটা বলবে তারপর ভাইয়া চিল্লাবে। বাড়িভর্তি আত্নীয়স্বজন সব শুনবে গসিপ করবে৷ ইশ কি বিশ্রী ব্যাপার হবে’
নাজিয়া শুনে ভাবলো এটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। অমন লুইচ্ছা স্বভাব যার বড় ভাইয়ের সে ই বা কিভাবে একদম নিপাট ভদ্রলোক হবে! রিস্ক নেয়ার প্রশ্ন ই উঠে না! চাদর জড়িয়ে তাত্তাড়ি শুয়ে পড়লে অন্তত গায়ে হাত দেবার সুযোগ পাবে না। এসব ভংচং ভেবে সে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিয়ে বিছানার এপাশ ওপাশ করতে থাকল। পরের আধঘন্টার মধ্যে দরজার নব ঘুরানোর শব্দ পেলে ধড়পড় করে জেগে উঠলে শুনতে পায় দরজা লক করার শব্দ। একইসাথে ভারী গলার ওই বর্বরের আওয়াজ।
‘অই ইমান বেইমানের সাথে প্রেম ছিলো তোমার? ‘

