মেঘের মুলুকে চল
আয়রা তাবাস্সুম
পর্ব ১১
অথৈ পড়েছে অথৈ জলে! কোম্পানির ইয়ারলি ইভ্যালুয়েশন রিপোর্ট বানিয়ে তার আজকে সাবমিট করার কথা। সাবমিট সে করেছে। এটায় সমস্যা নেই। সমস্যা সাবমিট করা রিপোর্ট টাতে। ডেডলাইনের আগের রাতে কাজ রেডি করার বাজে অভ্যেস তা টাকে মহাবিপদে ফেলবে একদিন সেটা সে জানত। তবে দিনটা যে এত তাড়াতাড়ি আসবে সেটা সে ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি৷ ফ্রেন্ডদের সাথে রাত জেগে মুভি নাইট মারাতে গিয়ে বেমালুম ভুলে বসেছিল রিপোর্ট টা রেডি করার বিষয়ে। এরপর আধা জাগা আধা ঘুৃমে কোনোমতে রিপোর্ট টা বানিয়ে সাবমিট করেছো আজ। একশটা ভুল ত থাকবেই!
আজ তার মনে হলো অফিসের পরিস্থিতি বেশ গরম। সকাল থেকে স্যারের মেজাজ চড়ে আছে। সবার ই কোনো না কোনো ভুল ধরছেন৷ সেখানে অথৈ র রিপোর্ট ত ভুলের বাহার! সে একটা বড়সড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে নার্ভ শান্ত করার চেষ্টা করল। রোজ রোজ এমন বকাবকি তে সে অভ্যস্ত তবে আজ মনে কু ডাকছে। মনে হচ্ছে ডোজ বেশি পড়বে।
অফিসের স্টাফ এসে খুব বিরসমুখে জানাল অথৈ কে ডাকা হয়েছে। অথৈ মুখটা জোর করে হাসি হাসি বানিয়ে ফেলল৷ অপমানের চৌদ্দ গুষ্টি শুনতে হবে বোধহয় আজ! আগেভাগে প্রস্তুতি নিয়ে রাখলে অন্তত হঠাৎ করে কান্নাটান্না চলে আসবে না। এতবড় মেয়ে হয়ে বকাটকা শুনে এরকম কান্নাকাটি করা খুবই লজ্জার। অন্তত এক্ষেত্রে এটুকু প্রফেশনালিজম সে মেইনটেইন করতে চায়।
‘আমাকে জোকার মনে হয় আপনার? আমার কথাবার্তা খুব ফানি?’
‘না স্যার।’
মেয়েটা খুব দুর্বল গলায় বলল। মনে মনে ভাবল মেইন প্রসংগে আসতে আসতে মনে হয় দু তিন দফা অপমান এমনিতেই শুনতে হবে৷
‘তাহলে আমার সামনে আসলেই আপনার মুখ থেকে হাসি সরে না কেনো! মিস অথৈ!’
রাদ থেমে থেমে যোগ করল আবার।
‘আমি কি আপনার থেকে মিনিমাম রেসপনসেবলিটি আশা করতে পারি না? রিপোর্ট রেডি করা কর্পোরেট অফিসে খুউব ব্যাসিক একটা প্র্যাকটিস। এটাও আপনি এতটা দায়সারা ভাবে রেডি করে সাবমিট করেছেন! টাইম লাগলে বলতেন৷ টাইম বাড়িয়ে দেয়া হতো! তবুও এরকম গা ছাড়া ভাব নিয়ে যেনতেন একটা রিপোর্ট প্রিপেয়ার করার ত দরকার ছিল না।’
‘আ’ম এক্সট্রিমলি সরি স্যার৷
নো! ইউ আর নট!
এক পার্সেন্ট ও রিগ্রেট নাই আপনার। আমি কালকে আপনাকে আবার আরেকটা রিপোর্ট বানাতে বললে সেটায় আরো একশটা ভুল করে আমার কাছে নিয়ে আসবেন।
আপনাকে বলতে বলতে আমি বিরক্ত এখন৷ নেহাৎ কোনো বড় অপরাধ ছাড়া এমপ্লয়ি ছাঁটাই করা আমাদের নিয়মবিরুদ্ধ তাই আপনি বারবার এমন করার সুযোগ পাচ্ছেন।’ রাদ একনাগাড়ে কঠিন কঠিন কথাগুলো নির্দ্বিধায় বলে গেল৷ সকাল থেকে মেজাজ নিয়ন্ত্রণে রাখাটা আর হচ্ছিল না তার দ্বারা।
অথৈ র আজ খুব কষ্ট লাগল। স্যার অন্যদিন হালকাপাতলা অপমান করে অথচ আজ একেবারে তার দায়িত্ববোধ আছে কিনা এই ব্যাপারটাতে আঙুল তুলল! কোম্পানির এইচআর হয়ে নিজেকে কত বড় হনু ভাবছে ব্যাটা! আরে ব্যাটা দায়িত্ববোধ না থাকলে অথৈ ত অসুস্থতার বাহানায় আরেকটা দিন চেয়ে নিতে পারত। সেটা ত করেনি। ঠিকই রাত জেগে রিপোর্ট টা রেডি করে ভুল শুদ্ধ যেরকম ই হোক সাবমিট ত করেছে। মনে মনে এসব ভেবে তার মুখের হাসিহাসি ভাব টা নিজের অজান্তেই গায়েব হলো। ভেসে উঠল মনখারাপ।
রাদ সে চেহারা দেখল একপলক। তারপরে গমগমে স্বরে বলে উঠল, ‘আপনি এখন যেতে পারেন। আর যেসব ভুলচুক করেছেন ওগুলো শুধরে নিবেন৷ প্রয়োজনে হাসান সাহেবের কাছ থেকে শিখে নেবেন৷ উনি উনার ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে এসব বহু বানিয়েছে। অভিজ্ঞ বলতে পারেন৷’
অথৈ আর কথা বাড়াল না৷ আজ তার খুব মন খারাপ। তাড়াতাড়ি এখান থেকে বেরুতে পারলে বাঁচে। কান্নাটান্না করে ফেললে ব্যাপারটা বিশ্রী হবে৷
রাদ মেয়েটার চোখমুখের অবস্থা ঠাহর করতে পারল৷ তার নিজেরও খানিকটা খারাপ লাগল। মানুষজনকে এত কঠিন কথা সে সহজে বলতে পারে না। সামনের মেয়েটাকে ত আরো না অথচ অদ্ভুত ভাবে সামনের মেয়েটাকেই তার সবচেয়ে বেশি কঠিন কথা বলা হয়েছে। সে মনখারাপ টুকু গিলে ফেলল৷ ত্রিশ ছুঁইছুইঁ বয়সে টিনেজারদের মতন এমন অযাচিত আবেগ মানায় না৷
_____________________
বিকেল থেকে নাজিয়ার মন ভার। মনখারাপটুকু ক্ষণে ক্ষণে বাড়ছে। কেমন হাসফাসঁ লাগছে। মায়ের ফোন পেয়ে সে শাশুড়ির কাছ থেকে জানতে চেয়েছিল সে কাল বাপের বাড়ি যাবে কিনা। ভদ্রমহিলা এ কয়েকদিনে তার সাথে সৌজন্যতামুলক তেমন কোনো কথাবার্তা বলেননি বরং বেশিরভাগ কথাবার্তাতেই অদৃশ্য ক্ষোভ ছিল৷ নাজিয়া এমন বিহেভিয়ারে প্রথমে অবাক হয়েছিল যথেষ্ট।
তার বুঝে আসেনি ঠিক কোন যুক্তিতে মহিলা তার লম্পট ছেলের স্ক্যান্ডাল টাকে এড়িয়ে গিয়েও পুরো ঘটনার জন্য নাজিয়াকে দায়ী করছেন। সে এটা পর্যন্ত জানত না অই ফ্রডকে বাড়ির ত্রিসীমানায় আসতে মানা করা হয়েছে তার শশুরের তরফ থেকে। অথচ সেটার জন্যও মহিলা আকারে ইঙ্গিতে তাকে দোষী সাব্যস্ত করেছে। দুদিনের এ সমস্ত ঘটনার কারণে নাজিয়ার বিন্দুমাত্র আগ্রহ কাজ করছিল না মহিলার সাথে কথা বলতেও তবুও মায়ের কথামতো অনুমতি নিতে গিয়ে দায়সারা গোছের জবাব পেলো। শুনল তিক্ত কিছু বাক্য৷
‘আমার কাছে পারমিশন নেয়ার কি আছে। তোমার জামাই নিয়ে গেলে যাবে! ও অবশ্য মানা করবে না। যেভাবে সানন্দে সংসার করছে তোমার সাথে সেরকম সানন্দে তোমার বাপের বাড়ি ও যাবে!’
এসবে মাথা খারাপ করার মতন মেয়ে সে না। মহিলা যে কুটনি সেটা সে ঠিকই বুঝেছে৷ টিভি সিরিয়াল ত নাজিয়া ও কম দেখেনি৷ তার মনখারাপ হলো অন্য ব্যাপারে৷ যখন তার ননদ মায়ের এমন তিক্ত কথাবার্তা শুনে তাকে স্বান্তনা দিতে এসে কথার ভুলে বলে ফেলল অন্য কথা। তার মায়ের এমন আচরণ নতুন নয়। ছোট থেকেই এমন তফাত ইশিতা দেখেছে৷ সবার ছোট হওয়ায় ইশিতা তবুও আদর আহলাদ পেলেও আযান সেটার সিকিভাগ ও পায়নি। তাদের মা নিজের বড় সন্তানকে এমন মাথায় তুলে বড় করেছে এত বড় অপরাধ করার পরও নামাতে পারছে না আর। ননদের কথাবার্তায় নাজিয়া আরো বুঝেছে তার শাশুড়ী গ্যাসলাইটিং বিহেভিয়ারে এক্সপার্ট। তার মন রীতিমতন ছুতোঁ খুজেঁ বেড়াচ্ছে নিজের বড় সন্তানের অপরাধ হালকা করতে। এজন্য ই ঘুরেফিরে আযানকে তিনি দায়ী করে বেড়াচ্ছেন নাজিয়া কে বিয়ে করে আনায়।
নাজিয়ার বজ্জাত টার জন্য খুব মনখারাপ হলো। নিজের পাপা মাম্মার সবচাইতে ছোট সন্তান হওয়ায় আদর ভালোবাসার কখনো কমতি পড়েনি তার ভাগে। পাশাপাশি তার এবং তার ভাইয়ের প্রতি তাদের বাবা মায়ের ভালবাসার দৃশ্যমান কোনো তফাতও চোখে পড়েনি কখনো। অথচ বজ্জাত টা কিনা এত অনাদর অবহেলায় ছোটবেলা কাটিয়েছে!
নাজিয়ার এত মনখারাপ হলো তার ইচ্ছে হচ্ছিল বদ টা এলেই সে তাকে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে দেবে। নাজিয়া ত আর ম্যাজিশিয়ান না যে তার ছোটবেলার সমস্ত অনাদর অবহেলা কে ভালবাসা বানিয়ে দ্বিগুণ করে ফিরিয়ে দিতে পারবে। কিন্তু যেটা নাজিয়া পারবে সেটা সে অবশ্যই করবে। সিদ্ধান্ত নিলো সে বদ টার খুুউউব ভালো বউ হবে! তার খেয়াল রাখবে যত্নআত্তি করবে। তার কথা শুনবে। যতই বজ্জাত টা চোটপাট দেখাক না কেনো প্রতিদিন দু তিনটার বেশি গালি সে কিছুতেই দিবে না। বদ টা নাজিয়াকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতে চাইলে সেটার পারমিশন ও নাহয় দিয়ে দিবে! আর নাজিয়ার মন যতই এটাসেটা বলুক নাজিয়া মনের বিরুদ্ধে গিয়ে হলেও বদ টার প্রেমে পড়বে! তাকে ভালবাসবে!
‘বদ টা মোটেও এতটাও বদ না যে তার প্রেমে পড়া মানা! তাকে ভালবাসা যাবে না।’ নাজিয়া নিজে ই যেনো নিজের মনকে কঠিনভাবে শাসাল৷ তবুও তার মনখারাপ দুর হলো না। কি যে কষ্ট লাগছিল তার বদ টার জন্য! মনের খবর চেহারায় ভাসে৷ ফলশ্রুতিতে মলিন চোখমুখ নিয়ে সে ধ্যানমগ্ন হয়ে বসে রইল৷
আযান যথেষ্ট ক্লান্তবিধ্বস্ত হয়ে বাড়ি ফিরেছে৷ কাল রাতজেগে ডেডলাইনের কাজ সারতে হয়েছে অমন অহেতুক ঘোরাঘুরির ফলে৷ রুমে ঢুকে বেকুব টাকে একনজর দেখল সে। খেয়াল করল তার মলিন চিন্তামগ্ন চেহারাটা। নিজের ক্লান্ত পরিশ্রান্ত অবস্থা ভুলে মাথায় প্রথম চিন্তা এলো মেয়েটার কোনোকিছু নিয়ে মনখারাপ কিনা। এত ভালো ভালো কথা তার মুখে আসে না। জানতে চাইলে হয়ত বাঁদর টা নিজেও অবাক হবে তবুও সহ্য হলো না মেয়েটার চেহারার এমন মলিনতা।চাইল মেয়েটার মনভার দুর করতে।
সেই অভিপ্রায়ে গলায় জোর করে খানিকটা বিরক্তি এনে বলল, ‘আরমিইইইন! অ্যাই মেয়ে! মনখারাপ তোমার? কেউ কিছু বলেছে বাড়িতে?’
গলায় হম্বিতম্বি এনে শতভাগ চেষ্টা করল যাতে নিজের কনসার্নটুকু লুকাতে পারে৷ কথাগুলো আদুরে না শোনায়! নাহয় বাঁদর টা তার মাথার উপ্রে উঠে আর নামবে না।
নাজিয়া ডুবে ছিল মন আর মগজের দোটানায়। বজ্জাত টাকে ভালোবাসার সিদ্ধান্তে সে অনড় তবুও বেয়াদপ মনটা বারবার যেনো বলছিল অমন চোটপাট করা লোকের প্রেমে না পড়তে। কিন্তু আযান ই যেন তার এই দোটানা দুর করল৷ সাদা শার্টের দু হাত গোটানো, চোখেমুখে রাজ্যের ক্লান্তি নিয়ে সারাদিন ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও মানুষটা কি অবলীলায় সবকিছু ফেলে রেখে বাড়ি ফিরেই আগে তার মনখারাপের ব্যাপারে জানতে চাচ্ছে! এত চমৎকার বর নাজিয়ার! এমন মানুষ নাজিয়া আর একটাও পাবে?এমন চমৎকার মানুষকে ভালো না বেসে পারা যায়!
আযানের এই এতটুকু কনসার্নে মেয়েটার চোখমুখ যে খুশিতে চিকমিক করে উঠবে সেটা আযানের ধারণার বাইরে ছিল। তার বরাবর মনে হতো তার সাথে কেউ সহজে থাকতে পারবে না। পরিবার আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব সবার মুখে এক কথা। এমন গোঁয়ার বদমেজাজী দের সংসারে বউ থাকে না। অথচ তারা যদি একটাবার দেখতো তার মতন গোঁয়ারের গমগমে গলার মায়াদয়াহীন কনসার্নেও একটা মেয়ের মনভার দুর হয়, খুশিতে চোখে জল ভরে আসে, তবে কি তারা অবাক হতো!
আযানের খানিকটা আফসোস ও হলো এত নরমসরম সামান্য আদরে গলে জল হয়ে যাওয়া মেয়েরই কেনো তার মত মানুষের জীবনে আসতে হলো! এমন আদুরে নরম মেয়েটির উপর আযান সারাক্ষণ কথার গরম চালাবে কি করে? তার মন মগজ কোনোটাই ত এমন জুলুম করতে সায় দেবে না! অথচ নরমসরম কথা বলা ত তার ধাতে নেই!
বিয়েটা করে আযান ইয়াসীর ভুইঁয়ার প্রথমবার মনে হলো সে বড্ড ঝামেলায় পড়ল যেন।

