‘মেঘের মুলুকে চল’
আয়রা তাবাস্সুম
পর্ব ১৩
সারাদিন নিজের বাড়িতে নাজিয়ার দিনটা খুউব ভালো কাটল। আযানের প্রসঙ্গ যতবার উঠেছে মুখের হাসি সরছিল না যেন৷ তার মা ব্যাপারটা খেয়াল করল ভালোভাবে ই। মেয়েকে এমন হাসিখুশি দেখে মহিলার চোখ জুড়িয়ে আসছিল। যতবার মেয়েটা বরের কথা উঠতেই মুচকি হাসছিল ততবার মনে মনে আল্লাহ পাকের কাছে শোকর আদায় করলেন তিনি।
ছেলেমেয়ে দুটো একে অপরের সাথে ভালো থাকুক খুশিতে থাকুক সেটাই এখন তার একমাত্র চাওয়া। নিজের স্বামীর কাছে ছেলেটার রাগ সম্পর্কে যা কিছু শুনেছিলেন তাতে তার ভয় ছিল মেয়েটা ভালো থাকবে কিনা। মেয়েকেও চিনেন তিনি। জানেন মেয়েটা দুঃখ লুকোতে পারে না। কষ্টে থাকলে তিনি ঠিকই ধরে ফেলবেন সেটা। কিন্তু আজ বুঝলেন মেয়ে সুখও লুকোতে পারে না। বরের কথা উঠতেই কেমন চোখমুখ খুশিতে চিকচিক করছিল মেয়েটার!
নাজিয়া ইশিতার কাছ থেকে আগের রাতেই আযানের সব পছন্দের আইটেম ডেজার্টের বিষয়ে জেনে নিয়েছিল। তাই পুরো আয়োজন জুড়ে থাকল আযানের প্রিয় সব খাবার৷ পুরো দিন সে মায়ের সাথে মোটামুটি হাত চালিয়ে সবটা বানাতে সাহায্য করল। কিছুটা শিখলও। রান্নাবান্না সে টুকটাক জানত৷ আহামরি কিছু না৷ তবে প্রথমবার তার ইচ্ছে হলো ভালো করে রান্না টা শিখবে সে। বদ টাকে এটাসেটা বানিয়ে খাওয়াবে।
আযান অফিস থেকে সোজা পৌঁছাল বনানী। সে আজ চেষ্টা করেছে অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বেরুতে। বেকুব কে ত সকালে কথা দিয়েছিল রাতে যেহেতু থাকতে পারবে না অন্তত বিকেলে তাড়াতাড়ি ফিরবে। কলিংবেল চাপতেই তার মুখের ভাবাবেগ পরিবর্তন হলো। দরজা খুলেছে তার শশুর। আযান ভেবেছিল বাঁদরটা লাফাতে লাফাতে দরজা খুলতে আসবে। যেভাবে বলেছিল আযান তাড়াতাড়ি আসার অপেক্ষায় থাকবে সে! আর এখন মেয়েটার হদিস ই নেই! আযান আগেও খেয়াল করেছে সেটা। কোথাও গেলেই বাঁদর টার খেয়াল থাকে না তার৷ আযানকে ভুলে যায় এক লহমায়।
আযানের বড় রাগ হলো৷ একদম সামান্য বিষয়েও বাঁদর টার উপর কেনো রাগ হয় ইদানীং তার সেটা সে ধরতে পারে না। অথচ সে বিয়ের প্রথমদিন থেকে চেয়ে এসেছে মেয়েটা তার প্রতি নির্লিপ্ত থাকুক। কোনো ভালোবাসা আবেগ না দেখাক তাকে৷ কারণ ভালবাসার বিনিময়ে মেয়েটাকে ভালবাসা দিতে অপারগ সে। তবুও আজ মেয়েটার এমন নীরব অবহেলায় আযানের রাগ লাগল। বাপের বাড়ি এলেই কি বর কে ভুলে যেতে হবে! অদ্ভুত!
সব ভাবনা সরিয়ে সৌজন্যমুলক হাসি দিয়ে ভিতরে ঢুকতেই রেজওয়ান চৌধুরী ভীষণ আন্তরিকতায় মেয়ে জামাই কে জড়িয়ে ধরলেন৷ আযান অনুভব করল উষ্ণ এই আলিঙ্গনে বিন্দুমাত্র খাদ নেই৷ সে ভেবেছিল বেকুব টা ইশির সাথে মিলে সুযোগ পেলেই যেভাবে তার বদনাম করে আজ সারাদিনও সেসব করে বেড়িয়েছে। অথচ তার শশুরের বিহেভিয়ারে এরকম কিছুর লেশমাত্র পেলো না সে৷ মনে মনে ভাবল বেকুব টা কবে থেকে এমন পতিভক্ত হলো! আযানকে কোণঠাসা করার একটা চান্স ও ত বাঁদর টা মিস করে না!
ড্রয়িংরুমে বসিয়ে রেজওয়ান চৌধুরী রাজ্যের কথাবার্তা শুরু করলেন মেয়ে জামাইয়ের সাথে। বাড়ির সবার খবরাখবর নিলেন৷ আফসোসও করলেন রাদের সাথে আযানের দেখা না হওয়ায়৷ বিজনেস ট্রিপে আপাতত শহরের বাইরে আছে সে। আযান শুনল সবটা৷ আলাপচারিতার ফাঁকে ফাঁকে নিজেও কথা বলল টুকটাক। এত কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল না তার। চোখ তার আতিউতি করে খুঁজছিল বাঁদর টাকে। অন্তত দশ মিনিট ত হবেই আযান এসে বসেছে অথচ মেয়েটার খবর ই নেই!
এদিকে রেজওয়ান চৌধুরী তখন নিজের কথাবার্তায় মশগুল। হঠাৎ কি ভেবে যেনো বলে ফেললেন, ‘নাজিয়া মামনির সাথে কথা হয়েছে তোমার সারাদিন?’
আযান মৃদু গলায় না বলে। অফিসে গেলে এমনিও সারাদিন বাঁদর টার সাথে কথা হয়না তার। তার কলিগেরা বউ দের কত মেসেজ টেসেজ দেয়৷ সেসব পড়ে আবার মুচকি হাসেও। আযানের বড় বিদঘুটে লাগে এসব। কেনো বাপ!বাড়িতে গিয়ে আর বউ কে পাবি না! এদের জীবনে এত প্রেম পিরিতি কোথা থেকে আসে আযান ভেবে পায় না৷ সে গোঁয়ার হিসেবে ঠিকই আছে৷ প্রেমিকপুরুষ হয়ে যদি কখনো এরকম ন্যাকামি সে করে বেড়ায়…পরের চিন্তাটা আর ভাবার সাহসও হলো না৷ গা ঝাড়া দিয়ে উঠল। মনস্থির করল আযান ইয়াসীর ভুইঁয়া নিজের এমন অধঃপতন কক্ষণো হতে দিবে না।
রেজওয়ান চৌধুরী তখন বলে চলেছেন সেই প্রসংগে৷ তরল গলায় বললেন, ‘ও কে ফোনে কিভাবে পাবে! আমি দুপুরে বাসায় আসার পর থেকেই দেখছি মা মেয়ে রান্নাঘরে রাজ্যের আয়োজনে ব্যস্ত। এটাওটা করছে’। পরবর্তীতে গলা কিছুটা খাদে নামিয়ে সলজ্জ মুখে বললেন, ‘আমার মেয়েটা রান্না তেমন পারে না। তবে আজ দেখলাম হাতেহাতে করছে৷ আমার ওয়াইফ বলেছে সব নাকি তোমার পছন্দের রান্না।’
এবার আযান পুরো ঘটনা বুঝল৷ বাঁদর টা রান্নাবান্নায় ব্যস্ত দেখে হয়তো তাকে দেখা দেয়ার অবসর পায়নি৷ হঠাৎ করে ফুরফুরে হয়ে গেল তার মনমেজাজ। মেয়েটা যে ইচ্ছাকৃত ভাবে তাকে অবহেলা করেনি এটুকু ব্যাপারটাই যেন প্রশান্তি এনে দিল তার মনমস্তিষ্কে।
এসব চিন্তাভাবনায় অন্যমনস্ক থাকায় রেজওয়ান চৌধুরী কখন যে উঠে কিচেনের দিকে পা বাড়ালেন আযান খেয়াল ই করল না সেটা। ধ্যান ভাঙল সামনের রমণীর নাশতার ট্রে রাখার শব্দে। উবু হয়ে টি টেবিলে প্লেট সাজাতে থাকা মেয়েটাকে একপলক দেখেই আযানের সারাদিনের সমস্ত ক্লান্তি অবসন্নতা গায়েব হলো নিমিষেই। উত্তপ্ত অন্তঃকরণে অহেতুক নামল ভালোলাগার বৃষ্টি।
ইদানীং এরকম হয় তার৷ মেয়েটাকে দেখলে স্বস্তি লাগে। মনে হয় আযানের নিজের মানুষ। এমন মানুষ যাকে দেখলে আযানের মনে হয় ক্লান্ত দিনশেষে সে অবশেষে ঘরে ফিরতে পেরেছে। এটাও ভেবে কুল পায় না যেই বিয়েটাকে তার প্রথমদিন এমন শাস্তির মনে হয়েছিল সেই বিয়ের সুবাদে তার জীবনে আসা মেয়েটাকে এখন এতটা স্বস্তির মনে হয় কেনো!
নাজিয়ার বদ টাকে দেখে খুব ভালো লাগল। সে প্লেট রেখে চটজলদি একেবারে আযানের পাশে গিয়ে বসল। খুব হাসিহাসি মুখে বলল, ‘থ্যাংকিউ। আপনি আপনার প্রমিজ রাখলেন সেজন্য।’
আযান মেয়েটার চেহারা আগাগোড়া পরখ করল৷ কোথাও মনখারাপের লেশমাত্র নেই বরং খুশির আভা। আযানের এটুকু করায় বাঁদর টা এত খুশি! বাঁদর টা কি ধরে ফেলেছে আযান তার কথা রাখতেই যেভাবে পারে কাজ শেষ করে চটজলদি ফিরেছে। কিন্তু সেটা ত হতে দেয়া যাবে না৷ বাঁদর টা তখন প্রত্যাশার পারদ বাড়িয়ে ফেলবে৷ হয়তো কোনোদিন বলে বসবে মন ভালো নেই আমার৷ আকাশের চাঁদ এনে দিন আমাকে।
তা হতে দেয়া যাবে না৷ বউ কে এত লাই দেয়ার মতন মানুষ আর যে হোক আযান ইয়াসীর ভুইঁয়া মোটেও নয়। বিলকুল নেহি!
তৎক্ষনাৎ যুতসই কোনো অজুহাত মাথায় এলো না তার৷ তাই প্রসংগ পাল্টাতে যা মাথায় আসলো বলে বসল। ‘তোমার প্রমিজ রাখতে তাড়াতাড়ি ফিরি নি আমি৷ তাড়াতাড়ি এসেছি যাতে আমার নামে বদনাম করার কম সময় পাও। সারাদিন নির্ঘাত চুটিয়ে বদনাম করেছ আমার! দেখলাম ত সেদিন৷ আমি অফিসে যেতেই ইশি বেদ্দপ টার সাথে মিলে কেমন আমার গোষ্ঠী উদ্ধার করছিলে!’
‘তোর মতন বদমায়েশের বদনাম ই ত করব। বদ একটা!’ ভালো বউ হবার সমস্ত প্রতিজ্ঞা ভুলে নাজিয়া মুহুর্তেই বদ টাকে মনে মনে গালি দিয়ে বসল৷ সারাদিন সে কত কষ্টে বজ্জাত টার পছন্দের কতকিছু রান্না করেছে অথচ এখন তার শুনতে হচ্ছে সে সারাদিন তার বদনাম করেছে! আরে ব্যাটা তোর নিজের বউ কে আদর লাগে না বলে কি নাজিয়ারও নিজের বর কে ভালো লাগবে না! নেহাৎ নাজিয়ার মন নরম। তাই নাজিয়া তোর মতন বদ কে ভালবেসে তোর জীবন ধন্য করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নাহলে নাজিয়ার মতন বউ তোর মতন বদের কপালে আল্লাহ দেয়! মনে মনে নাজিয়া খুউব বকল তার পাজি বর টাকে। তবে অভিমানে মুখে কিচ্ছুটি না বলে মুখ বেজার করে বসে রইল।
আযান দেখল বাদরঁটার ফুলিয়ে রাখা গালদুটো। মেয়েটা বড্ড আদরকাতুরে সেটা আযান এ কয়দিনে বুঝেছে ঠিকই। তবুও শরীরের ক্লান্তিতে তার ইচ্ছে হলো না আর কথা বাড়ানোর, মেয়েটার মান ভাঙার। বরং উপভোগ করল মেয়েটার এমন ছেলেমানুষি রাগ। রাগ আরো বাড়িয়ে দেয়ার অভিপ্রায়ে খানিকটা সময় যাওয়ার পর উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, ‘অ্যাই খবিশ! ওয়াশরুম আছে তোমাদের বাড়িতে? ফ্রেশ হব আমি। গা চিটচিটে হয়ে আছে ঘামে।’
এবার মেয়েটা যেন চেতে উঠল। আগের ঘটনা টার রাগ ত ছিলোই। তাই চিবিয়ে চিবিয়ে জবাব দিল, ‘কেনো ওয়াশরুম থাকবে না আমাদের বাসায়? মানুষ না আমরা? জন্তু জানোয়ার?’
আযানের বড্ড হাসি পেলো তবুও মুখটা মিছিমিছি বিরক্ত বানিয়ে বলল, ‘সেরকম বলেছি আমি? ভাবলাম হয়ত তোমাদের বাসায় ওয়াশরুমের সংকট সেজন্য তুমি গোসল একদিন পরপর করতে।’
নাজিয়ার রাগ এবার আকাশচুম্বী। সে উঠে পা চালাতে চালাতে বিড়বিড় করে আযানকে রাজ্যের শাপ অভিশাপ দিলো। নেহাৎ তার বাপের বাড়ি এটা নাহয় বদ টাকে সে আজকে মোক্ষম জবাব দিতো ই দিতো!
ডিনার শেষে আযানকে লম্বা হয়ে তার বেডে শুতে দেখে নাজিয়ার খেয়েদেয়ে ঠান্ডা হওয়া মনমেজাজ আবারও বেজার হলো। তরতরিয়ে ফিরে এলো পুর্বের রাগ৷ গতকাল রাতে ত খুব ভাব দেখানো হচ্ছিল রাতে থাকবে না এটাসেটা৷ নাজিয়া বদ টাকে মানাতে পা ধরা টা বাকি রেখেছিল কেবল। অথচ এখন দেখো কেমন চিৎ হয়ে শুয়ে পড়েছে। সব নাজিয়াকে হেল্পলেস বানিয়ে নিজের ভাব বাড়ানোর ধান্দা! বের করবে নাজিয়া বজ্জাত টার ভাব৷ সে খেয়ালে চটজলদি গিয়ে সে আযানের কানের কাছে মুখ নিয়ে বরফঠান্ডা গলায় বলল, ‘বাড়ি ফিরে যাওয়ার কথা ছিল বোধহয় আপনার! এখানে ঘুম হবে না তো!’
আযান মুহুর্তের মধ্যে পাশ ফিরে হাত দুটো বাড়িয়ে তার কল্লার উপর দাঁড়ানো মেয়েটাকে নিয়ে এলো তার মুখের কাছাকাছি। মেয়েটা হুমড়ি খেয়ে পড়ল তার বুকে৷ মেয়েটাকে তেমন নাজেহাল অবস্থা তেই রেখে আযান ভরাট গলায় বলল, ‘অ্যাই বাদরঁ! আমি রাতে থাকলে এত সমস্যা তোমার? আমার আরো কিছু বদনাম করা বাকি রয়ে গেছে?’
বদ টার এতটা কাছে থাকায় শরীর মন কেমন বেহাল অস্থির হয়ে পড়ল নাজিয়ার। চোখে চোখ রেখে শক্ত কিছু কথা বলবে সেই অবস্থাও নেই৷ তাই কোনোমতে শব্দ জুড়িয়ে যা তা বলে বসল, ‘বদনাম করার জন্য না, আমার বেড আরাম না তাই৷’
‘সমস্যা নেই। বউ ত আরাম। বউ কে জড়িয়ে ঘুম এসে যাবে আমার। মেনেজ করে নিবো।’ আযান ফিচেল হাসি হেসে কথাগুলো বলল মেয়েটাকে বুকের উপর ফেলে রেখেই৷
নাজিয়া তক্ষুণি ভাবল কোন কুক্ষণে মনের বিরুদ্ধে গিয়ে বদ টার প্রেমে পড়েছে সে! এরকম অসভ্য বেহায়া ঠোঁটকাটা মানুষের প্রেমে ধপাস করে পড়া মোটেও উচিত হয়নি তার। বদটাকে ঠেলেঠুলে সরাতে পারলে প্রথমে ফোন হাতে নিয়ে গুগলে সার্চ করবে সে!
সার্চ করবে প্রেমে পড়ার পরে সেটা থেকে উঠে দাঁড়ানোর উপায়!

