#মেঘের_মুলুকে_চল
#আয়রা_তাবাস্সুম
#পর্ব১৪
[নন ফলোয়ার রা পেইজ ফলো দেন না কেনো?? হোয়াই! আপনারা কি ইমান আযহার ভুইঁয়া?? নাকি ওর কুটনি বউ?]
দুদিন আগেও নাজিয়ার বিরক্ত লাগছিল বাসায় টিভি সিরিয়ালের মতন জমজমাট কোনো কাহিনি কেনো হয়নি সেটা নিয়ে৷ তার এই ইচ্ছে যে এভাবে পুরণ হবে সেটা সে দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি।
সেদিন বিকেলে ভুইঁয়া পরিবারে সত্যিকার অর্থেই একটা জমজমাট টানটান উত্তেজনার কাহিনি ঘটল!
বাড়ি থেকে বেড়িয়ে আসায় সকাল থেকে নাজিয়ার মেজাজ বেশ ফুরফুরে৷ বিকেলে ভালো ঘুমও দিলো একটা। ঘুম ভাঙল ননদের ডাকে। টিভিতে কোন একটা জনপ্রিয় হিন্দি মুভি চলছে৷ তাই ইশিতা চাইল ভাবিকে সাথে নিয়ে দেখতে। দুই ননদ ভাবী তখন সবেমাত্র লিভিং রুমের ডিভানে বসে মনোযোগ দিয়ে মুভি দেখতে শুরু করেছে৷ তখনই মনোযোগ হটল কলিংবেলের শব্দে৷ নাজিয়া জানে এটা বদ টা হবে না৷ আসতে আসতে তার সন্ধ্যে হয় রোজ। দরজা খুলতে গেল ইশিতা। নাজিয়ার শাশুড়ি তখন কিচেনে৷ শশুর ও বাড়িতে।
নাজিয়া উঁকিঝুকিঁ দিয়ে লিভিং রুম থেকেই দেখছিল কে এসেছে। ইশিতা বেজার মুখে সরে যেতেই দরজা দিয়ে ঢুকা মানুষটাকে নজরে পড়ল তার। নিমিষেই মুখ থেকে রক্ত সরে পাংশুটে বর্ণ হয়ে উঠল চেহারাটা। ব্রেইন ও যেনো দু মিনিট সময় নিলো পুরো ব্যাপারটা বুঝতে। লম্পট টা একা আসেনি। সাথে এনেছে আরেকটা মেয়েকে৷ মেয়েটার পেটের বেবি বাম্প টা নজর এড়ালো না নাজিয়ার।
চেহারায় বাঙালিয়ানা থাকলেও মেয়েটার পড়নের সাজ পোশাক চালচলনে মডার্ন বিদেশিনী ভাব প্রবল। নাজিয়া দুজনকে একপলক দেখে বিতৃষ্ণায় মুখ ঘুরিয়ে নিলো৷ এরকম লম্পট চরিত্রহীনের সাথে বিয়ে হবার কথা ছিল তার! এমন ভাবনা মনে আসতেই একটা বিশ্রী তিতকুটে অনুভুতি যেনো তার গলায় দলা পাকিয়ে থাকল৷ ইচ্ছেও হলো না ফ্রড টার মুখ অব্দি দেখার!
ইশিতা দরজা খুলে তার ভাইকে একনজর দেখেই চটজলদি মুখ ফিরিয়ে দেখল নাজিয়াকে৷ নিজে মেয়ে হওয়ায় সে জানে ভাবির মনে এখন কি চলছে। তার নিজেরও রুচি হলো না এমন ভাইয়ের সাথে হাইহ্যালো করার! দুটো শব্দও কথা বলার! ভাইয়ের পেছনে দাঁড়ানো মেয়েটাকে দেখে ঘৃণাও লাগলো তার।
এক লহমায় ইশিতার মাথায় এটা আসলো তার বাবা বাড়িতেই আছে। কি যে মায়া হলো তার নিজের বাপের জন্য। ইশিতা ত জানে কিভাবে তার ভাইয়ের এক কথায় তার বাপ কোনো বিচার বিবেচনা না করেই ইন্টারমিডিয়েটের পর তাকে বিদেশে পড়তে পাঠিয়েছিলেন ৷ মাও একবাক্যে ছেলের আবদারে সায় দিয়েছিলেন বিনা দ্বিধায়। ছোট থেকেই মায়ের চোখের মণি তার বড়ভাই।
আর সেই সমস্ত আদর আহলাদের সুযোগ নিয়ে তার ভাই বিদেশে গিয়ে এওর সাথে মিশে বিধর্মীদের কালচার ফলো করে লিভ ইন রিলেশনশিপে থাকল বছরের পর বছর। একটা মেয়েকে প্রেগন্যান্ট ও বানিয়ে বসল তবুও ভালো আদর্শ ছেলেটির ভান ধরে আরেক মেয়েকে ঠকাতে বিয়েতে বসল। দু বার ভাবলও না এমন অনাচার করতে!
ইশিতার ভাইয়ের পেছনে দাড়ানোঁ মেয়েটার জন্যও বিন্দুমাত্র সিম্প্যাথি কাজ করল না। কনসেন্ট ছাড়া ত আর কেউ লিভ টুগেদারে থাকতে পারে না, প্রেগন্যান্ট ও হয়না। এর মানে দাঁড়ায় যা হয়েছে দুজনের ইচ্ছে তেই হয়েছে। যেমন নোংরা তার ভাই, তেমন নোংরা এই মেয়ে!
সে এটাও বুঝল নিশ্চয় দুজনে মিলে কোনো বড়সড় নাটকের প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে নাহলে বাবার নিষেধাজ্ঞার পরও ভাই এই বাসায় আসবে কেনো! মনে মনে ভাবল, ‘দেখা যাবে বড়ভাইয়া মায়ের পা ধরে কান্নাকাটি করে এই বাসায় ঘাটিঁ গেড়ে বসবে। বাবা র কাছে ত নো চান্স৷ এজন্য বড়ভাইয়া বরাবরের মতন মায়ের একপাক্ষিক অন্ধ ভালোবাসার সুযোগ নিবে।’ ইশিতার আবারও খুউব ঘিন লাগল নিজের ভাইকে।
সে জানে এখন বড়ভাইয়া মাকে এটাসেটা ভুলভাল বোঝাবে৷ প্রয়োজনে হয়তো পুরো দোষটা আযানের ঘাড়ে কোনোভাবে দিয়ে দিবে ছোটবেলার মতো৷ ইশিতা পরিস্থিতি হাত থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগেই চটজলদি বাপের রুমের দিকে পা বাড়াল।
ইমান আযহার ভুইঁয়া। জেনেটিক্যালি মায়ের ম্যানিপুলেটিভ আর গ্যাসলাইটিং ন্যাচার পেয়েছে। নিজের অতিমাত্রার চালাকি এবং বুদ্ধিমত্তার গুণে সেগুলো এমনভাবে রপ্ত করেছে যে মানুষ সহজে বুঝবে না সে কথার বশে তাদের কাছ থেকে নিজের কাজ আদায় করে নিচ্ছে৷ মায়ের কাছ থেকে জিনগত ভাবে এটা পেলেও সে সবচেয়ে বেশি মায়ের উপরেই নিজের এই কায়দা চালিয়েছে। আজও তার বিশ্বাস এই ফাঁড়া সে কেটে উঠবে৷ এত টেনশনের কিছু নেই। মায়ের সাথে একবার কথা বলতে পারলেই হবে!
দরজা দিয়ে ঢুকতেই নাজিয়ার এক ঝলক পেতেই যদিও ইমানের কনফিডেন্সে কিছুটা ভাটা পড়ল৷ মেয়েটা এখানে না থাকলে কাজটা আরো সহজ হতো তার জন্য। এখন তার মা যতই তার পুত্রপ্রেমে অন্ধ হউক ছেলের করা অপরাধের একটা জলজ্যান্ত নমুনা সামনে থাকলে মায়ের ত দ্বিধা কাজ করবেই তাকে ক্ষমা করতে! তার ইমোশনাল নাটকে গলে জল হতে!
কি একটা ভেবে দু মিনিট দাঁড়িয়ে থেকে কপালে আঙুল ঘষে নাজিয়াকে আবারও দেখল সে৷ মেয়েটা তীব্র ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে আছে হয়তো। ইমানের অবশ্য এসবে মাথাব্যথা নেই। ইনফ্যাক্ট মেয়েটার জীবনে এমন বিপর্যয় ঘটিয়েও তার বিন্দুমাত্র রিগ্রেট হয়নি একবারও৷ বরং মনে হয়েছিল কাজটা আরেকটু সাবধানে করলে ব্যাপারটা এতদুর গড়াত না। প্ল্যান ও তেমন ছিল।
বাবা মেয়ের ভালো আদর্শ ছেলে সেজে মেয়েটাকে বিয়ে করে দেশে ফেলে রাখত সে। আর বাপের বিজনেস পুরোটা আয়ত্বে এনে বিজনেস ট্রিপের নামে বারবার বিদেশে যেয়ে তার দীর্ঘদিনের হাফ বিদেশিনী গার্লফ্রেন্ড ডেইজি র সাথে থাকত। যদিও এখন ডেইজি কে তার একটা আপাদমস্তক ঝামেলা ছাড়া আর কিচ্ছু মনে হচ্ছে না। স্টুপিড মেয়েটাই ত ফোলা পেট টা নিয়ে তার সাথে বিদেশ থেকে দেখা করতে এসে তার সমস্ত প্ল্যানে পানি ঢেলেছে।
পুরনো ঘটনা মনে পড়তেই ইমানের চোখমুখ বিতৃষ্ণায় কুঁচকে এলো।
তবুও পেছনের মেয়েটাকে আলগা মহব্বত দেখিয়ে হাত ধরে আস্তেধীরে বাসার ভেতরে নিয়ে এলো। এখন এই মেয়ে টাই তার তুরুপের তাস। এই ফোলা পেট দেখিয়েই মায়ের মন নরম করবে সে৷ এসমস্ত ভাবনা ভাবতে ভাবতেই ইমান পা বাড়াল বাসার ভেতর। আগে মাকে একলা পেয়ে এটাওটা বুঝিয়ে বাগে আনতে হবে।
মেয়েটাও এক জায়গায় স্থির হয়ে দাড়াঁল না। ইমান আযহার ভুইঁয়া র যোগ্য সহধর্মিণী সে। কথার চালে বাজিমাত কিভাবে করতে হয় তা তার ভালোই জানা৷ তাই নাজিয়াকে দেখে রাগে তার গা কিড়মিড় করে উঠলেও মাথা ঠান্ডা রেখেই তার দিকে এগিয়ে আসল কথা বলতে৷
রসিকতার ছল করেই বসে বসল কিছু কড়া কথা!
‘নাজিয়া রাইট? সাচ অ্যা প্রিটি লেইডি ইউ আর!’
বিদেশে থাকলেও তার ঝরঝরে বাংলা এক্সেন্ট শুনে নাজিয়া বেকুব বনে গেল৷ বুঝল বিদেশে পেলেবেড়ে উঠলেও মেয়েটা হয়তো জন্মগত ভাবে বাংলাদেশি। অবাক হবার রেশ কাটিয়ে না উঠতেই মাথা ঝিমঝিম করে উঠল মেয়েটার পরবর্তী কথাটা শুনে। প্রশংসার আড়ালে নাজিয়াকে অপমান করার কি দারুণ প্রচেষ্টা মেয়েটার!
‘অ্যাকচুয়েলি তোমাকে শুধু প্রিটি ডেকে ভুল করলাম। বলা উচিত বিউটি উইদ ব্রেইন৷ সাংঘাতিক উপস্থিত বুদ্ধি তোমার! কি সুন্দর এক ভাইয়ের সাথে বিয়ে না হওয়ায় আরেক ভাইকে বিয়ে করে সিচুয়েশন সামলে ফেললে! সিরিয়াসলি হ্যাটস অফ গার্ল!’
নাজিয়া ফিডার খাওয়া বাচ্চা না। ঠিকই বুঝল মেয়েটার কথার ইঙ্গিত। মুখ খুলে মেয়েটাকে সৌজন্যতার ধার না ধরেই কঠিন কিছু কথা শুনাবে তার আগেই শুনল গমগমে ভরাট গলার আওয়াজ। গলাটা নাজিয়ার ভীষণ পরিচিত, ভীষণ প্রিয়!
‘আমার ওয়াইফের চেয়ে উপস্থিত বুদ্ধি ত আপনার বেশি ম্যাডাম! একেবারে বাচ্চা পেটে নিয়ে চলে আসলেন অধিকার বুঝে নিতে। আপনার এমন বুদ্ধির কাছে আমার ওয়াইফের মাথাভর্তি বুদ্ধিও ফেইল’

